সৌরভ আর শুভ্র দু’ভাই। ছোট সংসার, সৌরভ তার বউ সুরভী আর ছোট্ট একটি ছেলে, নাম প্রান্তিক। সৌরভ একটা বেসরকারী কোম্পানীতে চাকরি করে, সে-ই সকালবেলা বাসা থেকে বের হয়ে যায় আর ফিরে আসে একেবারে রাতে। সারাদিন সুরভীর কেটে যায় প্রান্তিকের সঙ্গে কথা বলে আর টি.ভি দেখে। এতদিন শুভ্র বেকার ছিল। বাইরে কোন কাজ না থাকলে সে প্রান্তিক আর সুরভীকে সঙ্গ দিত। আজ শুভ্র নতুন চাকরিতে জয়েন্ট করতে গেছে। বিকেল পাঁচটার পর থেকে সুরভী শুভ্রর জন্য অপেক্ষা করছিল।
শুভ্রর বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা।
শুভ্রকে দেখে সুরভী জিজ্ঞেস করল, কি রে ফার্স্ট চাকরিতে জয়েন্ট করেই তো শুরু করলি একেবারে ম্যারাথন চাকরি। যেন সৌরভের যোগ্য ছোট ভাই।
ভাবী প্রথম দিন চাকরি করে আসলাম কি তুমি ভাল ভাল নাস্তা রেডি করে রাখবে, তা না করে তুমি খোঁটা দিয়ে কথা বলতে শুরু করলে, এটা কি ঠিক?
সে কথা আর তোকে বলতে হবে না, তুই হাত-মুখ ধুয়ে আয় দেখবি কত সুন্দর সুন্দর নাস্তা তৈরী করে রেখেছি।
শুভ্র হাত-মুখ ধুয়ে এসে বসল, ভাবী সত্যি সত্যিই তো তুমি আমার জন্য ঠিক আমার পছন্দের খাবারগুলো তৈরী করেছ।
থ্যাংকস্ ভাবী, ইউ আর সো নাইস।
শুভ্র নাস্তা খেতে খেতে বলতে শুরু করল। ভাবী তোমাকে একটা কথা বলব কিন্তু তার আগে তোমাকে বলতে হবে এনিয়ে তুমি আমাকে কোন ধরণের কটাক্ষ করতে পারবে না এবং কাউকে বলতেও পারবে না।
তুই আর কি বলবি নতুন কোন মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে? এ তো আর নতুন কথা না, তোর প্রেম তো আবার চৈতালী হাওয়ার মতো কখন কোন্দিকে যায় তার কোন ঠিক নাই। আর এক মেয়েকে তো তোর বেশিদিন ভাল লাগে না। বল্ নতুন মেয়েটার কথা, শুনি।
কিছু বলার আগে তুমি এমন কিছু কথা শোনালে যেন বলার আগ্রহটাই নষ্ট হয়ে গেল।
না না আমি তোর আগ্রহ নষ্ট করিনি, আমি তোর ভাবী সারাদিন একা একা থাকি তোর সঙ্গেই একটু-আধটু ইয়ার্কি করি সেটুকু থেকে তুই আমাকে বঞ্চিত করিস্ না ভাই।
সত্যি বলছ তো?
হ্যাঁ।
আমার সঙ্গে একটা মেয়ে জয়েন্ট করেছে। মেয়েটার নাম উর্মী, নামটা খুব সুন্দর না?
হ্যাঁ সুন্দরই তো।
মেয়েটার কণ্ঠস্বর আমার কাছে খুব পরিচিত বলে মনে হলো।
কেন হঠাৎ করে মেয়েটার শুধু কণ্ঠস্বর তোর কাছে পরিচিত মনে হলো আর মেয়েটাকে বোধ হয় তোর পরিচিত মনে হয়নি?
আরে পরিচিত মনে হবে কি করে? মেয়েটা তো এসেছে বোরকা পরে শুধু বোরকা বললে ভুল হবে সে এমন একটা বোরকা পরে এসেছে যে শুধু তার চোখ দু’টা দেখা যায়। আর হাতের দিকে তাকালে বোঝা যায় উর্মীর গায়ের রংটা।
কেমন হবে গায়ের রং?
খুব ফর্সা।
তাহলে এ পর্যন্ত অগ্রগতি।
আপাতত।
কি কথা হলো?
আমি ওর গ্রামের এড্রেসটা জানার চেষ্টা করলাম। ওরে বাবা বলল, এ প্রশ্নটা করা নাকি আমার ঠিক হয়নি। মেয়েটার চোখের শাসন আছে, ইচ্ছা করলেই বেশি কথা বলা যায় না।
চোখের শাসন থাকা ভাল, নাহলে তো আবার তোর মুখ থেকে কথার খই ফুটত।
তবে উর্মীর কণ্ঠস্বরআমার এখনো মনে পড়ছে। আমার এক বান্ধবী ছিল নাম মায়া, আমরা ধামইরহাটে থাকার সময় একসঙ্গে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছি। কিন্তু মায়া উর্মী হবে কেন? আবার কণ্ঠস্বরআমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না।
আচ্ছা আপাতত এর চেয়ে বেশি না ভাবলেও চলবে, তুই প্রান্তিককে নিয়ে একটু বস্ আমি আবার রান্না করব।
উর্মীর রুম মেট হেমা ফুল নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছিল।
সে রুমে ঢুকতেই হেমা ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাল।
উর্মী জিজ্ঞেস করল, কিরে ফুল কিসের?
তুই আজ প্রথম চাকরিতে জয়েন্ট করেছিস্ তোকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে হবে না?
থ্যাংকস্ হেমা।
হেমা বলল, কি রে তোর মন খারাপ কেন? কোন সমস্যা?
না রে, কোন সমস্যা নাই।
তুই কাপড় চেঞ্জ কর, একসঙ্গে চা খাব।
রাতে উর্মী বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করল কিন্তু কিছুতেই তার চোখে ঘুম এলো না। একটা কথা বার বার করে তার মনে খচ্খচ করে দাগ কাটল। একই সঙ্গে পাশাপাশি ডেস্কে চাকরি করে সে শুভ্রর কাছ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখবে কিভাবে? আবার কখনো মনে হলো চিনলেই বা অসুবিধা কি আমার তো কোন দোষ নাই তবে শুভ্র আমাকে খারাপ বলবে কেন?
উর্মী কাত ফিরে শুইল। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করল। কিন্তু না তার চোখে ঘুম নাই বার বার করে তার হারানো দিনের স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল।
মায়া আর মামুনদের বাড়ী পাশাপাশি। কবে তাদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল মনে নাই। মায়ার মনে হয় জন্ম থেকেই সে যেন মামুনকে দেখছিল। মায়া মধ্য বিত্ত পরিবারের মেয়ে দুই বোন এর মধ্যে মায়া সবার বড়। বাবা মোস্তাফিজ সাহেব মধ্যবিত্ত কৃষক। এক সময় দিগন্ত বিস্তৃত জমি, পুকুর, বাগান, গোলাভরা ধান ছিল, আজকাল গোলায় ধান রাখা হয় না কিন্তু ধানের গোলাটা যেন বংশের ঐতিহ্য বহন করছে। আগে গোয়াল ভরা গরু ছিল এখন শুধু দু’টা গাভী আছে আর বলদের স্থান দখল করেছে পাওয়ার টিলার। আগে বাড়ীর মেয়েরা কোথাও আত্মীয়তা করতে গেলে গরুর গাড়ীতে চড়ে যেত এখন মাইক্রোবাস ছাড়া কোথাও আত্মীয়তা করতে যায় না। সমস্ত কিছুতেই যেন এখনো আভিজাত্য আর বিলাসিতাটা রয়েই গেছে।
মামুন নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে, বাবা-মা’র আদরের সন্তান। বাবা প্রান্তিক চাষী, সারাদিন মাঠে কাজ করে, বর্গা নেওয়া জমিতে যে ফসল পায় তা দিয়ে কোন রকমে দিন কেটে যায়। মামুনদের সংসারে প্রায় সব সময় টানাটানি থাকে। ইচ্ছা করলেই মামুন সামর্থ্যের অভাবে বাবা-মা’র কাছে কিছু চাইতে পারে না। ভাল টিচারের কাছে প্রাইভেট কোচিং পড়তে পারে না। ক্লাসে যা বুঝে নিজে নিজে তা-ই আয়ত্ত্ব করে। মামুনের বাবা-মা অনেক কষ্টে তার লেখাপড়ার খরচ বহন করে।
মামুন আর মায়া শৈশব থেকে একসঙ্গে লেখাপড়া করেছিল। তাদের গ্রাম থেকে প্রাইমারী স্কুল প্রায় এক কিলোমিটার দূরে, প্রাইমারী স্কুলে যেতে মামুনকে মায়াদের বাড়ীর সামনে দিয়ে যেতে হতো। সেই যে শৈশব থেকে দু’জনে একসঙ্গে স্কুল যাওয়া শুরু করেছিল কোনদিন যেন কেউ একা স্কুলে যায়নি। শৈশব থেকে মায়া স্কুল যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে বাড়ীর সামনে বসে থাকত, মামুন তাদের বাড়ীর কাছাকাছি এলে দু’জনে একসঙ্গে স্কুল যেত। কোনদিন পথিমধ্যে বৃষ্টি এলে দু’জনে একই ছাতার নীচে গা ঘেঁষাঘোঁষি করে বাড়ী ফিরত।
এভাবে ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস সেভেনে ওঠার পর একদিন মায়া স্কুল ড্রেস পরে বাড়ীর বাইরে মামুনের জন্য অপেক্ষা করছিল। মায়ার মা তাকে ভিতরে ডেকে বলেছিল, এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকিস্ না মা, আমি বুয়াকে বলছি মামুন এলে তোকে ডেকে দিবে।
তারপর থেকে স্কুলের সময় হলে মায়া স্কুল ড্রেস পরে বাড়ীতে বসে থাকত মামুন তাদের বাড়ীর কাছাকাছি এলে বুয়া মায়াকে ডেকে দিত।
এভাবে আরো দু’বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল। মায়া আর মামুন তখন ক্লাস নাইনে উঠেছিল। ক’দিন পর ক্লাস নাইনের রেজিস্ট্রেশন হবে। আর রেজিস্ট্রেশনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই মায়া অনেকটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। তার মনের কথাটা যেন মামুন আগেই বুঝতে পেরেছিল। শুধু সেদিন না মামুন যেন মায়ার মুখ দেখেই অনেককিছু বুঝতে পারত।
মামুন বলেছিল, এই মায়া চিন্তিত কেন রে?
মামুন সামনে রেজিস্ট্রেশন, সায়েন্সে পড়ব নাকি আর্টসে পড়ব বুঝতে পাচ্ছি না, মনে হয় আমার সায়েন্সে পড়া ঠিক হবে না।
কেন?
কারণ ইলেকট্রিভ ম্যাথ খুব কঠিন সাবজেক্ট, শুধু ইলেকট্রিভ ম্যাথ না ফিজিক্স, ক্যামিস্ট্রিসহ সায়েন্সের সবগুলো সাবজেক্টই আমার কাছে কঠিন মনে হয়।
ভালভাবে লেখাপড়া করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
মামুন তুই আমাকে হেল্প করবি?
আমিও তো তোর সঙ্গে পড়ি আমি আবার তোকে কিভাবে হেল্প করব? তারচেয়ে তুই বরং ভাল কোচিং সেন্টারে কোচিং কর, সব ঠিক হয়ে যাবে।
স্যাররা তো কোচিং-এ অনেকজনকে একসঙ্গে পড়ায় আমি তো সবার সঙ্গে কুলাতে পারি না।
তাহলে বাড়ীতে প্রাইভেট টিচারের কাছে পড়, তোদের তো টাকার অভাব নাই, টিচার বাড়ীতে গিয়ে তোকে পড়িয়ে আসবে।
মামুন জানিস্ এর আগে আমি এক স্যারের কাছে পড়তাম, স্যার পড়াতে এসে শুধু সময়ের হিসাব করত। আমি বুঝতে পারলাম কি না সেটা বুঝতে চায় না।
হ্যাঁ একজন স্যার তো আসলে কয়েক বাড়ীতে প্রাইভেট পড়ায়, সেজন্য বেশি সময় দিতে পারে না।
মামুন আমি কোচিং করছি কিন্তু তারপরও আমার যদি কোন সাবজেক্ট বুঝতে অসুবিধা হয় তবে তুই আমাকে হেল্প করবি নোট দিয়ে, সাজেশন দিয়ে এবং মাঝে মাঝে পড়া বুঝিয়ে দিয়ে, তাহলে আমি সায়েন্সে পড়ব আর না হয় আমি সায়েন্সে পড়ব না।
তাহলে তুই এক কাজ কর, বুঝতে বেশি অসুবিধা হলে তুই আর্টসে পড়।
মায়া প্রচন্ড রেগে গিয়েছিল, তুই এমন কথা বলতে পারলি? এতদিন একসঙ্গে লেখাপড়া করলাম আর এখন তুই সায়েন্স পড়বি আর আমি আর্টস পড়ব?
তবে?
আমিও সায়েন্স পড়ব, তুই আমাকে হেল্প করবি, করবি না?
করব।
তিন সত্যি বল্।
মামুন অদ্ভুত ভঙ্গীতে তাকিয়ে বলেছিল, জি ম্যাডাম, তিন সত্যি।
মামুনের সেই অদ্ভুত ভঙ্গীটা উর্মীর আজও স্পষ্ট মনে আছে সেই একদিনের একটা চাহনি আর এক খন্ড হাসি যেন পিছনের ফেলে আসা সমস্ত স্মৃতিতে নতুন মাত্রা জুগিয়েছিল। সেদিনই প্রথম উর্মী জীবনের নতুন স্বাদ পেয়েছিল। সেটাই ছিল কারো চোখে চোখ রেখে প্রথম কথা বলা। আসলে কাউকে ভাললাগার জন্য বুঝি একবার এক মুহূর্তের দৃষ্টি বিনিময়ই যথেষ্ট আবার কারো সঙ্গে ভাবের মিল না হলে একসঙ্গে যুগের পর যুগ বসবাস করা অর্থহীন, গত কয়েকবছরের ঘটনাগুলো উর্মীকে যতটা না নাড়া দিত একবারের দৃষ্টি বিনিময়ই তার চেয়ে বেশি হৃদয়ে দাগ কেটেছিল।
চলবে...
আলোচিত ব্লগ
আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ক্রাউড ফান্ডিং-এর সুযোগ তৈরি করে সরকারী লাভজনক প্রজেক্টে জনগণের বিনিয়োগ নিন
বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত, তা বুঝা যাচ্ছে। নাহলে, খোদ প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে জনগণকে অনুরোধ করতেন না। আমার মন হয়, দেশের মানুষের কাছেই অনেক সম্পদ আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিএনপির আবালীপনা।


Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।