বঙ্গভবনের সেই দিনগুলো - ২
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী
বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশের পর বিএনপি মহাসচিব ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সংলাপের ফলাফল অনুযায়ী সঙ্কটের সমাধান হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কারণ দুই নেতা সংলাপ এই ইস্যুতেই শেষ করেছিলেন। হাসান না আজিজ এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত হাসানের বিদায় ইস্যুতে যবনিকাপাত ঘটিয়েছিল। কিন্তু তখন আবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম এ আজিজের বিদায় ও অন্যান্য দাবি তোলা হয় নতুন করে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দল নেতৃবৃন্দের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাওয়া হলে যথারীতি তার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এগ্রেসিভ বা আক্রমণাত্নক ভঙ্গীতে কথা বলছিলেন। কেউ কেউ প্রেসিডেন্টকে তাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, সম্মানিত ব্যক্তিত্ব, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান প্রেসিডেন্ট ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে আবার টিপ্পনিও কাটছিলেন। শেখ হাসিনা আমাকে বলেছিলেন, তিনি শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট ও আমাকে নিয়ে একান্তে কিছু সময় বসতে চান এবং এ ব্যবস্থাটা আমাকেই করে দিতে হবে। গণতন্ত্র ও সংবিধান সমন্নত রাখার স্বার্থে আমি এ প্রস্তাবে সম্মত হলাম। এর বিরোধিতা ছিল। এমনি একর্পায়ে আমি তাদের দু’জনকে বসিয়ে কিছু সময়ের জন্য বাইবে চলে আসি। এ উদ্যোগ ফলদায়ক ছিল। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার এ উদ্যোগটিকে ভালোভাবে নেনন। তাদের ৯ জনের একটি গ্রুপ দু’টি দেশের কাছে নেত্রীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়ে রেখেছিলেন। শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশ নিতে চাচ্ছিলেন এবং এই গ্রুপটর কারণে পারছিলেন না। একান্ত আলোচনায় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, দলের নেতারা অনেক দাবি জানাবেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আপনি সিদ্ধান্ত দেবেন।
আপনি বিচারপতি আজিজকে পদত্যাগ করানোর চেষ্টা করবেন। সাংবধানিক পদ হিসেবে তিনি নিজে পদত্যাগ না করলে তো জোর করে করানো যাবে না- এটা আমিও বুঝি। সে ক্ষেত্রে তাকে ছুটিতে পাঠিয়ে হলেও নির্বাচনটা করুন। আমাদেরকে নির্বাচনে অংশ নিতে দিন। আমার দলেও আপনার অনেক ছাত্র আছে। তিন আরও বললেন, আমাদের পক্ষ থেকে বক্তৃতা বিবৃতি হবে। কর্মীদের ঠিক রাখতে হবে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমরা নির্বাচনে অংশ নেবো। বিচারপতি আজিজের পক্ষেও আওয়ামী লীগে লবিং ছিল। বরিশাল অঞ্চলের নেতারা তার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু কে এম হাসানের ব্যাপারে তাদের নেত্রীর পারসোনাল ইগো কাজ করছিল। সেটি হচ্ছে কর্ণেল ফারুক-রশীদদের সঙ্গে তার আত্নীয়তার কারণ। তাই হাসান ও আজিজের মধ্যে একজনকে বাদ দেয়ার প্রশ্ন যখন আসলো তখন স্বভাবতই হাসান মাইনাস হন। আওয়ামী লীগের একটি প্রভাবশালী অংশের মত ছিল একটি একটি ইস্যু ধরে এগোলে সরকারকে দূর্বল করা যাবে, যা নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সহায়তা করবে।
যাই হোক, শেখ হাসিনার কথা মতো আমি পরদিন সকালে প্রেসিডেন্টের রুম থেকেই সিইসি বিচারপতি এম এ আজিজকে রেড ফোনে ধরলাম। তাকে বললাম, দেশ ও জাতির স্বার্থে আপনাকে স্যাক্রিফাইস করতে হবে। সকল দলকে নিয়ে নির্বাচন করাই আমাদের লক্ষ্য। বিচারপতি আজিজ বললেন, আমি আমার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে চাই। তিনি বললেন, নির্বাচন হওয়ার আগে কি করে তারা আমার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। আমি তাকে বললাম, আপনার বক্তব্য কনটেস্ট করছি না। কিন্তু এখানে সৃষ্টি হযেছে আস্থার সঙ্কট। নির্বাচনটা তো করতে হবে। তিনি বললেন, ঠিক আছে। আমি কোন অবস্থাতেই পদত্যাগ করবো না। এছাড়া কী করা যায় বলুন। আমি এ কথা লুফে নিয়ে বললাম, হ্যাঁ আমিও মাঝামাঝি একটি প্রস্তাব দিতে চাচ্ছিলাম।
আপনি ছুটিতে গিয়ে আমাদেরকে একটি সুযোগ করে দিতে পারেন। তিনি বললেন, কিন্তু আমাকে অবশ্যই তখন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এমেনিটিজ দিতে হবে। তাতেও রাজি হলাম। সিইসিকে কমনওয়েলথের একইট স্কলারশিপ এবং অন্তর্বর্তীকালীন তার ফুল ফ্যামিলিকে বিদেশে প্রভাইড করার প্রস্তাব দিলাম। বৃটিশ ডেলিগেশন আমাদের সঙ্গে দেখা করে এস্কলারশিপের ব্ল্যাসঙ্ক চেক দিয়েছিল। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি জাতিসংঘও স্ট্যান্ডিং অফার দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু তিনি তাকে সম্মত হলেন না। বললেন, আমি দেশেই থাকবো। আমার বাসা, সিকিউটিরি সব বহাল থাকতে হবে। তবে নির্বাজন শেষ হওয়ার কিছুদিন পর পর্যন্ত তিনি নির্বাচন কমিশন থেকে পুরোপুরি দূরে থাকতে অর্থাৎ ছুটিতে থাকতে সম্মত হন। দেশ ও জাতির স্বার্থে আলহামদুলিল্লাহ বলে মহামান্যের হাতে ফোন সেটটি দিই। প্রেসিডেন্ট তাকে জাতির ঐতিহাসিক মুহূর্তে এভাবে এগিয়ে আসার জন্য ধন্যবাদ দেন। এরপর বিচারপতি আজিজ আবার আমাকে চান।
কথা অনুযায়ী আমি আমার রুমে যাই বঙ্গভবনে আমার অফিস রুম এবং নির্বাচন কমিশনে সিইসি’র অফিস রুম বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর সাদা কাগজে বিচারপতি সাহেব প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে ছুটির দরখাস্ত লিখেন। তাতে তিনি নির্বাচনকালীন সময়ে ছুটিতে থাকা, তার বাসায় অবস্থান এবং সকল সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এমেনিটিজ প্রদানের অনুরোধ ইত্যাদি জানান। তিনি আমার রুমে ফ্যাক্সে দরখাস্তটি পাঠিয়ে দেন। শেখ হাসিনা এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হতে দেখে খুশি হন। খালেদা জিয়াও বলেন, আর কোন দাবি-দাওয়া যেন না আসে। কারণ আমরা নিজেরাই তো বসে আরও কমে সঙ্কট সমাধান করে ফেলেছিলাম। সত্যি কথা বলতে কি, দু’টি প্রধান দলের মধ্যে সমঝোতা তখন বড় বেশি প্রয়োজন। কারণ খেলায় যারা খেলোয়াড় থাকবেন তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া ও তার ফলাফল মেনে নেয়া অর্থাৎ হেলদি কমপিটিশন না হলে রেফারির জন্য অসুবিধা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা রাজপথ গরম করার বক্তব্য দিতে থাকেন।
উপদেষ্টা এডভোকেট সুলাতান কামালকেও আমরা শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে বলেছিলাম। কারণ আমরা চেয়েছিলাম যেখানে যার সুসম্পর্ক আছে সিটি কাজে লাগাতে হবে। সুলতানা কামালকে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বিচারপতি আজিজকে যে কোনভাবে ছুটিতে পাঠিয়ে হলেও সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। এর বাইরে নির্বাচন কমিশনার স. ম. জাকারিয়াকে সরানোর জন্যও চেষ্টা করতে হবে। তবে বিচারপতি আজিজ ইস্যু সমাধানে অন্যথা করা যাবে না। এ বিষয়টি আমরা প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টা পরিষদে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছিলাম। প্রেসিডেন্টের জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষনে সদ্য বিলুপ্ত সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দলগুলোর কাছে উপদেষ্টাদের নাম চাওয়া হয়েছিল। সংসদীয় গণতান্ত্রিক বিধান অনুযায়ী ৩০টি আসন যাদের আছে তারা রাজনৈতিক দলের স্বীকৃতি পায়। আর দশটি আসন সংবলিত দলকে গ্রুপ বলা হয়। আমরা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সংলাপে গ্রুপ পর্যন্ত গিয়েছিলাম।
এমনকি উপদেষ্টাদের নাম নেয়ার সময়ও গ্রুপের বাইরে থেকেও নাম এসেছিল। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সময় ১৯৯১ সালেও অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে এভাবেই নাম নেয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক দল ছাড়াও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জায়গা থেকে যাদের নামে আপত্তি ছিল তাদের মধ্যে বেগম কামালের নামও ছিল। তখন আমরা সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যারা প্রেসিডেন্টের কাছে ছিলাম আমরা চেয়েছি যেহেতু নাম চাওয়া হয়েছে সে জন্য উপদেষ্টা পরিষদে সংশ্লিষ্ট প্রধান দলগুলোর প্রতিনিধি থাকতে হবে। অন্য অনেকের ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে আপত্তি ছিল। সুলতানা কামালকে ব্যালান্স করার জন্য নেয়ার পক্ষে জোর দিয়েছিলাম। অবশ্য তিনি সমঝোতার পক্ষে কাজ করছিলেন। বঙ্গভবনে কাজের ফাঁকে একরাতে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমরা সব উপদেষ্টারা যখন ডিনারে ছিলাম তখন সুলতানা কামাল ও তার স্বামী মি. চক্রবর্তী আমার পাশে ছিলেন। সুলতানা কামাল সেখানে ও উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকটি বৈঠকে আমাকে বলছিলেন আপনি যেভাবে এখানে রাত-দিন সমঝোতার জন্য কাজ করছেন বাইরে কিন্তু আপনার সম্পর্কে অন্য রকম ধারণা দেয়া হয়েছে। একসঙ্গে কাজ না করলে আমরা বুঝতাম না। দিন-রাত আমি বঙ্গভবনে এমনই ব্যস্ত ছিলাম যে, স্ত্রী-পরিবারের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। বৈঠক, অন্যান্য প্রোগ্রাম, প্রেস ব্রিফিং করা ইত্যাদি কারণে সন্ত্রীক বৈঠকগুলোতেও স্ত্রীকে নিয়ে যেতে পারিনি। উপদেষ্টারা কিভাবে অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলেন এবং সেখানে কিভাবে বিভিন্ন দলগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে তাদেরকে নেয়া হয়েছিল তারা এ ব্যাপারে ভালই জানেন।
ড. আকবর আলী খান, মাহবুবুল আলমসহ উপদেষ্টারা দেখেছেন কিভাবে তাদের সিনিয়রিটি নির্ধারণ করেছি। সবাইকে বঙ্গভবনের এক নম্বর ভিআইপি কল অন রুমে বসিয়ে প্রত্যেকের অবস্থান ইতাদি নিয়ে আলাদা আলাদা আলাপ করে সিরিয়াল ঠিক করেছিলাম। সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের নামের সমন্বয়েও সমস্যা হচ্ছিল। অনেকে পেছন থেকে কথা বলতেন। সামনে বিড়ালের গলায় কেউ ঘন্টা বাঁধতে চাইতেন না। ক্যাবিনেট সেক্রেটারি থাকার কারণে আকবর আলী খানের অবস্থানটি নির্ধারণ করার পর অবসরপ্রাপ্ত সেনা লেঃ জেঃ হাসান মশহুর চৌধুরীর অবস্থান দ্বিতীয় করতে গেলে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সিএম শফি সামী মুখ্য পররাষ্ট্র সচিব থাকার প্রসঙ্গ তোলা হয় এবং বলা হয় মুখ্য পররাষ্ট্র সচিবের অবস্থান কেবিনেট সেক্রেপারি বা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সমপর্যায়ের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আপত্তি এবং ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্ট দেখে দুদক নম্বরে জেনারেল মশহুদ ও ৩ নম্বরে সিএম শর্মা সামীকে অবস্থান দেয়া হয়। এরপর কে কবে স্ব পদে এলেন এবং কে কি হিসেবে অবসরে গেলেন, সরকারি-বেসরকারি অবস্থান ইত্যাদি দেখে তাদের সিরিয়াল করে দেয়ার অপ্রিয় কাজটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে করি। অবশ্য সুষ্ঠুভাবে এটি করার কারণে খুশি হয়েছিলেন।
বিচারপতি আজিজ ছুটিতে গেলে আবার স. ম. জাকারিয়া ইস্যু আনা হলো। বিভিন্ন মহল থেকে এটিকে দেখা হলো ওয়াদার বরখেলাপ হিসেবে। আওয়ামী লীগ থেকে চাপ দেয়া হচ্ছে আমাদের ওপর। রাস্তায় হরতাল-অবরোধ চালানো হচ্ছে। উপদেষ্টা পরিষদ বসছে ঘন ঘন। চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ রাখা ও সারাদেশকে অবরোধ করে রাখার সেই দুঃসহ পরিস্থিতিতে এক-দু’দিন পর পর আইন-শৃঙ্কলা কমিটির বৈঠকও করা হচ্ছে। ২০০৭ সালের সেই ১১ই জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির আগ পর্যন্তও প্রেসিডেন্টসহ আমরা সবাই ল’অ্যান্ড অর্ডার মিটিংয়েই ছিলাম। আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটকে নির্বাচনে আনার জন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে বঙ্গভবনে বৈঠকে আমরা স. ম. জাকারিয়া ইস্যু নিয়ে আলাপ করছিলাম। ওই বৈঠকে সুস্পষ্টভাবে আমার ও সুলতানা কামালের একই রকমের বক্তব্য ছিল। আর তা হলো শেখ হাসিনা স. ম. জাকারিয়া ইস্যু ছাড়াই মেনেছিলেন। কিন্তু এখন দলের কয়েকজন নেতার কারণে সমস্যায় পড়েছেন বলে জানিয়েছেন।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


