বছর খানেক হলো দক্ষিন বনশ্রীর কে ব্লকের ৮৭ নং বাসাটায় উঠেছি। চারতলা বাড়িটার টপ ফ্লোরের দুই ইউনিট পূর্বেই বিক্রি করে দিয়েছেন বাড়িওয়ালা জীবিত থাকতে। আমি ভাড়া থাকি চতুর্থ তলার একটাতে আর অন্যটাতে ব্যাচেলর মেস। তৃতীয় তলা বাড়িওয়ালা তার নিজের জন্য তৈরী করেছেন। দ্বিতীয় তলার দুই ইউনিট এবং নীচ তলার এক ইউনিট ভাড়া দেওয়া।
বাড়ির কর্তা মাষ্টার সাহেব খ্যাত পূর্বেই গত হয়েছেন তার ক্যান্সারে আক্রান্ত স্ত্রীকে রেখে। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন এক কালিয়ার সাথে যার এই প্রজেক্টে বাড়ি আছে। ছোট মেয়েকে আমেরিকা প্রবাসীর সংগে বিয়ে দিয়েছেন এবং স্ব-পরিবারে তারা আমেরিকায় থাকে। আর এক মাত্র আদরের ছেলেকে কানাডা পাঠিয়েছিলেন লেখাপড়ার জন্য তিনিও বর্তমানে বউ নিয়ে কানাডাতে থাকেন।
তিন তলায় বৃদ্ধা মা এক জন কাজের মেয়েকে নিয়ে থাকেন। বয়স হয়ে যাওয়ায় ওনার অনেক শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। ডায়াবেটিস, চোখের সমস্যা, মাথা ঘুরানো তাছাড়া মরন ব্যাধি বোন ক্যানসারতো আছেই। পুরা বাড়িটা খা-খা করে, ভাড়ার টাকা তুলেই ওনাকে চলতে হয়। কিন্তু এই টাকা তার চিকিৎসা ব্যায় মিটানোর পক্ষে কিছুই নয়। ছেলে মেয়েকে অনেকবার টাকার কথা বললেও কেউ পাত্তা দেয়নি। উল্টে একমাত্র ছেলে মায়ের কাছে খরচের হিসাব চেয়ে বার বার ফোন করে কানাডা থেকে। এই বাড়িটা যখন তৈরী হয় তখন মাষ্টার সাহেব বেশ টাকা লোন করেন, যার কিছু অংশ শোধ হয় টপ ফ্লোর বিক্রি করে এবং বাকি টাকা ছেলে ও তার বউ শোধ দেয়। এজন্য বোধ করি ছেলের বউয়ের অধিকার জন্মায় বাড়িটার উপর তার ছেলের থেকেও বেশী।
বৃদ্ধা মাতা তার চিকিৎসার ব্যায় মেটাতে বাড়ি ভাড়ার টাকা খরচ করেন সেই সাথে খরচ করে ফেলেছেন গ্যাস বিল, কারেন্ট বিলের টাকাও। এভাবে বেশ টাকা বকেয়া হয়ে গেছে গ্যাস বিল এবং বিদ্যুত বিলের। পূর্বে অনেকবার নোটিশ এসেছে গ্যাস বিল পরিশোধ করার জন্য কিন্তু মায়ের কাছে টাকা না থাকায় তিনি শোধ দিতে পারেন নি। বার বার ছেলের কাছে টাকা চেয়েছেন কিন্তু ছেলের সেই একই কথা। এতো টাকা আপনি কি করেন? হঠাৎ গ্যাসের লাইন কাটতে লোক এসেছে অফিস থেকে, বৃদ্ধা মাতা তার মেয়ের কাছে টাকা চেয়েও কোন লাভ হয় নাই। মেয়ে বলেছেন আমরা কেন টাকা দিতে যাব? ক্ষিপ্ত হয়ে ছেলে মাকে উচিৎ শিক্ষা দিতে ছুটে আসেন কানাডা থেকে। এসব খবর শুনে ছোট মেয়েও এসে যায় আমেরিকা থেকে।
পুত্র বধু প্রথমেই হিসাব খোঁজে, ভাড়ার টাকা কি করেন? সন্তানেরও একই প্রশ্ন। একবারও ভাবে না যে মা আমার অসুস্থ। বৃদ্ধা সব হিসাবই দেখান কিন্তু সাতহাজার টাকার হিসাব দেখাতে পারেন নাই। অগ্নি মূর্তি ধারনকারী পূত্র বধূ শুধু গায়ে হাত তুলতে বাকি রাখেন শাশুড়ির। ছেলেও বউ এর সাথে মাকে ইচ্ছা মতো গালি গালাজ করতে থাকেন। এর পর ক্ষুব্ধ হয়ে মাকে ঘর থেকে বের করে দেন। এবং দারোয়ানকে একটা নতুন তালা দিয়ে বলেন মেইন গেটে মেরে রাখতে যেন শাশুড়ি বাড়িতে ঢুকতে না পারে। বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বাসা ছেড়ে বের হয়ে মেয়ের কাছে যায়। ড্রাকুলার মতো দাঁত আর বিশাল দেহী চেহারার বোনকে আগেই স্মার্ট ভাই ফোন করে দিয়েছে "যদি তোমার বাসায় মা যায় আর যদি তাকে ঠাই দাও তাহলে তোমার সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ"
শুনেছি মেয়েরা সাধারনত মাকে একটু অন্য চোখে দেখে। কিন্তু ড্রাকুলার মত চেহার এই বিশাল দেহী মেয়ে তার মাকে তার বাসায় উঠতে দেয় না তার কালিয়া জামাই ও একই কথা বলেন। বৃদ্ধা মা চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারেন না। বড় মেয়ে মাকে তড়িয়ে দিলে তিনি আবার নিজ বাসায় ঢোকার চেষ্টা করেন কিন্তু গেটে তালা মারা দেখে তিনি কাঁদতে থাকেন। পাশের বাসার বাড়িওয়ালার স্ত্রী এসব ঘটনা শুনে ওনাকে তার বাসায় নিয়ে যান।
এবার ছেলে আর ছেলের বউ ইন্ডিয়া বেড়াতে যান সপ্তাহ খানেকের জন্য। এখন বাসায় শুধু ছোট মেয়ে যিনি আমেরিকা থেকে এসেছেন। তাকে বলা আছে মা যেন বাসায় না ঢোকে। পাশের বাসা থেকে বসাই ওনাকে নিজের বাসায় নিয়ে আসেন এই ভেবে যে ছোট মেয়ে নিশ্চয়ই ঠাই দিবে। কিন্তু এ কি !! ছোট মেয়ে তার মাকে বাসায় ফিরে আসতে দেখে একেবারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। মা তার মেয়েকে জ্ঞান হারাতে দেকে কাজের মেয়েকে দিয়ে আমার স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে যায় কি হলো দেখার জন্য। অনেক পানির ছিটা দেওয়ার পর তার হুশ আসে। জ্ঞান ফিরেই তিনি বলে ওঠেন, "তুমি বাসায় এসেছ কেন? আসবেই যখন ভাইয়া ভাবি থাকতে আসনি কেন? এখন সব দোষ আমার ঘাড়ে পড়বে, ভাবি মনে করবে আমি তোমাকে ডেকে নিয়ে এসেছি।"
আমার স্ত্রী অনেক বুঝিয়ে তাকে বাসায় রেখে আসে। ছেলে খবর পেয়ে আবার চলে আসে ইন্ডিয়া থেকে। মা ভয়ে বাসা থেকে চলে যায়, তিনি থাকার মতো কোন জায়গা খুঁজে পান না। উপায়অন্ত না দেখে তিনি মালিক সমিতিতে শালিশ বিচার বসান। একদিন সন্ধায় সবাই এসে হাজির হয় রাস্তায়, মা- ছেলের বিচার করতে।
শালিশ বিচার সবই মানি তালগাছটা আমার। ঘটনাটা ঠিক সেই রকম; সবার কথাই শুনতে রাজি বিচার মানতেও রাজি কিন্তু শর্ত হলো মা এখানে থাকতে পারবে না। ছেলের মুখে এসব কথা শুনে সবাই হতাশ হয়ে চলে যায়.........
মায়েরও ঠাঁই হলো না নিজ গৃহে, অবশেষে কেউ একজন তাকে একটা বাসা ভাড়া করে দিলেন এবং ছেলেও রাজি হলেন ভাড়ার টাকাটা দিতে। অপমানিত অসহায় মার চোখের পানিতে হয়তো খোদার আরশ কেঁপে উঠেছে কিন্তু অপদার্থ সন্তান এবং পূত্র বধূর মন একটুও কাঁপেনি। তারা এক মাসের মধ্যে সবগুলো ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে গেছেন কানাডা। ভাগের ভাগ মেয়েরাও পেয়েছেন। তবে তিন তলাটা বিক্রি করেন নাই। নিজেরা দেশে এসে মাথা গোঁজার জন্য রেখে দিয়েছেন। হয়তো তাদের প্লানই ছিল এমন যে, মাকে তাড়িয়ে দিয়ে বাড়ি বিক্রি করা। এজন্য কোন বোনই মা-কে ঠাই দেন নি, ছোট জনও আমেরিকা থেকে এসেছেন ভাগের টাকা নিতে। পিছে ভাগের টাকা হাত ছাড়া হয়ে যায় সে জন্য ভাই -ভাবীর তাবেদারী শুরু করে দিয়েছেন। হয়তো মা-কে তাদের আর প্রয়োজন নাই। তাই মায়ের ঋণ শোধ হলো গলা ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে।
অবশেষে কানাডার প্রবাসী স্মার্ট ছেলে প্রতি মাসে মায়ের জন্য বাসা ভাড়া দিতে হচ্ছে দেখে মাকে আবার পাহারাদর হিসাবে পুনারায় নিজ বাসায় থাকার অনুমতি দিলেন।
বৃদ্ধা একা, একটা কাজের মেয়েও নাই দেখার জন্য। গতকাল চুলায় পানি গরম করতে দিয়ে ঘুমিয়ে গেছেন সকালে ঘুম থেকে উঠে গলিত কলসি চুলা এবং কিচেনের ফ্লোরে দেখতে পেয়ে বুঝতে পেরেছেন যে চুলা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন। হয়তো এভাবেই একসময় কোন একসিডেন্টে একদিন মারা যাবেন। ছেলে এবং তার বউ হয়তো লোক দেখনো চোখের পানি ফেলবেন। হয়তো বা মনে মনে খুশীর মিষ্টি মানুষকে বিলাবেন। হয়তো ওনার মেয়েরা টাকার তোষক বানিয়ে ঘুমাবেন। হয়তোবা আরো অনেক ইনজয় করে বেড়াবেন।
এত কিছু তাদের কোন কাজেই আসবে না, তারা পৃথিবীর সকল ধন রত্নের বিনিময়েও মায়ের চোখের এক ফোঁটা জলের দাম দিতে পারবে না। তারা তাদের সন্তান কর্তৃক এর রিটার্ন পাবেনই, এটা পেতেই হবে। হতভাগা ছেলেরা সুন্দরী বউ পেলে তারা মাকে মর্যাদ দেয় না। আর পূত্রবধূ মায়ের ছেলেকে এমন ভাবে কেড়ে নেয় যেন "নিজের সন্তানকে কোন ছেলেধরা কেড়ে নিল" তারা ভুল যায় যে সে-ও একদিন মা হবে। তারাও মায়ের জাতি, মা শব্দটার অর্থ তাদের জানতে দেরী হয় যেহেতু তারা মা হন দেরী করে।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি তার বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে পেল আর সেবা শশ্রুষা করে নিজেকে পাপমুক্ত করতে না পারল তার মতো হতভাগা এই পৃথিবীতে আর নাই"
আমার আমাদের কে সেই আদর্শে গড়ে তুলি যেন আমাদের ছেলে মেয়েরা আমাদের কাছ থেকে শিখতে পারে। আমার যখন বৃদ্ধ হব তারা যেন আমাদের সাথে ভাল ব্যবহার করে ঠিক যেমনটি ওরা এখন দেখবে। টাকা পয়সা হাতের ময়লা, মায়ের হাতে পাঁচশ টাকা দিলে একদিন ৫ লাখ টাকা রিটার্ন পাওয়া যাবে। আমাদের ভাবতে হবে আমাদের সন্তানের দিকে তাকিয়ে, ওদের আমরা কতো ভালোবাসি; একটু অসুখ হলে অস্থির হয়ে যাই। কোথও কেটে গেলে ব্যথা যেন আমরা পাই, কিছু খেতে চাইলে টাকা ধার করে হলেও ছেলে-মেয়ের আবদার মেটাই। কি-না করি সন্তানের জন্য; ঠিক একই কাজ করেছেন আমাদের বাবা-মা আমাদের জন্য। সন্তানকে কিডন্যাপার ধরে নিয়ে গেছে, মুক্তি পণ সরূপ এক কোটি টাকা চেয়েছে। এমতাবস্থায় পিতা-মাতা কি করেন? ছেলেকে ওদের হাতে ছেড়ে দেন? না-কি নিজের কিডিনি বিক্রি করে হলেও মা তার ছেলেকে ফেরত চান; এই হলো মা, আর সামান্য সাত হাজার টাকার জন্য আমার তাকে ঘর থেকে বের করে দেই।
সুশীল সমাজে এমন অনেক সন্তান আছে যারা নিজেদের বড়ই "ইজ্জতদার আদমী" ভেবে থাকেন। মা-বাবা খেয়ে আছে নাকি কষ্টে আছে তার খবরও রাখেন না। হয়তো বাবা-মা টাকা চাইলে গরীব হয়ে যান বলে থাকেন "মা অভাবে আছি" অথচ বউ শাড়ী চাইলে কিস্তিতে হলেও কিনে দেন। এমন সন্তানের অভাব নাই এই ধরনীতে।
আমরা নিজের দিকে তাকালে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে, নিজেকে প্রশ্ন করি আমি কি ঐ কানাডা ফেরত সন্তানের মতো? আমার বউ কি আমার মাকে দেখতে পারে? আমি কি আমার মা-বাবাকে কথা দিয়ে, সেবা দিয়ে বা টাকা দিয়ে সাহায্য করি?
আল্লাহ আমাদের ঈমানকে মজবুত করে দিন। অন্তত মা-বাবার সেবা কারার মন মানসিকতা তৈরী করে দিন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

