সার্বভৌমত্ব বনাম নির্বাচন
ফরহাদ মজহার
গত ১৫ নভেম্বরে হোসেন জিল্লুর রহমান ক্ষমতাসীন দখলদারদের পক্ষে যে বিবৃতি দিয়েছেন, তার মূল উদ্দেশ্যের মধ্যে অনেকগুলো স্তর বা পর্ব-বিভাগ আছে। সেইগুলো ধরতে পারলে আগামি দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন দিকে গড়াচ্ছে আমরা খানিক ধরতে পারব। এই স্তর বা পর্ব-বিভাগ হচ্ছে; (এক) নির্বাচন বানচাল করে অবৈধ দখলদারি আরো স্থায়ী করা; (দুই) এই কর্ম সম্পন্ন করবার লক্ষ্যে বিএনপির ঘাড়ে নির্বাচন না হবার দোষ চাপিয়ে দেওয়া; (তিন) বিএনপি এবং ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সাম্প্রতিক মতপার্থক্যকে আরো উসকে দেওয়া এবং বিএনপিকে বাদ দিয়ে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাপ সৃষ্টি করা এবং (চার) হোসেন জিল্লুর নিজের জন্য আপন ভাবমূর্তি বহাল রেখে ক্ষমতা থেকে নিষ্ত্র্নান্ত হবার একটা পরিস্থিতি তৈরি করা। ভাবখানা এই রকম যে, আমরা তো চেয়েছি, কিন্তু বিএনপি নির্বাচন না করলে আমাদের কী দোষ!
বিএনপির মৃদু আপত্তি ও অবস্থানের অস্পষ্টতা
বলাবাহুল্য বিএনপি মৃদু কণ্ঠে আপত্তি জানিয়েছে। দুর্বল আপত্তি। বিএনপি নির্বাচনমুখী দল, অতএব নির্বাচনের সমস্ত প্রস্তুতিই তার রয়েছে। বিএনপি চাইলে ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচন করা মোটেও দুঃসাধ্য কিছু নয়। আওয়ামী লীগ যেমন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত দাবি করে নিজেদের পক্ষে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মত তৈরি করতে নেমে পড়েছে, বিএনপি নিজের প্রস্তুতি ঘোষণা করে সেই প্রচার আন্দোলনে নামতে ব্যর্থ হয়েছে। কৌশলের ক্ষেত্রে এই ধরনের ব্যর্থতা বিপজ্জনক। গণমাধ্যমগুলো এই ধারণাই দিচ্ছে যে বিএনপির নির্বাচনের জন্য কোন প্রস্তুতি নাই। অথচ নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্যই খালেদা জিয়ার জন্য নতুন অফিস নেওয়া হয়েছে। চোখের সামনে এই ধরণের প্রস্তুতির উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও গণমাধ্যমে যখন আওয়ামী প্রস্তুতির কথা ফলাও করে জাহির করে দাবি করছে বিএনপির কোন প্রস্তুতি নাই, তখন সেটা বিএনপির মতো নির্বাচনমুখী দলের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিএনপির এই হুঁশ আছে কি না সন্দেহ। এই খবরই রটেছে যে প্রস্তুতি নাই বলেই বিএনপি নির্বাচনে যাবে না।
খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন এর একটা উত্তর দেবার চেষ্টা করেছেন বটে। তিনি বলেছেন, আমাদের ৭ দফা দাবি মেনে নিলেই আমরা নির্বাচনে যাব। সরকার দাবি মানেনি, অথচ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এটা প্রস্তুতির খবর নয়, দরকষাকষির ভাষা। তাছাড়া আমরা নাগরিকরা তাদের সাত দফার সব দফার সঙ্গে একমত নই। বিএনপি গণতন্ত্রের প্রশ্নে একাট্টা হলে একটি মাত্র দাবিই যথেষ্ট ছিলঃ অবিলম্বে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া। কিম্বা প্রাচীন সেই শ্লোগান ‘এক দফা এক দাবি, ... তুই কবে যাবি’। সাত দফা দাবির মধ্য দিয়ে বিএনপি এই ধারণাই দিয়েছে যে এখনো তারা রাজনীতিকে দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তদের রক্ষা করবার জন্য ব্যবহার করতে চাইছে। তাদের সাত দফা দাবির মধ্যে কারাগারে বন্দী নেতাদের মুক্তির প্রশ্নটাই বড় হয়ে উঠেছে যাদের দুর্নীতি ও রাজনীতিতে দুর্বৃত্তপনার জন্য আজ বিএনপির এই দশা। একইভাবে জনগণ দেখছে পুরানা দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তরাই নির্বাচনের নামে বিএনপিতে আবার ভিড় করছে। এর ফলে বিএনপির পক্ষে জনমত যতোটা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছিল, সেখানে ভাটা পড়তে শুরু করেছে। জনগণকে ফাঁকি দিয়ে রাজনীতি করবার চেষ্টা ভণ্ডুল হতে বাধ্য। বলাই বাহুল্য। দুর্নীতির মামলা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মোকাবিলা করবার যে উদাহরণ ও মনোবল খালেদা জিয়া অনুসরণ করছিলেন এবং তার দলের এতো অকাণ্ড ও কুকাণ্ডের পরেও যার কারণে তার প্রতি জনগণের আস্থা জনগণ দেখাতে শুরু করেছিল সকলকে নিঃশর্তে ছেড়ে দেবার দাবি জানিয়ে বিএনপি সেখানে কালি লেপতে শুরু করেছে।
এটাও আমরা খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃদু আপত্তির মধ্যে পরিষ্কার শুনিনি যে নীতিগত প্রশ্নে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে বিএনপির আলাপ-আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠকও একটি রাজনৈতিক ইস্যু। নির্বাচনের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির জন্য যে প্রক্রিয়াগুলো বহাল রয়েছে যেমন, অবিলম্বে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া সেই বিষয়ে এখনও কোন মীমাংসা হয় নি। এই ক্ষেত্রে মীমাংসা না হলে কিসের নির্বাচন? অর্থাৎ আমরা শুনিনি যে বিএনপি বলছে আমরা নির্বাচনের জন্য সর্বৈব প্রস্তুত, নির্বাচনের জন্য যা কিছু দরকার তার সমস্ত প্রস্তুতিই আমরা নিয়েছি। কিন্তু আমাদের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের সুষ্ঠু ও সাবলীল নির্বাচনের প্রশ্নে নীতিগত পার্থক্য আছে। নীতিগত ঐক্য যতক্ষণ না হবে ততক্ষণ বেসামরিক লেবাসে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার দায় কোন গণতান্ত্রিক দল নিতে পারে না। অথচ এটাই আগামি নির্বাচনের জনগণের একমাত্র ইস্যু। ক্ষমতাসীনরা ইলেকশান নয়, সিলেকশান চায় এটা তো বিএনপিরই শ্লোগান। মহাসচিব কথাগুলো দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন নি। কোন গণতান্ত্রিক দলই ক্ষমতাসীন দখলদারদের দখলদারী চিরস্থায়ী করবার রাজনীতি করতে পারে না। এই দুর্বল প্রতিবাদের কারণে এটাই প্রতিষ্ঠিত হোল যে দুর্নীতিবাজদের ছেড়ে না দেওয়ার কারণে এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি নাই বলেই বিএনপি নির্বাচনের বিরোধিতা করছে। জরুরি অবস্থার অধীনে এবং ক্ষমতাসীন দখলদারদের ‘সিলেকশান’ নিষ্পন্ন করবার রাজনীতির বিরুদ্ধে বিএনপির অবস্থান অস্পষ্টই থেকে গেল। থেকে গেল নিছকই কথার কথা হিশাবে।
জীবের জীবন বনাম রাজনৈতিকতা
আমি অধিকাংশ সময় গ্রামে থাকি। সেখানেও দেখেছি নির্বাচনের পক্ষে আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপির প্রস্তুতি মোটেও কম নয়। সত্য যে গ্রামে বা জনগণের মধ্যে কোন নির্বাচনী হাওয়া লাগে নি। তবুও জনগণ চায় নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটুক, যদিও কোন দলকেই তারা বিশ্বাস করে না। তারা হানাহানি চায় না, অবশ্যই। সেই জন্যই নির্বাচন হয়ে যাক, এবং ফখরুদ্দীন আহমদ গদি ছাড়ুক এটা তাদের আশা। কিন্তু সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা আগামি নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। মানুষ মাত্রই ভাত কাপড় বাসস্থান চিকিৎসা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিশ্চয়তা চায়, অর্থনৈতিক জীব হিশাবে সেটা প্রতিটি মানুষেরই চাওয়া-পাওয়ার অন্তর্গত। কিন্তু মানুষ নিজের মর্যাদা বা ইজ্জত নিয়ে বিশ্বসভায় দাঁড়াতে চায়। এখানে মানুষ জীব মাত্র নয়, রাজনৈতিক প্রাণী। এখানেই তার রাজনৈতিকতার তাৎপর্য। রাজনৈতিক দিক থেকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব সেই দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এটা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিশাবে প্রতিটি নাগরিকের ইজ্জতের মামলা।
তার মানে এই নয় যে, অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া অরাজনৈতিক ব্যাপার। সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবনধারণ ও জীবনযাপন সহজ করা যে কোন গণতান্ত্রিক রাজনীতির অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য এ ব্যাপারে তর্কের কোনই অবকাশ নাই। কিন্তু আমরা ক্ষমতায় এলে মানুষকে কম দামে চাল খাওয়াব এই ধরণের রাজনীতি মানুষকে নিু শ্রেণীর জীব গণ্য করার শামিল। ভাবখানা এই রকম মানুষ নিছকই বুঝি কুকুর বেড়াল গরু ছাগল ছাড়া কিছুই নয়, তাদের খড় বিচালি দাও হাড্ডি কাঁটা সাপ্লাই করো খাওয়াদাওয়া ব্যবস্থা করলেই তারা বুঝি খুশি। এইসব বললেই বুঝি ভোট দিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষ। তাহলে ব্রিটিশ আমল খারাপ কীসে? কিম্বা মহান আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়ার পাকিস্তান? দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক অধিকার, সবার জন্য সমান গণতান্ত্রিক আইন ইত্যাদি বুঝি কোন ইস্যু নয়। বুঝি ‘জরুরি অবস্থা’ রাজনীতির প্রধান প্রশ্নে রূপান্তরিত হয় নি। বুঝি পরাশক্তির সহায়তায় স্থানীয় তাঁবেদাররা বল প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেওয়া ও দুই বছর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে রাখা বাংলাদেশের জনগণের কাছে কোন রাজনৈতিক ইস্যু নয়। বুঝি, মানুষ ১১ জানুয়ারির ঘটনা ভুলে বসে আছে। রাজনৈতিকতা বা রাজনৈতিক চেতনা জীবনের জৈবিক চেতনা মাত্র নয়। যে কারণে মানুষকে ‘দাস’ বানানো যায় না। একটি দেশের জনগণকে পরাধীন রাখা সাময়িক সম্ভব হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘকাল অসম্ভব। পরাশক্তির বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে মানুষ। বাংলাদেশেও তার অন্যথা হবে না। খাওয়াপরা, বাড়িঘর ইত্যাদি যদি মানুষের প্রধান দাবি হোত তাহলে মানুষ দাসত্ব মেনে নিয়ে সেই সব নিয়েই খুশি থাকত। ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ বুকে-পিঠে বেঁধে গুলি বুকে নিয়ে শহীদ হবার সাধ করত না মানুষ।
এই দিকটা আলোচনা করার কারণ হচ্ছে বাংলাদেশে সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের প্রশ্নই এখন প্রধান ও একমাত্র রাজনীতি এমনকি নির্বাচনী রাজনীতির এটাই প্রধান ইস্যু। খালেদা জিয়া ও চারদলীয় জোট, আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট কিংবা ডান বা বাম যারা আগামি দিনে রাজনীতি করবে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা নির্বাচনের বিরোধিতা করবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনগণের কাছে বিচার্য বিষয় হবে কে পরাশক্তির দালাল? কারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের শত্রু। শত্রুমিত্রের এই ভেদ দ্বারাই আগামি দিনের ঘটনাবলি স্থির হবে। নির্বাচনের প্রস্তুতি থানা না থাকাটা এই ক্ষেত্রে নিছকই কৌশলগত প্রশ্ন। অতএব নির্বাচন করা না করা এই ক্ষেত্রে কূটতর্ক মাত্র। কোন দল পরাশক্তির নির্দেশে নির্বাচনে গিয়ে দখলদারদের বৈধতা দিতেই পারে। ইতিহাসে মীরজাফর ও উমিচাঁদদের দিন শেষ হয়ে যায় নি। বিএনপির মধ্যেও মীরজাফর আর উমিচাঁদদের সংখ্যা কম ভাববার কারণ নাই। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির মূল প্রশ্ন হচ্ছে কারা সার্বভৌমত্বের পক্ষের শক্তি? কারা জনগণের দুষমন? নির্বাচন হোক বা না হোক বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটাই এখন কেন্দ্রীয় বিষয়।
ফখরুদ্দীনের সরকার পরাশক্তির সমর্থনপুষ্ট সামরিক সরকার এটা বিদেশি পত্রপত্রিকাই বলছে। বহিরঙ্গে বেসামরিক কিন্তু অন্তরঙ্গে সামরিক সরকার এটা বোঝার মত কাণ্ডজ্ঞান জনগণের আছে। তার পরেও দখলদার পরাশক্তির পক্ষে হোসেন জিল্লুরদের ভূমিকা স্পষ্ট। জরুরি অবস্থা অবিলম্বে তুলে নিয়ে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি না করে এখন কারো না কারো ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তারা বাংলাদেশের জনগণ ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী শক্তির হাতেই ইলেকশানের নামে সিলেকশান করে বাংলাদেশ তুলে দেবার ফর্মুলা হাজির করেছেন। এখন যেমন বহিরঙ্গে বেসামরিক কিন্তু অন্তরঙ্গে সামরিক ঠিক একই ধরণের সরকার গঠনের জন্যই ১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচন চান তিনি। তফাত হচ্ছে অবৈধ দখলদারদের বর্তমান সরকার অনির্বাচিত; বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে নির্বাচিত সরকার হবে একই অবৈধ দখলদারদেরই সরকার। তবে নির্বাচিত। এই ধরণের নির্বাচিত সরকারের একটাই কাজ; অবৈধ সরকারের ক্ষমতারোহণ ও তাদের অকাণ্ড-কুকাণ্ডগুলোকে বৈধতা দেওয়া।
নির্বাচন বানচালের রাজনীতি ও সরকারি পরিকল্পনা...
ক্ষমতাসীন দখলদাররা অবশ্যই ক্ষমতায় থাকতে চায়, ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। যে কোন ছুতায় নির্বাচন বানচাল করা তাদের প্রধান একটি মতলব। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে তারা নির্বাচন দিতে রাজি হয়েছে বটে, কিন্তু শুধু সেই নির্বাচনই তারা চাইতে পারে যা তাদের স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
স্বার্থটা কি? এখনকার মতো সামনে বেসামরিক সরকারের ছবি টাঙিয়ে রেখে অস্ত্র ও নিপীড়নমূলক আইন ও রাষ্ট্রযন্ত্র হাতে বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর লুণ্ঠন ও মুনাফাখোরির পাহারাদারি। পাহারাদারি করছে কিছু লোক। দখলদার তারাই। খোদ সত্যটা হচ্ছে ক্ষমতাসীন দখলদাররা সেনাবাহিনী বা রাজনৈতিক দল কারোরই পক্ষের কেউ নয়। তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সেনাবাহিনীকে তাদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কাজে লাগাতে গিয়ে সৈনিকের মর্যাদাকেও ক্রমাগত ভূলুণ্ঠিত করে চলেছে। সেনাবাহিনীকে যেমন ব্যবহার করছে তারা, ঠিক সেই ভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলকেও সমানভাবেই ব্যবহার করছে। এ অবস্থাটাই দখলদাররা বহাল রাখতে চায়। পাহারাদার অনেক সময় মনিবের চেয়েও মনিবের স্বার্থের জন্য অতি মাত্রায় কাতর হয়ে পড়ে।
ফখরুদ্দীন সরকার ক্ষমতা ছাড়ুক। এটা জনগণ চাইছে, সন্দেহ নাই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দাবিও হচ্ছে ‘ইলেকশান’, কারণ বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে দীর্ঘস্থায়ী করা বিপজ্জনক। তবে দখলদাররা যে ‘সিলেকশান’ ছাড়া আর কিছুই চাইছে না, হোসেন জিল্লুরের হঠাৎ এই কর্কশ বক্তব্যে এটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দখলদাররা পিছু হটে নি। কোন একটা নির্বাচনী খেলা খেলে তাদের পছন্দের লোকগুলোকে এনে একটা ‘সংসদ’ তাদের গঠন করতে হবে। এ ছাড়া উপায় কী? বিকল্প হচ্ছে নির্বাচন বানচাল করা ও নতুনভাবে দখলদারি সাজানো। এই পথ সংঘাত ও রক্তপাতের পথ। হোসেন জিল্লুরের এই ঘোষণা তারই ইঙ্গিত কিনা কে জানে।
শুরু থেকেই পরিকল্পনা রয়েছে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী মহাজোটকে জয়ী করিয়ে আনা। অবশ্য এই হিসাবের মধ্যে শেখ হাসিনা ‘মাইনাস’ ছিলেন, খালেদা জিয়া তো অবশ্যই। উভয়কে বাদ দিয়েই দলের মধ্যে উচ্চাভিলাষীদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ‘সংস্কারপন্থীদের নিয়ে ঘটনাটি ঘটবার কথা ছিল। শেখ হাসিনা তার দলের অভ্যন্তরের উচ্চাভিলাষীদের মুখে তুড়ি মেরে নিজেই আগামি সংসদে অবৈধ দখলদারি এবং তাদের সকল অপকর্মকে ‘বৈধতা’ দেওয়ার নেতৃত্ব নিয়েছেন। শেখ হাসিনা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মতো প্রকাশ্যে একটি বেসরকারি সরকার গঠন করবেন। কিন্তু ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি থাকবে এখন যারা ক্ষমতায় তাদেরই হাতে। শেখ হাসিনা এই ব্যবস্থাটা মেনে নিয়েই বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাকে স্বাগত জানাবার জন্য আয়োজনও হয়েছিল বিশাল। আওয়ামী লীগ যখন বলছে আমরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত, তখন ওর মধ্যে যা কিছু বলা হয় তার পুরাটাই আমাদের বুঝতে হবে। নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত কথাটার মর্ম হচ্ছে এই যে আওয়ামী লীগ বলছে আমরা ক্ষমতাসীন দখলদারদের ক্ষমতা দখল ও তাদের সকল অপকর্ম আগামী সংসদে বৈধ করবার জন্য তৈরি হয়ে আছি। অতএব সরকারের উচিত আমাদের ক্ষমতায় যেতে দেওয়া। বিএনপি নির্বাচন করুক বা না করুক তাতে কিছুই আসে যায় না।
কিন্তু রাজনীতিতে কিছু নতুন উপাদান তৈরি হয়েছে...
কিন্তু এই হিসাবের মধ্যে রাজনীতিতে কয়েকটি নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে। উচ্চ আদালত ক্রমশ এই অবৈধ দখলদারির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শুরু করেছে। সর্বশেষ ট্রুথ কমিশন সংক্রান্ত রায় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। জনগণের রাজনৈতিক হুঁশ যত ফিরে আসছে সেই মাত্রায় আদালতও মাঝে মধ্যে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক দলের চেয়েও ক্ষমতাসীনদের লালচোখ উপেক্ষা করে আদালত যতো বেশি সংবিধান ও আইনের প্রশ্নকে মুখ্য রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত করতে সক্ষম হবে, ততটাই রাজনীতি গণমানুষের পক্ষে যাবে। সজাগ ও সক্রিয় আদালতের চেয়ে ভাল অস্ত্র এখন আর জনগণের হাতে নাই। উদারনৈতিক রাজনীতির মধ্যে গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রাম চালাবার জন্য আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। রাজনীতির নতুন উপাদান হচ্ছে দখলদারির প্রথম দিককার পর্যায়ের মতো ক্ষমতাসীনরা আদালতকে পুরাপুরি তাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারছে না। আদালত কতটুকু এই শক্তি ধরে রাখতে সক্ষম তা নির্ভর করবে গণআন্দোলন, গণসংগ্রামের ওপর। জরুরি অবস্থায় মানুষ রাস্তায় নাই। অতএব এই মুহূর্তে তা নির্ভর করবে প্রধানত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরও। যদি নির্বাচনে যাওয়ার উদ্দেশ্য হয় অবৈধ দখলদারদের ‘বৈধতা’ দেওয়া এটাই যদি রাজনৈতিক দলের ভূমিকা হয় তাহলে ‘সংবিধান’, ‘আদালত’ ইত্যাদি কথারও কোন তাৎপর্য আর থাকে না। অস্ত্র ও বলপ্রয়োগ করেই যদি রাজনীতির সমাধান হয় তাহলে বিধিবিধান বিচারব্যবস্থা দিয়ে কী হবে? যদি অসাংবিধানিক ভাবে যে কেউই শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সংবিধান, আইন ও আদালত যদি পদদলিত হয় আর সেই দখলদারদের বৈধতা দেওয়াই যদি নির্বাচনের উদ্দেশ্য হয়, তাহলে কী ধরনের বাংলাদেশ আমরা তৈরি করতে চলেছি পাঠক নিজেই ভেবে দেখতে পারেন।
হাইকোর্ট ‘স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ অধ্যাদেশ ২০০৮’-কে সংবিধানপরিপন্থী ও অবৈধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে এই অধ্যাদেশের আওতায় গঠিত ‘সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন’ -এর কার্যক্রমকেও অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। যেখানে খোদ সরকারেরই কোন সাংবিধানিক বৈধতা নাই সেখানে উচ্চ আদালতের এই রায় খোদ অবৈধতার মধ্যে আরেক প্রস্থ অবৈধতার দারুণ এক পরাবাস্তব চিত্র। এই প্রকার দ্বিগুণ অবৈধতা আইনশাস্ত্রবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে এখন তো বটেই, ভবিষ্যতেও ভারি আমদের বিষয় হতে বাধ্য। কিন্তু বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের ভবিষ্যতের দিক থেকে যদি তাকাই তাহলে দখলদার ক্ষমতার স্বেচ্ছাচারিতা বিশেষত সংবিধান, আইন বা আদালতকে ক্রমাগত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী অবস্থানই বলতে হবে। দখলদার শক্তির অধ্যাদেশ ততটুকুই কার্যকর যতটুকু গায়ের জোর খাটে। এর বিপরীতে আদালত কতটুকু নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে তা আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি আপিলের পরে দেখব।
দ্বিতীয় উপাদান হচ্ছে খালেদা জিয়ার চট্টগ্রাম সভা। এ যাবৎকাল রাজনীতিতে নির্বাচনী হিসাব নিকাশ ছিল বিএনপির ঘোরতর বিপক্ষে। সঙ্গত কারণেই। দুর্নীতি ও অপরাপর অপশাসনের কারণে বিএনপি এতই নিন্দিত যে খালেদা জিয়া যতই নিজের ‘আপোষহীন’ ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন না কেন, তার পক্ষে নির্বাচনে বিএনপিকে জয়ী করে আনা অসম্ভব। তবে শেখ হাসিনার মতো তিনি চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়েননি, তারেক রহমানকে স্বাস্থ্যের কারণে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন, সর্বোপরি তার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত মামলা তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি আস্তে আস্তে যে গণআস্থার জায়গা তৈরি করছেন সেটা চট্টগ্রামের সভার মধ্য দিয়ে খানিকটা প্রমাণিত হয়েছে। জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে নির্বাচন করলে ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনে নিজেদের পছন্দের লোক পাস করিয়ে আনতে পারবে কি না সেখানে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন খুব সহজ হবে না চট্টগ্রাম সভাকে সেই দিক থেকেও বিবেচনা করা যায়।
বিএনপি যদি নির্বাচনে না যায় তো কী হবে?
এর দুটো দিক আছে। প্রস্তুতি নাই ও আমাদের লোকদের ছেড়ে না দিলে নির্বাচন করবো না এই যুক্তিতে যদি বিএনপি নির্বাচন না করে তাহলে বিএনপি বিপদে পড়বে। যারা বিএনপিকে অবশ্যই নির্বাচন করতে হবে বলে শোরগোল করছেন তারা এই গোড়ার কথাটা বলছেন না। জনগণের দিক থেকে অবশ্য এর ভিত্তিতে আঠারো তারিখ নির্বাচন না করার কোনো যুক্তি নাই। অন্য দিকে, সরকার এই শর্ত মেনে এবং নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে হলেও বিএনপিকে যদি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করায় তার পরেও বিএনপি সম্মানজনক সংখ্যা নিয়ে জিতে আসতে পারবে কি না সন্দেহ।
কারণ তখন এই সমঝোতা রাজনৈতিক নীতির প্রশ্ন হবে না, হবে একটি দুর্নীতিবাজ দলের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দখলদারদের সমঝোতা। আওয়ামী লীগ ও তার জোটের তুলনায় এখানে কোনই গুণগত পার্থক্য থাকবে না। বিএনপি তার সহযোগী দলগুলো আওয়ামী লীগ ও তার অনুসারীদের কাছ থেকে কোথায় আলাদা সেটা দেখাবার মধ্যেই বিএনপির ভবিষ্যৎ। নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা না করার মধ্যে নয়।
তবে বিএনপি বারবারই জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া ও সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের যে ডাক দিয়ে চলেছে, তার রাজনৈতিক আবেদন অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই। এক দিকে আওয়ামী লীগ ও জোট নির্বাচনে গিয়ে দখলদারদের বৈধতা দিচ্ছে অন্য দিকে বিএনপি জাতীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সাজানো নির্বাচনের বাইরে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে এই পরিস্থিতি খালেদা জিয়ার সকল প্রতিপক্ষের জন্যই বিপজ্জনক। এমনকি তার দলের অভ্যন্তরের সংস্কারবাদী ও ঘাপটি মেরে থাকা সুযোগসন্ধানীদের জন্যও।
সতর্কতার সঙ্গে বলি, অবস্থান তার জন্য ঝুঁকি বাড়াবে কিন্তু তিনি চলে আসবেন জনগণের কাতারে। তার পক্ষে এই ধরনের রাজনীতি ধারণ করা কতটুকু সম্ভব বলা মুশকিল।
আমাদের এখন অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য কোনো গত্যন্তর নাই।
২ অগ্রহায়ণ ১৪১৫/ ১৬ নভেম্বর ২০০৮ শ্যামলী, ঢাকা।
ইমেইলঃ [email protected]
(নয়া দিগন্ত: ১৭/১১/২০০৮)
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

