স্বার্থবুদ্ধিই মানুষকে অনাত্মীয় করে ফেলে
আল মাহমুদ
পুরো রমজান মাসই দুশ্চিন্তা এবং আশঙ্কার মধ্যে কাটিয়েছি। তবুও এই মাস আমার জন্য সহনীয়ই মনে হয়েছে, আমার মহান প্রভু আল্লাহ গাফুরুর রাহিমকে এই জন্য ধন্যবাদ জানাই। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি তাঁর প্রতি। আমি মনে মনে সব সময় রমজান মাসে বড় কোনো কাজ করার পরিকল্পনা করে থাকি। কিন্তু এবার বড় কোনো কাজে হাত দিতে সাহসে কুলায়নি। কিছু মিষ্টিমধুর লিরিক লিখে নিজের প্রসন্নতাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। দেখেছি, দেশে যখন কোনো সৃজনশীল উদ্যম থাকে না, তখন ব্যক্তিগত উদ্যোগও সফল হয় না। লেখক মাত্রই সার্থকতায় পৌঁছতে চান। কিন্তু দেশের আবহাওয়া অনুকূল না হলে ঠিকমতো ঠিক জায়গায় পৌঁছানো যায় না। একটা জিনিস লক্ষ করেছি, আমার পাঠকরা আমি যাতে স্বচ্ছন্দে লিখতে পারি সে জন্য নানা সহানুভূতির ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। এটুকু তো আমার পাঠকদের কাছ থেকে অর্জন করতে পেরেছি। আমি চাই, জীবনের এ শেষ প্রান্তে এসে একটা বাঁক পরিবর্তন। কিন্তু সেটা সহসা ঘটবে বলে মনে হয় না। বিপর্যয়ের আশঙ্কা করি, দুর্ঘটনার ভয়ে আতঙ্কিত থাকি। অন্য দিকে জীবনের বহুমাত্রিকতা অতিক্রম করে আমি যে ভেসে চলেছি, তাও নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। কোথায় চলেছি, পরিণতি কী এসব প্রশ্ন না তুললেও লেখালেখি করে সময় কাটাতে হলে লেখার বিষয় তো থাকতে হবে। আমার জীবনকেই লেখার বিষয় করে তুলেছি। ফলে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। অথচ কৈফিয়ত দিতে মন সায় দেয় না। ঈদের ছুটিটা চলে গেলে কী করব, তা যদিও স্থির করতে পারছি না, তবে লেখালেখি ছাড়া আমার তো আর বিকল্প কোনো কাজ নেই। ধরে নিতে হবে যে, লিখেই কাটাব। নিজের কাছে আমার প্রশ্ন হলো, কী লিখব? তবে প্রতিটি মানুষের জীবনে ব্যর্থতা ও হতাশায় আপ্লুত কিছু দিক থাকে, আমারও আছে। সেই সব বিবরণ কোনো লেখক নিজে থেকে উত্থাপন করে না। বরং লুকিয়ে রাখে।
আমি আত্মগোপনের পক্ষপাতী নই। লজ্জার কথা শরমের মধ্যে বিনীতভাবে উত্থাপনের কৌশল আমার জানা নেই। এই ত্রুটি লেখক হিসেবে নিজেই উপলব্ধি করি। আমার খারাপ কিছু দিক আছে। হতাশাব্যঞ্জক ঘনঘটা আছে আমার জীবনে। আমি সেসব কথা এত দিন সাহস করে বলিনি, বুকে সেই সাহস ছিল না। কিন্তু লেখক জীবনের পূর্ণতার জন্য অন্ধকারকে আলোয় মেলে ধরার কাজটি আঞ্জাম দিতে হয়। অনেক বড় লেখকই তা করেছেন আবার অনেকে তা করেননি। যারা করেননি, তাদের প্রতি মানুষের কৌতূহল অনেক কম। যারা করেছেন তাদের প্রতি মানুষের উসাহ বেশি।
অনেক পাঠক আছেন যারা লেখকদের কথায় আস্থা স্থাপন করেন না। মনে করেন, এর সব কথা সত্য নয়। আমার ব্যাপারে অনেকের এ রকমই ধারণা। আমাকে সরাসরি কেউ মিথ্যুক বলে না। তবে আমি যে সত্যবাদী, এমন সুনামও কেউ করে না। আর নিজে মিথ্যা উত্থাপন করি বটে, তবে আমার সেসব মিথ্যার সাথে সত্য জড়িত থাকে। নির্জলা মিথ্যা আমি কখনো উত্থাপন করতে পারিনি, তাহলে সাহিত্য হতো না।
এখানে একটা কথা উল্লেখযোগ্য যে, আমার আত্মজীবনী লেখার ব্যাপারে পৃষ্ঠপোষকতার প্রস্তাব এসেছে। যারা পৃষ্ঠপোষকতা দিতে চেয়েছেন, তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার সীমা নেই। অবশ্য এই পৃষ্ঠপোষকতা নেয়ার ব্যাপারে আরো চিন্তাভাবনা করছি। একান্ত প্রয়োজন হলে তা জানাব। আসলে একজন শ্রুতিলেখক হলেই কাজটি শুরু করে দেবো। এত হাঁকডাক করে কোনো কিছু শুরু করতে চাই না। দেখা যাক, একজন শ্রুতিলেখকের সাহায্য নিয়ে নিয়মিতভাবে এ কাজটি করে যেতে পারি কি না। আমার জন্য প্রতিটি দিবস অতিশয় দ্রুতগতিতে এসে চলে যাচ্ছে। মনে হয় কিছুই করতে পারছি না। অথচ আমার প্রতিপক্ষের ধারণা, এই শহরে আমি সবচেয়ে বেশি লেখালেখি করছি। আমিও চাই, তাদের ধারণা সত্য হোক। কিন্তু আমি আশানুরূপভাবে লেখার কাজ করে যেতে পারছি না। শারীরিক সঙ্কটের দোহাই দিই না। আমার নিজের মনমানসিকতার কারণেই মেজাজ খাট্টা হয়ে থাকে। লেখার জন্য তো মেজাজ মর্জি লাগে; চিত্ত প্রফুল্ল থাকতে হয়, তাহলেই তো নিত্য লেখাজোখা সম্ভব হয়। ঈদের ছুটিতে ঢাকা শহর একদম ফাঁকা হয়ে যায়। এই অতিরিক্ত ঢাকা আমার কাছে সবসময় উপভোগ্য। যদি ঢাকার আসল চেহারা কেউ দেখতে চান তাহলে ঈদের ছুটিতে বাড়ি না গিয়ে তার উচিত যানবাহনহীন কিংবা গাড়িঘোড়ার দাপটহীন, যানজটহীন ঢাকাকে একবার দেখে যাওয়া। এই ধরনের ঢাকা বহুবার দেখেছি। কারণ আমার কোনো ঈদের ছুটি নেই, বাড়ি নেই, ঘর নেই। একদা ছিল বটে, এখন তো নেই। কত কিছুই মানুষের জীবনে থাকে। আবার থাকেও না।
জীবনকে অতিক্রম করতে করতে মানুষের আসল চেহারা দেখেছি। স্বার্থবুদ্ধি কী মারাত্মক অনাত্মীয়তা সৃষ্টি করে, সেটা প্রত্যক্ষ করেছি। দেখেছি, প্রকৃত আত্মীয়তা এক দুর্লভ ব্যাপার। আমি এখন আর আত্মীয়তার ওপর তেমন ভরসা রাখি না। তবে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতেও আগ্রহী নই। মানুষের স্বার্থবুদ্ধিই মানুষকে অনাত্মীয় করে ফেলে। অবশ্য এ অবস্থাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যাখ্যা করতে পারব না। কারণ আমার লজ্জাবোধ আছে। চক্ষুলজ্জা আছে। জীবন আমি কাটিয়ে দিয়েছি। এখন আফসোস করার কিছুই দেখি না। যদি কোনো সন্তাপ আমার মনে জমে থাকে, তাহলে তা ছাই চাপা দিয়ে নিভিয়ে ফেলব, পানি ঢেলে দেবো। ধিকিধিকি জ্বলতে দেবো না।
জীবনের সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাই না। জীবন তো এ রকমই হয়, যা আমার হয়েছে। এখন পড়ন্ত সূর্যের রক্তিম আভার মধ্যে সূর্যাস্তের দিকে হেঁটে চলেছি। আমারও তো অবসান দরকার। সমাপ্তি দরকার। কে ছিল আপনজন জগতে, এ প্রশ্ন করে আর দুঃখ বাড়াতে চাই না।
আমি আমার পেশাটাকেই জানি। জগতে আরো কত পেশাজীবী মানুষ আছে, তাদের কথা তো জানি না। কত বিচিত্র ধরনের মানুষের মধ্যে বসবাস করে গেলাম। এর মধ্যে কতজনকেই বা ঠিকমতো চিনেছি? অচেনাই রইল অনেক রহস্যময় নর-নারীর পরিচয়।
এখন আর অতীত চিন্তায় কাজ কী আমার? বরং অনেক ছোটখাটো বিষয় আছে যা মানুষের সাথে মানুষের আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি করে। এসব সম্পর্ক আপনা থেকেই গড়ে ওঠে এবং দৃঢ়তা পায়। এ কথা বলতে আমার লজ্জা নেই যে, আমি আত্মীয়তার স্নেহ-মমতার কাঙাল, যেকোনো মূল্যে সম্পর্ক ধরে রাখতে চাই। বন্ধন ছিন্ন হওয়ার মতো অনুশোচনা আর কোনো কিছুতেই নেই। সারা জীবন জেনে এসেছি মানুষের সাথে মানুষের যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে সেটাই আত্মীয়তা। এ আত্মীয়তা বজায় রাখতে কত ত্যাগ স্বীকার করেছি; দুঃখ পেয়েও বেদনা বিস্মৃত হয়েছি, তবু হাসিমুখ আত্মীয়স্বজন দেখতে আমার উসাহের অন্ত নেই।দুঃখ ও অনুতাপ হলো মানুষের স্বভাবের অন্তর্গত। তবু পাওয়া-না-পাওয়ার হিসাব করতে চাই না। ধরে নিয়েছি, আমার পাওয়ার অঙ্কটা পর্বতপ্রমাণ। ‘পাইনি’ বলব কেন? বরং এত পাওয়ার মধ্যে থেকে পাওয়ার অনুভূতিটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এখন জাগতিক বিষয়াদি থেকে সরে এসে যদি কয়েকটি ভালো কবিতা লিখে যেতে পারি, সেটাই হবে আমার সার্থকতা। যা হোক, আমার মতো কবির সুখদুঃখ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মতো মানুষ এ দেশে আছেন, এটা ভেবে আমার হৃদয় আনন্দে ভরে যায়। সদয় সহৃদয় পাঠক সাধারণ সব সময় আমার মঙ্গল কামনা করেছেন। আমি তাদের সবার প্রতি ‘ঈদ মোবারক’ বলতে চাই। অনেক ভক্ত আছেন, যারা ঈদের ছুটিতে গ্রামেগঞ্জে, হাটেমাঠে চলে গেছেন। আমি তাদেরকেও ঈদের শুভেচ্ছা জানাই। আর ঈদের শুভেচ্ছা জানাই আমার একাকিত্বকে।
ঈদ এলে আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে মায়ের কথা। ঈদের সময় আমাদের পরিবারে আমার মা-ই ছিলেন সবার মুরব্বি, সবার জন্য অন্নদাত্রী। ঝালেব্যঞ্জনে সবার সামনে সুখাদ্য তুলে ধরতেন আমার মা। ঈদ এলে মায়ের মুখ ফিরে আসে। এই তো আনন্দের সুগন্ধি বাতাস বইতে শুরু করেছে; সব কিছু মিলিয়ে জীবন কত আনন্দময় সুখে মাতোয়ারা হয়ে আছে। এমন দিনে স্মৃতি হাতড়িয়ে কোনো দুঃখকে তুলে আনা অনুচিত। আমি পারতপক্ষে দুঃখবাদী হতে চাই না। আবার অকারণ আনন্দেও লাফাই না। তাকাতে চাই মাঝামাঝি একটা জায়গায়। একটা মোটামুটি আরামদায়ক অবস্থানে।
কথা হলো, লেখক জীবন আমার সুখেই কেটে গেছে, দুর্ঘটনা-দুর্বিপাক আমাকে কাবু করতে পারেনি। তা ছাড়া আমার মনেই আছে এক ধরনের সদা প্রফুল্লতা। আমি তো কোনো সময় কারো কাছে হার মানতে চাইনি। কবির মতোই মাথা উঁচু করে চলতে চেয়েছি, হার মানব কেন? লেখকরা যেমন হয়ে থাকে, আমিও তেমনি। সমাজকে স্বপ্ন দেখিয়েছি, সমগ্র জাতিকে কল্পনার মধ্যে আশা জাগিয়ে তুলতে সাহস জুগিয়েছি এটাই তো কবির কাজ। এটাই আমি আমার সাধ্যমতো জোগান দিয়ে এসেছি। এর বেশি আর কী করতে পারতাম?
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


