যমুনা কি বলতে পারে
কত বার কেঁদেছে রাধা ?
আনমনে চলতে গিয়ে কোন পথে পেয়েছে বাধা !
অঙ্গে সোনা ছিলো যত
কলঙ্কে দ্বিগুণ তত
সে কালি চন্দন হতো অবিরত
কালিন্দীর ওই কালো জলে ভেসে গেলো নিরব কাঁদা ।
ধন্য প্রেমে জরজর
আনন্দ অধিক আরো
পিরীতি সুন্দরতর মনোহর
গুণধর রুপ লাগি দিবানিশি হয়েছে সাধা ।
"এইটা খেয়ে নে।" মা কোন ফাঁকে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন বোঝেনি বর্না । শাড়ি, ওড়না, মাথা ভরা ফুল আর জড়োয়া গয়নার ভিড়ে টুক করে মুছে নিতে তাও সমস্যা হয় না । একটু ঝুকে পড়ে , যেন অনেক কঠিন , অনেক ঝামেলার এই পরিবর্তন , এমন ভাবেই বর্না মুখ ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকায়। হাসি মুখে দাঁড়িয়ে একটা ছোট্ট খাট্ট মহিলা । ঢাকার একটা প্রায় অন্ধকার পাড়ার ঘিঞ্জি ফ্লাটের চারদিক বদ্ধ রুম। কোন দিক থেকেই বাতাস কিংবা আলো ভুলেও ঢোকে না। যদি আর বেরুতে না পারে ? সেই ঘরেই ছড়ানো ছিটানো উপহার, শাড়ি , কাপড় এটা সেটার এক পাশে বউ এর সাজে সজ্জিত বর্না । লালচে কমলা কাতানটা ওর নিজের পছন্দ করে কেনা । মাকে যা মানিয়েছে ! প্রায় তিরিশ পয়ত্রিশ বছর ধরে প্রয়োজন আর প্রাপ্তির হিসেব ঘানি টেনে মায়ের দুধে হলুদ গায়ের বরণের কিছুই অবশিষ্ট নেই। তবু মায়ের দিকে মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকে বনু । তার কারন মায়ের অমলিন হাসি । অনেক, অনেক দিন পরে মা আজকে সূর্যের মত ঝলমল করছেন । একলাই সব অন্ধকারকে ঠেলে সরিয়ে দেবেন তিনি যেন! যেমনটা করেন তিনি রোজ সকালে তার দুই হাত বাই পাঁচ হাতের ছোট্ট রান্না ঘরে । কোন মতে এক মানুষ সমান চিলতে বারান্দায় । ঐটুক জায়গায় এমন সর্বশক্তি দিয়ে ঝাড়ু চালনা করতে দেখলে যে কারো সন্দেহ হবে উনি সিটি কর্পোরেশনের বেতনভূক ঝাড়ুদার, ঢাকা পরিষ্কারের দায় একলাই তার!
" বনু, ওরা যেতে মনে হয় সময় নেবে রে। শরবতটা খেয়ে নে। আর পারলে আমি একটুস ভাত চুরি করে পাঠিয়ে দেব। " মা ফিস ফিস করে বলেই রুম থেকে বেরিয়ে যান, পাছে সমস্ত পৃথিবী জেনে যায়, বর্না অতিথিদের ফেলে ভাত খেয়ে ফেলেছে ।
" চাঁদ তারা সূর্য নও তুমি, নও পাহাড়ি ঝর্ণা ,
যদি বলি ফুল, তবুও হবে ভুল , তুমি আমার বর্না।"
আবোল তাবোল গানের বাউলা ছেলেটার কথা মনে পড়ে খুব। বাম রাজনীতির একনিষ্ঠ ছাত্র , সমাজ বদল , বাংলাদেশ বদলের স্বপ্নে বিভোর ছেলেটার কথা । কি উচ্ছ্বল, কি হাসিখুশি, কি তার গানের গলা। বর্না ওকে চিনতোই না বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে পদার্পনের দুই বছর পরেও। চিনবেই বা কি করে ? ওর মত যারা পড়ালেখাকে দারিদ্র ক্লিষ্ট এক ঘেঁয়ে জীবন থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র সম্বল করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে , যাদের টিউশনি না পেলে যাওয়া আসা কিংবা দুপুরে খাওয়ার চিন্তায় অস্থির থাকতে হয় , তাদের ঐসব সমাজ, দেশ বদল করে কে কি উদ্ধার করে ফেললো তা দেখলে চলে না । ও দেখেনি আসলে । ছেলেটাই দেখেছিলো । হুট করে কার মাথায় ঢুকলো আবৃত্তি সন্ধ্যা করতে হবে এবং সেখানে অংশ গ্রহন করতে হবে সবাইকেই । এইটা সর্বজন বিদিত সত্য যে হলের অনুষ্ঠান গুলোতে দর্শক সংখ্যা বাড়াতে হলের দারোয়ান , রান্নার লোক আর দুই চারটা পুলিশ ভাড়া করে আনতে হয় । ফিরি খাওয়ার ব্যবস্থা ছাড়া আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রতিযোগীই হয়ত পাওয়া যাবে না । সুতরাং , পাল্লায় পড়ে বর্নাকে একটা কবিতা মুখস্থ করতে হলো । সেটা দাঁড়িয়ে বলতে হলো আর পুরস্কার ও জুটে গেলো কারন বাকি আবৃত্তিকারদের একজনের ডেটিং পড়লো ঐদিন আর অন্যজন খাবার কিনতে গিয়ে জ্যামে পড়েছিলো । তারপরেও প্রতিযোগী বলে কথা , ঘটা করে পুরস্কার দিয়েছিলো রঞ্জন । জয়িতার ক্লাসে মুরাদ আর নাইম যত রকমের বাদরামি করে তার আসল পরিকল্পক হিসেবে রঞ্জনের নাম খুব শুনা যেত । কেউ কখনো দেখেনি । ঐ সন্ধ্যায় বিশেষ অতিথির পদ অলংকৃত করে রঞ্জন এলো । সাথে আরো আড্ডাবাজ বন্ধু বান্ধব নিয়ে । সেইখান থেকে বর্নার বান্ধবী জুটে গেলো জেবীন, সাকি, আইরিন , শামীমা। শামীমা রঞ্জনের দোস্ত মুরাদক্কে বিয়ে করে বর্নাদের ঐদিকেই বাসা নিলে ওদের আড্ডাতে বর্নার উপস্থিতি সহজ হয়ে ওঠে ।বর্নাকে দেখে রঞ্জনের ভালো লেগেছিলো কিনা সঠিক কেউ জানে না । যদিও পরের দিকে ওর অনেক কবিতা কিংবা গানে ঘুরে ফিরে বর্না শব্দটা কেন আসতো এটা অনেকেই হাসি ঠাট্টায় বলতে ছাড়েনি ।
কোন রকমের ইঙ্গিতেই বর্না সাড়া দেয়নি কখনো । প্রতিবাদও করেনি । বাড়ির বড় মেয়ে ও। যে কোন দিন বিয়ে হয়ে যেতে পারে । সেটা জানতো বলেই স্বপ্ন দেখার সাহস ওর কোন্দিন হয়নি । রঞ্জন ঠিক উলটো । ও যেন জন্মই নিয়েছে স্রেফ স্বপ্ন দেখার জন্য । নিয়মিত আড্ডার অংশগ্রহনকারী হওয়ার পর বর্না নিজেই যেন ওর নিবিষ্ট শ্রোতা হয়ে উঠেছিলো। একটু একটু করে ওর কাছে দুনিয়াটা বড় হচ্ছিলো । মায়ের রান্না ঘর , বাবার হিসেবের টানাটানি আর টিউশনির বাইরেও যে একটা পৃথিবী আছে , ওখানে মানুষ খাওয়া আর টাকার চিন্তা ছাড়াও অন্যকিছু ভাবে , আবিষ্কার করে , বাঁচে - এইটা বর্নার চিন্তাজগতে ঢুকে পড়ছিলো । বর্না নিয়মিত বই ধার নিতে শুরু করে । ওরা আলোচনায় যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করে , সেই সবের খবরও রাখতে শুরু করে । কথা না বললেও বুঝার চেষ্টা করে এবং এক সময় আবিষ্কার করে ও আসলেই অনেক চট করে অনেক কিছু বুঝতে পারে । সমাজ, সংসার , জীবন , পৃথিবী , বিজ্ঞান - ওর চোখে বদলাতে শুরু করে । বর্না পড়ালেখায় বরাবরই ভালো । ঐ যে , পিন্ডি যোগাড়ের তাগিদ ! কিন্তু এইবার ওর ভালো ফলাফল কিংবা ছাত্রীত্বের পাশাপাশি কিছু নতুন লক্ষ্য যোগ হয় । উৎসাহ বাড়ে । বর্না নিরবেই নিজেকে শানিত করে । চিন্তায়, চেতনে , মননে , দৃষ্টিভঙ্গীতে ও নিম্নমধ্যবিত্তের ভীতি আর অল্পসন্তুষ্টির বেড়া কেটে সার্বজনীন হয়, তুখোড় হয় , আন্তর্জাতিক হয়।
বর্না লুকিয়ে লুকিয়ে লিখতে শুরু করে । নিজেই লেখে নিজেই পড়ে । লেখার বিভিন্ন পয়েন্ট গুলো মাঝে মাঝে আড্ডায় উঠিয়ে দিয়ে নিজে চুপ হয়ে যায় । অন্যদের , বেশি পড়ুয়া আর বেশি জানিয়েদের তর্ক শোনে । ভেতরে ভেতরে ওর বিশ্লেষক সত্ত্বাটা বিকশিত হয় একটা বৃক্ষের মত । ফলাফলটা প্রথম টের পায় সবাই ওর গবেষনা পত্রের নম্বরে । ভূয়সী প্রশংসাসহ বিভিন্ন শিক্ষকের অভিনন্দন ওর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিলে পেপারটাকে ঘষে মেজে প্রকাশ করার উদ্যোগ নেয় । ওতে বর্নার চেয়ে ওর আড্ডার বন্ধুদেরই যেন উৎসাহ বেশি । কোথায় লিখতে হবে , কোথায় কাকে ধরতে হবে -- এই সব চলে । অতি উৎসাহীরা ওর নামে এখানে ওখানে এপ্লাই ও করে ফেলে । আহা দেখাই যাক না, একটা স্কলারশীপ হতেও তো পারে! হয়েও যায় । বর্না নিজের চোখে কানে বিশ্বাস করতে পারে না । ওর মত একটা মেয়ে বিদেশ যাবে পড়তে তাও আবার কিনা স্কলারশীপ নিয়ে! বাড়ির সবাই মনে হয় খুশিতে পাগলই হয়ে যাবে। কিন্তু একটা সমস্যা দেখা গেলো স্কলারশীপের পরিমান নিয়ে । থাকা , খাওয়া , টিউশন মিলিয়ে সবটা হয় না । যেটুকু বাকি পড়ে , তা বেশি নয় । কিন্তু বর্নাদের পরিবারে ওটাই অনেক বেশি। যেখানে যেতে হবে সেখানে কোন আত্মীয় স্বজন নেই । কি যে হবে ভেবে কেউ কূল কিনারা করতে পারে না ।
এক সময় হঠাৎ করেই সমাধান হয় । বাংলাদেশে শিক্ষিত মেয়ে যারা বিদেশ যাওয়ার জন্য স্কলারশীপ পায় , তাদের সমাধান যে ভাবে হয়, সেভাবেই । এই সব সমাধানে কোন চমক নেই । আর দশটা সমাধানের মতই বর্নার সমাধানটাও একটা কাগজ, কিছু নতুন মানুষ , একটা নতুন পরিবার আর কিছু অলঙ্ঘনীয় শর্ত নিয়ে আসে । আশে পাশের মানুষের খুশি আর আনন্দের কোন সীমা নেই । অতি সাধারন গল্পের মতই তারা খিল খিল করে হাসে, কেনা কাটা করে , মিষ্টি আর উপহার আদান প্রদান করে, খুঁটি নাটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া ঝাটিও করে । এবং নির্দিষ্ট সময় পরে সব খুঁটি নাটি মিটে গিয়ে আবার হাসাহাসি হয়। বাড়িটা ফুলে ফুলে সেজে ওঠে । রঙ মাখে । বাজনা বাজে ।উপন্যাস বা সিনেমার মত এখানে কোন অঘটন ঘটে না । কেউ বিষ খায় না । কেউ কাজ কর্ম ভুলে উদাস হয় না । বন্ধু মহল থেকে অজানা অচেনা কারনে কেউ বাদও পড়ে না । সকলেই হাজার গুণ উৎসাহ নিয়ে অনুষ্ঠান করে, অনুষ্ঠান শেষ করে ।
কেউ অবশ্য জানতে চায় না বর্না আর রঞ্জনের মধ্যে কোন কথা হয়েছিলো কিনা। কেউ জিজ্ঞেস করে না , ওরা আড্ডার বাইরে কোথাও কখনো দেখা করেছিলো কি না । কেউ এটাও ভাবে না ওদের দুজনের কাউকে কেমন লাগছে, কেমন আছো প্রশ্নটা করতে হবে কিনা । আরে বাবা , খুশির ঘটনা ঘটছে , নিশ্চয়ই সকলেই অনেক অনেক খুশি ।
শুধু কেউ একলা হলে কেন ভাবে " মররে তুই মরেই যা, হেথাক তোকে মানাইছে নারে , ইখেবারে মানাইছে না রে " !
যমুনা কি বলতে পারে (শিপ্রা বসু)
[ এই গল্পের কাহিনী বা ঘটনা ব্লগের কারো সাথে কোনভাবেই কোন মিল নেই। তবে পরিচিত কিছু নাম ব্যবহার করা হয়েছে । কোন কিছুরই কোন মানে নেই । আজকেই শিপ্রা আর লাল পাহাড়ির গান দুটো শুনলাম আর মনটা উদাস হলো । এই সবই উদাস মনের পাগলামি । স্রেফ গান দিতে ইচ্ছে হলো না তাই ফুট নোটের মত করে ফুট গল্প। দুইটা সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী গানকে এক জায়গায় করার অপপ্রয়াস ।কিংবা , ধুত্তুরি , হবে কিছু একটা , অথবা কিছুই হয় নাই । মাইনাস]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


