ঈদের আগের দিন রাত থেকে আব্বুকে হাসপাতালের আই সি ইউতে নিয়ে রাখতে হলো । পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে জানা গেলো , যা ভয় পেয়েছিলাম তাই, মাইল্ড হার্ট এটাক । আগেও হয়ে গেছে , ধারনা আর ই সিজি বলে , তিন তিন বার ; তাই এবার ভয়টা বড় বেশি । মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারি না , ভিতরে ভিতরে কেমন লাগে । মন কেন যেন বার বার বলছিলো , এই শেষ । আর আব্বুর সাথে দেখা হবে না , কথা হবে না রাজনীতি , বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ; আর দিন রাত জেগে লেখা হবে না "জনগণের মুক্তি"। এই পর্যন্ত লেখা বই ক'টা দিয়ে এসেছিলাম আরিফ জেবতিক , অন্যমনস্ক শরৎ , বাকীবিল্লাহ , কৌশিক প্রমুখকে । যথারীতি তাদের কোন উচ্চবাচ্য নেই আর । জানতেও পারিনি আব্বুর গাঁটের পয়সা খরচ করে ছাপানো বইটা কেউ পড়লো না ইঁদুরে কাটলো ! বিনম্র অভিমানে জিজ্ঞেস করিনি কাউকে , করবোও না । এমন কত মানুষই তো কথা রাখলো না ; তাদের সবার কাছে প্রশ্ন করতে গেলে এক জীবন পার হয়ে যাবে ।
আব্বুর শরীরে বয়সের কশাঘাত পড়েছে বহুদিন আগেই। আজন্ম মাটি, কাঁদা মেখে দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া আব্বুকে শেষের দিকে দেখতাম বাড়ি থেকে বের হলেই ঢাকার ধুলো, ধোঁয়া, রোদ-তাপ আর অসহনীয় দূষণ কাবু করে ফেলছে । বাড়ি থেকে বের হলেই অসুস্থ লাগে , মাথা ঘুরে যায় হাঁটতে গেলে - তাই সহজে বের হতে চাইতেন না । প্রথম যেদিন নিজামী সংসদে গেলো , আব্বুর স্বজন, বন্ধু , ভাইয়ের রক্তে রাঙানো পতাকা বিশেষ নিরাপত্তা ও সুবিধা দিয়ে বহন করতে লাগলো এই বরাহ নন্দন ঘাতককে -সেদিন দেখেছিলাম , একজন জীবন্মৃত মানুষের চেহারা। ভুল হলো । এক নয়, দু'জন । মামণি বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন আর বলছিলেন , "আমার বাবার লাশ, ভাইয়ের লাশ পায়ে মাড়িয়ে এই শয়তানের বাচ্চা সংসদে যাবে ? "
মেডিকেল সাইন্স অনেক কিছুই বলবে । বলবে বয়স, ব্লাড প্রেশার , টেনশন - আরো কত কি ! কিন্তু , ডাক্তার হয়েও আমি জানি , আব্বুর শরীর আসলে খারাপ হয়েছে দেশে যুদ্ধাপরাধীদের আগ্রাসন দেখে । আরেকবার জেগে উঠতে দেখলাম তাঁকে । সেই ১৯৭১ এ যেমন জান বাজি রেখে করাচী থেকে পালিয়ে এসে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন , নয়টা মাস কোন রকম সাহায্য ছাড়াই বন্ধু আর গ্রামের ছেলে পেলেদের নিয়ে পাহারা দিয়েছিলেন ৮ নম্বর সেক্টরের অনেকটা এলাকা , সেই রকম প্রত্যয় নিয়ে আবার ঝাপালেন যুদ্ধে । এবার হাতে কলম আর বুকে আগুন । কখনো নাগরিক সম্প্রদায়, কখনো কমান্ডার'স ফোরাম , কখনো সচেতন নাগরিক সমাজ - যখন যেখানে পারলেন , মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে , যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিরোধের সংকল্পকে তুলে ধরলেন । মানুষকে জাগানোর সংগ্রামে সকাল, বিকাল , সন্ধ্যা , রাত মিটিং , মিছিল, মানব বন্ধন , সেমিনার , পত্রিকা , সংবাদ সম্মেলন , যে কোন সভায় যেতে লাগলেন । শরীর সহযোগিতা করে না । তাই লুকানো শুরু করলেন নিজের অসুস্থতা । ডাক্তার কন্যার কাছে ধরা পড়ে গেলে নিতান্ত অনভ্যস্ত কন্ঠে ধমকে চুপ করিয়ে দিতে চাইলেন । কন্যা বুঝে নিলো , সংগ্রাম চলবেই , যে কোন মূল্যে ।
বার বার একটি কথাই বলেন । " যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে আমরা জিতেছিলাম, পেয়েছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশ। দ্বিতীয় পর্যায় এখনো চলছে । এর শেষ হয়তো দেখে যেতে পারবো না কিন্তু আরেকবার একটা গনজাগরন এর শুরুটা অন্তত দেখে যেতে চাই । ৭১ আমাদের শ্রেষ্ঠ শক্তি । ৭১ আমাদের শ্রেষ্ঠ গৌরব। একাত্তর আমাদের শ্রেষ্ঠ পথ প্রদর্শক । আরেকটা ৭১ দরকার , আর অন্য কোন উপায় নেই।"
আমিও জানি, আব্বুও জানে , আর বেশিদিন পাবো না তাঁকে । সবাই ঘুমিয়ে গেলে রাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদি । দিনে কাঁদি না । আর কাউকে জানতেও দেই না । আব্বুর জন্য চোখের জল নয় - একটাই ছোট্ট স্বপ্ন আমার- মৃত্যুর আগে তাঁকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে , এই উপহারটা দিতে চাই ।
মানুষটা বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করে বিনিময়ে কোন সুবিধাই নেননি কোন দিন, না কোন আরাম , না কোন স্বীকৃতি ... ... ... তাঁর এই একটি চাওয়া পূরণ করতে চাই ... ... ... রাজাকার , আল বদর , জামাত -শিবির তথা বাংলাদেশের মানুষের রক্ত চুষে খাওয়াদের হাত থেকে " জনগণের মুক্তির" প্রথম ধাপটি তাঁকে দেখাতে চাই।
বাংলাদেশের জন্য তাঁর আত্মত্যাগ , তাঁর ভালোবাসাকে সম্মান জানানোর এই একটা চেষ্টা আমি করতে চাই প্রতি ক্ষণে , প্রতি মুহূর্তে !
কমরেড, থাকবেন না সাথে ?
আলোচিত ব্লগ
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন
স্মৃতির নৌকা
কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।
কোন কোন সন্ধ্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।