আমি আশরাফুলের সমালোচকও নই
আমি আশরাফুলের অন্ধ ভক্তও নই।
যা মনে হল তাই লিখলাম। আমার মনে হওয়াটা অন্যের সাথে না মিলাটাও স্বাভাবিক, ভুল থাকাটা আরও স্বাভাবিক।
২০১১ সালের বিশ্বকাপের সময় সঞ্জয় মাঞ্জেরেকার আশরাফুল সম্পর্কে যা বলেছিলেন তার বাংলা করলে অনেকটা এরকম দাঁড়ায়-
আশরাফুল সম্পর্কে অনেক কথা বলার পর আমরা এখন আসলে অবসর নিয়ে ফেলেছি। তার বয়স যখন ২০ ছিল আমরা বলতাম বিশ্বের সেরা ২০ বছরের খেলোয়ার বয়স হলে দেখিয়ে দিবে। তার বয়স যখন ২১ ছিল তখনও আমরা তার সম্পর্কে তাই ভাবতাম। তবে সে হতাশ করেছে।
আশরাফুলের উথান -
২০০১ সালের শুরুতে ঢাকায় অনুর্ধ-১৭ এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের বিরুদ্ধে ৮৭ বলে ৮৯ করে। তার টেকনিক এবং শট গুলো সবার মন জয় করে। ঐ বছরই ঢাকা লীগে একটা ম্যাচে ১৫৭ করার পর গাজী আশরাফ হোসেন লিপু বলেন- ও তো দেখি অন্য ওপেনারদের ভাত মারবে।
আন্তর্জাতিক রাজকীয় সূচনা -
২০০১ সালেই শ্রীলঙ্কার মাঠে ১৭ বছর বয়সে অভিষেকেই সেঞ্চুরী। ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ হয়েছিলেন যৌথভাবে মুরালিধরনের সাথে। ঢাকায় আসার পর একটা সাক্ষাৎকারে যা যা বলেছিলেন-
-আমার টেস্ট খেলতে খুব ভাল লাগে
-আমার প্রথম বল থেকেই নিজেকে সেট মনে হয়
- মুরালিধরনকে খেলতে সমস্যা হয়নায় কারন আমাদের গলিতে ঐরকম একশনের একটা বোলার ছিল।
- আমি প্রতিবছর ২টা করে সেঞ্চুরি করতে চাই
আশরাফুলের টেস্ট সেঞ্চুরী ৫ টি। ১০ বছরে ২০ টির জায়গায় ৫ টি। তাহলে ভুল গুলা কোথায়? সে কথা পরে আসছি। তার আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আশরাফুলের অবদান এবং আমাদের প্রাপ্য-
-১৯৯৯ সালে পাকিস্তানকে হারানোর ৫ বছর পর বাংলাদেশ কোন ওয়ানডে জিতে আশরাফুলের ৩১ বলের হাফ সেঞ্চুরীর উপর। যে স্কুপ শট সবাই এখন দিলশানের নামে বলে সেটা ২০০৪ সালেই আশরাফুল বেশ ভাল খেলত। তবে স্কুপ শটটার আবিষ্কারক আসলে জিম্বাবুয়ের ডগলাস ম্যারিলিয়ার। ২০০১ সালে এই শটটা খেলে ভারতের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য এক ম্যাচ জিতিয়েছিলেন তিনি।
- ২০০৪ সালে ভারতের বিপক্ষে ১৫৮ অপ। এখন পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ। তৃতীয় দিনে ঐ সময় পিচ মোটামুটি ভেঙ্গে গিয়েছিল এবং পিচে দাড়ানোই যাচ্ছিল না। কিন্তু আশরাফুলের দিনে কি আর ইরফান পাঠান অথবা অনীল কুম্বলের কথা হয়!!
-২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো সেই ম্যাচ। আশরাফুলের ১০১ বলে ১০০ রান। ম্যাকগ্রাথকে কভার ড্রাইভ, সুইপ, ফ্লিক কোন জায়গা থেকে চার মারতে বাকি রাখেনি। ম্যাকগ্রাথের রাইজিং বলে কভারের উপর দিয়ে যেই চারটা আশরাফুল মারে সেরকম শট আমার মনে হয়না বাংলাদেশের আর কোন ব্যাটসম্যানকে কখনো খেলতে দেখেছিলাম। তবে আশরাফুলের শেষ করে দিয়ে আসা উচিত ছিল। তখনকার দিনে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো ব্যাপারটা কি ছিল সেটা তখনকার ক্যাপ্টেন হাবিবুল বাশারের কথাতেই শোনা যাক- জীবনে অনেক স্বপ্ন দেখেছি। শেষ বলে ৬ মেরে জিতাব। টেস্টে ডবল সেঞ্চুরী করব। কিন্তু কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি অস্ট্রেলিয়াকে হারাব।
- ২০০৫ সালেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৫২ বলে ৯৪। ২১ বলেই অর্ধশত রান। ম্যাচটি বাংলাদেশ জিতেনি কিন্তু কিছু কিছু জিনিস আছে ভোলা যায়না। বোলারদের নাম ছিল ট্রেমলেট,হার্মিসন, ফ্লিনটফ। খেলা শেষে হার্মিসন বলেছিল- জীবনে কোনদিন এত মার খাইনি।
- ২০০৬ সালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে প্রথম জয়। আশরাফুল অবশ্য ম্যান অফ দি ম্যাচ হননি তবে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৫২ রান করেছিলেন।
- ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে দক্ষিন আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৮৭ রান। স্কুপ শট কারে বলে কত প্রকার ও কি কি সব দেখানো। ক্রিকেট ইতিহাসের সব থেকে ভয়ঙ্কর ব্যাটসম্যান ভিভ রিচার্ডস তখন স্টেডিয়ামে। আন্দ্রে নেলকে স্কুপ শটে ৪ মারার পর যিনি বলে উঠেন 'ওয়াও'।
- ২০০৭ টুয়েন্টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ২৯ বলে ৬৪। পুল, হুক, কভার ড্রাইভ, স্কুপ কোন কিছু বাকি নেই।
- ২০০৭ সালেই টেস্ট ক্রিকেটে সব থেকে কম সময়ের হাফ সেঞ্চুরী করেন আশরাফুল।
এবার আসা যাক আশরাফুলের আউটের কিছু ধরন। সব তো আর মনে নেই তারপরেও যা যা বলা যায়-
আশরাফুল যখন স্লিপে ক্যাচ দেয় সেটা আর ১০ টা ব্যাটসম্যান থেকে আলাদা। অন্য ব্যাটসম্যানরা মিস শট খেলে। পয়েন্টে মারতে যায় বা কভার ড্রাইভ করতে যায় মিস শট স্লিপে যায়। আশরাফুলের কিছু শট দেখলে মনে হয় সে ঠিক ঐ জায়গাটাতেই মারতে চাইছিল যেখানে ফিল্ডারটা আছে। মানে এইখানে মিস শট হইলে একটা চার হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেমন জিমাবুয়ের সাথে টেস্টে ৭৩ করার পর স্লিপ থাকা অবস্থায় তার স্টিয়ারিং করার দরকারটা কি? এটা তো টেস্ট ম্যাচ!!
ভারতের সাথে একবার বাংলাদেশের রান ৫০ রানে ৪ উইকেটে। আশরাফুল আগের ওভারে ৩ টা চার মেরেছে। পরের ওভারে জাদেজা ডাউন দ্যা উইকেট মারতে গিয়ে স্ট্যাম্পিং। তারপর ওহ শিট ওহ শিট করতে করতে প্যাভিলিয়নে। ঐ অবস্থায় ডাউন দ্যা উইকেট যাওয়ার দরকার কি?
মাঝে মাঝে আশরাফুলকে দেখলে আমার মনে হয় সে সবকিছু আগের থেকে ঠিক করে রাখে। যেমন সে মনে করে ৩ নম্বর বলটি ঠেকাব। সেটা ফুলটস পড়লেও সে ঠেকায়। সে মনে করে রাখে ৬ নম্বর বলটি হাকাব। সেটা হয়ত একতা ভাল বল এবং সে হাকাতে গিয়ে আউট হবে। ক্রিকেট যে প্রেজেন্টস অফ মাইন্ডেরও খেলা।

আশরাফুলকে যেই চাপ নিতে হইছে সেটা অবশ্য অনেক বড় চাপ। কারন তার প্রজন্মের আগের বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের টেকনিকটাই অত ভাল ছিলনা। পুল , হুক জিনিসটা তার আগে বাংলাদেশের কোন খেলোয়ার খেলত কিনা সেটাই মনে পড়েনা। তার আমলে সে যদি পাকিস্তানে খেলত সে শিখতে পারত ইনজামাম, ইউসুফের কাছ থেকে, ভারতে থাকলে শচীন , দ্রাবির। ঐসব দলে কখনোই ম্যাচ জিতানোর ভার একমাত্র একটা ১৮ বছরের ছেলের হাতে পড়েনায়।
২০০৯ সালে শচীন টেন্ডুলকারকে আনা হয়েছিল বাংলাদেশের ড্রেসিং রুমে। আশরাফুলকে তিনি বলেছিলেন-
কখনো দেখি তুমি খুব আক্রমনাত্মক হয়ে যাও। কখনো খুব রক্ষনাত্মক। আজকে ভাজি'র (হারবাজান) বলে চাইলেই সিঙ্গেল বের করতে পারতে।
সময়ের হিসেবে টেস্টে দ্রুততম হাফ-সেঞ্চুরী আশরাফুলের। সেটা খেলার পর দ্রাবির বলেছিলেন, এই রানটাই যদি আজকে দুই ঘন্টা লাগিয়ে করতে তাহলে তোমার দলের কাজে আসত।
তবে আমার ধারনা আশরাফুলকে যে আমাদের স্বপ্নের আশরাফুলের মত পাইনি তাতে আমাদেরও দোষ আছে। যে যাই বলুক তার প্রতিভা ঠিক মত বিকশিত হয়নি। একমাত্র ডেভ হোয়াটমোরের সময়েই তার মধ্যে অল্প কিছু হলেও ধারাবাহিকতা ছিল। তবে ডেভ হোয়াটমোর পারতেন খেলোয়ারদের থেকে বের করে আনতে। মাহেলা জয়াবর্ধনের শুরুও কিন্তু আশরাফুলের মতই ছিল। ইংল্যান্ডের সাথে ১২০ ছাড়া প্রথম ৩০-৪০ ওয়ানডেতে বলার মত কোন রানই ছিলনা। শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ডও আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু ডেভ হোয়াটমোর তাকে দলের সাথে রাখতেন। কারন হোয়াটমোর জানতেন সব প্লেয়ারদের জন্য সব ডোজ না। তিনি বলেছিলেন যদি মাহেলাকে এখন দল থেকে বের করে দেওয়া হয়। সে আর ফিরতে পারবেনা। কিন্তু আমি জানি সে ভাল করবে। মাহেলা জয়াবর্ধনে পরে কি করে দেখিয়েছে আমরা জানি।
হয়ত আশরাফুলের সময়ও শেষ হয়নি। কিন্তু তার সঠিক ব্যবহার করতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ১০:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





