টুকরো খবরের টুকরো বিশ্লেষণ
ফরহাদ মজহার
এক
টুকরো খবর দিয়ে শুরু করি।
বিদেশি লগ্নি পুঁজির সরাসরি আগমন ২০০৭ সালে পড়ে গিয়েছে, অর্থাৎ কমেছে। দুই হাজার সাত সালে মার্কিন ডলারের হিশাবে ৬৬৬ মিলিয়ন এসেছে বাংলাদেশে। অথচ ২০০৬ সালে এর পরিমাণ ছিল ৭৯৩ মিলিয়ন ডলার। কমবার পরিমাণ হচ্ছে শতকরা ১৬। যদি দুই হাজার ছয় সালে ১০০ ডলার বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ হয়ে থাকে সেখানে ২০০৭ সালে লগ্নি পুঁজির প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ হয়েছে ৮৪ ডলার। অন্যদিকে বিশ্ব বিনিয়োগ পরিস্থিতির ওপর আংকটাডের রিপোর্ট (World Investment Report) অনুযায়ী দুনিয়াব্যাপী সরাসরি বিদেশি লগ্নি পুঁজির বিনিয়োগ বেড়েছে শতকরা তিরিশ ভাগ।
দ্বিতীয় খবর, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফেকচারার্স এন্ড এক্সপোটার্স এসোসিয়েশান-এর (বিজিএমইএ) প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যদি আগামি দিনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং সঠিক অর্থনৈতিক নীতিমালা অনুসরণ করা হয় পোশাক শিল্প খাতে রপ্তানি তারা ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়াতে পারবেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কথাটা কে কিভাবে কোন অর্থে বলে সেটা বুঝতে হবে। যে-সারকথা রপ্তানিমুখি কারখানা মালিকরা বলছেন সেটা হলো ঠিকমতো বেতন না পেলে, এমনকি নিয়োগপত্র পাওয়ার নূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেও শ্রমিকরা যেন হরতাল-ধর্মঘট না করে। যদি করে তবে সরকার যেন কঠোর ব্যবস্থা নেয়। সঠিক অর্থনৈতিক নীতি বলতে তাঁরা বোঝান সস্তায় শ্রম কেনা ও কোন প্রকার রাষ্ট্রীয় বাধাবিঘ্ন ছাড়া মুনাফা কামানোর পরিবেশ। তাছাড়া বিদেশি মুদ্রা আয় হচ্ছে বলে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নেওয়া।
আরেকটি খবর হলো, আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ব্যারিস্টার রফিকুল হক ও ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হককে বলেছেন, ‘দু নেত্রী বৈঠক করবেন কি করবেন না, তা নিয়ে আইনজীবী ও ব্যবসায়ীদের নাক গলানো সঠিক নয়। সেটা রাজনীতিই ঠিক করবে। বলা বাহুল্য ইসলামের বক্তব্যে দুই হকই ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
আমরা খবরগুলো চিন্তা করে বাছি নি। এই খবরগুলো কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের ভাবনাচিন্তার দিকটা পরিষ্কার করবার চেষ্টা করব।
দুই
বিদেশি লগ্নি পুঁজি অবাধে এলেই দেশের উন্নতি হয় এই ধরনের ধারণা ধর্মবিশ্বাসের মতো শোষক ও শাসক শ্রেণী আমাদের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে। অর্থনীতি শাস্ত্রের দিক থেকে এর পক্ষে তাত্ত্বিক যুক্তি নাই। যাঁরা দিয়ে থাকেন, তাঁরা বিতর্কিত। প্রগতিশীল অর্থনীতিবিদদের কথা তো দূরের কথা, বাজার ব্যবস্থার পক্ষের শক্তিশালী অর্থনীতিবিদরাও এটা দাবি করেননি যে কাছাখোলা অবাধ বাজার ব্যবস্থাই বিশ্বব্যবস্থার অসম ও শোষণমূলক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের শিকার দুর্বল অর্থনীতি বিশেষত বাংলাদেশের মতো পুঁজির পরিধির দেশকে উন্নতি বা বিকাশের দিকে নিতে পারে। সেই ক্ষেত্রে অধিকাংশই মিশ্র নীতির কথাই বলেছেন। জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে কোথাও শিথিল আর কোথাও শক্ত নীতি কাজ করে। তাছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে নীতি শিথিল বা কঠোর হতে পারে। ইনফরমেশান টেকনোলজি বা মানবসম্পদ ও জ্ঞাননির্ভর ক্ষেত্রগুলোতে অবাধ বিনিয়োগ যে বিকাশটা ঘটাতে পারে, জ্বালানি খাত বিদেশি কর্পোরেশানের হাতে তুলে দিলে বা কৃষি খাতকে বহুজাতিক কর্পোরেশানের অবাধ মুনাফার ক্ষেত্র বানালে তার ফল হতে পারে সম্পূর্ণ উল্টা। আগামি দিনের শিল্পায়নের জন্য যে জ্বালানি দরকার তা ভারতের হাতে তুলে দেবার পক্ষে আমাদের দেশে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এদের আবার রাজনৈতিকভাবে ঠেকানোর জন্য ভারতবিরোধী আরেকটি গোষ্ঠি চাইছে তেলক্ষেত্রগুলোর জ্বালানি অন্বেষণ, উত্তোলন ও বিপণনের কারবারটা মার্কিন, ফরাসি বা অন্য কোনো সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হোক। এটা আবার নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করবার নীতির নজির। খাদ্য উৎপাদন বাড়াবার নাম করে কৃষকের হাত থেকে কৃষিব্যবস্থা চলে যাচ্ছে কোম্পানির হাতে। জাতীয় অর্থনৈতিক বিকাশের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও গণনিরাপত্তা ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট জায়গা থেকে বিমূর্তভাবে অবাধ বাজার ও অবাধ বিনিয়োগ নীতির পর্যালোচনা এখন অতি জরুরী হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির হাঁকডাক এখন শুরু হবে। সেই দিকে আমাদের নজর রাখতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন রাখা না রাখার এখন কূটতর্ক। বিদেশি বিনিয়োগ দরকার হতে পারে, কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সেটা হয়ে ওঠে আত্মহত্যার শামিল। যেখানে রাষ্ট্র দুর্বল, সরকার বিদেশ মুখাপেক্ষি এবং শ্রমিক-কৃষকসহ গণমানুষের পক্ষে কথা বলা, আন্দোলন-সংগ্রাম করবার শক্তি ক্ষীণ, সেখানে কাছাখোলা বিদেশি বিনিয়োগ পরাশক্তির হাতে বাংলাদেশকে তুলে দেওয়ার নীতি ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। ক্ষমতাসীন প্রতিটি রাজনৈতিক দলই কাছাখোলা বাজার ব্যবস্থা ও অবাধ বিদেশি বিনিয়োগের নীতি অনুসরণ করেছে। গত এক দশকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সরকার হোক, কিম্বা হোক জোট সরকার প্রত্যেকেই কাছাখোলা অবাধ বাজার ব্যবস্থাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের একমাত্র পথ গণ্য করেছে। এই ক্ষেত্রে দুই প্রধান রাজনৈতিক ধারার মধ্যে কোন পার্থক্যই নাই। যে কারণে এই নীতিতে যারা উপকৃত সেই ব্যবসায়ী শ্রেণীর ইফতার পার্টিতে তারা সদানন্দ চিত্তে যেতে আপত্তি করে না, কিন্তু কে আবার আগামি পাঁচ বছর বাংলাদেশকে শোষণ লুণ্ঠন করবে সেখানে ছাড় দিতে কেউই রাজি না। অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে ঐক্য থাকলেও জাতীয় রাজনৈতিক প্রশ্নে ব্যবধান কমানো এই ক্ষেত্রে অসম্ভব। রাজনীতির প্রধান দুই ধারাই চায় অবাধে বিদেশি বিনিয়োগ হোক, কর্পোরেশানগুলো টাকা-পয়সা নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকুক। কিন্তু লুটের বখরায় অপর পক্ষকে শরিক করতে কেউ রাজি না। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে এই দিকটা খুবই ভালভাবে বুঝতে হবে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অবাধ বাজার নীতি অনুসরণের খবর দিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ে জাতিসংঘের এই প্রতিষ্ঠানটি (UNCTAD) ঠিকই বলছে, ‘বাজার ব্যবস্থার প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য আছে’। বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারের অধীনস্থ করা ও পরাশক্তির দাসে পরিণত করার ক্ষেত্রে দুটো প্রধান রাজনৈতিক ধারার মধ্যে আশ্চর্যরকম মিল। এরপর আংকটাড বলছে‘A recent assessment showed that the country offers perhaps the most liberal foreign direct investment (FDI) regime in South Asia, with no prior approval requirements and no limits on equity participation. For export-oriented Activities, the Government has set up export-processing zones (EPZs), which offer facilitation services and a variety of fiscal and non-fiscal incentives.’
দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য যে কোন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের রয়েছে অতি উদার কাছাখোলা বিদেশি বিনিয়োগ নীতি। মারহাবা। আগাম কোন অনুমতিরই দরকার নাই এবং রাষ্ট্রীয় বা দেশীয় বিনিয়োগকারীতে পুঁজির অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা নাই। কিন্তু এর পরও বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ ফল্গুধারা বয়ে যায় নি।
সারা দুনিয়ায় যে বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে তার ৫.২ ভাগ এসেছে ২০০৫ সালে, আর ২০০৬ সালে এসেছে ৪.৫ ভাগ। দুই হাজার সাত সালে ফখরুদ্দীন আহমদের আমলে সারা দুনিয়ায় বিদেশি বিনিয়োগের মোট ১৮৩৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে বাংলাদেশে এসেছে মাত্র ৩.৪ ভাগ। বাংলাদেশের বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেছেন, অবকাঠামো বিশেষত গ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদি জ্বালানি জোগান দেবার ক্ষেত্রে সংকটের কারণে নাকি বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। অর্থনীতির একজন অধ্যাপক বলেছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার জন্য বিনিয়োগ কমেছে। তাঁরা ঠিক কি বলেছেন তা পুরাটা পত্রিকায় পাই নি। তবে বিনিয়োগ না হবার এই ব্যাখ্যাগুলো খোঁড়া। বাংলাদেশ ২০০৫ ও ২০০৬ সালেও জ্বালানির জোগান দিতে পারে নি, তখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূরে থাকুক, রীতিমতো অস্থিতিশীল ছিল। বাজে কথা না বলে এটা স্বীকার করা দরকার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটা আস্থা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নীতির পুনর্মূল্যায়নের জন্য আমাদের মনোযোগের সঙ্গে বিশ্লেষণের দরকার কেন তৃতীয় বিশ্ব নয়, এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলোও নয় বিদেশি বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সে। এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে চীন এবং হংকংয়ে। কাছাখোলা বাজার বা বিনিয়োগ নীতি করলেই বিনিয়োগ হয় না।
তিন
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফেকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টাস এসোসিয়েশান (বিজিএমইএ)-এর ইফতার পার্টি তাদের শ্রেণীর স্বার্থের সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়েই। সেখানে রাষ্ট্রদূতরা ছিলেন, ফখরুদ্দীন আহমদ সাহেবের তরফে ক্ষমতাসীনদের পক্ষের লোকজনও ছিলেন, রাষ্ট্র শাসন ও জনগণকে শোষণের নীতি যারা বানায় ও যারা প্রয়োগ করে সকলকেই বিজিএমইএ জোগাড় করেছে। ঠিক আছে। মাশাল্লাহ। কিন্তু আমি খোঁজ করছিলাম যাঁরা রক্ত আর ঘাম ফেলে এই গরিব দেশটির জন্য বিদেশি মুদ্রা আয় করেন, তাঁদের পক্ষের কেউ এই রোজার দিনে ইফতারিতে হাজির ছিলেন কিনা। থাকলেও তাঁরা কারা? কয়জন? শ্রমিকদের তরফে কোন শ্রমিক, তাঁদের কোন নেতা, তাঁদের স্বার্থ নিয়ে কথা বলেন এমন কেউ আসলেই ছিলেন কি? কাগজে সেই ধরনের কোন জীবের ছবি ছাপা হয় নি। যাদের খাটাখাটনি করে পেটের ধান্দা মেটাতে হয়? কোন ফটো দেখি নি যারা তাদের সস্তা শ্রম শোষণ করে ধনী হয় তাদের সঙ্গে একসঙ্গে ইফতার করছে। বলা যায় বাঘ তো আর হরিণের সঙ্গে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে পাশাপাশি পানি খাবে না। খাবে কি? সেটা হবে রাগের কথা। আমরা মানুষ নিয়ে কথা বলছি। কোন এক ইফতার পার্টিতে দেখেছি খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন আর আমির হোসেন আমু কানাকানি করে কথা বলছেন। সেই ফটো পত্রিকায় ছাপিয়ে আমোদও হয়েছে বেশ। এই দুইটি দলের এক পক্ষ হাতে তরবারি আর অন্য পক্ষ ত্রিশূল নিয়ে সার্বক্ষণিক বিবাদে থাকে কিন্তু বিজিএমইএ-র ইফতার পার্টিতে যদি আমরা দেখতাম পোশাক তৈরি কারখানার শ্রমিকেরা অংশগ্রহণ করেছে, তখন নিশ্চয়ই নিশ্চিত হতাম এটা আসলেই ‘ইফতার’ ছিল ইসলাম নিয়ে তামাশা ছিল না। সেই ধরনের ছবি ছাপা হলে রোজারমজানের দিনে মানুষেরও ভাল লাগত।
শ্রমনীতি, বিনিয়োগ নীতি ইত্যাদি গার্মেন্ট মালিকদের পক্ষে থাকলে তাঁরা আমাদের ২৫ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করে দেবেন, শুনতে ভাল লাগে। অথনৈতিক নীতি শুধু গার্মেন্ট শিল্পের স্বার্থ রক্ষার কথা ভেবেই যদি করা হয় তা কখনই জাতীয় উন্নয়ন নীতি হতে পারে না। এর সঙ্গে শ্রমনীতি বিশেষত শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তা ও ন্যায্য মজুরির পাওয়ার প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পোশাক শিল্পের মালিকরা যদি বলেন, আমাদের জন্য রাষ্ট্র সবকিছুই করে দিক, আর শ্রমিকদের ব্যাপারটা আমরাই দেখব এটা কোন নীতি হতে পারে না। হরতাল ধর্মঘট হলেই তারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বা র্যাবের শরণাপন্ন হবেন, যেন নিজের ন্যায্য দাবি তোলাটাই ক্রিমিনাল কাজ এটা হয় না। দেখলাম, তাঁরা দাবি করছেন মাত্র ৫ ভাগ কারখানার মালিক ঠিকমতো বেতন দেয় না, শ্রমিকদের বঞ্চনা করে। এটা ঠিক পরিসংখ্যান কিনা জানি না। ঠিক হলেও তারা কি বিজিএমইএ-র সদস্য? যদি হয়ে থাকে তাহলে বিজিএমইএ-র উচিত তাদের সদস্যপদ বাতিল করা এবং তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বা সরকারকে ব্যবস্থা নেবার দাবি করা। সেটা তাঁরা করেন না। করবেনও না। সেই ক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য শ্রমিকদের দিক থেকে পোশাক শিল্পের বিকাশ ও সাফল্যের মূল্যায়ন করা। আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার মানতে ও মানাতে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত সকলকেই বাধ্য করা।
পঁচিশ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি করা পোশাক তৈরি কারখানার মালিকদের সংকল্প বা ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপার নয়। তাঁরা রপ্তানি করুক, কিন্তু বাগাড়ম্বর হাস্যকর, যেন তাঁরা আমাদের উদ্ধার করে দিচ্ছেন। আয়ের টাকাটা কি তাঁরা বাংলাদেশ সরকারকে দেবেন? নাকি জনগণকে? পোশাক শিল্পের মালিকদের ধনী করবার জন্য রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে বহু মূল্য দিতে হয়। এই খাতে প্রধান আয়ের উৎস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু অর্থনৈতিক কারণে পোশাক শিল্পওয়ালাদের এই সুযোগ দেয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্্রনীতির অংশ হিসাবেই পোশাক তৈরি কারখানার মালিকরা এই সুযোগ পেয়ে থাকেন। অথচ তাঁরা বোঝাতে চান পুরাটাই তাঁদের কৃতিত্ব। এটা ভুয়া দাবি, কিন্তু সত্যিকারের উদ্যোক্তাদের কৃতিত্ব আমাদের স্বীকার করতে হবে এবং তাঁদের ভূমিকা নিশ্চিত করবার জন্য তাঁদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক নতুন নীতির কথাও ভাবতে পারি আমরা। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে বাণিজ্য সুবিধা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অধীনস্থতার আর পোশাক শিল্পখাতের ভবিষ্যৎ আগামি দিনে সীমারেখাটা আমরা কোথায় টানব? কারণ এগারোই জানুয়ারিরই ঘটনাবলী আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে সেনা সমর্থিত অসাংবিধানিক সরকার এই শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা সমর্থন করে গিয়েছে। বাংলাদেশকে রাজনীতিশূন্য করবার ক্ষেত্রে তাঁদের তৎপরতা, আস্ফালন ও হুংকার আমরা দেখেছি। কিছুই ভুলি না।
চার
আইনজীবী হিশাবে ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সুনাম অবিতর্কিত। পেশাগত কারণে এমন অনেকের পক্ষে তিনি নানান সময় আদালতে লড়েছেন। যাদের আমি রাজনৈতিক দিক থেকে পছন্দ করিনি বা করব না। কিন্তু সেই সকল ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের মূল্য এবং ক্লিয়েন্টের প্রতি তাঁর দায় মেনে নিতে আমি রাজি। এই তফাত বজায় রেখে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা এবং আইনজীবী হিসাবে তাঁর অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা এমনকি হাল্কা চালে কথা বলার ধরনও আমার দারুণ পছন্দ। তিনি তখন সমাজ, রাজনীতি, আইন আদালত ইত্যাদি বোঝার ক্ষেত্রে আমার অপরিহার্য বিষয় বা সাবজেক্ট হয়ে ওঠেন।
কিন্তু পেশাদারি পরিমণ্ডল ছেড়ে তিনি যখন রাজনীতির পরিমণ্ডলে প্রবেশ করেন তখন তাঁর বিচার আলাদা। তবে, বলে রাখা ভাল, রাজনীতি করা বা রাজনীতিতে ভূমিকা পালন করা দেশের নাগরিক হিশাবে তাঁর অধিকারও বটে। সকলেরই। যখন তিনি রাজনীতির আসরে সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে প্রবেশ করেন তখন রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর পেশাদারি আচরণের সঙ্গতি ও অসঙ্গতি খুঁজতে জনগণ বাধ্য। তিনি যদি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন অর্থাৎ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতার পরিমণ্ডলে নিজে বা কারো তরফে হাজির হন, তখন তাঁর পেশাদারি দিকটিও রাজনীতির বিষয়ে পরিণত হবে। অবশ্যই। ডক্টর কামাল হোসেন পেশাদারি কারণে এশিয়া এনার্জি বা আরো বহু কম্পানির স্বার্থ রক্ষা করতেই পারেন। কয়টা মামলায় তিনি জিতেছেন বা হেরেছেন তাই দিয়ে মানুষ তাঁর পেশার সাফল্য ও সামাজিক খ্যাতি বিচার করবে। তাঁর পেশার মানুষজনও তাই করবে। উকিলী পেশার চরিত্রের একটা দিক হচ্ছে অন্যের জন্য টাকার বিনিময়ে খাটা। এমনকি যে অন্যায় করেছে তাকেও আইন ও আদালতের শাস্তি থেকে রক্ষা করেন আইনজীবীরা। নীতি ও আদর্শের জায়গা থেকে মানুষ এই ক্ষেত্রে ভালমন্দ বিচার করবার খেই হারিয়ে ফেলে প্রায়ই। কিন্তু যাঁরা পেশার তাৎপর্য বোঝেন, তাঁরা সমাজে সবচেয়ে খারাপ লোকটির পক্ষেও দাঁড়াতে পারেন এই কারণে যে, বিদ্যমান আইন বা আইনি প্রক্রিয়ার শক্তি ও দুর্বলতার পরীক্ষা করা তাঁদের পেশাদারি কর্তব্যের মধ্যেও পড়ে। বাইরে থেকে বিচক্ষণতার সঙ্গে যাঁরা এই পেশার পর্যালোচনা করতে সক্ষম তাঁরাও এই কাজের গুরুত্বকে মূল্য দিতে বাধ্য থাকেন। এই কারণে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক যখন বলেছিলেন সাংবিধানিক বা আইনি প্রক্রিয়ায় নয়, মামলাগুলোর মীমাংসা করতে হবে ‘রাজনৈতিক’ভাবে। তখন তাঁর এই বাক্য ইতিহাস হয়ে গিয়েছে।
ডক্টর কামাল হোসেন যখন রাজনীতির পরিমণ্ডলে আসেন, তখন তাঁকে আমাদের সুষ্ঠু রাজনীতির দরকারেই তাঁকে ও তাঁর পেশাদারি কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করতে হয়েছে। বিশেষত জাতীয় স্বার্থের দিক থেকে। দেশের স্বার্থের কথা বলে তিনি রাজনীতি করতে এসেছেন বলেই তিনি তাঁর পেশাকে দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন কিনা সেই তর্ক উঠেছে। উঠবেই। অসঙ্গতিগুলো জনগণের চোখে ঠিকই ধরা পড়ে। এই তর্কগুলো আমরা আমাদের সমাজে সুষ্ঠু ও গঠনমূলকভাবে করতে পারি নি। অনেক অস্পষ্টতা ও অপরিচ্ছন্নতা রয়ে গিয়েছে। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের পার্থক্য হচ্ছে, যতদূর জানি তিনি কোন রাজনৈতিক দল করেন না। সেটা তাঁর শক্তিও বটে, যে কারণে একসঙ্গে তিনি রাজনীতির দুই বিরোধী শিবিরের নেত্রীর মামলা একসঙ্গে পরিচালনা করেছেন।
রাজনীতি করা না করা বা রাজনীতিতে নাক গলানো প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। অতএব সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত নই। রফিক-উল হক ঠিকই ধরেছেন, রাজনীতিতে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি গণ্য করলে এই ধরনের চিন্তার দুর্দশা কটু বাক্যের মধ্য দিয়ে উদাম হয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সঙ্গে আমাদের বিরোধের জায়গা অনেক গভীর এবং রাজনৈতিক। আমাদের বিরোধের জায়গাটা হচ্ছে ওখানে যে তিনি নিজে নিজের একক সিদ্ধান্তে তাঁর নাগরিক দায়িত্ব পালন করবার জন্য দুই নেত্রীকে একসঙ্গে বসবার উদ্যোগ নেন নি। এতোদিন কেন তিনি নেন নি? এই দুই নেত্রীর মামলা যখন কেউই নিচ্ছিল না, তখন শর্ত হিশাবেও তো তিনি তাঁদের বাধ্য করতে পারতেন যে গণতন্ত্র, দেশের সার্বভৌমত্ব এবং গণমানুষের স্বার্থে দুইজনকে অবশ্যই কথা বলতে হবে। কারণ সংবিধান লংঘন করে ক্ষমতায় থাকা এই ধরনের সরকার আইনের দিক থেকে যেমন সমর্থনযোগ্য নয়, তেমনি গণতান্ত্রিক চর্চার বিকাশের জন্য বিপজ্জনক। মানুষের মধ্যে রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রত্যাশা জোরদার করবার জন্য তাদের প্রকাশ্যে একসঙ্গে বসতেও হবে। যদি তিনি সেই কাজ করতেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটবার একটা সুযোগ তৈরি হতো। আপনাতেই হওয়া শুরু করত।
তিনি উদ্যোগ নিলেন কখন? যখন পরাশক্তি ও তাদের স্থানীয় বরকন্দাজরা পিছু হঠতে শুরু করেছে। নতুনভাবে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি অগণতান্ত্রিক, সেনাসমর্থিত, সংবিধানবহিভূত বা আদৌ সাংবিধানিকভাবে এই সরকারকে ‘সরকার’ বলা যায় কিনা সেই ধরনের একটি নিন্দিত শক্তির পক্ষে তাদেরই অনুরোধে তিনি খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে একসঙ্গে বসতে বলছেন। এটা তাঁর নিজের এজেন্ডা নয়, ক্ষমতাসীনদের এজেন্ডা। এখন সাধারণ মানুষ বলতে শুরু করেছে ক্ষমতাসীন সরকার আগামি দিনে যে জাতীয় সরকার গঠনের পরিকল্পনা করছে, সেখানে ড. কামাল হোসেনের জায়গায় তাঁকে নিয়েই কথাবার্তা চলছে। আইনজীবী হিশাবে তাঁর সাহসী লড়াইয়ের পরিণতি যদি হয় হোসেন জিল্লুর রহমানের অনুরোধে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে বসতে বলা (আসলে বাধ্য করা তাহলে তাঁকে আরো অনেক কঠোর সমালোচনা শোনার জন্য তৈরি হতে হবে। এতোদিন তাঁর যে ভাবমূর্তি সাধারণ মানুষের কাছে ফুটে উঠেছিল, সেখানে কালি পড়বে, বলাই বাহুল্য।
এতে তাঁর ক্ষতি হবে কিনা জানি না, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ক্ষমতাসীন পক্ষকেও রাজনৈতিক শক্তি হিশাবে জায়েজ করবার প্রকল্পই আসলে হাতে নিয়েছেন। গণমানুষের পক্ষে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার মধ্যে দূতিয়ালি করে তিনি যে অবদান রাখতে পারতেন, সেটা ভণ্ডুল হয়ে গেল বলেই আমি মনে করি।
Link : Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



