১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলেছিলো। কিন্তু সেই সময় তারা যুদ্ধপরাধীদের বিচার করে নাই। ২০০৮ সালেও আওয়ামীলীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলেছিলো। দেশের তরুণ সম্প্রদায় তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে একাট্রা। যার ফলে আওয়ামীলীগ আবারো দেশের শাসনভার পায়, ক্ষমতায় আসে। কিন্তু বিরোধী দলের ভূমিকা, বহিঃ বিশ্বের ভূমিকার কথা বলে এবারো আওয়ামীলীগ সরকার টাল বাহানা শুরু করে যুদ্ধপরাধীদের বিচার নিয়ে। যার প্রভাব আমরা দেখি টিভিতে, পত্রিকাতে, ব্লগে। একান্ত আওয়ামীলীগ ভক্তরাও হতাশ হয়ে পড়েছিলো সরকারের দ্বিধান্বিত ভূমিকায়।
১৯ শে মে ২০১০। পল্টন ময়দানে লাখো মানুষের সামনে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করেন, "বিএনপি যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধী নয়। তবে সেই বিচারের নামে কাউকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা হলে আমরা মেনে নিবোনা।" বস্তুতঃ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এ ঘোষণার মাধ্যমেই বিএনপি তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলো। দেশের কোটি মানুষ আশায় বুক বেঁধেছে এবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই হবে। আওয়ামীলীগ সরকারও আটঘাঁট বেধেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু করেছে।
কিন্তু ৫ অক্টোবর জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে খালেদা জিয়া তাঁর বক্তৃতায় বললেন, "স্বাধীনতার পরপরই প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেওয়া হয়। স্বাধীনতাবিরোধীদেরও তখনকার সরকার ক্ষমা করে দিয়েছিল। আজ প্রায় চার দশক পর স্বাধীনতাবিরোধীদের সহযোগীদের বিচারের কথা বলে জাতিকে হানাহানির দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। সরকারের দুমুখো নীতির বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক জনগণকে রুখে দাঁড়াতে হবে" (প্রথম আলো, ৬ অক্টোবর ২০১০)। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আশায় যারা বুক বেঁধে ছিলো সেই কোটি মানুষের মতো আমিও এ কথায় হতাশ হয়েছি।
যেখানে গত ১৯ মাসে বিএনপির প্রায় সব স্তরের নেতা-নেত্রীর বক্তৃতা-বিবৃতি ঘাঁটলে দেখা যায়, সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও কেউ যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিপক্ষে অবস্থান নেননি। কয়েক দিন আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মওদুদ আহমেদ আলাপ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার আমরাও চাই। কিন্তু বিচারের নামে রাজনৈতিকভাবে কাউকে হয়রানি করা যাবে না।’ এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যখন যুদ্ধাপরাধের বিচারে বিএনপির সহযোগিতা চাইলেন, তখন দলের মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন বললেন, একদিকে সহযোগিতা চাইবেন, অন্যদিকে দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালাবেন, এ স্ববিরোধী নীতি চলতে পারে না। সেখানে হঠাৎ করে বিএনপির চেয়ারপারসনের এ বক্তৃতায় বিএনপির একজন হিসাবে ক্ষুব্ধ, অবাক এবং বাকরুদ্ধ হয়েছি। ফলশ্রুতিতে এটা নিয়ে গত কয়েকদিনে বিএনপির ভিতরকার অবস্থা জানার চেষ্টা করেছি, বুঝার চেষ্টা করেছি।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি ধীরে চলো নীতিতে এগোচ্ছিলো। এর কারন ছিলো মূলত দুইটা। এক. ১/১১ এর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দল ছিলো বিএনপি। ফলে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা পুরাপুরি ভেঙ্গে যায়। দুই. অতীত থেকে শিক্ষা। ফলে হরতালের অরাজাকতা রাজনীতি থেকে বিএনপি বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলো। এরই মানসিকতায় বিএনপি বারবার সরকারকে আহবান জানিয়ে বলেছে তারা আওয়ামীলীগ সরকারকে সহযোগিতা করতে পুরাপুরি প্রস্তুত।
খালেদা জিয়া বুঝেছিলো দেশের মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। ফলে উনি নেতা-কর্মীদের যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে সজাগ থাকতে বলেছিলেন। নিজ দলের কাউকে যেনো শত্রুতার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধী মামলায় জড়িয়ে না ফেলে সেজন্য তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখতে বলেছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর মূল নেতারা, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা যখন ধরা পড়ে তখন জামায়াতের পক্ষ থেকে বার বার বিএনপির চেয়ারপারসনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতের কোন নেতাকে সাক্ষাৎ দেয়নি। অবশেষে জামায়াতের মুনাফাভোগী বিএনপির কিছু নেতার মাধ্যমে জামায়াতের নেতারা চেয়ারপারসনের সাথে সাক্ষাৎ করলেও চূড়ান্তভাবে হতাশ হতে হয়। বিএনপির চেয়ারপারসন তখন বলেছিলো, "যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচিয়ে বিএনপি এর কলঙ্ক নিতে চায় না।" শোনা যায়, জামায়াত নাকি বিএনপিকে প্রস্তাব দিয়েছিলো, সরকার পতনের। অর্থাৎ বিএনপি যদি সহযোগিতা করে তাহলে জামায়াতের কর্মীরা ১ মাসের মধ্যে আওয়ামীলীগ সরকারের পতন ঘটাবে। কিন্তু এরপরও আপোষহীন নেত্রীকে টলাতে পারেনি।
জামায়াতের শত্রুরাও স্বীকার করে সাংগাঠনিক এবং আর্থিকভাবে জামায়াত অনেক এগিয়ে। জামায়াত সেই শক্তিতে বলিয়ান হয়ে বিএনপির থিংক ট্যাঙ্কের কিছু লোক এবং দুর্ণীতিগ্রস্থ কিছু নেতাকে নিজেদের দিকে ভিড়িয়ে নেয়। ফলে সবাই মিলে প্রতিনিয়তঃ খালেদা জিয়াকে বুঝানোর চেষ্টা করছে যে, যুদ্ধপরাধী বিচারের নামে আওয়ামীলীগ বিএনপি তথা বিরোধী দলকে নিচ্ছিহ্ন করতে চায়। তারা প্রতিনিয়ত খালেদা জিয়ার কাছে বলে
১। আওয়ামীলীগ তাদের দলের চিহ্নিত/অভিযোগকৃত যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে কিছু বলছেনা কিন্তু যুদ্ধপরাধীদের বিচারের নামে বিএনপির নেতা কর্মীদের হয়রানি করছে।
২। আওয়ামীলীগ যুদ্ধপরাধী বিচারের ইস্যু দিয়ে জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরিয়ে রেখে ছাত্রলীগ এবং যুবলীগ দিয়ে বিরোধীদলের উপর হামলা করাচ্ছে।
৩। দীপু মনির সেই ঘোষণার কথা (প্রতিটি ইউনিয়নে ইউনিয়নে যুদ্ধপরাধীদের তালিকা তৈরী করা হচ্ছে) স্মরণ করিয়ে হুশিয়ারী দিচ্ছে যে বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি তালিকা করা হয়েছে। সুতরাং জামায়াতের বিচারের পরই বিএনপির নেতা কর্মীদের ধরা হবে।
৪। অনেক যুদ্ধপরাধীই আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীদের সাথে মিশে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলো এমন কথা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো এমন সার্টিফিকেটও যোগার করেছে। ফলে আওয়ামীলীগ কৌশলে নিজেদের লোক বাড়াচ্ছে এমন অভিযোগও করা হয়।
এরকম অনেক কিছু বলে প্রতিনিয়তই বিএনপির চেয়ারপারসনকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এমনিতেই ১/১১ ঘটনার পরে খালেদা জিয়া কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছেনা। বিভ্রান্তিকারীরা সেই সুযোগই নিচ্ছে।
সুতরাং ভালো মন্দ না বুঝে এ রকম একটা মন্তব্য করার দায়ভার যতটুকু না চেয়ারপারসনের তারচেয়ে বেশী বিশ্বাসঘাতক নেতাদের এবং আওয়ামীলীগের কিছু নেতার দ্বিমুখী নীতিও।
আশা করছি বিএনপির চেয়ারপারসন তার প্রজ্ঞা, মেধা দিয়ে পুনরায় সঠিক অবস্থানে ফিরে যাবে। সেই সাথে আওয়ামীলীগও ৭১ এর দোসর রাজাকারদের নিজ দলে না ভিড়িয়ে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করবে এবং সেই সাথে নিজদলের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও নিশ্চিত করবে।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০১০ রাত ১:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



