জয়পুরহাট জামালগঞ্জের পরিত্যাক্ত কয়লাখনি থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড কোল গ্যাসিফিকেশন (ইউসিজি) প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র ৩ বছরে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে দিতে সরকারকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি কোম্পানী। উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রতি কিলোওয়াট গ্রাহকদের মাত্র ৩ টাকা ৪৬ পয়সায় বিতরণ করা যাবে বলে জানিয়েছেন সিমিলি উন্নয়ন কর্পোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান আলী এ নুরানী।
তিনি জানান, ১৯৫৯ সালে আবিষ্কৃত জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ কয়লাখনি ভূপৃষ্ঠের সাড়ে ৬ শ’ থেকে সাড়ে ১১ শ’ মিটার নিচে। সাধারণত সর্বোচ্চ ৫শ’ মিটার নিচে থেকে কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হলে শ্রমিক নিহতের আশংকা থাকে বেশি। জামালগঞ্জের কয়লাখনির গভীরতা বেশি হওয়ায় দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এই কয়লা খনিটি পরিত্যক্ত পড়ে আছে। ইউসিজি প্রযুক্তির মাধ্যমে কার্বন ড্রাই অক্সাইড, হাইড্রোজেন, মিথেন ইত্যাদি জ্বালানি ব্যবহার করে কয়লাকে প্রথমে গ্যাসে রুপান্তর করা হবে। সে গ্যাস থেকে উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ। কয়লা উৎপাদন পরিবেশ এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও এ পদ্ধতিতে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে পরিবেশবান্ধব। এর জন্য বসত-বাড়ি স্থানান্তর করতে হবে না। জামালগঞ্জ কয়লাখনি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে প্রায় ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে বলেও তিনি জানান।
সিমিলি উন্নয়ন কর্পোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান আলী এ নূরানী ফোকাস বাংলা নিউজকে আরো জানান, কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারকে সহযোগিতা করতে আমেরিকার ‘ক্লিন কোল’ নামে একটি কোম্পানী আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে। সরকার অনুমোদন দিলে আগামী তিন বছরের মধ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব। প্রকল্পটি স্থাপনে সরকারকে কোন অর্থ দিতে হবে না। এর মাধ্যমে সরকার প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব পাবে বলেও তিনি জানান।
তিনি আরো জানান, ‘ক্লিন কোল’ কোম্পানী আমেরিকা, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, ভিয়েতনাম, স্পেন, অষ্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশে এ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। জামালগঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারলে ‘ক্লিন কোল’ এ প্রযুক্তি বিনামূল্যে বাংলাদেশে স্থানান্তর করবে, যা ভবিষ্যতে দেশের আরো অন্যান্য অব্যবহৃত কয়লা খনিতে ব্যবহার করা যাবে।
নূরানী জানান, গত ১৮ অক্টোবর ক্লিন কোল কোম্পানী এবং আমেরিকা ও কানাডা থেকে জ্বালানী বিশেষজ্ঞ ও এক্সপার্টদের নিয়ে বিদুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিদুৎ প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী উপদেষ্টা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ইউসিজি প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত দিক সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেন ক্লিন কোল কোম্পনীর প্রতিনিধিরা। এতে সরকার প্রযুক্তি সম্পর্কে আরো যাচাই-বাছাই করে বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করতে পেট্রোবাংলাকে নির্দেশ দিয়েছে। তিনি জানান, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদুৎ উৎপাদনে সরকারকে আগ্রহী করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে গ্রীণ সিগন্যাল পেয়েই তিনি বিদেশী এক্সপার্টদের নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেছেন।
পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, দেশে এখন সর্বোচ্চ দেড় হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং আছে। বর্তমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে আগামী পাঁচ বছরে ৩ হাজার ৫শ’ ৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে। এর মধ্যে নির্মাণাধীন হচ্ছে ৭শ’ ৫২ মেগাওয়াট। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আছে আরও ১ হাজার ৩শ’ ৫০ মেগাওয়াট এবং প্রতিশ্রুতি আছে ১ হাজার ৪শ’ ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পে অর্থায়নে। কিন্তু গ্যাস সংকটসহ বিভিন্ন কারণে এ প্রকল্পগুলো ঠিকভাবে বাস্তবায়ন অনিশ্চিত। তাই আগামী বছরে ১৪’শ মেগাওয়াট, ২০১১ সালে ১৮’শ মেগাওয়াট এবং ২০১২ সালে ১ হাজার ৮শ’ ৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হতে পারে।
জানা গেছে, দেশকে লোডশেডিংমুক্ত করতে বর্তমান পরিকল্পনার বাইরে আরও সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে ভাড়ার ৫শ’ থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট, আগামী ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে ৮শ’ মেগাওয়াট পিকিং এবং আগামী ৪ থেকে ৫ বছরে কয়লাভিত্তিক ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেষ্টা হচ্ছে। এর মধ্যে ভাড়ার ৫শ’ ৩০ মেগাওয়াট এবং পিকিং ৮শ’ ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য টেন্ডার হয়ে গেছে। এর মধ্যে ভাড়ার চুক্তি করা হবে ১৯ নভেম্বর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৫ বছরে উৎপাদন খাতে ৭ বিলিয়ন, সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে তিন বিলিয়ন ডলার বা সর্বমোট ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের দরকার হবে। এর মধ্যে উৎপাদন খাতে সরকারকে বিনিয়োগ করতে হবে ৮শ’ ৫০ মিলিয়ন ডলার। এর বাইরেও ২০১৫ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ৪শ’ ৫০ মেগাওয়াট। এজন্য ইতিমধ্যে বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ১শ’ মেগাওয়াটের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া ৯ থেকে ১৪ মেগাওয়াটের সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনে জামালপুরের সড়িষাবাড়ী, রাজশাহীর আঞ্চলিক ট্রেনিং সেন্টার, রাজশাহীর গোদাগাড়ী এবং কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বসানো হবে। এছাড়া ত্রিপুরার ৭শ’ ৪০ মেগাওয়াট কেন্দ্র, পশ্চিম বাংলার বাহারামপুর থেকে ২৫০-৩০০ মেগাওয়াট এবং আসাম ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে যাতে দেশকে লোডশেডিংমুক্ত করা যায় তার জন্য ইতিমধ্যে ৫শ’ ৩০ মেগাওয়াট ভাড়ার এবং ৮শ’ ২০ মেগাওয়াট পিকিং প¬ান্টের (মোট ১৩৫০ মেগাওয়াট) জন্য টেন্ডার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকারের।
পিডিবির সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে পিডিবি দুই টাকা ৬৬ পয়সায় প্রতি ইউনিট উৎপাদন করে পাইকারি গ্রাহকদের (বিতরণ কোম্পানিকে) কম দামে অর্থাৎ দুই টাকা ৪৫ পয়সায় বিক্রি করছে। তবে পিডিবি তার উৎপাদিত বিদ্যুতের ২০ শতাংশ সাধারণ গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করে। সেসব গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে প্রতি ইউনিট সাড়ে চার টাকা ব্যয় হলেও বিল হয় তিন টাকা ৫৬ পয়সার মতো। বেশি দামে উৎপাদন করে কম দামে বিক্রির কারণে পিডিবি শত শত কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। এতে আরও বলা হয়, উচ্চমূল্যের ভাড়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র আগামী বছর থেকে উৎপাদনে আসা শুরু হবে। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন (যদি ১৫’শ মেগাওয়াট ভাড়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসে) ব্যয় প্রতি ইউনিট বর্তমানের দুই টাকা ৬৬ পয়সা থেকে বেড়ে ৩ টাকা ২২ পয়সা, ২০১১ সালে চার টাকা ৬১ পয়সা, ২০১২ সালে চার টাকা ৭০ পয়সা, ২০১৩ সালে চার টাকা ১০ এবং ২০১৪ সালে ৩ টাকা ৩৮ পয়সা খরচ হবে। এ সময় বিদ্যুতের দাম না বাড়ালে পিডিবি এবং বিতরণ কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। তাই পর্যায়ক্রমে এর দাম বাড়ানো সুপারিশ করেন পিডিবির নীতিনির্ধারকরা।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


