টুকরা কথাঃ যুদ্ধ, আদালত, নির্বাচন ইত্যাদি
ফরহাদ মজহার
বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি মোঃ আবু তারিক ২০০৮ সালের ১৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপুর্ণ রায় দিয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ ও সার্বভৌমত্বের হুমকির দিক থেকে আদালতে যে বিষয় নিয়ে কথা বলা হয়েছে তার গুরুত্ব রয়েছে। গণমাধ্যমে রায়টি যে গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল অধিকাংশ পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিও ততটা গুরুত্ব দেয়নি। তবে ১৮ নভেম্বরে আমার দেশ প্রথম পাতায় খবরটি ছেপেছেঃ ‘আফগান অভিযানে বাংলাদেশের ভুখন্ড ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুমতি ঝড়েবক বিজ্ঞাপন
দেয়া সংক্রান্ত মামলা খারিজ।’ রায়টি হাতে আসতে আরো সময় লাগবে। এর গুরুত্ব এতই যে, ততদিন অপেক্ষা করে থাকা যাবে না। খবরের কাগজ পড়ে যতটুকু বুঝেছি তার ভিত্তিতে যতটুকু সম্ভব ততটুকু নিয়ে আজ দু’-একটি কথা বলব।
আফগানিস্তানের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে পারবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বাংলাদেশ ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে আফগানিস্তান দখল করার যুদ্ধে আকাশ, ডাঙা ও জলভুমি ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। নিয়েছিলেন তত্ত্বাধায়ক সরকারের তৎকালীন প্রধান লতিফুর রহমান। অথচ আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ যুদ্ধ ঘোষণা করেনি।
আফগানিস্তানও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বা নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি ছিল না। যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মদত দেয়ার জন্য কোনো আঁতাত বা চুক্তিও বাংলাদেশ করেনি। কিন্তু মার্কিন ও তার মিত্রশক্তি যেন আফগানিস্তান দখল করে নিতে পারে, সেই কুকাজে বাংলাদেশ নিজের আকাশ, ডাঙা ও পানি ব্যবহার করতে দিয়েছে। বাংলাদেশকে যুুদ্ধ পরিচালনার উপায় বা ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুধু নির্বাচন করবে, কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না-এই তর্কটা আমরা এখন শুনলেও লতিফুর রহমানের সিদ্ধান্ত শুধু নীতিগতই ছিল না, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত ছিল।
সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে ও পরদেশ দখলের (কু)কাজে বাংলাদেশ আদৌ জড়িত হবে কিনা, সেটা একটা গুরুতর রাজনৈতিক প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত, যে দেশ বাংলাদেশের শত্রু নয়, তার বিরুদ্ধে অন্য দেশের পরিচালিত যুদ্ধে বাংলাদেশকে জড়ানোর আদৌ সাংবিধানিক বা আইনি অধিকার কোনো সরকারের আছে কিনা, সেটাও সমান গুরুতর প্রশ্ন। অথচ যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজ শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক, নীতিগত নয়, সেখানে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি? কিন্তু লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তান আক্রমণের জন্য বাংলাদেশের ভুখন্ড, আকাশ ও জলসীমা ব্যবহার করতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সিদ্ধান্ত নেয়া আর অনুমোদন দেয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। পত্রিকার খবর পড়লে মনে হয় লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘অনুমতি’ দিয়েছিল, কিন্তু ব্যাপারটা নিছকই সিদ্ধান্ত ছিল না। বিচারের রায় যেভাবে পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেষতক আদৌ অনুমোদন দিয়েছিল, নাকি শুধু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, সেটা বোঝার উপায় নেই।
ধান ভানতে শিবের গীত
ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি ষ্টার ১৮ তারিখে এই খবরের শিরোনাম করেছে Polls must be held within constitutional framework রায়ের মুল বিষয়বস্তুর কোনো ছিটেফোঁটা শিরোনামে নাই। শিরোনাম পড়লে মনে হয় আদালত বুঝি নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো একটা রায় দিচ্ছে। ধান ভানতে শিবের গীত। আদালত অবশ্য নির্বাচনের যে সময়সীমার কথা এর আগে বলেছিলেন, এই রায়ের মধ্যে সেই সময়সীমা মেনে চলার পরামর্শ আছে। ঠিক সময়ে নির্বাচন করতে পারেনি বলে আদালত নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে যে তারিখ এখন এই অযোগ্য কমিশন ঘোষণা করেছে, সেই তারিখের মধ্যেই করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সেটা আদালতের ‘নির্দেশ’ নয়। আর সাংবিধানিকতার দোহাই তুলে ১৮ তারিখেই নির্বাচন না হলে মহাবিপর্যয় ঘটে যাবে বলে যারা ফালতু হৈ-হল্লা করছেন, তারা যদি এতই সংবিধান বোঝেন তাহলে এই অসাংবিধানিক ও অদ্ভুত সরকার সম্পর্কে তাদের অবস্হানটা কী, সেটা জানার খুবই সাধ হয়। তামাশারও একটা সীমা থাকে! যেখানে সরকারই অবৈধ ও অসাংবিধানিক সেখানে এই সরকারের ঠিক করা তারিখে নির্বাচন না হলে সংবিধানের কোথায় কোন অক্ষরটায় গরমিল হয়? নির্বাচন তো দু’বছর আগে হওয়ার কথা ছিল। সেই সংবিধান লঙ্ঘনের দায়টা কে এখন নেবে?
পরাশক্তির যুদ্ধে বাংলাদেশের ভুখন্ড, আকাশ ও জলসীমা ব্যবহারের অনুমোদন সংক্রান্ত বিাচরের রায় দিতে গিয়ে আদালত কেন নির্বাচনের সময়সীমার মতো সম্পুর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়কে প্রাসঙ্গিক মনে করল, সেটা পুরো রায় পাঠ করলে আমরা বুঝব। তবে একটু অবাক হয়েছি, শিবের গীত না হয় আমরা গাইলে চলে। ধমক দিয়ে বলা যায় ধান ভানতে এসে ধান ভানা জরুরি। কিন্তু পত্রিকায় আদালতের রায় পড়ে বিভ্রান্ত হবে পাঠক। অবশ্যই। বুঝবে না, প্রসঙ্গছুট গানটা গাইছে কে? গণমাধ্যম নাকি আদালত?
ডেইলি ষ্টার এই রায়টির সারকথা বলেছে এভাবে Only parliament is the owner of sovereign power of the republic, because the members of parliament represent people directly, the court said while discharging a long-pending writ petition against Bangladesh's permission for the US-led coalition force to use facilities here for the Afghan warfare.। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান লতিফুর রহমান আফগানিস্তান যুদ্ধে বাংলাদেশের ভুখন্ড, আকাশ ও জলসীমা মার্কিন যুদ্ধবাজদের ব্যবহার করার সিদ্ধান্তকে ‘বৈধ’ গণ্য করছেন। তাই কি? প্রশ্ন জেগেছে, আসলেই কি আদালত এই রায় দিয়েছেন, নাকি এটা ডেইলি ষ্টারের ব্যাখ্যা।
পরাশক্তির আগ্রাসন ও যুদ্ধে বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে দেয়া তাহলে ‘বৈধ’?
যদি আদালত এই রায় দিয়ে থাকেন, এই রায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার, দায় ও দায়িত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু পুরা রায় পাঠ না করে আমরা ডেইলি ষ্টারের এই ব্যাখ্যা এখন গ্রহণ করছি না। এই ব্যাখ্যার বিপদ সম্পর্কে পাঠককে কয়েকটি কথা বলে রাখছি মাত্র।
এক. প্রথমত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি এই ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং এই ধরনের সিদ্ধান্ত যদি আদালত ‘বৈধ’ জ্ঞান করে তাহলে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারও বাংলাদেশকে যে কোনো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যুুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার ‘বৈধতা’ রাখে। ঠিক এই সময় এত বছর পর এই রায়টি দেয়ার যদি কোনো রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকে তাহলে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্হিতি-প্রসঙ্গ পাঠ করলেই রায়টির তাৎপর্য আমরা ধরতে পারব।
দুই. মিয়ানমারের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে জলসীমা নিয়ে যে যুদ্ধাবস্হা বিরাজ করছে, সেই যুদ্ধের তাগিদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের তরফ থেকেই আসছে। বঙ্গোপসাগরের জ্বালানির ওপর নিজের অধিকার কায়েম করা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার চেয়েও আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তির তরফে বাংলাদেশ যে ভুমিকা রাখছে, তা বাংলাদেশের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। তেল ও গ্যাস খুঁজতে গিয়ে মিয়ানমার বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা যেমন লঙ্ঘন করেছে, একইভাবে ভারতও লঙ্ঘন করে বসে আছে। কিন্তু ভারতের দখলদারি বাংলাদেশের জন্য কোনো ইস্যু নয়, বরং উল্টো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের তরফে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ সংঘর্ষে লিপ্ত হতে চাইছে মিয়ানমারের সঙ্গে। ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগরের অধিকাংশ ব্লকই মার্কিন কোম্পানি কনকোফিলিপসকে দিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিন. ধরা যাক, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের পুরো বিষয়টাই শান্তিপুর্ণভাবে কুটনৈতিক পথে সমাধান হলো। যদিও তার সম্ভাবনা মোটেও দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু আমরা বিষয়টিকে অন্যদিক থেকেও ভাবতে পারি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মার্কিন জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যদি কাজ করেন তাহলে ইরাক থেকে তাকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে। সৈন্য পাঠাতে হবে আফগানিস্তানে। যুদ্ধ কেন্দ্রীভুত ও সম্প্রসারিত করতে হবে আফগানিস্তানেই। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভুখন্ড, আকাশ ও জলসীমা ব্যবহরের প্রয়োজন দেখা দেবে। সেটা আফগানিস্তানের যুদ্ধের জন্য হতে পারে। এমনকি হতে পারে মিয়ানমারের বিরুদ্ধেও। মিয়ানমারে ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার একটা কর্তব্য আছে পরাশক্তিগুলোর। কিংবা চীনের বিরুদ্ধে আস্ফালন প্রদর্শনের প্রয়োজনেও দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন সেনাবাহিনী হাজির রাখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে এখন। নানা দিক থেকে যদি আমরা বিচার করি তাহলে বুঝব রায়টি আসলে ঠিক এই সময়েই সুসঙ্গত। বাংলাদেশের ভুখন্ড, আকাশ ও জলসীমা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় তার যুদ্ধ আরো সম্প্রসারিত করার জন্য যেন ব্যবহার করতে পারে, বর্তমান ‘তত্ত্বাবধায়ক’-এই সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রকে সেটা আশ্বস্ত করা খুবই জরুরি একটি কাজ ছিল। আমি নিশ্চিত, যুক্তরাষ্ট্র এতে আশ্বস্তই হয়েছে। পরাশক্তির এই গোলামির চিহ্নগুলো শাসকশ্রেণী কীভাবে ধারণ এবং মনিবকে আমোদে রাখার জন্য প্রদর্শন করে, তার ভাষা বোঝা খুবই দরকার।
জরুরি অবস্হা সম্পুর্ণ তুলে নেয়া এবং গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ৯১(ই)
যেহেতু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সবকিছু উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, বর্তমান পরিস্হিতি সম্পর্কে কিছু না বলে এই লেখা শেষ করা যাচ্ছে না।
নির্বাচন পেছানো হোক বা না হোক, অবিলম্বে জরুরি অবস্হা সম্পুর্ণ প্রত্যাহার ও গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ৯১(ই) ধারা বাতিল না করার অর্থ হচ্ছে বিএনপিকে নির্বাচন করতে না দিয়ে দখলদাররা তাদের বাছাই করা কিছু লোক নির্বাচিত করিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। বিএনপি জরুরি অবস্হার অধীনে মিউনিসিপ্যালিটি ও পৌরসভার নির্বাচন করেনি। এতে বিএনপি রাজনৈতিক দিক থেকে যে নীতিগত অবস্হানে দাঁড়িয়েছিল, তারও প্রতিফলন ঘটেছে জরুরি অবস্হা সম্পুর্ণ প্রত্যাহার করে নেয়ার দাবির মধ্যে। ক্ষমতাসীনরা সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে শুনছি। যদি তাই হয় নীতিগত প্রশ্নে চারদলীয় ঐক্যের অন্যান্য শরিকদের অবস্হা কী?
গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ যে মামলা দায়ের করেছিলেন, সেই মামলাটি আর চালানো হবে না বলে আদালতকে জানিয়ে মামলাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তার কৌঁসুলি বলেছেন, ‘গঠনতন্ত্র সংশোধন করায় নির্বাচন কমিশন জামায়াতে ইসলামীকে নিবন্ধন করেছে। যে পরিস্হিতি সৃষ্টি হয়েছিল সেই পরিস্হিতি এখন আর নাই।’ (দেখুনঃ সমকাল, ১৮ নভেম্বর, ২০০৮)
গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ীঃ ১. গঠনতন্ত্রে সংবিধান পরিপন্হী বিধান থাকতে পারবে না, ২. ধর্মভিত্তিক বৈষম্যের রাজনীতির বিষয় থাকতে পারবে না এবং ৩. দলের সব কমিটিতে ২০২০ সালের মধ্যে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ কোটা নিশ্চিত করার বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামী মামলা করেছিল এসবের বিরুদ্ধে।
লক্ষ্য করার বিষয়, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ৯১(ই) ধারার বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের হয়নি। এই ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন যে কোনো মুহুর্তে প্রার্থিতা বাতিল করতে পারে। এই ধারাটি নতুন করে সংযোজন করা হয়। বেগম খালেদা জিয়া সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার যে আলটিমেটাম দিয়েছেন, সেখানে তার চার দফা দাবির অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ দাবি এই অধ্যাদেশ বাতিল। প্রশ্ন হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীর কাছে এই অগণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ কতটা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপুর্ণ?
রাজনীতির তর্কটা নির্বাচন হওয়া বা না হওয়া হয়। নির্বাচনী দলগুলো নির্বাচন করবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রশ্ন ‘নির্বাচন’ নয়। দখলদাররা ‘বৈধতা’ চাইছে। কোন দল ‘বৈধতা’ দেয়ার রাজনীতি করছে আর কে করছে না, সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। এটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, কিন্তু জোট হিসেবে এই নীতিগত অবস্হান কতটা শক্তিশালী আমরা এখনো জানি না।
তবে বিএনপিকে যদি নির্বাচন করতে দেয়া না হয় এবং জবরদস্তি যদি নির্বাচন হয়ে যায়, তাহলে নির্বাচনী জোয়ারের সাময়িক ফেনা মোটেও টিকবে না। টেকা অসম্ভব। তবে বিএনপির জন্য এই পথ ফুলবিছানো হবে না। তাকে রাজনৈতিকভাবে লড়াই-সংগ্রাম করেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। জনগণের দিক থেকে সুবিধা হচ্ছে, এই বিএনপির অভ্যন্তরীণ দলীয় সংস্কারটা ঘটবে রাজপথে। আন্দোলনে। সেক্ষেত্রে লুটেরা ও রাজনীতির দুবৃত্তদের ভুমিকা থাকবে কম। জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বিএনপির রাজনীতির মধ্যে বেড়ে ওঠা নেতাকর্মীরা জনগণের কাছে যাবে। হয়তো বাধ্য হয়েই। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে সার্বভৌমত্বের পক্ষের শক্তি ও জাতীয় দুশমনদের মধ্যে ভেদরেখা স্পষ্ট হওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুততর হবে। আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়াকে পরাস্ত করা এখন দুঃসাধ্য, কিন্তু বর্তমান পরিস্হিতিতে ‘নির্বাচন’?
ফলাফল যদি আগে আগেই পরাশক্তির হাতে নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাহলে একে কি নির্বাচন বলে? যাদের জিতিয়ে আনা হবে, তারাই জিতবে। এই ‘নির্বাচন’ নির্বাচন নয়; যাদের বাছাই করা হয়েছে তারাই জিতেছে, সেই মনোহর প্রদর্শনী। দেখা যাক, এই প্রদর্শনীর নাটকটা কীভাবে সাজানো হয়। দেখে আনন্দ হবে আমাদের।
৫ অগ্রহায়ণ, ১৪১৫, ১৯ নভেম্বর ২০০৮, শ্যামলী, ঢাকা। (সূত্র, আমার দেশ, ২০/১১/২০০৮)
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


