জেনারেল জ্যাকব এর বয়স এখন ৮৭। মাঝারি উচ্চতা। বয়সের ভারে একটু ন্যুব্জ। কিন্তু নিজে নিজেই হাটেন। ধীরে ধীরে। কিন্তু যখন কথা শুরু করলেন তখন বুঝলাম এখনও যথেষ্ট তেজ আছে তার গলায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ইন্ডিয়ান আর্মির ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অফ স্টাফ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কমান্ডার ছিলেন তিনি এবং খুবই গুরুত্বপূর্ন অবদান রেখেছেন। নিয়াজীর সারেন্ডার করার সেই দলিলটি তারই লেখা। পাকিস্তানিরা চাইছিল জাতি সংঘের হস্তক্ষেপ। কিন্তু জ্যাকব সেটা হতে দেননি। তিনি ঢাকায় নিয়াজির হেড কোয়ার্টারে গিয়েছিলেন তার সাথে আত্মসমর্পন নিয়ে নেগোশিয়েট করতে।
জেনারেল জ্যাকব বসে আছেন। পেছনে দাঁড়িয়ে ভাবছি কথা শুরু করব কিনা
আমার সাথে অনেকক্ষণ গল্প করলেন খেতে খেতে। দুঃখের বিষয়, আমার কাছে কোন রেকর্ডার ছিলনা। কথপকথন ছিল অনেকটা এরকম—
আমিঃ আপনার সাথে কি নিয়াজীর পরে আর কখনও দেখা হয়েছিল, যুদ্ধের পরে?
জ্যাকবঃ না। তবে সারেন্ডারের পরে কোলকাতা জেলে আমি তাকে জেরা করেছিলাম। অনেকক্ষণ ধরে।
আমিঃ সেই জেরায় নিয়াজী কি নিজের দোষ স্বীকার করেছে?
জ্যাকবঃ না। সে বিষয়টাকে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত হিসাবে জাহির করতে চেয়েছে। এবং ছাড়া পাওয়ার পরে বলে বেড়িয়েছে যে আমি নাকি তাকে ব্ল্যাক মেইল করেছি। আমার তো ব্ল্যাক মেইল করার প্রশ্নই আসেনা। তাদেরই অবস্থা বরং খারাপ ছিল। সারেন্ডার ছাড়া গতি ছিলনা।
আমিঃ আপনি যখন সারেন্ডারের জন্য নেগোশিয়েট করতে গেলেন তখন সে কি বলল?
জ্যাকবঃ প্রথমে সে বলল- সারেন্ডারের প্রশ্নই আসেনা। আমরা বরং সিজ ফায়ার নিয়ে আলোচনা করতে চাই। (আমি জানতাম সিজ ফায়ার একটা বাহানা মাত্র, আসলে সে সময় কিনতে চাইছে যাতে করে জাতি সংঘের অনুপ্রবেশ ঘটানো যায়) তখন আমি বললাম যে তোমাদের আমরা ঘিরে রেখছি। তাড়াতাড়ি ডিসিশন নাও নাহলে আমরা তোমার পুরো বাহিনীর উপর বম্বিং শুরু করব। আমি ফিরে আসার প্রায় তের মিনিট পরে ওরা খবর দিল যে সারেন্ডার করবে। এইত। সারেন্ডারের দলিলটিও আমি লিখেছিলাম আর ওদেরকে দিয়ে এসেছিলাম পড়ার জন্য।
আমিঃ সারেন্ডারের যে দলিল টি আপনি লিখেছিলেন সেটাই কি ওরা মেনে নিয়েছিল নাকি কোন শব্দ পরিবর্তন করতে চেয়েছিল?
জ্যাকবঃ ওরা ওদের তরফ থেকে একটা লিখেছিল কিন্তু আমরা তাতে রাজী হইনি। আমি চেয়েছিলাম ওদের সম্পুর্ণ সারেন্ডার। একেবারে নিশর্ত আত্মসমর্পন। কারন নিয়াজী একবার বলেছিল যে তার লাশের উপর দিয়ে যেতে হবে তবু তারা বাংলা ছাড়বেনা। কাজেই আমি চেয়েছিলাম তার এই দম্ভ চূর্ণ করতে।
আমিঃ আপনি জানেন যে আমাদের দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অনেকে বলছে যে সিমলা চুক্তির আওতায় ১৯৫ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে ফেরত দেয়ার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ হয়ে গেছে। আপনার কী মত?
জ্যাকবঃ দ্যাট হ্যাজ নাথিং টু ডু উইথ ওয়ার ক্রিমিনালস নাও। দে শ্যুড ব্রট আনডার জুরিসডিকসন।
- এ পর্যায়ে একে খন্দকারকে দেখিয়ে তিনি তার ভুয়সী প্রসংশা করলেন। বললেন, “একে খন্দকার অত্যন্ত মেধাবী এবং চতুর সমরবিদ। ওর প্ল্যানিং আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছে এই বিজয়ে। হি ইজ আ জিনিয়াস।“
আমি তাকে স্যালুট দিলাম আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের জন্য। আমাকে বললেন “এখন তোমাদের দায়িত্ব পরবর্তী কাজের”। সেক্টর কমান্ডারদের দেখিয়ে বললেন “ওরা তোমাদের দেশ এনে দিয়েছে। তোমরা সে দেশকে এগিয়ে নাও”। আমি বললাম, আমাদের প্রজন্মের অনেকেই এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উৎসাহী। তারা অনেক ভালো ভালো কাজ করছে। ব্লগ লিখছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রাখছে।
একে খন্দকার, কে এম শফিউল্ল্যাহ আর আবু ওসমান চৌধুরীকে সাহস করে কিছু কথা জিজ্ঞেস করলাম। আমার মাথায় ঘুরছিল অমি পিয়ালের সেই রহস্যময় পুরুষ মোহাম্মদ হোসেন। তার ব্যপারে জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু কেউই ভালোভাবে তার কথা বলতে পারলেন না।
আবু ওসমান চৌধুরীকে মোহাম্মদ হোসেনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছি
সব শেষে জ্যাকব ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠলেন হোটেলে ফেরার জন্য। শ্রদ্ধায় আনত আদ্র চোখ নিয়ে আমিও ধরলাম আমার ডেরার পথ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


