আপনি কি জানেন, কেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি?
নিজেকে একজন বড় মানুষ বানানোর জন্য!
অনেক উঁচু দালানের মালিক হবার জন্য...
আমি কোথায় থাকি, এটা দেখার জন্য মানুষ ঘাঁড় বাঁকা করে আকাশের দিকে তাকাবে, তখন আমি নিজেকে সার্থক মনে করব।
আমার এ.সি. গাড়ি যখন রাস্তায় চলবে তাখন তার জানালার কাচ বন্ধ থাকবে। বাইরের নোংরা পরিবেশ আর প্রতিবন্ধি ফকির গুলি যাতে আমাকে ডিস্টার্ব করতে না পারে।
শুধু এতেই আমি সার্থক হব না, আমি সার্থক হব সেইদিন যেইদিন, আমার গাড়ি রাস্তায় চলবে আর চারদিকের পাবলিকের গাড়ি আটকে রাখা হবে, এম্বুলেঞ্চ আর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির চেয়ে আমার গাড়িকে বেশি মুল্য দেওয়া হবে।
আমি বড় হচ্ছি এক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে, আমার মনে অনেক বড় এম্বিশন, আমি একদিন অনেক বড় হব।
এই ক্যাম্পাসের বিচিত্র সব ঘটনা দেখি।
এক মহিলাকে দেখি মাঝে মাঝে, যেই মহিলা ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে কলম বিক্রি করে। সবাইকে কলাম কিনবে কিনা জিজ্ঞাস করে বিরক্ত করে। মহিলার হাতে অনেকগুলা কলম থাকে, দুই একজন হৃদয়বান ছাত্র-ছাত্রী তার হাত থেকে সেই কলম কিনেও নেয়।
মহিলা মাঝা মাঝে পেটের উপর হাত রেখে মুখটা বিকৃত করে ফেলে, সরিলটা বাঁকিয়ে ফেলে। এটা তার কলম বিক্রি করার কৌশল, মানুষ তার মুখের ওই ভাব দেখে যদি দয়া করে কলম কিনে। কত কৌশল যানে মহিলা! হাটতে পারে না মহিলা, আবার ঢং করে!
এই মহিলা সবাইকে বিরক্ত করে কেন? আমাদের কলাম কিনার অনেক জায়গা আছে। তাকে বিরক্ত করতে হবে না।।
হঠাৎ একদিন শুনলাম মহিলার নাম নাসেরা বেগম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। তার পুরো জীবনি জেনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো।
নাসেরা বেগমের জন্ম ১৯৩৮ সালে নাটোরের কান্দিভিটা গ্রামে। নাটোর গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৬৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। লেখাপড়া শেষে কর্মজীবন শুরু করেন একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে। ১৯৬৯ সালে হাবীব ব্যাংকের (বর্তমান অগ্রণী ব্যাংক) কর্মকর্তা চান মিঞার সঙ্গে বিবাহ হয়। ভালোই চলছিল নাসেরা বেগমের সংসার। ১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল ব্যাংক কর্মকর্তা স্বামী চান মিঞাকে হানাদার পাকিস্তান বাহিনী ধরে নিয়ে হত্যা করে। স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন নাসেরা। পরে আর বিবাহ করেননি। ১৯৮৫ সালে খুলনা মেমোরিয়াল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনকালে ধরা পড়ে তার হার্টের ভাল্ব নষ্ট। বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে ১৯৮৭ সালে ঢাকায় এসে কল্যাণপুর কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নেন অপেক্ষাকৃত কম পরিশ্রমে। অসুস্থতার জন্য সে চাকরিও ছেড়ে দিতে হয়। জমানো টাকা দিয়ে কল্যাণপুরের রাজিয়া সুলতানা রোডে একটি হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান দেন। একপর্যায়ে তাকে দোকানও বিক্রি করতে হয়। এর পর শুরু হয় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কলম বিক্রির সংগ্রামী জীবন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় ১৯৮৯ সাল থেকে শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কলম বিক্রি শুরু করেন। অসুস্থতার কারণে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া সম্ভব হয় না বলে জানান। নাসেরা বেগম বলেন, ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এরশাদ রহমান নামে এক ডাক্তার তাকে মিরপুর হার্ট ফাউন্ডেশনে চিকিৎসা দেন। তার হার্টে ৫টি ব্লক ধরা পড়ে। এরপর ওই ডাক্তারের বোন সঞ্জিতা রিমা ওষুধ বাবদ মাসে ১৫০০ টাকা করে দিতেন। গত ২ বছর ধরে কারও কাছ থেকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পান না। তিনি জানান, এখন হৃদরোগসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। নাসেরা বেগম বলেন, বুকে ব্যথার কারণে কথা বলতে খুব কষ্ট হয়।৭৩ বছর বয়সী এই হৃদরোগী একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী বরাবর সাহায্যের আবেদন করেও কোনো ভাতা বা সাহায্য পাননি। নাসেরা বেগম বলেন, মুক্তিযুদ্ধে স্বামী হারানো একজন উচ্চশিক্ষিত বয়োবৃদ্ধা অসুস্থ নারী হিসেবে বিবেচনা করে তাকে যেন বয়স্ক ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়।
হলে আমার রুমে বসে বসে কেঁদেছিলাম। আমার কান্না থামছিলো না, টাওয়াল দিয়ে চোখ মুছেছি আর কেঁদেছি। নিজেকে একটা শিক্ষিত পশু মনে হচ্ছিলো! কেন একদিনের জন্যও ওই মহিলাকে জিজ্ঞাসা করিনি আপনি কেন এই বয়সে এভাবে ঘুরে ঘুরে কলম বক্রি করেন?
তার জন্য একটি পেইজ খোলা হয়েছে, আমি এটার লিঙ্ক দিলাম-
আমাদের কলমদাদি
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মার্চ, ২০১১ দুপুর ১:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




