আমার মা-টিও বাংলাদেশের আর সব মায়েদের মত অতীব সুশীলা এবং সর্ব গুণে গুণান্বিতা ধরনের। তিনি রাধেন ভালো। চুল বাঁধেন ভালো। ঘরকন্নায় নিখুঁত ধর্মে বিশ্বাসী । তার এই নিখুঁতের ঠেলায় জান ত্রাহি করে ঘর গুছাতাম এক সময় । পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা জনিত তার কুকর্মের সুবাদে আমি পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে অপারগ! কোথাও গেলে কাপড় চোপড় নেই না নেই, ব্যাগ ভর্তি করে জীবানুনাশক নিতে ভুলি না। যে কোন রান্না খেতে পারি না বলে বাধ্য হয়ে রান্না শিখেছি। সুন্দরের ধারণাটি তিনি শিশুবেলা থেকে গেঁথে দিয়েছিলেন বলে সুন্দরের প্রতি একটু নির্লজ্জ রকমের টান আছেই। কিন্তু মুশকিল হইলো অন্য জায়গায় ।
তিনি সুজলা , সুফলা , শস্য , শ্যামলা বাংলার মত অতুলনীয় এক মা হইলেও তার কিছু ব্যতিক্রমী ঝামেলাও আছে। যেমন তিনি আমাকে লালন পালন করেছেন ঠিকই কিন্তু তার বিপরীতে আমার কাছ থেকে তিনি কোন রকম উপহার গ্রহন করেন না । তিনি অন্যের উপকারে নিজের সময় ও জীবনিশক্তি বিলিয়ে দিতে ওস্তাদ । আমার ভেতরেও এই ধরনের বাজে অভ্যাসটা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, প্রাণ পণ লড়ে যাচ্ছি সেই দুর্মতি দূর করতে। খুব একটা লাভ হচ্ছে না । সামনে পরীক্ষা বা প্রজেক্ট কিংবা রিসার্চ জাতীয় একান্ত ব্যক্তিগত কোন কাজ থাকলেই আমার ভিতরে পরোপকারের নেশা দাউ দাউ আগুনের ন্যায় জ্বলিয়া উঠে ।
তখন নিজের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলিয়া অন্যের উপকার করার জন্য অস্থির হই। অন্যে উপকার না চাইলেও জোর করিয়া চাপিয়া ধরিয়া উপকার করি। অতীতে এই রকম কতিপয় উপকৃতরা মামলার হুমকি দিয়ে জীবন রক্ষা করেছেন।
তারপরের ঝামেলাটা ব্যাতিক্রমী না হইলেও খ্যাতিক্রমী । মানে বাড়িতে কোন আঙ্কেল আন্টি , আত্মীয় আসিলে অন্যের সন্তানের সুনাম ও নিজের সন্তানের দুর্নাম করার যে বাংগালী সংস্কৃতি রহিয়াছে , উনিও সেইটি পালন করতেন। ফলে, ছোটবেলায় আমার অনেক সুখ্যাতি ছিলো । এই যেমন আমার হাত যে হাটু পর্যন্ত লম্বা এবং বখতিয়ার খিলজি সাহেবের সাথে আমার কি কি মিল আছে , সেই সব। কিংবা আমার বাহুর আশে পাশে কোন কাঁচের জিনিস টেবিলে রাখা ঠিক না। অথবা , জোরে বাতাস লাগিলে আমি কেমন ঊড়ে যাই বক পক্ষী - সেই সব। আচারের বোতল জিহবা দিয়ে চেটে পরিষ্কার করার নৈপুণ্য , গরম পানি বা ডালের হাড়িতে পদার্পণের আশৈশব দক্ষতা , হাটু ও কনুই ছিলা প্রজেক্টে আমার একাগ্রতা - সেই সব।
ঠিক এই কারণেই আমার জোর দাবী , একটা সন্তান দিবস চালু হোক । কেবল পোস্ট লেখার সময়েই যদি উনারা বাচ্চাদের খানিক প্রশংসা করতে পারেন, আলহামদুলিল্লাহ!
আরেকটা সময়ে বেশি বেশি প্রশংসা করে মায়েরা । সেইটা হলো বিয়ে দেওয়ার সময়ে। প্রতি বছর বিয়ে তো দেওয়া সম্ভব না , আমার প্রস্তাব হইলোঃ আসেন আমরা শ্বাশুড়ি ও বেয়াই দিবস চালু করি। এই দিন দুনিয়ার সব বউ তাদের শ্বাশুড়ি নিয়ে , সব শ্বাশুড়ি বউমা/জামাইদের নিয়ে আর বেয়াই-বেয়াইরা অপর পক্ষের বেয়াই, বেয়াইনদের নিয়ে পোস্ট দিবেন! ( পারিবারিক অশান্তির প্রযুক্তিগত সমাধান)
নাহ, আমার মামণী কিন্তু প্রশংসাও করতেন অনেক। আমি যে কিছুই না খেয়ে তার খরচ কম রাখি, লম্বা বলে মশারির দড়ি লাগাই , চিকন বলে আলমারির চিপা থেকে বলপেন কুড়িয়ে আনি আর ভালো গাছে চড়তে পারি- এইসব তিনি কোনদিনই লুকান নাই । আমার কবিতা - গান কিংবা খেলাধুলা নিয়েও উনার উৎসাহ কম ছিলো না। আমার গানের শুরু মায়ের কাছে । মামণী অসম্ভব গুণী গায়িকা । শান্তি নিকেতনের স্কলারশীপ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বাচ্চাদের জন্য। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী হয়েও আর পড়লেন না বাচ্চাদের জন্য। জীবনে নিজের পিছনে ১টা পয়সা খরচ করলেন না , বাচ্চাদের জন্য। আমার বই পড়ার শুরু মায়ের কাছে । আমার ভালো সিনেমা দেখার নেশা মায়ের কাছ থেকে । আমার সেলাই - ফোড়াই , রান্না , আড্ডাবাজি , হাস্যরসের হাতে খড়ি আমার মায়ের পরিবার থেকেই । এমন লিখতে শুরু করলে মাকে নিয়ে লেখা শেষ হবে না । তাই আজ আর লিখবও না ।
মায়ের প্রতি আমার একমাত্র অভিমান , মা আমায় কোন প্রতিদান দিতে দেন না । তিনি বলেন, আমার পরিচয় , আমার জীবন বলে কিছুই নেই । আমার পরিচয় আমার তিন মেয়ে । আমার জীবন আমার তিন মেয়ে। আমার টাকা পয়সা , ধন সম্পদ কিছুই নেই , আছে তিনটা মেয়ে । এই তো আমি !
অসম্ভব গুণী আর সুন্দরী এই মাকে আমি অবাক হয়ে দেখি আর ভাবি , এত কিছু নিজের মধ্যে ধারণ করেও মামণী কেন তার এই তিনটা বান্দরকে ছাড়া আর কোন কিছু দিয়েই নিজেকে পরিমাপ করেন না? তাকে পালনের ধৃষ্টতা আমার নেই। তাকে কেবল বুকের ভিতরেই লালন করতে পারি আমি , বাস্তবে পারি না । সে সুযোগ আমার হয়নি। কিন্তু , যে লেখালেখির নেশা নিয়ে বড়াই করি , সেই লেখাও তো একটা মাকে দিতে পারলাম না আজো ।
যতবারই মা-কে নিয়ে লিখতে যাই , আবোল তাবোল নিজের কথা লিখি । মা-কে নিয়ে আর লেখা হয় না। লিখতে পারি না । ঝাপসা চোখে কি-ই বা লেখা যায়!
( মামণি এই লেখাটি দেখেছেন এবং যথারীতি "রম্য" ট্যাগটি না খেয়াল করেই আমাকে জানিয়েছেন যে আমার লেখার ক্ষমতা ও দক্ষতা সম্পর্কে উনি যা জানেন, সেই তুলনায় আমার এই লেখাটি জঘন্য হয়েছে । সত্যি কথা বললে মন খারাপ করা ঠিক না । আমিও করিনি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


