দুটো মানুষের একটি গল্প...
৩০ শে অক্টোবর, ২০০৭ রাত ১১:২৮
একটি গল্প।দুটো মানুষকে নিয়ে।
এপ্রিল এর বাইশ তারিখ। বিরক্তিকর ল্যাব ক্লাশ শেষে ছেলেটি নিজের রুমে ফিরলো।কিছুক্ষণ পর কম্পিউটারের সামনে বসা ছেলেটি।অতঃপর নেটে লগ ইন।মনিটরের কাঁপা কাঁপা আলোয় ''বাংলাক্যাফে''র জনারন্যে অস্থির চোখদুটো কোন একজনকে খুঁজে বেড়ায়।অচেনা কেউ,বিকেলটা যার সাথে বসে গল্প করে কথায় কথায় কাটিয়ে দেয়া যায়।অনেকের দরজাতেই টোকা পড়লো,সাড়া এল খুব কমই।দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালো একজনই, এ গল্পের দ্বিতীয় জন।
এরপর একটি কথা।দুটি কথা।তিনটি কথা।অনেক অনেক কথা।অনেক দুপুর।অনেক বিকেল।ভূগোলের সব নিয়ম মেনে দিনের পর রাত আর রাতের পর দিন আসে।কথার ভাজে কথা জমে।গল্পের মানুষ দুজন একটু একটু করে কাছে আসে।হাতের ওপর হাত পড়ে,মনের ওপর মন। কথার বৃষ্টি ঝরতেই থাকে,থামার কোন নাম নেই।
ভালোই চলছিলো।স্বপ্নগুলো সবে বাইরে এসে আড়মোড়া ভাঙছে।নিমগ্ন দুজন খেয়ালই করেনি আকাশের এক কোণায় কেমন মেঘ জমতে শুরু করেছে।
জুলাই এর কোন এক বিকেল।ছেলেটার তারিখটা ঠিক মনে নেই।মনে রাখতে চায়ওনা সে।জীবনানন্দ এখানে স্মরণযোগ্য।কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?
মেয়েটার ফোন।ঘুমজড়ানো চোখে ছেলেটা রিসিভ করলো।ঘুম উধাও।মেয়েটার বাবা হঠাৎ প্রচন্ড অসুস্থ।আগে থেকেই মেয়েটার বিয়ের কথা হচ্ছিল।এতদিনকার দমকা হাওয়া হঠাৎ ঝড় হয়ে বেরিয়ে এলো।বিয়ে তাকে করতেই হবে।মেয়েটা নিরুপায়।ছেলেটা নির্বাক।
সেদিনই সন্ধ্যাবেলা।ছেলে আগে থেকেই বাবার পছন্দ করা,বন্ধুর ছেলে।হাসি হাসি মুখে আংটি পড়িয়ে গেল।মেয়েটার চোখের কোণে স্বচ্ছ বিশুদ্ধ জল।ছেলেটার নজরেই পড়লোনা।সে তখন স্বপ্নে বিভোর,মেয়েটার প্রতি আটবছরের একপেশে ভালোবাসা আজ অবয়ব পেতে যাচ্ছে।
গল্পের দুজনের নির্ঘুম রাত কাটে।জেগে থাকে অন্য ছেলেটাও।প্রথম দুজন স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পোড়ে।তৃতীয়জন ভাঙ্গা টুকরোগুলো কুড়িয়ে এনে জোড়া লাগায়।
কিছুদিন পরের কথা।ঢেউ অনেকটা শান্ত হয়ে এসেছে।মেয়েটার বাবা এখন বেশ সুস্থ।মেয়েটা সব খুলে বলে।ছেলেটার কথা,ছেলেটার চোখের তারায় খুঁজে পাওয়া ভালোবাসার কথা।সব শুনে বাবা অনড়।অন্য ছেলেটাও নিশ্চুপ।ভালোবাসার এতো কাছে এসে ফিরে যেতে চায়না সে।মেয়েটার সব চেষ্টা পানাফুল হয়ে বানের জলে ভেসে যায়।বিয়ে ভাঙ্গার অংকটা অর্ধেক পাতায় এসেই মিলে যায়।ফলাফল ''শুন্য''।
মেয়েটা কাঁদছে।অঝোরে কাঁদছে।না পাওয়ার যন্ত্রণা কান্না হয়ে গলে গলে পড়ছে মেয়েটার গাল বেয়ে।বালিশে মুখ গুজে ফোপাতে ফোপাতে সিদ্ধান্তটি নিয়ে নিলো সে।ছেলেটা চাইলে প্রয়োজনে ভালবাসার টানে ঘর ছাড়বে।আকুল হয়ে ছেলেটিকে ফোন করলো।জানতে চাইল ছেলেটি কি চায়।ফোনের অন্য পাশে জোনাকি জ্বলা নৈশঃব্দ। এক হাতের মুঠোয় ভালোবাসা,অন্য হাতে মধ্যবিত্ত পরিবারের কিছু স্বপ্নমাখা প্রত্যাশার দায়।ট্রাপিজের সরু তারে দুলতে থাকে ছেলেটির মন।যে কোন এক হাত তাকে ছেড়ে দিতে হবে।এমন কঠিন সময় তার জীবনে আর কখনো আসেনি।থেমে গিয়ে ঘড়ির কাটাও কান পেতে আছে,উত্তরের অপেক্ষায়।বুকের ওপর হাজার মণী পাথর চেপে ছেলেটি অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলো।কোন কথা না বলে রইলো নিরুত্তর।মেয়েটি ততক্ষণে তার উত্তর পেয়ে গেছে।রাত্রি কালো চোখে রাত আরো গাঢ় হয়ে নামে।
১৩ জুলাই,শুক্রবার।এই দিনটার কথাও ভুলে যেতে পারলে ভালো হত।কিন্তু বাস্তবতা বড় বেশি কিপ্টেমি করে,মানুষের সব চাওয়া পূরণ করে দেবার মত উদারতা তার কোন কালেই ছিলোনা। ছেলেটারও তাই আর ভুলে যাওয়া হয়না।লাল শাড়িতে দুঃখগুলোকে পেচিয়ে পরিবারের সবচেয়ে আদরের ছোট মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়।সবাই অনেক খুশি,মেয়েটি খুশি হয়েছিল কীনা তা জিজ্ঞেস করার মত সময় কারোরই ছিলোনা।
তারপর......??
দুটো হৃদয় ভাঙার আটপৌরে এই গল্পের এখানেই আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি।আড়ালে আড়ালে গল্পের মানুষ দুজনের গল্প তবু এত অল্পেই শেষ হয়ে যায়না।দুঃখরা যে এতো সহজে নিঃশেষিত হতে চায়না।
......... কলম থামিয়ে ছেলেটা এখন অঝোরে কাঁদছে।প্রিয় পাঠক,আপনি চাইলে এখনই চলে যেতে পারেন।কারণ ছেলেটির কান্নার এখনো অনেক বাকি।সে কান্না কখন থামবে তার উত্তর ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসা রাত্রি ছাড়া আর কারো জানা নেই।
প্রকাশ করা হয়েছে: ডায়েরী বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ দুপুর ১:৫১ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
মফিজ বলেছেন:
আমি কখনও রেটিং করিনা।আমার মতে ৫ দিয়ে এই লেখনি মাপা যাবেনা।
আরিফুল হোসেন তুহিন বলেছেন:
দোস্ত,পরাজিত মানুষদের অনেক কষ্ট,আমার চেয়ে আর কে ভালো জানে,
কিছুই চিন্তা করাটা ভীষণ কঠিন...................
সমস্যা হচ্ছে তারা জ্বলে নেভার জন্যে
রোদ্দূর মিছিল বলেছেন:
"দুটো হৃদয় ভাঙার আটপৌরে এই গল্পের" ঐ ছেলেটাকে এটা বলাটা কি বাহুল্য হবে যে ভালবাসার সুখস্মৃতি রাতের তারাদের মত দিনের আলোর গভীরেই তো লুক্কায়িত আছে; কিছুই কি গেছে একেবারে হারিয়ে - চিরতরে?
@হোসেন মনে হয় আমরা দুজনেই জানি কেমন লাগে
@রোদ্দুর মিছিল এখনো তো তাই হারিয়ে যাইনি।আপনাকে ধন্যবাদ
আরিফুল হোসেন তুহিন বলেছেন:
হারায় হয়ত না,তবে মৃত্যুর মত ঘুমিয়ে পড়ে,শুধু ঘুমায়,আট টনী ট্রাকের নীচে চাপা পড়া শিশুর কোমলাস্থি ভাঙ্গনের বিকৃত শব্দে কাঁদে,
অজানা অচেনা বলেছেন:
মনে হচ্ছে বাস্তব গল্প। ৫!
রাশেদ বলেছেন:
হুমম...পড়লাম।
অজানা একজন বলেছেন:
ওরিব্বাস । ভেরি সিনেমেটিক ।
সিনেমার কাহীনিঅ হার মানায় ।
আসলে এসব জিনিস সিরিয়াসলি নিলে কষ্ট পাবেন এটাই শিরোধার্য ।
বিবর্তনবাদী বলেছেন:
এ পোস্টে আসার আগে ১৫ নভেম্বরের আপনার তিথির কাছে লেখা চিঠিটা পড়লাম। এ পৃথিবীতে বিচ্ছেদ যে কত রুপে আসে, তা সত্যিই বৈচিত্রময়। ভাল থাকুন।
নির্বাসিত বলেছেন:
দুর্ধর্ষ লেখা। ফাইভ ফিফটি ফাইভ দিলাম।
সিহাব চৌধুরী বলেছেন:
ভাইডি, তোমার ইয়াহু আই ডি খানি দিও ! (এই কথা তোমার পোষ্টে ৪ বার ইংরেজীতে ৪ বার লিখলাম, দেখি বংলায় মনে হয় কাজে দিবে । )
সিহাব চৌধুরী বলেছেন:
কাজ দিছে ।
অভাগী বলেছেন:
চোখ বুজে পেতে তো মানা নেই।
লেখক বলেছেন: তাইতো সারাটিক্ষণ চোখ বুজেই থাকি...
লেখক বলেছেন: ...............
ভাঙা চাঁদ বলেছেন:
কেন এভাবে ঝরে যায়?
মোঃ ইবরাহিম আরমান বলেছেন:
কেন?বার বার কেন এমন হ্য়...........?
জীবনের এটাই কি নিঠুর নিয়তি.............
আমার একটাই লাইন বার বার মনে আসছে
"সে তো আমার, ছাড়া,আর কারো নয়"
আত্তার প্রতিধ্বনি বলেছেন:
হুম...পড়লাম।ভাল লাগলোকিন্তু চোখের কোণে যে একফোটা জল ঝলঝল করছে
তা আর ধরে রাখতে পারলামনা।
ভাল থাকবেন।
লেখক বলেছেন:
ঐ একফোটা জল ই বলে দেয় আমরা এখনো মানুষ আছি,অমানুষ হয়ে যাইনি।
ভাল থাকবেন।
লেখক বলেছেন:
নিলা বলেছেন:
আবারও দীর্ঘশ্বাস তবুও বুকের মাঝে আটকে রাখা কান্না রয়ে যায়।
লেখক বলেছেন: চোখের কোণায় হাসছে দেখো ভালোবাসার জল...
প্রচেত্য বলেছেন:
অসাধারণ লেখা
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...



















