বিশ্ব তালিকায় নিচে নামছে দেশের সরকারি ভার্সিটি
০ সাইদুর রহমান/ ইত্তেফাক
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঐতিহ্য হারাচ্ছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রমে বিরাজ করছে বেহাল দশা। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগুতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সারাবিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিং-এ নিচের দিকে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এগিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট, অঙ্গনে দলীয় রাজনীতি, আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য, বিক্ষিপ্ত গবেষণা কার্যক্রম, শিক্ষকদের অন্যত্র খন্ডকালীন শিক্ষকতা, ভিসি থেকে শুরু করে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেছেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে পড়ার কথা নয়। সার্বিক দিক দিয়ে অবশ্যই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার হার্ডকপি জমা দেন শিক্ষকরা যা ওয়ার্ল্ড র্যাকিং-এ কাউন্ট হয় না। অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্ল্ড র্যাকিং'র দিকে খেয়াল রেখে তাদের ওয়েবসাইট আপডেট করে থাকে। তাদের গবেষণা পেপারগুলোও ওয়েবসাইটে দেয়া হচ্ছে নিয়মিত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের কোন উন্নতি হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক র্যাকিং-এ পিছিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ওয়েব সাইট 'টপ ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ' র্যাংকিং-এর সর্বশেষ ২০১০ সালের ফলাফলে দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থান ৫৯৪ তম। স্পেনভিত্তিক অপর একটি ওয়েবসাইটের র্যাংকিং-এ অবস্থান ৫হাজার ৫শ ৩১তম। এছাড়াও বিভিন্ন বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় ও মিডিয়ার জরিপে সেরা ৫শ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নেই এদেশের কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।
যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত র্যাংকিং সংস্থা টাইমস হায়ার এডুকেশন এবং কুয়াকুয়ারেলী সাইমন্ডস (কিউইএস) যৌথভাবে সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ২০০৪ সাল থেকে 'টপ ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ' র্যাংকিং জরিপ পরিচালনা করে আসছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক তথ্য, বুদ্ধিভিত্তিক গবেষণা, ওয়েবসাইটে সংযোজিত তথ্য এবং গবেষণা কর্মকাণ্ড নিয়ে জরিপ করে সংস্থাটি। সর্বশেষ জরিপে বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিং-এ প্রথমে রয়েছে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজ, দ্বিতীয় অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি এবং তিন নম্বরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটি। চায়নার সাংহাই জিয়াং টাও'র সর্বশেষ ২০০৮ সালের সেরা ৫শ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেটিং-এ দেশের কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এছাড়াও স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, হাভর্ার্ড ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউএস টুডে'র সর্বশেষ প্রকাশিত সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিং-এ সেরা ৫শ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নেই বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়। স্পেনের সবচেয়ে বড় পাবলিক গবেষণা সংস্থা 'কনসেজো সুপেরিয়র ডি ইনভেসটিসিওন সিয়েন্টিফিকাস'র এক গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৫ হাজার ৫শ ৩১তম স্থানে। র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। দ্বিতীয় অবস্থানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। বুয়েট ২,৯১৬তম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ৪,৫৭৭তম, দক্ষিণ এশিয়ার 'শীর্ষ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয় এর মধ্যে বাংলাদেশের রয়েছে ৬টি। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (২৩), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় (৫৬), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (৭৬), আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (এআইইউবি) (৮৭), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (৯৫) এবং ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (৯৯)।
তালিকায় জায়গা করে নেয়া অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হল ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (৬৮৬০), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (৭০৭৮), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (৭১৯৬), ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (৮৭৫৯), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (৮৭৮৯), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
(৯৪০৯), আহসান উলস্নাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (১০২০৩), ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (১০৪৭৪), নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (১০৫০৩), ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক বাংলাদেশ (১০৫১৮), চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (১০৬৪৭), এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন (১০৬৬৭), ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (১১০৪৩), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (১১১৪২), ঢাকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (১১২৩৫), খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (১১৪২২) এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (১১৬৪৩)।
যদিও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার প্রকাশিত জরিপের ফলাফল নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। এক এক সংস্থার জরিপে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন অবস্থান দেখানো হয়েছে।
র্যাংকিং-এ এক সময় ঢাবি ছিল সেরা
র্যাংকিং-এ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময় গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সেরা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া এশিয়া ও অষ্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরব অবস্থান ছিল। ১৯৯৯ সালে এশিয়া উইক প্রকাশিত রেটিং-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ৩৭। ২০০০ সালে ছিল ৬৪ তম। ছাত্র-ছাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ২৩ তম।
পিছিয়ে পড়ার কারণ
সংশিস্ন্লষ্টদের মতে, উচ্চশিক্ষার একটি মৌলিক কার্যক্রম গবেষণা। এ ক্ষেত্রে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক এগিয়ে ছিলো। এ জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হত প্রাচ্যের অক্সফোর্ড । কিন্তু বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ গুলোর বিষয়ে বিভিন্ন সভা সেমিনারে কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতার কথা শোনা গেলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অপর্যাপ্ত গবেষণা কর্মের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। ওয়েবসাইটের জরিপে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে থাকার মূল কারণ হলো-পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমান যে ওয়েবসাইট রয়েছে তাতে যৎসামান্য তথ্য রয়েছে। ওয়েব সাইটের প্রতিটি বিভাগ, হল, ইনস্টিটিউট, লাইব্রেরী, শারীরিক শিক্ষা কেন্দ , সিন্ডিকেট, সিনেট, একাডেমিক কাউন্সিল, যাতায়াত ব্যবস্থা, মেডিকেল সেন্টার, ভর্তি সংক্রান্ত বিষয়, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক বিষয় এবং গবেষণা কেন্দ গুলো সম্পর্কে নামেমাত্র তথ্য দেয়া হয়েছে। ওয়েব সাইটে বিদেশী শিক্ষাথর্ীদের ভর্তি, গ্র্যাজুয়েট, আন্ডার গ্র্যাজুয়েট এবং একাডেমিক ক্যালেন্ডার, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে অনেক বেশি তথ্যসমৃদ্ধ। শিক্ষকদের গবেষণার ফলাফলও ওয়েবসাইটে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের টিকিয়ে রাখার স্বার্থে র্যাকিং-এ অনুযায়ী ওয়েবসাইট আপডেট করাও হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ইত্তেফাককে বলেন, ওয়েবসাইটের তথ্যের ভিত্তিতে যে ফলাফল উপস্থাপন করা হচ্ছে তা বাস্তবতার সঠিক প্রতিফলন নয়। 'বর্তমানেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচুর কাজ হয়। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এর অধিকাংশই অনলাইনে প্রকাশ করা যায় না। ফলে অনলাইনের সঙ্গে বাস্তবের একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে। আমরা এ ব্যবধান কমাতে কাজ করে যাচ্ছি।'
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম আরো বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য সাপোর্ট দেয়া হচ্ছে। ৩ থেকে ৪ বছর পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিত্র পাল্টে যাবে। প্রতিনিয়ত ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভালো গবেষণার জন্য উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে।
-ইত্তেফাক ১৮.০৯.২০১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


