- হারুন ইয়াহিয়া
সর্বশক্তিমান, দয়ালু ও করুণাময় আল্লাহ তায়ালা কোরআনের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন যে, তিনি মানুষের সাথে ঘনিষ্ট এবং মানুষ তাঁর কাছে প্রার্থনা করলে তিনি তাতে সাড়া দেন।
প্রাসঙ্গিক একটি আয়াতের বর্ণনা নিম্নরূপঃ
'(হে নবী,) আমার কোনো বান্দা যখন তোমাকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে (তাকে তুমি বলে দিয়ো), আমি (তার একান্ত) কাছেই আছি; আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেই যখন সে আমাকে ডাকে, তাই তাদেরও উচিত আমার আহ্বানে সাড়া দেয়া এবং (সম্পূর্ণভাবে) আমার ওপরই ঈমান আনা, আশা করা যায় এতে করে তারা সঠিক পথের সন্ধান পাবে।' (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৬)
উপরের আয়াতের বর্ণনা অনুসারে আল্লাহ তায়ালা সকলেরই সন্নিকটে বিরাজমান। তাঁর গোচরেই আছে প্রত্যেকের ইচ্ছা, অনুভূতি, চিন্তা, উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, অর্ধোচ্চারিত প্রতিটি শব্দ এবং এমনকি মনের গহীনে লুকায়িত ভাবনা। ফলে যে কেউ তাঁর দিকে ফিরে তাঁর কাছে প্রার্থনা জানালে তিনি তা শোনেন ও সাড়া দেন। এটাই হচ্ছে মানবজাতির প্রতি আল্লাহ তায়ালার রহমত এবং তাঁর করূণা, বরকত আর তাঁর অসীম শক্তির প্রকাশ। আল্লাহ তায়ালার আছে অফুরান শক্তি ও অশেষ জ্ঞান। সমগ্র বিশ্বজগতের সবকিছুরই মালিক তিনি। মহাশক্তিধর মানুষ থেকে বিশালতম ধনভান্ডার পর্যন্ত, বেহেশতের মহত্তম সত্তাসমূহ থেকে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম জীব পর্যন্ত জগতের সবকিছুই তাঁর এবং তাঁরই ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণের অধীন।
এ সত্যে যাঁর অটল বিশ্বাস তিনি আল্লাহ তায়ালার কাছে যে কোন বস্তু প্রার্থনা করতে এবং সে প্রার্থনা মঞ্জুর হবার আশা করতে পারেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি অবশ্যই সব ধরনের চিকিত্সার ব্যবস্থা নেবেন। তবুও, যেহেতু তিনি জানেন কেবল আল্লাহ তায়ালাই স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করে দিতে পারেন তাই তাঁর কাছেই আরোগ্যের জন্যে প্রার্থনা করবেন তিনি। অনুরূপভাবে কোন প্রকার ভীতি ও শঙ্কায় আর্ত ব্যক্তি সব রকম ভীতি-শঙ্কা থেকে মুক্তি ও স্বস্তি লাভের জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করতে পারেন। কোন কার্য সম্পাদনে সমস্যার সম্মুখীন ব্যক্তি সমস্যা সমাধানের জন্য আল্লাহর কৃপা ভিক্ষা করতে পারেন। সত্যের পথে পরিচালনা, অন্য সকল ঈমানদারদের সঙ্গে বেহেশত নসীব করা, স্বর্গ-নরক-ঐশী শক্তি সম্পর্কে পূর্ণতর জ্ঞান লাভ করা, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া - এ রকম অসংখ্য বরকত লাভের জন্য আল্লাহ তায়ালার করুণা প্রার্থনা করা যায়। নবী করীম (সঃ) এই বিষয়ের ওপর জোর দিতে গিয়েই বলেছেন,
আমি কি এমন একটি অস্ত্র তোমাদের গোচরে আনব যা একাধারে তোমাদেরকে শত্রুর অপকার থেকে রক্ষা করবে এবং তোমাদের স্ব অবস্থানে টিকে থাকার শক্তি বৃদ্ধি করবে? তারা বলল, হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ (সঃ)। তিনি বললেন, দিন-রাত আল্লাহকে ডাকো, 'প্রার্থনা'-ই হচ্ছে বিশ্বাসীর অস্ত্র।
কোরআনে বর্ণিত আরেকটি রহস্য সম্পর্কে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, '... মানুষ (যেভাবে নিজের জন্যে না বুঝে) অকল্যাণ কামনা করে, (তেমনি সে) তার (নিজের) জন্যে (বুঝে সুঝে) কিছু কল্যাণও কামনা করে, (আসলে) মানুষ (কাংখিত বস্তুর জন্যে এমনিই) তাড়াহুড়ো করে।' (সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত ১১)
মানুষের সকল প্রার্থনাই মঙ্গলকর হয় না। দৃষ্টান্তস্বরূপ, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যে সম্পদের প্রার্থনা করা হল আল্লাহর কাছে। কিন্তু আল্লাহ হয়তো এই প্রার্থনায় কল্যাণকর কিছুই দেখতে পাবেন না, কেননা সম্পদ-সমৃদ্ধি ওই সন্তানকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে নিতে পারে। এই অর্থে আল্লাহ প্রার্থনাটি শোনেন এবং সর্বোত্তম পন্থায় সাড়া দেন। আরেকটি দৃষ্টান্ত নিন: নির্ধারিত সময়ে কারও সঙ্গে সাক্ষাতের কর্মসূচি যেন বিনষ্ট না হয় সে জন্যে প্রার্থনা করা হল। কিন্তু এমন হতে পারে যে, সাক্ষাতের জন্যে নির্দিষ্ট স্থানে নির্ধারিত সময়ে না গিয়ে পরে, অর্থাৎ বিলম্বে যাওয়াই প্রার্থনাকারীর জন্যে কল্যাণকর হবে, কেননা নির্ধারিত সময়টিতে অন্য কোন ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের ফলে তার জাগতিক জীবনের কল্যাণ হবে। আল্লাহ তায়ালা সেটা জানেন এবং তিনি সাড়া দেন প্রার্থনাটি যে আকারে উত্থাপিত হয়েছে সে আকারে নয় বরং বিকল্প সর্বোত্তম পন্থায়; অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা প্রার্থনাকারীকে শোনেন কিন্তু প্রার্থনায় তার জন্যে হিতকর কিছু দেখতে না পেলে, তার জন্যে যা সর্বোত্কৃষ্ট তা' তিনি সৃষ্টি করেন। এটি স্বতঃই একটি বড় রহস্য। কোন প্রার্থনা না-মঞ্জুর হয়েছে বলে প্রতীয়মান হলে এই রহস্যটি সম্পর্কে যারা অজ্ঞ তারা ভাবে আল্লাহ বুঝি প্রার্থনাটি শুনতে পাননি। এটা অজ্ঞতা ও একটি বিকৃত বিশ্বাস। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেন, '... আমি তার ঘাড়ের রগ থেকেও তার অনেক কাছে (অবস্থান করি)।' (সূরা ক্বাফ, আয়াত ১৬)
তিনি মানুষের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, অনুচ্চারিত প্রতিটি চিন্তা তথা তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সম্পর্কে অবহিত। এমনকি নিদ্রামগ্ন অবস্থায় সে যে স্বপ্ন দেখে এবং স্বপ্নে যা দেখে সে সম্পর্কেও আল্লাহ তায়ালা অবহিত। আল্লাহ তায়ালাই সবকিছুর স্রষ্টা। তাই প্রতিবার প্রার্থনার সময় এ কথাটি অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে যে আল্লাহ তায়ালা তার প্রার্থনাটি উপাসনারূপেই গ্রহণ করবেন এবং সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত সময়ে তা মঞ্জুর করবেন এবং তার জন্যে যা সর্বোত্তম তা-ই সৃষ্টি করবেন। প্রার্থনা শুধু যে ইবাদতের একটি রূপ তা নয়, এটি মানবজাতির প্রতি আল্লাহ তায়ালার একটি মূল্যবান উপহার। তার কারণ আল্লাহ তায়ালা মানুষকে প্রার্থনার মাধ্যমে যে কোন বস্তু লাভে সক্ষম করেছেন; অবশ্য তার জন্যে যা শুভ ও কল্যাণকর বলে আল্লাহ তায়ালা মনে করেন। প্রার্থনার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, '(হে নবী,) তুমি (এদের) বলো, তোমরা যদি (তাঁকে) না ডাকো তবু আমার মালিক তোমাদের মোটেই পরোয়া করবেন না, যদি তোমরা তাঁকে ডাকো তবে তা তোমাদেরই কল্যাণ বয়ে আনবে, কিন্তু তোমরা তো (তাঁকে) অস্বীকার করেছো, (তাই) অচিরেই (এটা) তোমাদের জন্যে কাল হয়ে দেখা দেবে।' (সূরা আল ফোরকান, আয়াত ৭৭)
*** অনুবাদ করেছেনঃ আবুল বাশার ***
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ১০:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



