‘ছোট বোন মিলিকে সাইকেলে চাপিয়ে যখন কলেজের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হতাম; রাস্তায় তখন কত ছেলে কত অশ্লীল মন্তব্য করত, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। বাবার বয়সী লোকেরাও বিশ্রী কথাবার্তা বলতেন। পাঁচ বছর ধরে বাড়ি থেকে এভাবে সাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কলেজে যাতায়াত করেছি। ক্লাস শেষে আবার একই পথ পাড়ি দিয়ে সাইকেল চালিয়েই বাড়ি ফিরেছি। শুধু তাই নয়, ছোট বোনটাকেও একই সাইকেলে চাপিয়ে কলেজে আনা-নেওয়া করতে হয়েছে। মেয়ে হয়ে সাইকেল চালিয়ে কলেজে যাতায়াত করার কারণে রাস্তায় লোকজনের নানা কটূক্তি শুনতে হয়েছে। এসব শুনে খুব খারাপ লাগত। মাঝেমধ্যে চোখ ভিজে আসত। বাড়িতে এসে কোনো কোনো দিন দুই বোন প্রচণ্ড কান্নাকাটি করতাম। কিন্ত পরক্ষণেই নিজেদের সান্ত্বনা দিতাম। এ আমাদের নিয়তি। বাবা দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা। সহায়সম্পদ বলতে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুই। লন্ড্রির দোকানের উপার্জনের অর্থে বাবা সংসার চালান। মা গৃহিণী। দুইবেলা দুই মুঠো ভাতই জোটে না, তারপর আবার তিন-তিনজন ভাইবোনের পড়ালেখার খরচ! কলেজে যাতায়াতের ভাড়া পাব কোথায়? তাই মুখ বুজে সব সহ্য করতাম। আমাদের দুই বোনের সংগ্রামও বৃথা যায়নি। দুই বোনই এবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছি। দুজনই ইতিমধ্যে যোগদান করেছি। দুই বোনেরই ইচ্ছা, প্রথম বেতনের টাকায় মাকে শাড়ি আর বাবাকে শার্ট কিনে দেওয়ার। বাবার লন্ড্রির দোকানের আয় দিয়ে সংসার চলে না। কিছুদিন পর বাবাকে একটা দোকান করে দেওয়ার ইচ্ছা আছে।’
জন্মের পর থেকেই চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে বড় হওয়া দুই বোন পল্লবী রানী ও মিলি রানী একসঙ্গে সদ্য সরকারি চাকরি পাওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন। পল্লবী ও মিলির বাবা জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার পাঠানপাড়া গ্রামের হতদরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা অজিত কুমার মহন্ত (৬০)। দুই বোনই পড়ালেখা করতেন কালাই মহিলা ডিগ্রি কলেজে। পল্লবী স্নাতক শেষ বর্ষের ছাত্রী। আর মিলি এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। বড় বোন পল্লবী এইচএসসিও পাস করেছেন কালাই মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে। দীর্ঘদিন ধরে সাইকেলে করে কলেজে যাতায়াত করার কারণে দুই বোনই এলাকায় ব্যাপক পরিচিত।
পল্লবী এইচএসসি ও স্নাতক মিলে পাঁচ বছর ধরে সাইকেল চালিয়ে কলেজে যাতায়াত করছেন। দুই বছর ধরে ছোট বোন মিলিকেও সাইকেলে সঙ্গে নিতে হয়েছে। সাইকেলে যাতায়াত করতে গিয়ে রাস্তার মাঝপথে মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে উঠলে ছোট বোন মিলি সাইকেল চালাতেন। আর পল্লবী পেছনে বসতেন।
পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা। দুই বোন একসঙ্গে সরকারি চাকরি পাওয়ায় ওই পরিবারটি এখন খুশির জোয়ারে ভাসছে। পরিবারটিতে বয়ে যাচ্ছে আনন্দের বন্যা। পল্লবী ও মিলির সঙ্গে কথা বলতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর যাওয়া হয়েছিল তাঁদের গ্রামের বাড়ি পাঠানপাড়ায়। সেখানে গিয়ে জানা গেল, মুক্তিযোদ্ধা অজিত মহন্তের ১১ শতক বসতভিটাটুকুই সম্বল। এখানেই একটি কুঁড়েঘর তুলে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে বসবাস করছেন। জানা গেল জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী অজিতকে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদ’ প্রদান করেছিলেন।
অজিতের স্ত্রী হাসি মহন্ত বলেন, ‘শৈশব থেকে তিন ছেলেমেয়ে অভাব-অনটনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে দেখেছে তাদের বাবাকে। তাই তারাও অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করতে শিখেছে। সংগ্রাম করেই পড়ালেখা চালিয়েছে। ঠিকমতো খাবার পায়নি, ভালো পোশাক পায়নি, কেরোসিন কেনার সামর্থ্য না থাকায় রাতে পড়ালেখার জন্য একটি কুপিবাতিও জোটেনি তাদের ভাগ্যে। তার পরও তারা নিজেদের সংগ্রাম থেকে পিছপা হয়নি। বড় ছেলে পলাশ প্রতিবন্ধী হয়েও স্নাতক পাস করেছে। নিজের চেষ্টায় গতবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকরি পেয়েছে। আর বাপ-ভাইয়ের মতো সংগ্রাম করেই দুই বোন পল্লবী-মিলি এবার নিজেদের চেষ্টায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে।’
অজিত কুমার মহন্ত বলেন, ‘লন্ড্রির ব্যবসার সামান্য উপার্জনে সংসার চলে না। শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেটা ব্রোংকাইটিসে আক্রান্ত। বেতনের টাকা সবই খরচ করতে হয় ওর চিকিৎসায়। অনেক কষ্ট করে বড় মেয়ে পল্লবীকে একটা পুরোনো সাইকেল কিনে দিয়েছিলাম। সেটাতে চড়েই দুই বোন কলেজে যাতায়াত করত। ওদের বিয়েশাদি নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু ওরা নিজের চেষ্টায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সংগ্রাম করে পড়ালেখা করেই সরকারি চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে। কী যে ভালো লাগছে, তা বোঝাতে পারব না।’
ছোট মেয়ে মিলি রানী বলেন, ‘বাড়িতে কেরোসিনের অভাবে কুপিবাতি জ্বলত না। কলেজে স্যারদের কাছ থেকে মোমবাতি চেয়ে নিয়ে এসে আমি ও বোন রাতে তার আলোয় পড়ালেখা করতাম। সহপাঠীদের কাছ থেকে বই-খাতা চেয়ে নিতাম। স্যাররা আমাদের দৈন্যের কথা জানতেন। তাই পরীক্ষার ফি মওকুফ করে দিতেন। কলেজের লাইব্রেরি থেকে বই-পুস্তক দিয়ে সাহায্য করতেন তাঁরা। সাইকেলে চেপে কলেজে যাতায়াতের সময় ছেলেরা নানা বাজে কথা বলত। এখন সরকারি চাকরি পাওয়ায় আনন্দ হওয়ার কথা। কিন্তু এখনো রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না। কষ্টের সেই অতীত দিনগুলোর কথা বারবার মনে পড়ছে।’
বড় বোন পল্লবী বলেন, ‘এখন একটাই কাজ। দুই বোনের চাকরির টাকায় বাবাকে লন্ড্রির দোকানের বদলে অন্য কোনো দোকান করে দেওয়া। কারণ লন্ড্রির দোকানের উপার্জনে সংসার চলে না। স্বামীর বাড়িতে গেলেও বাবা-মা যাতে অন্তত দুই বেলা ঠিকমতো খেতে পারেন, এটা নিশ্চিত করে যাওয়াটা হবে আমাদের দুই বোনের জন্য নতুন সংগ্রাম।’
কালাই মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ নাজিমউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই বোন পল্লবী ও মিলি এলাকার নারীশিক্ষার জন্য রীতিমতো মডেল। চরম দারিদ্র্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেই তারা পড়ালেখা চালিয়েছে। অজপাড়াগাঁ থেকে প্রতিদিন ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আধা ভাঙা একটা সাইকেলে চেপে কলেজে যাতায়াত করেছে। পড়ালেখা করে তারা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলই অর্জন করেনি, পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে। পল্লবী ও মিলি দুই বোনের এ সাফল্যে কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে আমি গর্বিত।’
সূত্রঃ প্রথম আলো
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই অক্টোবর, ২০১০ দুপুর ১:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


