somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তিযুদ্ধের নায়ক জেনারেল জ্যাকব এর সাথে এক সন্ধ্যা

১৭ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ৩:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ মুজিব নগর দিবস। প্রত্যেক বারের মতই ভেবেছিলাম দিনটা অজান্তেই কেটে যাবে। কিন্তু এবারের মুজিব নগর দিবস আমার জন্য একটা সুযোগ এনে দিল। আমাদের এম্বেসির আয়োজনে এখানে ১৬ এপ্রিল পালিত হল মুজিব নগর দিবস। সে উপলক্ষে ঢাকা থেকে এসেছেন কে এম শফিউল্লাহ, এ কে খন্দকার, আবু ওসমান চৌধুরী এবং স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পীবৃন্দ। কিন্তু উপরি পাওনা হিসাবে ছিলেন লেফটেনেন্ট জেনারেল জ়ে এফ আর জ্যাকব। তার লেখা “সারেন্ডার এট ঢাকা” আগেই পড়া ছিল। কাছ থেকে দেখে চোখে পানি চলে আসলো। আমাদের বিজয়ী বীরদের এত কাছ থেকে আগে দেখার, কথা বলার সৌভাগ্য হয়নি। আজকে তাদের পেয়ে আবেগে একটু আপ্লুত ছিলাম। তার উপর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শিল্পীরাও এসেছেন এবং তাদের সেই রক্ত আগুন করা গানগুলো শুনছিলাম একটু আগে।
জেনারেল জ্যাকব এর বয়স এখন ৮৭। মাঝারি উচ্চতা। বয়সের ভারে একটু ন্যুব্জ। কিন্তু নিজে নিজেই হাটেন। ধীরে ধীরে। কিন্তু যখন কথা শুরু করলেন তখন বুঝলাম এখনও যথেষ্ট তেজ আছে তার গলায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ইন্ডিয়ান আর্মির ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অফ স্টাফ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কমান্ডার ছিলেন তিনি এবং খুবই গুরুত্বপূর্ন অবদান রেখেছেন। নিয়াজীর সারেন্ডার করার সেই দলিলটি তারই লেখা। পাকিস্তানিরা চাইছিল জাতি সংঘের হস্তক্ষেপ। কিন্তু জ্যাকব সেটা হতে দেননি। তিনি ঢাকায় নিয়াজির হেড কোয়ার্টারে গিয়েছিলেন তার সাথে আত্মসমর্পন নিয়ে নেগোশিয়েট করতে।


জেনারেল জ্যাকব বসে আছেন। পেছনে দাঁড়িয়ে ভাবছি কথা শুরু করব কিনা

আমার সাথে অনেকক্ষণ গল্প করলেন খেতে খেতে। দুঃখের বিষয়, আমার কাছে কোন রেকর্ডার ছিলনা। কথপকথন ছিল অনেকটা এরকম—
আমিঃ আপনার সাথে কি নিয়াজীর পরে আর কখনও দেখা হয়েছিল, যুদ্ধের পরে?
জ্যাকবঃ না। তবে সারেন্ডারের পরে কোলকাতা জেলে আমি তাকে জেরা করেছিলাম। অনেকক্ষণ ধরে।
আমিঃ সেই জেরায় নিয়াজী কি নিজের দোষ স্বীকার করেছে?
জ্যাকবঃ না। সে বিষয়টাকে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত হিসাবে জাহির করতে চেয়েছে। এবং ছাড়া পাওয়ার পরে বলে বেড়িয়েছে যে আমি নাকি তাকে ব্ল্যাক মেইল করেছি। আমার তো ব্ল্যাক মেইল করার প্রশ্নই আসেনা। তাদেরই অবস্থা বরং খারাপ ছিল। সারেন্ডার ছাড়া গতি ছিলনা।
আমিঃ আপনি যখন সারেন্ডারের জন্য নেগোশিয়েট করতে গেলেন তখন সে কি বলল?
জ্যাকবঃ প্রথমে সে বলল- সারেন্ডারের প্রশ্নই আসেনা। আমরা বরং সিজ ফায়ার নিয়ে আলোচনা করতে চাই। (আমি জানতাম সিজ ফায়ার একটা বাহানা মাত্র, আসলে সে সময় কিনতে চাইছে যাতে করে জাতি সংঘের অনুপ্রবেশ ঘটানো যায়) তখন আমি বললাম যে তোমাদের আমরা ঘিরে রেখছি। তাড়াতাড়ি ডিসিশন নাও নাহলে আমরা তোমার পুরো বাহিনীর উপর বম্বিং শুরু করব। আমি ফিরে আসার প্রায় তের মিনিট পরে ওরা খবর দিল যে সারেন্ডার করবে। এইত। সারেন্ডারের দলিলটিও আমি লিখেছিলাম আর ওদেরকে দিয়ে এসেছিলাম পড়ার জন্য।
আমিঃ সারেন্ডারের যে দলিল টি আপনি লিখেছিলেন সেটাই কি ওরা মেনে নিয়েছিল নাকি কোন শব্দ পরিবর্তন করতে চেয়েছিল?
জ্যাকবঃ ওরা ওদের তরফ থেকে একটা লিখেছিল কিন্তু আমরা তাতে রাজী হইনি। আমি চেয়েছিলাম ওদের সম্পুর্ণ সারেন্ডার। একেবারে নিশর্ত আত্মসমর্পন। কারন নিয়াজী একবার বলেছিল যে তার লাশের উপর দিয়ে যেতে হবে তবু তারা বাংলা ছাড়বেনা। কাজেই আমি চেয়েছিলাম তার এই দম্ভ চূর্ণ করতে।
আমিঃ আপনি জানেন যে আমাদের দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অনেকে বলছে যে সিমলা চুক্তির আওতায় ১৯৫ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে ফেরত দেয়ার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ হয়ে গেছে। আপনার কী মত?
জ্যাকবঃ দ্যাট হ্যাজ নাথিং টু ডু উইথ ওয়ার ক্রিমিনালস নাও। দে শ্যুড ব্রট আনডার জুরিসডিকসন।

- এ পর্যায়ে একে খন্দকারকে দেখিয়ে তিনি তার ভুয়সী প্রসংশা করলেন। বললেন, “একে খন্দকার অত্যন্ত মেধাবী এবং চতুর সমরবিদ। ওর প্ল্যানিং আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছে এই বিজয়ে। হি ইজ আ জিনিয়াস।“

আমি তাকে স্যালুট দিলাম আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের জন্য। আমাকে বললেন “এখন তোমাদের দায়িত্ব পরবর্তী কাজের”। সেক্টর কমান্ডারদের দেখিয়ে বললেন “ওরা তোমাদের দেশ এনে দিয়েছে। তোমরা সে দেশকে এগিয়ে নাও”। আমি বললাম, আমাদের প্রজন্মের অনেকেই এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উৎসাহী। তারা অনেক ভালো ভালো কাজ করছে। ব্লগ লিখছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রাখছে।

একে খন্দকার, কে এম শফিউল্ল্যাহ আর আবু ওসমান চৌধুরীকে সাহস করে কিছু কথা জিজ্ঞেস করলাম। আমার মাথায় ঘুরছিল অমি পিয়ালের সেই রহস্যময় পুরুষ মোহাম্মদ হোসেন। তার ব্যপারে জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু কেউই ভালোভাবে তার কথা বলতে পারলেন না।

আবু ওসমান চৌধুরীকে মোহাম্মদ হোসেনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছি

সব শেষে জ্যাকব ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠলেন হোটেলে ফেরার জন্য। শ্রদ্ধায় আনত আদ্র চোখ নিয়ে আমিও ধরলাম আমার ডেরার পথ।

১৩টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×