ভালোমন্দ বিচার করার মানুষ কই?
আল মাহমুদ
নিজের অক্ষমতার কথা বারবার বললেও এই কলামটি শেষ পর্যন্ত আমাকে লিখে যেতে হচ্ছে। আমি যে বেঁচে আছি সেটা আমার প্রভুর অসীম অনুগ্রহ। বেঁচে থাকা মানে হলো লিখতে পারা। নিজের জীবনের কথা আমি উল্লেখ করতে না পারলেও সেটা একট-আধটু বেরিয়ে পড়ে। এটাই স্বাভাবিক। এত যে দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে এলাম, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, লেখাটাই হলো আমার বাঁচার প্রমাণ। যখনই লিখতে বসি, আমার বিষয় স্থির করে নিতে পারি না। তবু অস্থিরতারও একটা নিয়ম আছে। সেই নিয়মের তাগাদায় কিছু কথা লিখে ফেলতে পারি বটে। আবার এটাও জানি, আমার এই কলামটি পড়ার জন্য অনেকেই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন। অবশ্য আমার আগ্রহ ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। সবচেয়ে অসুবিধা হচ্ছে, আমি আগের মতো কাউকে প্রতিশ্রুতি দিলে তা রক্ষা করতে পারি না। ফলে অনেকেই মনঃক্ষুণ্ন হন। কিন্তু আমার সাধ্যে না কুলালে আমি আর কী করতে পারি? এমন নয় যে, লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছি। এখনো সুযোগ পেলে এবং সামর্থে কুলালে আমি লিখতেই চাই। অথচ এখন লেখার কথা শুনলে আমার বুক দুর দুর করতে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাস আসার আগে আমার দু-একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু এবার সব কিছু এলোমেলো হয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে পড়ে আছে। হয়তো এবারো বই হবে। কী বই হবে, কেমন বই হবে, তা আগাম বলতে পারছি না। তবে একান্তভাবে একটি-দু’টি বড় কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি করার চেষ্টা ছাড়ব না। আসলে আমার উদ্দীপনা বর্তমানে দীর্ঘ কবিতামুখী। মনে হয় দীর্ঘতর কবিতায় আমার কিছু বক্তব্য আছে, যা অন্য কারো সাথে মেলে না।
আমি ঘর থেকে বেরোতে না চাইলেও বাইরে যাওয়ার টান আছে আমার দিকে। কিন্তু বেরোলেই আমার জন্য বিপদে ঘটে যেতে পারে। আজকাল সেটা বুঝে সমঝে চলতে হচ্ছে। বয়স যতই বাড়ছে, ততই অক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর বার্ধক্যের একটা লক্ষণ হলো, স্মৃতিকে হাতড়ে বেড়ানো। শুধু কৈশোরের স্মৃতি কেন আমাকে এমনভাবে ঘিরে ধরে, তা জানি না। অনেক স্থানের কথাই মনে আসে। অনেক পাত্রপাত্রীর মুখ মনে পড়ে। সব সম্পর্কই তো এখন শীতল হয়ে গেছে। অতি আপনজনও নিজের স্বার্থচিন্তায় আমার স্বার্থকে অস্বীকার করার প্রবণতায় ভুগছে। নিজেও জানি, আমি আর ফিরব না। অথচ যে মাটি আমার থাকার কথা, সেটা আর আমার থাকছে না। ভাবি, কবরের মাটিটা পেলেই এখন আমি খুশি। সেটা কোথায় নির্ধারিত আছে, এটা আমার প্রভুই জানেন। আমার মায়ের কথা খুব মনে পড়ে।
আমার মা ছিলেন আমাদের শহরের সবচেয়ে ধনী ও ব্যবসায়ী লোকের মেয়ে, সারাজীবন বিলাসিতার মধ্যেই কাটিয়েছিলেন। পরে অবশ্য দুঃখ-কষ্টের মধ্যেই তার জীবনের অবসান ঘটেছিল। তবু বলব, তিনি ভালোভাবে জীবন কাটিয়ে গেছেন। আমি অনেক ছোটকালে আমার মাকে ত্যাগ করে আমার লেখক জীবনের সার্থকতা খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলাম। আমার জীবন ভালোভাবে কাটাতে পারিনি। তবে কিছু বইপত্র আছে যা আমি অত্যধিক শ্রম স্বীকার করে রচনা করেছিলাম। আশা করা যায়, অনেক উত্থান-পতন, ভাঙা-গড়া চলতে থাকবে। এর মধ্যেও থাকবে আমার কিছু কবিতা, কিছু গল্প। কিংবা অন্যরকম রচনা। এভাবেই তো আমার মতো কবিরা সমাজের অভ্যন্তরে নানা উথাল-পাতালের মধ্যে বেঁচে থাকেন।
কেবল মনে পড়ে, অনেক রাতে আমি ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে গেলে বাড়ির সিঁড়িতে ওঠার আগেই আমার মাকে চিৎকার করে ডাকতাম, মা ঘুম ভেঙে চমকে উঠে আমার ডাকের জবাব দিতেন। দরজা খুলে দিয়ে প্রথমে আমাকে খাবার দিতেন। আমার খিদে না থাকলেও মায়ের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য খেতে বসে যেতাম। মা লাকড়ির চুলা জ্বালিয়ে খাবার গরম করে আমাকে বেড়ে খাওয়াতেন। আমার কুশল জানতে চাইতেন। সেসব দিন আর ফিরবে না। এখন আমার মা-ও তো নেই। আর সে ঘরবাড়িও নেই, আমিও তো এখন আর ফেরার উপায় জানি না। কোনো কিছুই ফেরে না। তবে কিছু মুখ, চেহারা, স্মৃতি একজন কবির মধ্যে কাজ করতে থাকে। এই স্মৃতি আমার মধ্যেও অত্যন্ত সজাগ হয়ে রক্তের সাথে মিশে আছে। তবে শুধু স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা হলো। দুঃখকে আলিঙ্গন করে বেঁচে থাকা।
আমি আগেই বলতে চেয়েছি, দুঃখকষ্টেই দিন যাপন করছি। এর মধ্যে কিছু লেখাও তৈরি করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। হয়তো ভালোই কিছু হবে কিংবা কিছুই হবে না। লেখকের বৃত্তি কেবল লিখে যাওয়াই হতে পারে না। লেখকের বিষয়-ভাবনা অবশ্যই তাকে তাড়না করে ফেরে। আমাকেও স্মৃতির তাড়না নানা জায়গায় নিয়ে ঠেলে যেমন তুলছে, তেমনি আবার নামিয়ে আনছে। আমি এই উত্থান-পতনের মধ্যে নিজের অস্তিত্বের উপস্থিতি জানান দিয়ে চলেছি।
অনেক বিষয় আছে যা ইচ্ছা থাকলেও লিখতে পারিনি। লিখলে অন্যের ক্ষতি হবে, এই ভাবনা আমাকে অনেক মজার ঘটনা লিখতে বারণ করে থাকে। অথচ আমার মৃত্যুর সাথে সাথে সব ঘটনাই শেষ হয়ে যাবে, এসব বলার আর কোনো মানুষ থাকবে না। তবু আমি কি সব কথা বলতে পারি? না, বলা উচিত নয়। এই জগতে শুধু ঠকেছি, প্রতারিত হয়েছি এটা এক দিকে যেমন সত্য, তেমনি অন্য দিকে যা পেয়েছি, তাও অপ্রত্যাশিত। অন্য কেউ পায়নি। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, আমার কবিজীবন কি সার্থক? এর জবাব তো জানি না। শুধু একটা কথা বলতে পারি, একটি ভালো লেখার জন্য, একটি কবিতার জন্য অনেক সময় অনেক মহার্ঘ বস্তু, সম্পদ, সুখ, আরাম হারাম করে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম। বেঁচে আছিও দীর্ঘদিন, কিন্তু এই বাঁচার সার্থকতা কী, তা আমার যেমন জানা নেই, তেমনি আমার পরিবেশের সব অংশীদারদেরও জানা আছে কি? আর কিছু দিন পরে আয়ু শেষ হলে আমি যেমন থাকব না, তেমনি আমার স্মৃতিও থাকবে না। থাকবে শুধু কয়েকখানা বই, আমার দীর্ঘশ্বাসের মতো। কারো ভালো লাগলে বইগুলোর পাতা উল্টে দেখবে, ইচ্ছা না হলে দেখবে না। এই তো লেখকের জীবন, কবির জীবন। বুকের মধ্যে বহন করে নিয়ে চলেছি অনেক উত্থান-পতনের ইতিহাস। এ দেশের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে একদা আমি ছিলাম। এখন ভাবতেও আমার ভয় লাগে, আমি ছিলাম কী করে? কবিতা ছাড়া তো আমার আর কোনো বিষয়ই ছিল না। কেবল কবিতা লিখে এ দেশে সম্মান ও ভালোবাসা পাওয়ার চেষ্টা করেছি। বলা যেতে পারে, আমার চেষ্টাটা একবারে বিফল হয়নি। এ দেশে কিছু মানুষ আমাকে ভালোবেসে যেমন বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, তেমনি কিছু মানুষ আছেন যারা আমাকে না বুঝেই শত্রুতা পোষণ করেছেন। অবশ্যই কখনো ঘৃণা বা বিদ্বেষের পথে পা বাড়াইনি, আমার কাজ তো লেখা এবং এ কাজের কোনো গোপনীয়তা নেই, সবই প্রকাশ্য। অনেক কিছু লেখালেখির মাধ্যমে করতে পেরেছি। আবার অনেক কিছুই পারিনি। যা পারিনি তার জন্য লজ্জাবোধ করেছি। আমি সহজ মানুষ; স্বাভাবিকতার মধ্যে জীবন কাটাতে চেয়েছিলাম। আমার চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে। আজকাল ঠিকমতো দেখতেও পাই না। কিন্তু অন্ধ হলেও পৃথিবী তো আর থেমে থাকে না। আমার জগৎও থেমে নেই। লিখেই চলেছি। যা কিছু লিখেছি, সব কিছুই আমার জীবন থেকে অর্জন করেছিলাম। তবে এমন কথা আমি লিখতে চাইনি যার প্রভাবে কারো কোনো অনিষ্ট হয়। মানুষের দুঃখ-বেদনার কথাই আমার রচনায় ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। ‘কবির সাধ্য’ বলে একটা কথা আছে। আমার সাধ্যের ভেতরে সম্ভবপর অনেক কিছুই উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। আবার অনেক বিষয় আমি জেনেও লিখিনি। কারণ তাতে অন্যের অনিষ্ট হবে। আমার জীবন বহুমাত্রিক বলেই নিজের ধারণা জন্মেছে। ফলে সতর্কতার সাথে অন্যের সাথে সম্পর্কের কথা ব্যক্ত করতে চেয়েছি। নিজে তো জানি, আমি একজন কবি ছাড়া আর কিছু নই। আর কিছু হতেও চাইনি
আমাকে যারা ভালোবেসেছেন, তাদের সবার দাবি পূরণ করতে পারিনি। এর জন্য আমার লজ্জাবোধ থাকলেও তা লুকিয়ে রেখেছি। এমন কাজ করিনি যাতে কোনো নারী বিব্রত বোধ করে, কোনো পুরুষ আমাকে ধিক্কার দেয়।
আমি প্রকৃতিপ্রেমিক ছিলাম। প্রকৃতির ভেতরে চলাফেরা করতে করতে এক দিন এর মধ্যেও হিংস্রতা দেখতে পেয়ে আঁতকে উঠেছি। সবুজের মধ্যে নিবিড় সহজতার মধ্যে সন্দেহ ও সর্বনাশ দেখেছি। দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। আমি মুখ বাঁকা করলেও হিংস্রতার নিয়ম বন্ধ হয়ে যায়নি। এভাবেই প্রকৃতি নারী- নিসর্গকে অধ্যয়ন করার চেষ্টা করেছি। মানুষের চোখ নষ্ট হয়ে গেলে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকে। কিন্তু আমি সেটা করিনি। চোখের বদলে অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছি। ঘ্রাণেন্দ্রিয়, শ্রবণেন্দ্রিয় এবং স্পর্শের ইন্দ্রিয়কে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছি। চোখের বিকল্প হিসেবে ওইসব ইন্দ্রিয় আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছে। আমি এভাবেই সচল, সচেতন এবং ছন্দে-গন্ধে ভরা এক পৃথিবীর সন্ধান পেয়েছি। তা কাজেও লাগিয়েছি। আমার কাজের জন্য কোনো পুরস্কার নেই, তিরস্কারও নেই। আফসোস করি না, অনুতাপ করি না। এখন আমার একমাত্র চিন্তা হলো, কোনোরকমে আমার আয়ুষ্কাল পূর্ণ করে তোলা। একই সাথে এটাও সত্য, যতক্ষণ আমার চৈতন্য বিপর্যস্ত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমার লেখার শক্তি বজায় রাখার চেষ্টা করা, কারণ এর চেয়ে নির্দোষ কোনো কাজ খুঁজে পাচ্ছি না।
আমার লেখার একটা গতিবেগ আছে। বিষয় থাকলে তা বিস্তার করা যায়। বিষয় না থাকলেই বিপর্যয় এসে উপস্থিত হয়। এখন কথা হলো, আর কী কী বিষয় আমার জন্য আবিষ্কার করতে পারব? অনেকে বলেন, আমার গল্প নাকি তাদের কাছে খুবই ভালো লাগে, আমি গল্প লিখি না কেন? প্রকৃতপক্ষে এসব কথার কোনো জবাব হয় না। কারণ আমার গল্পগুলো আমার জীবনেরই কোনো না কোনো উপাদান দিয়ে গঠিত। আমি খুব বেশি বানিয়ে তুলিনি। কবি হওয়া সত্ত্বেও আমার বাস্তব বুদ্ধি এবং সৃজনক্রিয়ার একটা মেলবন্ধন ঘটাতে পেরেছিলাম। ফলে গল্পগুলো পাঠকের মর্মে গাঁথা হয়ে গেছে। তবে আমারও লোভ হয় আরো কিছু গল্প লিখে যাওয়ার প্রয়াস চালিয়ে যেতে। আরো একটা ব্যাপার উল্লেখ করতে চাই। সেটা হলো আমাকে খুব সক্রিয় লেখক হিসেবে ধারণা করা হলেও আমারও ক্লান্তি আছে; আলসেমি আছে। ফলে সৃজনের উত্তেজনা মাঝে মাঝে মুলতবি রেখে বিছানায় গড়াগড়ি যেতে বেশি পছন্দ করি।
লেখালেখিটা হলো আসলে পরিশ্রমের কাজ। আর আমি নিজে আরামপ্রিয় অলস মানুষ। যেটুকু লেখালেখি আমার জন্য নির্ধারিত বলে মনে করি, সেটুকুই আমার কাজ। এর বেশি আমার কাছ থেকে জোর করে আদায় করার চেষ্টা ঠিক নয়। অন্য দিকে এটাও মানি, চাপ সৃষ্টি করলে আমিও কাজ করতে বাধ্য হই। অনেক সময় তা ভালো কাজের পর্যায়ভুক্ত হয়েছে। নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় সব সময় লেখক চলতে পারেন না। অনেক সময় অন্যের চাপের মুখে লেখা নিয়ে বসতে হয়। এতেও ভালো ফল হয়। কখন যে কী ঘটে যাবে তা লেখকরা আগাম বলতে পারেন না। এর মধ্যেই আমার জীবন বয়ে গেছে। কখনো স্বেচ্ছায় স্বাধীনভাবে লিখেছি, কখনো অন্যের সাধাসাধিতে লিখেছি। কথা হলো, আমি তো লিখেছি, এখন ভালো-মন্দের বিচার করার মানুষ কই? (সূত্র, নয়া দিগন্ত, ২৭/১১/২০০৮)
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

