গত দু’দিনের ভূমিকম্পের ক্ষয়-ক্ষতির আশংকায় ভীত দেশবাসী এখন অনেকটাই সংবাদমাধ্যম গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে কখন কোন পূর্বাভাস আসে কিনা। আবহাওয়া অফিসের উপর ভরসা (!) করে কেউ এখন আর বৃষ্টির দিনে ছাতা সাথে নিতে ভুলে যান না। তাই দেখা গেছে আমেরিকান জিওগ্রাফিক্যাল সার্ভে যে বলেছে ঢাকার ভূমিকম্প ৪.৬ না ছিল ৪.৮ মাত্রার তা-ই বিশ্বাস করেছে বেশিরভাগ মানুষ।
আমরা এই দপ্তরের বংশ উদ্ধার না করে বরং মূল আলোচনার দিকে তাকাই। কারন এখন আমাদের সামনে একটিই প্রশ্ন-এ ধরনের দুর্যোগ প্রতিরোধ না প্রতিকার কোন পথ বেছে নেব আমরা। সরকারের এ সংক্রান্ত একটি মন্ত্রণালয় রয়েছে যার নাম-ই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। এই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আসলে কি তা সবারই জানা। যখনই কোন পরিচিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যেমন-বন্যা, ঝড়, সাইক্লোন, জলোচ্ছাস ইত্যাদি) আসে তখনই এ মন্ত্রণালয় ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে ক্ষয়-ক্ষতির একটি মনগড়া তালিকা তৈরী করে সে অনুপাতে ত্রান বিতরনের কাজে। কিছুদিন পর আর সেই ’ব্যবস্থাপনা’-ও চোখে পড়ে না। শুরু হয়ে যায় লুটপাট, ত্রানের টিন দিয়ে বাড়ি তৈরী, চাল বিতরন হয় স্বচ্ছল কোন রাজনৈতিক নেতার পরিবারে। এ সবের পরও একটি শুকরিয়া অন্তঃত মন্ত্রণালয় আছে বৈকি। এখন পাঠকের মনোযোগকে অন্য একটি বিষয়ে আকর্ষিত করে আবারও ফিরে আসছি মন্ত্রণালয়ের নীতিতে।
সরকারের ভেতরে আর এক সরকার রয়েছে যে সরকারের পরিচালকদের মাথায় (কু)বুদ্ধি সঞ্চার করে থাকে। আমরা আরো আগেই দাবি জানিয়েছি যেন প্রস্তাবিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি না করা হয়। ১৮০০০ কোটি টাকা ব্যায়ে তৈরী এই উড়াল সড়ক কাজে লাগবে ঢাকা শহরে বসবাসকারী শুধুমাত্র ৫ ভাগ লোকের। অথচ যে পরিমান জমি অপচয় হবে তাতে ক্ষতির সম্মুখীন হবে প্রায় ১৫ ভাগ লোক। কিছুদিন পূর্বে প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা বলেছেন সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহনের স্বাধীনতায় প্রতিনিয়ত হস্তক্ষেপ করে যাচ্ছে এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী। এরা সরকারদলীয় পরিচয়ে ঠিকাদারী কাজ পাওয়ার জন্য নীতি নির্ধারনী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করে থাকে বিভিন্ন প্রকল্প পাস করানোর জন্য। ১৮০০০ কোটি টাকা ব্যায়ে মাত্র ২২ কি.মি. উড়াল সড়ক না করে এই অর্থ ব্যায়ে ৪০০ কি.মি. পাকা হাইওয়ে উন্নত সড়ক তৈরী করা সম্ভব। উপরন্তু ঢাকা শহরে বাড়বে ট্রাফিক জ্যাম।
পাঠক আপনার অবগতির জন্য জানাতে চাই-দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে এ ধরনের একটি হাইওয়ে তৈরীর পর যানজটের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটির সরকার পুনরায় এটি ভেঙ্গে লেক তৈরী করেছে যা দিয়ে নৌ পথে মানুষ চলাচল করছে। আর আমরা চলেছি উল্টো পথে ! !
সম্প্রতি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এবং সংবাদপত্র গুলো প্রকাশ করছে বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার। তাঁরা পরম বিজ্ঞজন হিসেবে একেকরকম করে বলেই যাচ্ছেন ১০০ বছর আগে ঘটা কোন এক ভূমিকম্পের স্মৃতিচারন। সমস্যাটা কি সেখানে নাকি অন্য কোথাও? কেউ কেউ বলছেন ভূমিকম্পের ঝুকি মোকাবেলার প্রশিক্ষণ নিতে। তার মানে তাঁরা কি জানেন যে অচিরেই আমরা একটি ধ্বংসস্তূপ দেখতে পাব ঢাকায় বা দেশের অন্য কোন জনবহুল শহরে? এই মন্তব্যের রেশ ধরেই আমাদের ভাবতে হচ্ছে আমরা প্রতিরোধ না প্রতিকারের রাস্তায় আছি? এবার ফিরে যাই দুর্যোগ মন্ত্রণালয় বিষয়ক আলোচনায়। কয়েক বছর আগে কম্প্রিহেনসিভ ডিসএস্টার ম্যানজেমেন্ট প্রোগ্রাম সংক্ষেপে সিডিএমপি চালু করেছে উক্ত মন্ত্রণালয়। কাজটা কি এই সিডিএমপি’র? বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এখানেও মূল কাজ দুর্যোগে প্রস্তুতি আর প্রশিক্ষণ। তাহলে ঐ বিশেষজ্ঞ মহাশয়ের মন্তব্যের উপর রাগ করে লাভ কি বলুন? তিনি পরিস্থিতিতে যথার্থই বলেছেন। আমরা বরং কিছু কাফনের কাপড় সংগ্রহ করে রাখি যেন বিনা কাফনে না মরতে হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যদি এই কাফনের ব্যবস্থা করেতন তবে এটিই হবে ঢাকায় বসবাসকারী নাগরিকের জন্য সঠিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। বিশেষজ্ঞদের প্রতি অনুরোধ দুর্যোগের প্রতিকার না করে প্রতিরোধের চিন্তা করুন।
একবার ভেবে দেখুন, যে পরিমান ঝুকির মধ্যে ঢাকার মানুষগুলো বসবাস করছে তার উপর প্রতিদিনই কোন না কোন নতুন বিল্ডার কোম্পানীর বিজ্ঞাপন বেরোচ্ছে। এ অবস্থা দেখে মনে পড়ে সেই প্রবাদটার কথা- রোম যখন পুড়ছে নীরু তখন বাশিঁ বাজায়। সরকারের এখনই উচিত ঢাকায় নতুন কোন হাই রাইজ বিল্ডিং বানানো নিষিদ্ধ করা। কিছুদিন আগে রাজউকের একটি উদ্যোগ ছিল পুরাতন ও ঝুকিপূর্ণ ভবন ভেঙ্গে ফেলার। কিন্তু যত দোষ নন্দ ঘোষ। এবার মিডিয়াকে কিছুটা দোষ নিতেই হচ্ছে। কারন এটা সময় যখন পত্র পত্রিকা আর ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছিল দুর্যোগের সম্ভাবনার কথা, তখনই রাজউক তড়িঘড়ি করে উক্ত কার্যক্রম গ্রহন করে। আবার মিডিয়া সংবাদ করা বন্ধ করে দেয়াতেই রাজউকের সে উদ্যোগ ফাইলচাপা পড়ে গেল। একটি কথা সহজেই অনুমেয় ঢাকা নগরী এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে বেশী আক্রান্ত মানব সৃষ্ট দুর্যোগের দ্বারা। কিছুদিন আগেই এক মর্মান্তিক অগ্নিকান্ড ঘটল । এখনো সেই মানব সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্যোগের রং মিশে যায়নি। হয়ত আগামী দিনগুলোতে দেখতে হবে ভূমিকম্পের মতন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা আসলে মানব সৃষ্ট কারনেই ঘটতে পারে।
এ সকল দুর্যোগ হ্রাসে জনসংখ্যার বিকেন্দ্রীকরণ তথা রাজধানীর উপর চাপ কমাতে শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরী। শহরের অভ্যন্তরে সকল প্রকার পাশাপাশি ঝুকিপূর্ণ বিল্ডিং গুলো ভেঙ্গে ফেলার স্থবির হওয়া উদ্যোগকে অবিলম্বে সচল করতে হবে। পুরো নগরীর পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহ সহ পর্যাপ্ত যাতায়াতের সুবিধা রেখে নতুন করে ঢেলে সাজানোর কথা ভাবা উচিত সরকারের। এটি আকাশ কুসুম কল্পনা লাগবেনা যদি একবার ভাবা যায়, যদি সত্যিই সেই ৭ রিকটার স্কেলের ভূমিকম্প হয় তবে যে ১ লক্ষ্ মানুষ মারা যাবে আর সেই ক্ষয় ক্ষতির শিকার কে কে হবেন? সে বিবেচনায় এখন যদি একটি নতুন বাসযোগ্য নগরায়নের পথে এগিয়ে কিছু ঝুকিপূর্ণ ভবন স্থাপনা ভাঙ্গা হয় আর কিছু নির্মান নিয়ন্ত্রণ করা হয় তবে কতটুকু ক্ষতি হবে তা দেরি না করে এখন্ই ভেবে দেখা উচিত সংশ্লিষ্ট সকলের।
লেখাটি সংগৃহিত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


