টালমাটাল মার্কিন অর্থবাজার অতি স্বাভাবিক!
আবু আহমেদ
বাজার অর্থনীতির নামে খাঁটি পুঁজিবাদ সময়ে সময়ে কেলেঙ্কারির জন্ম দেবেই। ইচ্ছা করে উপরে ওঠা, আবার বুদবুদে ফেটে পড়া এসব পুঁজিবাদী অর্থনীতিরই অঙ্গ। অনেকে বলেন, আবশ্যিকতাও। পুঁজিবাদ এটা টিকে থাকে বিশ্বাসে, আশাবাদে। যত দিন বিশ্বাস আর আশাবাদ হাতে হাত ধরে সাথে থাকে, তখন সবাই খোশমেজাজে থাকে, সবাই ভাবে তারাও বুঝি অতি শিগগিরই মিলিয়নিয়র্স হয়ে যাচ্ছে। শেয়ারের মূল্য বাড়ছে, কেউ জানে না কোথায় গিয়ে সেই মূল্য থামবে, সবাই ক্রেতা হয়ে ওয়াল স্ট্রিটে ভিড় জমিয়েছে। অতি চালাক কিছু লোক কিন্তু ঠিকই বুঝল শেয়ার স্টকের জন্য আকাশ শেষ সীমানায়। লাখো লোক নতুন ক্রেতা হলো সত্যি, তবে ফায়দাটা তুলল কয়েক শ’ লোকমাত্র। শেষোক্তরা যখন বিলিয়নিয়র্স হয়ে গেল, তখন ওই সম্পদের মূল্য পড়তে লাগল। ওই স্বপ্ন দেখা লাখ লাখ লোকের মিলিয়নিয়র্স হওয়ার স্বপ্ন আর কোনো দিনই পূরণ হলো না। বরং ওই লোকগুলো উল্টো এক ঋণের জালে আটকা পড়ে গেছে। ঋণ বিক্রেতা ও শেয়ার বিক্রেতারা লাভবান হলো ঠিকই, তবে লাখ লাখ লোকের হিসাবের অর্থ তাদের হিসাবে আনার মাধ্যমে পুঁজিবাদের অর্থনীতির নামে এক পকেটের অর্থ অতি সহজে অন্য পকেটে চলে যায়। এ সবই হয় বেচাকেনার নামে। বেচাকেনা করতে নিজের অর্থ সামান্য লাগে। নিজের সামান্য অর্থ থাকলে, অন্য অর্থ আসে ঋণ বিক্রেতাদের বা কথিত বিনিয়োগ কোম্পানি বা বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো থেকে। ঋণের জালে আটকিয়ে ফেলাও পুঁজিবাদের টাইকুনদের আর এক খেলা। ঋণও দেয়া হয় সম্পদের বাজার মূল্যের ভিত্তিতে। ফলে শেয়ারের মূল্য যখন বাড়ে, কথিত বিনিয়োগকারীরা ঋণও বেশি পায়। অনেকে সম্পদের বিপরীতে ঋণ নিয়ে অন্য ভোগে ব্যয় করেন। তারা ভাবেন, তারা তো ইতোমধ্যে অনেক ধনী হয়ে গেছেন। কিন্তু তাদের এটা জানতে দেয়া হয় না যে তারা শুধু কাগজে-কলমে ধনী। এভাবে তাদের একটা দৌড়ে ফেলে দেয়া হয়। একপর্যায়ে দৌড় থেমে যায় এবং তাদের সম্পদের মূল্য কমতে থাকে।
বড়রা অর্থ নিয়ে ইতোমধ্যে অন্য বাজারে প্রবেশ করেছে। হয়তো তাদের অর্থ চলে গেছে তেলের বাজারেও। স্বর্ণের মূল্য বাড়ছে কেন? অর্থ শেয়ার বাজারকে ত্যাগ করে এখন স্বর্ণ ও ভবিষ্যৎ তেলের বাজারে প্রবেশ করেছে। বাজার অর্থনীতি তথা পুঁজিবাদে বাজারগুলো পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। এক বাজারের খেলা শেষ হয়ে গেছে তো খেলোয়াড়রা অন্য বাজারে প্রবেশ করে। গত কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের বারোটা বাজল। কম অর্থ অনেক বেশি শেয়ারকে দৌড়াচ্ছিল। ফল হয়েছে, শেয়ার সূচকের ক্রমাগত নিুগতি। তাহলে ২০০১ সালের আগে শেয়ারবাজারে যে অর্থ ছিল সেই অর্থ গেল কোথায়? গেছে অন্য বাজারে। সেই বাজার দুটো হলো, রিয়েল এস্টেট তথা ঘরবাড়ির বাজার এবং অন্য পরিসরে তেল ও স্বর্ণের বাজার। এক সময় তেলের ভবিষ্যৎ বাজার বলতে কিছু ছিল না। কিন্তু ওয়াল স্ট্রিটের আর্থিক প্রকৌশলীরা তেলের বেচাকেনার ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ বাজার চালু করল। তেল বেচাকেনা হতে থাকে ভবিষ্যতে কে কত দরে সরবরাহ দিতে পারবে সেই মূল্যে। তেলের ভবিষ্যৎ মূল্যের বাজারে বিলিয়নস অব ডলারের জোগানের ব্যবস্থা হলো। জোগানও দিয়েছে সেইসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেগুলো একসাথে শেয়ারবাজারে বড় ঝুঁকির জোগান দিয়েছিল। গত দশ বছরে ঋণের আর্থিক বাজারে ঋণের ব্যবহার এবং ঋণের বেচাকেনা বিচিত্র গতি অর্জন করেছে। যে ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান আদিতে ঋণ দিয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠান আবার সেই ঋণকে লাভে, ক্ষেত্রবিশেষে লোকসানেও অন্য পক্ষের কাছে বা কথিত অন্য বিনিয়োগকারীর কাছে বেচে দিয়েছে। শেয়ার বেচাকেনা, ঋণ বেচাকেনা হয়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজারের খেলোয়াড়দের কাছে অতি প্রিয় বিষয়। যে পথই তাদের বিলিয়নিয়র্স হতে হাতছানি দিচ্ছিল, ওরা শুধু সে দিকেই ছুটল। এ ব্যাপারে সমালোচনাকে তারা জবাব দিত এই বলে যে, এটা হলো বাজার অর্থনীতির মহাগুণ। তারা বলতে লাগল, বাজার অর্থনীতি অসাধ্য সাধন করতে পারে। বাজার অর্থনীতির ম্যাজিক হলো সবাইকে কোটিপতি বানাও, সবাইকে ভালো ভোক্তা বানাও। সবাই আপনা থেকে কাজ করতে থাকবে অর্থনীতি অসাধ্যকে সাধন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে। অশোধিত তেলের মূল্য এত বাড়ল কেন? সহজ উত্তর হলো, তেলের বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবেশ। যুক্তরাষ্ট্র তেল উৎপাদনকারী সঙ্ঘ ওপেককে তেলের উচ্চমূল্যের জন্য যতই দোষ দিক না কেন, সত্য হলো ওদের লগ্নিকারকরা মিলিয়নস অব ডলারের নতুন অর্থের জোগান দিয়েছে এই বাজারের খেলোয়াড়দেরকে। ফলে তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১ শ’ ডলার পেরিয়ে ১৫০ ডলারে গিয়ে পৌঁছল। আবার উল্টোপথে এই বাজার হাঁটতে শুরু করেছে। কেন? কী অনেক বেশি তেল উৎপাদন করছে বলে? বিষয়টা কিন্তু তা নয়। বড় খেলোয়াড়রা অনেক অর্থ বানিয়ে এখন অন্য বাজারে প্রবেশ করেছে, আর ছোটরা দেখতে পেয়েছে তাদের কেনা তেলকে এখন ৫০ শতাংশ কম মূল্যে বেচতে হবে। এভাবে বাজার পরিবর্তনের সময় এক পক্ষ হারে, অন্য পক্ষ জিতে। কোনো ভবিষ্যৎ বাজারই এক মূল্যে চলে না। ভবিষ্যৎ বাজারকে চালুই করা হয় স্পেকুলেশন বা ধারণাকে কাজে লাগানোর জন্য।
স্পেকুলেশন আসে অতিরিক্ত গ্রিড বা লোড থেকে। অর্থ বাজারের জন্য একশ্রেণীর লোক মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা প্লান মতো ভবিষ্যৎ বাজারে অপারেট করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুদবুদটা ফেটে যায়। তখন চার দিকে পড়ে যায় শোরগোল। রেগুলেটর ছাড়া চলতে থাকে নোংরা খেলোয়াড়দের, কংগ্রেস সদস্যরা দায়ী করতে থাকে দুর্বল রেগুলেটরি অবস্থাকে। শেষ পর্যন্ত একপর্যায়ে সবাই শান্ত হয়ে যায়। যারা ঋণী হয়েছেন, তারা দীর্ঘ দিন যাবৎ তাদের ঋণের বোঝা বহন করে চলতে থাকেন। আবার নতুন খেলা শুরু হবে। তবে অন্য অবয়বে। কয়েক বছর আগে এনরন কেলেঙ্কারি হলো। এনরন নামের এনার্জি কোম্পানির শেয়ার ৮০ ডলার থেকে নেমে ০১ ডলারে চলে এলো। অথচ যখন শেয়ার মূল্য ৮০ ডলার ছিল তখন এনরনের ম্যানেজমেন্ট বলে চলেছিল, তাদের শেয়ারের আরো বেশি মূল্য আছে। কিন্তু তারা যখন তাদের শেয়ারগুলো বেচে সারা করলেন, তখনই বের হতে লাগল এনরনের আসল আর্থিক অবস্থা। সবাই মিলে বিনিয়োগকারীদের তারা শুধু মিথ্যা তথ্যই দিয়েছে। এনরনের যে বিরাট অঙ্কের ব্যাংক ঋণ ছিল সেটা অডিটর এবং ম্যানেজমেন্ট বিনিয়োগকারীদের জানতেই দেয়নি। অডিটরের শাস্তি হয়েছে। ম্যানেজমেন্টের কেউ কেউ সাময়িকভাবে জেলেও গেলেন। কিন্তু তাতে কী হলো? সেই লাখ লাখ বিনিয়োগকারী তাদের বিনিয়োগের কোনো মূল্যই আর ফেরত পায়নি। সে দিন আমার এক সিনিয়র ছাত্র আমাকে প্রশ্ন করল, সমস্যা হয়েছে ওদের হাউজিং ঋণে, কিন্তু বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো কেন বসে যাচ্ছে? আমি বললাম, ধনী লোকদের সমস্যা হলে অবশ্যই ঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলোরও সমস্যা হবে। তারা অন্যের ঋণ কিনেছে। এখন হাউজিং খাতে ধস নামার সাথে সাথে ওই সব ঋণের বাজার মূল্য অনেক কমে গেছে। ঋণগুলোকে বেচার জন্য নতুন ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কুঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি দেখতে গিয়ে ওই সব বিনিয়োগ ব্যাংকের এসব দশা হচ্ছে। আমার এই ছাত্র ব্যাংকের বড় পদে চাকরি করে। আমার কথা সহজেই বুঝতে পেরেছে।
Link : Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

