somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অধ্যাপক মোহাম্মদ নোমান অশান্ত সময়ে একজন শান্ত মানুষ:সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সিরাজুল ইসলামের সুন্দর একটি লেখা নিচে দেয়া হলো ...

অধ্যাপক মোহাম্মদ নোমান অশান্ত সময়ে একজন শান্ত মানুষ
:সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

মোহাম্মদ নোমান আমার সহপাঠী মোহাম্মদ মুশতাকের বড় ভাই ছিলেন। দু’জন সর্কেই মর্মান্তিক অতীতকাল ব্যবহার করতে হচ্ছে, বলতে হচ্ছে ছিলেন, কেননা দু’জনেরই কেউই আজ নেই। মুশতাক গেছে আগে, মোহাম্মদ নোমান গেলেন পরে।

মোহাম্মদ নোমান আমার বড় ভাইয়ের মতোই ছিলেন, অনেকটা মুশতাকের কারণে।
অথচ এই কথাটা জীবিত তিনি ছিলেন যখন তখন তাঁকে বলা হয়নি। বলার সুযোগ ছিল না। এমনকি মুশতাক এবং আমি খুব কাছাকাছি ছিলাম না, ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার পরে। মুশতাক চলে গেছে কর্মের এক নিজস্ট্ব জগতে, আমি গেছি অন্যত্র। অথবা বলা যায় রয়ে গেছি সেখানেই, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে মুশতাকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল এবং প্রথম পরিচয়েই ঘনিষ্ঠতা। মুশতাক যে সাংবাদিকতায় যাবে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থাতেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল, তখনই সে খকৈালীন কাজ শুরু করেছিল একটি পত্রিকায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম। ইংরেজি অনার্সে আমরা ক’জন ছিলাম? তের-চৌদ্দজন হবে, সবাই ছাত্র, ছাত্রী একজন, সেও অবাঙালি। মুশতাকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল একটি ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে। ঢাকা শহর তখনও পুরোপুরি মফস্ট্বলীয়, বইপত্র পাওয়া যেত খুবই কম। সহপাঠী আনোয়ার হোসেন আমাকে ‘এনকাউন্টার’ পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যা দিয়েছিল পড়তে, ইংল্যান্ড থেকে তার এক আত্মীয় পাঠিয়েছিলেন। এনকাউন্টার তখন সবে বের হয়েছে। বইপত্রে আমার উৎসাহ দেখেই হবে, মুশতাক আমাকে একটি বই এনে দিয়েছিল, বাসা থেকে। ওয়াল্কল্টার পেটারের ‘এ্যাপ্রিসিয়েশনস’। সে বইয়ের নাম শুনেছিলাম, দেখিনি। বইয়ের গায়ে নাম লেখা ছিল মোহাম্মদ নোমানের। তখনই তাকে জানা আমার, ওই বইয়ের ভেতর দিয়ে। মুশতাকই জানাল, অল্কপ্প কথার মধ্য দিয়ে। নোমান ভাই ইংরেজিতে এমএ পাস করে গেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন শিক্ষক হিসেবে, এখন আছেন সরকারি কলেজে।

মুশতাকের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা জমে গিয়েছিল। ওরা থাকত শান্তিনগরে, আমি থাকতাম আজিমপুরে। শান্তিনগর তখন ফাঁকা, আজিমপুরে সরকারি কর্মচারীদের জন্য কলোনি তৈরি হয়েছে। সেখানে আমরা থাকি। মুশতাকের সঙ্গে শান্তিনগরে গেছি আমি। ওরা আগে থাকত কুমিল্ক্নায়। বাবা সেখানে ওকালতি করতেন। ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার স্ট্বার্থে চলে এসেছেন ঢাকায়, বাসা নিয়েছেন শান্তিনগরে। সেকালে পড়ালেখার বিষয়ে মধ্যবিত্তের আগ্রহ ছিল খুব বেশি, মুশতাকদের পরিবারকে মনে হয়েছিল তার মধ্যেও বিশিষ্দ্ব।

মুশতাকদের সাত ভাইয়ের মধ্যে পাঁচজনের সঙ্গেই আমার পরিচয় হয়েছে, পরে। মুশতাক ছিল একই সঙ্গে বুদিব্দদীপ্টস্ন ও প্রাণবন্স্ন। ওর ভাইদের ভেতরও ওই দুই গুণ দেখেছি আমি। মনে হয়েছে আমার যে, এরা কথাও বলে একই সুরে ও স্ট্বরে। মুশতাক আজ নেই। এখনো খুবই খারাপ লাগে, তার কথা ভাবলে। নোমান ভাইকে বেদনার এই কথাটা একদিন বলতে চেয়েছিলাম। মুশতাকের মৃত্যুর পর দেখা হয়েছিল নোমান ভাইয়ের সঙ্গে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বললাম। কিন্তু সবটা বলা হলো না। আমরা উভয়েই বিষম্ন হয়ে পড়লাম। ধারণা হলো অধিক বলা প্রগলভতা হবে। ঠিক ওই রকমই মনে হতো আমার নোমান ভাইয়ের সঙ্গে যতবার দেখা হয়েছে ততবারই। নীরব নন, প্রাণবন্ত। কিন্তু প্রগলভ নন। এমন নন যে গম্ভীর, কিন্তু অনেক কথা বলেন না। যা বলেন ভেবেচিন্তে। এর সামনে অপ্রয়োজনীয় কিংবা আড়ম্বপূর্ণ বাক্যালাপ চলবে না। শ্রেণীকক্ষে তাকে দেখিনি কখনো। অন্যদের কাছে শুনেছি যা বলতেন খুব গুছিয়ে বলতেন, বুঝিয়ে বলতেন পরিষ্ফক্ষার করে। একেবারেই সরল মানুষটি ছিলেন তিনি। তার নামের সংক্ষিপ্ততার মতোই স্বল্পবাক, কিন্তু আন্তরিক। খুব কাছে আসেন, কিন্তু আবার একটি দূরত্বও বজায় রাখেন। উচ্চহাস্যের নয়, স্মিত হাসির।

সময়টা বড়ই অস্থির ছিল। রাজনৈতিক ভাঙাগড়া তো চলছিলই, সামাজিক জীবনে ব্যস্ততাটা নিতান্ত কম ছিল না। এখন যেমন উঁচু উঁচু দালান উঠছে, চলছে নির্মাণের যুগ, তখন তেমন ছিল না ঠিকই কিন্তু উন্নতির ব্যস্ততা চলছিল ঠিকই। মধ্যবিত্ত উঠছিল, দালান না তুলুক জমি কিনছিল দ্রুতগতিতে। সে অশান্ত সময়ে শান্ত মানুষ ছিলেন নিশ্চয়ই অনেকে যারা দায়িত্ম্ব ও কর্তব্যের কথা ভাবতেন, যাদের জন্য চন্দ্র-সূর্যের ওঠানামা সম্ভব হতো, মোহাম্মদ নোমান এই শান্ত মানুষদেরই একজন ছিলেন। শিক্ষকতায় এসেছিলেন তিনি ব্যর্থ হয়ে কিংবা বাধ্য হয়ে নয়। এসেছিলেন স্বেচ্ছায়। হয়তো তিনি বিশ্ববিদ্যালয়েই থাকতেন, কিন্তু সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চিত জীবনের প্রতিশ্রুতি দিত না। সে জন্যই সরকারি কলেজে গেলেন। ওইটুকুই। নিশ্চয়তার জন্য, উন্নতির জন্য নয়। উন্নতি তার হয়েছে কিন্তু তার জন্য অস্থির ছিলেন না তিনি। সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছেন, জনশিক্ষা অধিদফতরের উচ্চ পদ পেয়েছেন, কোষাধ্যক্ষ ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের, কিছু সময়ের জন্য উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু সবটাই এসেছে স্ট্বাভাবিকভাবে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার দরুন, ছোটাছুটি-দৌড়াদৌড়ির কারণে নয়। তিনি শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের স্বীকৃতি পেয়েছেন। একুশের পদকও পেয়েছেন। উভয় প্রাপ্তি ছিল অত্যন্ত যথার্থ।

প্রশাসনিক দায়িত্ম্ব নিয়েছেন তিনি। সে অবস্থানেই আমি দেখিছি তাকে। এসব দায়িত্ম্বে তার দক্ষতা ছিল সংশয়াতীত; কিন্তু অনেককে যেমন মনে হয় সবসময়ই চেয়ারে আছেন, যখন বাসায় এসেছেন তখনো, মোহাম্মদ নোমানকে তেমন কখনো মনে হয়নি; বরং উল্কেল্টা ধারণা হয়েছে যে, যখন তিনি অফিসে বসে আছেন তখনো তিনি অফিসে নন, তিনি নিজেরই, নিজের পেশায়, শিক্ষকতার। যেন শিক্ষক হওয়ার জন্যই জন্ম তার। অন্য পেশায় যাননি, যাওয়ার কথাও ছিল না। শিক্ষকদের মধ্যেও আমলা থাকেন, কারণটা হচ্ছে রাষ্দ্ব্রের চরিত্র যা নাকি পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক। আমলাতান্ত্রিক শিক্ষকদের দেখে মনে হয় তারা শিক্ষক নন অফিসার; তাদের কাছে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষার্থী নয়, কর্মচারী। মোহাম্মদ নোমান সে রকমের শিক্ষক ছিলেন না। আদপেই নন। একবার তিনি রাষ্ট্রপতির শিক্ষা উপদেষ্টার একান্স্ন সচিব হয়েছিলেন। দেখে আমার অস্বস্থি লেগেছে। তারও লাগবার কথা। অব্যাহতি পেয়ে মুক্ত হয়েছিলেন।

তাহলে কি বলব তিনি পুরাতন কালের মানুষ ছিলেন? না, পুরাতন কালের নয়, একেবারে আধুনিক কালের, আধুনিক বিষয়ের শিক্ষক ছিলেন, দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল আধুনিক। তবু বিশেষ কালের নন, যেন চিরকালের মানুষ তিনি। যথার্থ শিক্ষকদের একজন। নিশ্চয়ই তার জীবনে উদ্বেগ ছিল, না থেকেই পারে না, সবারই থাকে। কিন্তু তা তিনি অন্যের মধ্যে সংক্রমিত করতে পছন্দ করতেন না। ছিলেন তিনি তাদেরই একজন যাদের ওপর ভরসা করা যায়, যেমনটা যায় যথার্থ শিক্ষকদের ওপর। অনেক দিক থেকেই তিনি ঈর্ষণীয়। তাকে ভোলা কঠিন।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×