চেয়ারম্যানের দায় নেই-সব দায় প্রধানমন্ত্রীর
: মাহমুদুর রহমান
অব শেষে ট্রাষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ঘুম ভেঙেছে। ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্হাপনা পরিচালক জনাব ইকবাল ইউ আহমেদ এক সময় আরব-বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। ক্ষমতাবান পরিবারের সন্তান এই ভদ্রলোককে সে সময় থেকেই ব্যক্তিগতভাবে চিনি। যাক সেই প্রসঙ্গ। সময়-সুযোগ হলে এ বিষয়ে পরবর্তীতে লেখা যাবে। ট্রাষ্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর অধীনে তফসিলভুক্ত অপরাধ, যা মানি লন্ডা ঝড়েবক বিজ্ঞাপন ।
রং প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০০৮-এর ধারা ৪ ও ৮ এবং পেনাল কোডের ৪০৬, ৪০৮ এবং ৪০৯ ধারায় আমার দুদকে প্রেরিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাষ্ট ব্যাংক দু’দিন আগে দৈনিক সংবাদপত্রসমুহে বিনে পয়সায় যে বিজ্ঞপ্তিটি ছাপতে বাধ্য করেছে, সেখানে তাদের কৈফিয়ত নিম্নরুপঃ
১. ট্রাষ্ট ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে ২৩.০৭ কোটি টাকা ব্যবসায়িক লোকসান দিয়েছে বটে; কিন্তু এই লেনদেনকালে কোনো মুদ্রা পাচার কিংবা অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেনি।
২. ব্যাংকের চেয়ারম্যান কিংবা পরিচালকরা কোনো প্রশাসনিক/পরিচালন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। তারা শুধু নীতি প্রণয়ন এবং ব্যবসায়িক কর্মকৌশল অনুমোদন করে থাকেন।
৩. প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, জানুয়ারি ২০০২ থেকে জুন ২০০৩ পর্যন্ত ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগ লেনদেনে ২৩.০৭ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। তার আগে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন পরিচালন পর্ষদ ওই ব্যবসায়িক কার্যক্রম অনুমোদন করে। লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ২০০২ সালের জুলাই মাসে।
৪. পরিচালন পর্ষদের সিদ্ধান্তক্রমে ব্যবস্হাপনা কর্তৃপক্ষ ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্হাপনা পরিচালক জাহিদ হোসেন চৌধুরী এবং অন্য দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে। মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন।
ট্রাষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নতুন কিছু তথ্য দেয়ার জন্য ধন্যবাদ না জানিয়ে উপায় নেই। তারা স্বীকার করেছে যে, রাষ্ট্রের এই বিপুল ক্ষতিসাধন বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যে ফটকা ব্যবসা করার কারণে ঘটেছে, তার পেছনে ট্রাষ্ট ব্যাংকের পরিচালন পর্ষদের অনুমোদন রয়েছে। ব্যাংকটির বর্তমান কর্তৃপক্ষ অবশ্য দুদক চেয়ারম্যানকে বাঁচানোর চেষ্টায় এই অনুমোদন প্রদানের জন্য দায়ী করছে আরেক সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) হারুন-অর-রশীদের নেতৃত্বাধীন পরিচালন পর্ষদকে। এখানে আমার কোনো মন্তব্য নেই; কারণ এটা ট্রাষ্ট ব্যাংকের নিজস্ব ব্যাপার। সঠিক তদন্ত হলেই বোঝা যাবে যে, ট্রাষ্ট ব্যাংককে দেউলিয়া বানানোর প্রক্রিয়ার জন্য কোন পরিচালন পর্ষদ অধিক দায় নেবে। এবার ট্রাষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কৈফিয়তের অন্তঃসারশুন্যতা এক এক করে তুলে ধরা যাকঃ
ক. ট্রাষ্ট ব্যাংক আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। এ জাতীয় জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের সম্পদহানিকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়দায়িত্ব পরিচালন পর্ষদের চেয়ারম্যানের এড়িয়ে যাওয়ার কোনোরকম সুযোগ নেই। কাজেই বৈদেশিক মুদ্রাসংশ্লিষ্ট ব্যবসার নামে ফটকাবাজির সিদ্ধান্ত নিয়ে ২৩.০৭ কোটি টাকা লোকসানের দায়ভার দুই সাবেক সেনাপ্রধানের একজনকে অথবা উভয়কে অবশ্যই নিতে হবে।
খ. ট্রাষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছে, ২৩.০৭ কোটি টাকা লোকসান নিতান্তই ব্যবসায়িক কারণে ঘটেছে। তাই যদি হবে, তাহলে সাবেক ব্যবস্হাপনা পরিচালকসহ ব্যাংকটির অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হলো কেন? কাজেই এসব খোঁড়া যুক্তি ধোপে টিকবে না।
গ. ব্যাংকের লোকসানের জন্য বর্তমান দুদক চেয়ারম্যান দায়ী নন; কারণ তিনি ২০০২ সালের জুলাই মাসে চেয়ারম্যান হিসেবে ট্রাষ্ট ব্যাংকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং ব্যাংকের ফটকাবাজিজনিত লোকসান শুরু হয়েছিল একই বছর জানুয়ারি মাস থেকে-এটিও এক হাস্যকর যুক্তি। ট্রাষ্ট ব্যাংকের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রাজনিত ব্যবসার সময়কাল জানুয়ারি ২০০২ থেকে জুন ২০০৩ পর্যন্ত। এই দেড় বছরের মধ্যে এক বছর যেহেতু লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী ব্যাংক চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন, কাজেই যে কোনো যুক্তিতেই ২০০২-০৩ অর্থবছরে যে লোকসান হয়েছে, তার দায়িত্ব বর্তমান দুদক চেয়ারম্যানকে অবশ্যই নিতে হবে। ২০০২ পঞ্জিকাবর্ষের প্রথম অর্ধেকে যে পরিমাণ টাকা কথিত লোকসান হয়েছে, তার দায়িত্ব নেবেন সে সময়কালীন চেয়ারম্যান, যার তথ্য ট্রাষ্ট ব্যাংকে থাকার কথা।
পাঠক নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, ট্রাষ্ট ব্যাংকের বিবৃতি যথাযথ তদন্তের আগেই অভিযুক্তদের বাঁচানোর চেষ্টা মাত্র। আচ্ছা, তর্কের খাতিরে না হয় মেনেই নিলাম দুদক চেয়ারম্যান ফুলের মতো পবিত্র এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের লোকসান, অর্থ আত্মসাৎ, মুদ্রা পাচারসহ কোনো অনিয়মের জন্য চেয়ারম্যানকুলের কোনো দায়িত্ব নেই। তারা পদাধিকারবলে পরিচালন পর্ষদের শোভাবর্ধন করে থাকেন মাত্র। উপরোক্ত যুক্তি মেনে নিলে সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধনের মামলায় অভিযুক্ত করার কোনোরকম নৈতিক অথবা আইনগত ভিত্তি আর থাকে কি? চট্টগ্রাম বন্দরের ঠিকাদার নিয়োগ সংক্রান্ত মামলার প্রাথমিক প্রতিবেদন (ঋওজ) থানায় দাখিল করেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলো।
তিনি দীর্ঘ ১৩ মাস কারাভোগ করে এ বছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি উচ্চ আদালতের রায়ে প্রদত্ত জামিনে মুক্তিলাভ করেছেন। তার মাথার ওপর একটি নয়, রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধনের তিন-তিনটি মামলার খাঁড়া ঝুলছে। এই মামলাগুলোতে অনুমোদন দিয়েছেন দুদক চেয়ারম্যান লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী। অথচ তিনি মনে করেন না ট্রাষ্ট ব্যাংককে দেউলিয়া বানানোর জন্য তার কোনো দায়দায়িত্ব রয়েছে। আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের সম্পদের এত বড় ক্ষতিসাধনের পরও তাকে কোনোরুপ অনুশোচনায় দগ্ধ হতে আমরা এখন পর্যন্ত দেখিনি। দ্বিমুখী নীতি এবং দুর্নীতি দমনের নামে তামাশার একটা সীমা থাকা দরকার। এসব বিষয়ে আমি দুদক চেয়ারম্যানকে একটি প্রকাশ্য এবং সরাসরি বিতর্কে অংশ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। বিতর্কের স্হান এবং সময় তিনি সুবিধামত নির্ধারণ করে নিতে পারেন। আশা করি, স্বচ্ছতার খাতিরে তিনি আমার প্রস্তাবে সম্মত হবেন, যাতে দেশের জনগণ প্রকৃত বিষয়টি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়।
(সূত্র, আমার দেশ, ০৭/১১/২০০৮)
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই নভেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



