২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ সালে হুমায়ুন আজাদের উপর ধর্মান্ধ কুলাংগারগুলা হামলা চালিয়েছিল। তারা নির্মমভাবে চাপাতি দিয়ে বাংলা একাডেমির বই মেলার পথে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে । ২৭শে ফেব্রুয়ারি দিনটির কথা হয়তো অনেকেই ভুলে গেছেন, বিশেষ করে বাংগালী যে ভুলোমনা। আজকে বেশ কিছু পোষ্ট আশা করেছিলাম এ বিষয়ে। মাত্র একটা কি দুটা নোটিশ টাইপের পোষ্ট দেখলাম।
দুদিন আগে বিশিষ্ট চিত্র শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনকে কাতারের আমীর নাগরিকত্ব দিয়েছেন। কারন দেব দেবী নিয়ে ছবি আঁকার জন্য ভারতের উগ্র হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে আন্দোলন, মামলা ও হামলার হুমকি দিয়ে আসছিল। তখন বেশ কিছু ব্লগার দেখলাম ফিদা হুসেনের এই পরিনতিতে ভারত সরকারের নিশ্চুপতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। আজকে অন্তত সেই ব্লগারদের কাছে একটা লেখা আশা করেছিলাম। কিন্তু সেই ব্লগাররা আজকে নিশ্চুপ। কেন? কারন ধর্ম। ফিদা হুসেনকে হুমকি দিয়েছে হিন্দু মৌলবাদীরা। কাজেই মুসলমান হিসাবে আমরা তাকে ডিফেণ্ড করার চেষ্টা করছি। সেই লেখা গুলোতে সামগ্রিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে ঘৃনা নয় বরং দেখলাম যে হিন্দু উগ্রপন্থীরা কিভাবে মুসল্মান হুসেনের বিরুদ্ধে নেমেছে তার প্রতিবাদ। রুশদী ও কিন্তু ভারতের। তাকে হুমকি দিয়েছে অবশ্য মুসল্মান জংগীরা এবং অন্যতম জংগী নেতা আয়াতুল্লায় খোমেনী। আমি একটা কমেণ্টে লিখেছিলাম-- সব ধর্মের জংগীবাদিদের চেহারা একই। সেটা মুস্লিম, হিন্দু বা খ্রিষ্টান বা অন্য কোন মতবাদ যাই হোকনা কেন। কাজেই ফিদা হুসেনের বিরুদ্ধে যা ঘটেছে তার নিন্দা জানাই আমরা সবাই। তার চেয়েও ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছিল আমাদের দেশে হুমায়ুন আজাদের ওপরে।
হুমায়ুন আজাদের উপর আক্রমণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটা উগ্র ইসলামপন্থী ও ধর্মান্ধদের মানসিকতা এবং বাংলাদেশে তাদের ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের একটা ধারণা দেয়। হুমায়ুন আজাদের দোষ কি ছিল? তিনি ছিলেন প্রথাবিরোধী লেখক। তিনি ধর্মে অবিশ্বাস করতেন। ধর্মে অবিশ্বাসকারিকে পরকালে আল্লাহ শাস্তি দেবেন, আমার বা আপনার তাতে কি? কিন্তু না। মুসলিম ধর্মানুভুতি এতই নাজুক যে, ইসলাম, তার নবী বা তাদের ঈশ্বরকে কোন রকমের সমালোচনা করলেই মুসল্মান্দের ধর্মানুভুতির পর্দা ছিড়ে খান খান হয়ে যায়। এত মোলায়েম আর পাতলা তাদের ধর্মানুভুতি যে কেউ তাদের বিরুদ্ধে লিখলেই তার কল্লার দাম ঘোষণা করতে হয়। তার বিরুদ্ধে রাস্তায় মিছিল করতে হয়।
কেন কল্লার দাম ঘোষণা করতে হয়, বা মুরতাদ ঘোষণা করতে হয়? হুমায়ুন আজাদ তো কোন মুসল্মানের বা মোল্লার কল্লার দাম ঘোষণা করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। তিনি তো কাউকে শারিরীক হুমকি দিয়েছেন বলে আমাদের জানা নেই। তিনি লিখেছেন। বিতর্ক করেছেন, প্রশ্ন করেছেন। তার লেখার কিছু ঠিক হতে পারে, কিছু বেঠিক হতে পারে। কেউই সম্পুর্ণ ভাবে সঠিক বা বেঠিক নন। তার সেই লেখার জবাব লেখা বা যুক্তি দিয়ে কেন দিতে পারেনাই মোল্লারা?
কারণ তার জন্য মগজ থাকা লাগে। মোল্লাদের সেটা কোন কালেই ছিলনা। কাজেই তাদের জবাব দিতে হয় উগ্রতা দিয়ে। ভিন্ন মতের দামও যে দিতে হয় এবং তা শ্রদ্ধাভরে নিতে হয় এটা মোল্লাদের কেউ কোনদিন শিখায়নি। আমি আমার আরেকটা লেখায় লিখেছিলাম যে, তোমার মতের সাথে আমার মতের মিল নাও হতে পারে, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি জীবন দেব-- ভল্টেয়ার। কিন্তু এসব কথা বোঝাবে কে ওদের। ওরা তো আল্লার ম্যন্ডেট নিয়ে নেমেছে। অবিশ্বাসির কল্লা কেটে ওরা বেহেস্তের হুরপরী পেতে চায়।
ধর্ম যেহেতু একটি দর্শন সেহেতু তার পক্ষে বিপক্ষে কথা থাকবে, সমালোচনা থাকবে। ধর্মের পক্ষে যদি কথা বলা যায়, তার বিপক্ষেও কথা বলার সুযোগ থাকতে হবে। তা না হলে সবকিছু একপেশে হয়ে যায়। কিন্তু বিপরীত সমালোচনা বা বিরোধীতা সহ্য করা তার ধাতে নেই। সেটা সব ধর্মে। মুস্লিম, খ্রিষ্টান, হিন্দু -- সব। মুস্লিমরা একটু বেশি উগ্র এই যা। হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন-- "হিন্দুরা মুর্তি পুজারী, মুসলমানরা ভাবমূর্তি পূজারী। মূর্তি পূজা নির্বুদ্ধিতা আর ভাবমূর্তি পুজা ভয়ঙ্কর"।
সমালোচনা ও বিরোধীতা থেকে আড়াল রেখে রেখে ধর্ম আরো ক্রমাগত অসহিঞ্চু হয়ে উঠছে। তাকে তুলায় মোড়া আংগুরের মত রাখা হচ্ছে। এতে করে তার নিজেরই হচ্ছে ক্ষতি। কারন বিপরীত স্রোতে চলতে না শিখলে তার কপালে আছে বদ্ধ পুকুরের ভাগ্য।
শেষ করছি হুমায়ুন আজাদের লেখার অংশ বিশেষ দিয়ে----
"আমার শিল্পানুভুতি সৌন্দর্যানুভুতি রাজনীতিকানুভুতি কাব্যানুভুতি প্রভৃতি পাহারা দেয়া রাষ্ট্রের কাজ নয়, কিন্তু রাষ্ট্র এক উদ্ভট দায়িত্ব নিয়েছে, মনে করছে ধর্মানুভুতি পাহারা দেয়া তার কাজ, তাই রাষ্ট্র দেখে চলছে কোথায় আহত হচ্ছে কার ধর্মানুভুতি"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



