somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বোন, তোমাদের এ অর্জনে চোখের জলে ভান আসে এ ভাইয়ের

০৬ ই অক্টোবর, ২০১০ দুপুর ১:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

‘ছোট বোন মিলিকে সাইকেলে চাপিয়ে যখন কলেজের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হতাম; রাস্তায় তখন কত ছেলে কত অশ্লীল মন্তব্য করত, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। বাবার বয়সী লোকেরাও বিশ্রী কথাবার্তা বলতেন। পাঁচ বছর ধরে বাড়ি থেকে এভাবে সাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কলেজে যাতায়াত করেছি। ক্লাস শেষে আবার একই পথ পাড়ি দিয়ে সাইকেল চালিয়েই বাড়ি ফিরেছি। শুধু তাই নয়, ছোট বোনটাকেও একই সাইকেলে চাপিয়ে কলেজে আনা-নেওয়া করতে হয়েছে। মেয়ে হয়ে সাইকেল চালিয়ে কলেজে যাতায়াত করার কারণে রাস্তায় লোকজনের নানা কটূক্তি শুনতে হয়েছে। এসব শুনে খুব খারাপ লাগত। মাঝেমধ্যে চোখ ভিজে আসত। বাড়িতে এসে কোনো কোনো দিন দুই বোন প্রচণ্ড কান্নাকাটি করতাম। কিন্ত পরক্ষণেই নিজেদের সান্ত্বনা দিতাম। এ আমাদের নিয়তি। বাবা দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা। সহায়সম্পদ বলতে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুই। লন্ড্রির দোকানের উপার্জনের অর্থে বাবা সংসার চালান। মা গৃহিণী। দুইবেলা দুই মুঠো ভাতই জোটে না, তারপর আবার তিন-তিনজন ভাইবোনের পড়ালেখার খরচ! কলেজে যাতায়াতের ভাড়া পাব কোথায়? তাই মুখ বুজে সব সহ্য করতাম। আমাদের দুই বোনের সংগ্রামও বৃথা যায়নি। দুই বোনই এবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছি। দুজনই ইতিমধ্যে যোগদান করেছি। দুই বোনেরই ইচ্ছা, প্রথম বেতনের টাকায় মাকে শাড়ি আর বাবাকে শার্ট কিনে দেওয়ার। বাবার লন্ড্রির দোকানের আয় দিয়ে সংসার চলে না। কিছুদিন পর বাবাকে একটা দোকান করে দেওয়ার ইচ্ছা আছে।’

জন্মের পর থেকেই চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে বড় হওয়া দুই বোন পল্লবী রানী ও মিলি রানী একসঙ্গে সদ্য সরকারি চাকরি পাওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন। পল্লবী ও মিলির বাবা জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার পাঠানপাড়া গ্রামের হতদরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা অজিত কুমার মহন্ত (৬০)। দুই বোনই পড়ালেখা করতেন কালাই মহিলা ডিগ্রি কলেজে। পল্লবী স্নাতক শেষ বর্ষের ছাত্রী। আর মিলি এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। বড় বোন পল্লবী এইচএসসিও পাস করেছেন কালাই মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে। দীর্ঘদিন ধরে সাইকেলে করে কলেজে যাতায়াত করার কারণে দুই বোনই এলাকায় ব্যাপক পরিচিত।

পল্লবী এইচএসসি ও স্নাতক মিলে পাঁচ বছর ধরে সাইকেল চালিয়ে কলেজে যাতায়াত করছেন। দুই বছর ধরে ছোট বোন মিলিকেও সাইকেলে সঙ্গে নিতে হয়েছে। সাইকেলে যাতায়াত করতে গিয়ে রাস্তার মাঝপথে মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে উঠলে ছোট বোন মিলি সাইকেল চালাতেন। আর পল্লবী পেছনে বসতেন।

পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা। দুই বোন একসঙ্গে সরকারি চাকরি পাওয়ায় ওই পরিবারটি এখন খুশির জোয়ারে ভাসছে। পরিবারটিতে বয়ে যাচ্ছে আনন্দের বন্যা। পল্লবী ও মিলির সঙ্গে কথা বলতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর যাওয়া হয়েছিল তাঁদের গ্রামের বাড়ি পাঠানপাড়ায়। সেখানে গিয়ে জানা গেল, মুক্তিযোদ্ধা অজিত মহন্তের ১১ শতক বসতভিটাটুকুই সম্বল। এখানেই একটি কুঁড়েঘর তুলে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে বসবাস করছেন। জানা গেল জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী অজিতকে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদ’ প্রদান করেছিলেন।
অজিতের স্ত্রী হাসি মহন্ত বলেন, ‘শৈশব থেকে তিন ছেলেমেয়ে অভাব-অনটনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে দেখেছে তাদের বাবাকে। তাই তারাও অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করতে শিখেছে। সংগ্রাম করেই পড়ালেখা চালিয়েছে। ঠিকমতো খাবার পায়নি, ভালো পোশাক পায়নি, কেরোসিন কেনার সামর্থ্য না থাকায় রাতে পড়ালেখার জন্য একটি কুপিবাতিও জোটেনি তাদের ভাগ্যে। তার পরও তারা নিজেদের সংগ্রাম থেকে পিছপা হয়নি। বড় ছেলে পলাশ প্রতিবন্ধী হয়েও স্নাতক পাস করেছে। নিজের চেষ্টায় গতবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকরি পেয়েছে। আর বাপ-ভাইয়ের মতো সংগ্রাম করেই দুই বোন পল্লবী-মিলি এবার নিজেদের চেষ্টায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে।’

অজিত কুমার মহন্ত বলেন, ‘লন্ড্রির ব্যবসার সামান্য উপার্জনে সংসার চলে না। শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেটা ব্রোংকাইটিসে আক্রান্ত। বেতনের টাকা সবই খরচ করতে হয় ওর চিকিৎসায়। অনেক কষ্ট করে বড় মেয়ে পল্লবীকে একটা পুরোনো সাইকেল কিনে দিয়েছিলাম। সেটাতে চড়েই দুই বোন কলেজে যাতায়াত করত। ওদের বিয়েশাদি নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু ওরা নিজের চেষ্টায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সংগ্রাম করে পড়ালেখা করেই সরকারি চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে। কী যে ভালো লাগছে, তা বোঝাতে পারব না।’

ছোট মেয়ে মিলি রানী বলেন, ‘বাড়িতে কেরোসিনের অভাবে কুপিবাতি জ্বলত না। কলেজে স্যারদের কাছ থেকে মোমবাতি চেয়ে নিয়ে এসে আমি ও বোন রাতে তার আলোয় পড়ালেখা করতাম। সহপাঠীদের কাছ থেকে বই-খাতা চেয়ে নিতাম। স্যাররা আমাদের দৈন্যের কথা জানতেন। তাই পরীক্ষার ফি মওকুফ করে দিতেন। কলেজের লাইব্রেরি থেকে বই-পুস্তক দিয়ে সাহায্য করতেন তাঁরা। সাইকেলে চেপে কলেজে যাতায়াতের সময় ছেলেরা নানা বাজে কথা বলত। এখন সরকারি চাকরি পাওয়ায় আনন্দ হওয়ার কথা। কিন্তু এখনো রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না। কষ্টের সেই অতীত দিনগুলোর কথা বারবার মনে পড়ছে।’

বড় বোন পল্লবী বলেন, ‘এখন একটাই কাজ। দুই বোনের চাকরির টাকায় বাবাকে লন্ড্রির দোকানের বদলে অন্য কোনো দোকান করে দেওয়া। কারণ লন্ড্রির দোকানের উপার্জনে সংসার চলে না। স্বামীর বাড়িতে গেলেও বাবা-মা যাতে অন্তত দুই বেলা ঠিকমতো খেতে পারেন, এটা নিশ্চিত করে যাওয়াটা হবে আমাদের দুই বোনের জন্য নতুন সংগ্রাম।’
কালাই মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ নাজিমউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই বোন পল্লবী ও মিলি এলাকার নারীশিক্ষার জন্য রীতিমতো মডেল। চরম দারিদ্র্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেই তারা পড়ালেখা চালিয়েছে। অজপাড়াগাঁ থেকে প্রতিদিন ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আধা ভাঙা একটা সাইকেলে চেপে কলেজে যাতায়াত করেছে। পড়ালেখা করে তারা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলই অর্জন করেনি, পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে। পল্লবী ও মিলি দুই বোনের এ সাফল্যে কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে আমি গর্বিত।’

সূত্রঃ প্রথম আলো
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই অক্টোবর, ২০১০ দুপুর ১:৫২
২২টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×