গুস্তাভ লা-ব
বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির দিকে সাদা চোখে তাকালে দৃষ্টিপ্রক্ষেপকারী শুধুই হতাশাই দেখবেন। উত্তরণের ছবি তার চিত্তকে পুলকিত করবে না এবং তিনি খানিকটা উত্তেজিত হয়ে বলবেনÑ দেশটা খুবই খারাপ পথে এগুচ্ছে। সম্মুখে বিরাট খাদ কিন্তু অন্ধ যেন নিশ্চিন্তে হাঁটছে। সবগুলো সমস্যার রাজ সমস্যাটি হচ্ছে নেতৃত্বের সমস্যা। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, নেতা পাইনি। আমরা মানচিত্র পেয়েছি, স্বাপ্নিক পাইনি। অতএব আমরা কিছুই পাইনি। এসব কথাবার্তা আজ ভিক্ষুক থেকে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রফেসর পর্যন্ত সকলে দেখা-সাক্ষাৎ হলেই বলাবলি করেন। প্রতিটি হৃদয় আজ দুঃখিত, হতাশাময় ও নির্জীব। রাজনৈতিক ও নেতাদের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিটি অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ধরা পড়েছে বেশকিচুকাল আগে প্রদত্ত ড. ইউনূসের একটি বক্তৃতায় Ñ‘রাজনীতিকে আমি ভয় করি। দেশের রাজনীতির হালহকিকত দেখে কেউ একে ভালোবাসে এ কথা আমার মনে হয় না। রাজনীতি যারা করে না তারাও একে ভয়ের চোখে দেখে, আমার মনে হয় যারা রাজনীতি করে তারাও একে ভয়ের চোখে দেখে। .. যে রাজনীতি হওয়ার কথা ছিল মানুষকে ভালোবাসার পেশা, সেটা আমাদের হাতে রূপ নিয়েছে হিংসা চরিতার্থ করার পেশায়, বিদ্বেষকে ঘনীভূত করার পেশায়, হানাহানি এমনকি খুনখারাবির পেশায়। তরুণদের হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র তুলে দিয়ে এক বন্ধুকে দিয়ে আরেক বন্ধুকে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করার পেশায়।..... রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্রের কথা বলেন, গণতন্ত্রের জন্য শেষ রক্তবিন্দু দেয়ার ঘোষণা দেন কিন্তু নিজেদের মধ্যে গণতন্ত্রকে পরিহার করে চলেন।
ড. ইউনূসের উপলব্ধি আজ প্রতিটি নাগরিকের উপলব্ধির প্রতিনিধিত্ব করছে। মিথ্যাচারকে শিল্পে পরিণত করেছে চলমান রাজনৈতিক দলগুলো। ‘ভিলেজ পলিটিক্স’ বলে একটা জিনিস আছে গ্রামে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ শঠতা, চরিত্রহীনতা এমনভাবে আসন গেড়েছে যে জাতীয় রাজনীতি ‘ভিলেজ পলিটিক্সের’ পর্যায়ে গিয়ে নেমেছে। নোবেল প্রাইজ বিজয়ী জাপানি সাহিত্যিক কাওয়াবাতা। মাত্র কয়েক বছর আগের ঘটনা। নোবেল প্রাইজের মতো মহাসম্মানের অধিকারী হওয়ার কিছুকাল পরেই সকলকে চমৎকৃত করে দিয়ে আত্মহত্যা করলেন তিনি। শোনা যায়, তার কারণ ছিল এই যে, বৃদ্ধ বয়সে যখন তিনি দেখলেন যে, আগের সেই সৃষ্টিক্ষমতা তাঁর মধ্যে আর নেই অথচ নোবেল প্রাইজে ভূষিত সাহিত্যিকদের কাছ থেকে উন্নতমানের কিছু রচনা সকলে আশা করেন, তখন তিনি ভুগতে লাগলেন আত্মগ্লানিতে এবং শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার কোনো সার্থকতাই আর দেখতে পেলেন না’। (দর্শন সাহিত্য ও সংস্কৃতি : আবদুল মতীন পৃ-৪৫)
বাংলাদেশের আজকের নেতারা কি বুঝতে পারছেন না জনগণ তাদের কাছে উন্নতমানের আচরণ প্রত্যাশা করেন? কাওয়াবাতা আত্মহত্যা করেছিলেন, আমরা আত্মহত্যা সমর্থন করি না, নেতা তো সংকটের দায় নিয়ে পথ থেকে সরে যেতে পারতেন। এমনই একটা পর্যায় আজ রাজনীতিতে অতিক্রমিত হচ্ছে যে, সাধারণ সৌজন্য ভদ্রতা আজ এখানে দুর্লভ।
বস্তুত আমাদের রাজনৈতিক নেতারা জাতীয় নেতা নন, তারা ‘ভিলেজ পলিটিশিয়ান’। স্বাধীনতার পর থেকেই এই সংকীর্ণতার চর্চা চলছে। ১৯৯৪-এর ১৬ আগস্ট মাসিক লোকায়ত পত্রিকায় ড. আহমদ শরীফ লিখেছিলেনÑ ‘আজ আমাদের ডানে বামে কোনো নেতা নেই। এ মুহূর্তে আমাদের রাষ্ট্র যেন স্থির সমুদ্রে ছেঁড়াপাল ভাঙা দাঁড়.... হয়তো একটি নৌকা। ঝড় উঠলে কী হবে কেউ জানে না।’
আহমদ শরীফ বহু বছর আগে যা লিখেছিলেন সেই বাস্তবতার কি সামান্য পরিবর্তন হয়েছে?
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মে, ২০০৮ রাত ৯:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


