নির্বাচন কমিশন এখন কী জবাব দেবে?
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
গত ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যা ঘটেছিল অনেকটা নিভৃতে, সুপরিকল্পিত আয়োজনে। ২২ জানুয়ারির উপজেলা নির্বাচনে তা ঘটল একেবারে প্রকাশ্যে। ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জিতিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ২২ জানুয়ারির উপজেলা নির্বাচনে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে আওয়ামী লীগ। ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। কোথাও কোথাও ছিল একেবারে ফাঁকা। ভোট কেন্দ্র দখল করে বসেছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তারা বোমা মেরেছে, ব্যালট ও ব্যালট বাক্স ছিনতাই করেছে। প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালিয়েছে, প্রতিপক্ষের এজেন্টদের মেরে বের করে দিয়েছে। প্রিজাইডিং অফিসারদের মারধর করেছে। শাসক দলের মন্ত্রী-এমপিরা কেন্দ্রে বসে থেকে প্রভাব বিস্তার করেছেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরেছে। হামলা, সংঘর্ষ, সহিংসতা ও পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন কয়েক শ’ লোক। ছয়টি উপজেলা ও শতাধিক ভোট কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। ৪৭৫টি উপজেলার ৩০০টিতেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। এ আসন আরো বাড়তে পারে।
নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য পুলিশ-বিডিআর-সেনাবাহিনী-আনসার সবই মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু তার কোনো কিছুতেই কোনো ফল হয়নি। ১৯৭৩ সালের কায়দায় সবই ছিনিয়ে নিয়ে গেছে আওয়ামী লীগ। উপজেলা নির্বাচনে জবরদস্তি করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কোনো রাখঢাক করেনি। প্রকাশ্যেই ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার ছিনতাই করেছে। প্রকাশ্যেই তাতে সিল মেরেছে। প্রকাশ্যেই তা ব্যালট বাক্সে ঢুকিয়েছে। আবার কোথাও কোথাও সরকারি কর্মকর্তা পোলিং অফিসাররাই আওয়ামী প্রার্থীর পক্ষে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরেছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮৭ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে তাকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশন সদস্যরা অনেক বগল বাজিয়েছেন। সেটাকে যৌক্তিক প্রমাণের জন্য তারা নানা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন এবং তখন দাবি করেছিলেন যে, উপজেলা নির্বাচনে ১০০ ভাগ ভোট পড়বে। আমরা তখনই প্রমাদ গুনেছিলাম। কল্পনা করে শিহরিত হয়েছিলাম যে, উপজেলা নির্বাচনে তাহলে কী মাত্রায় কারচুপির আশ্রয় নিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। কিন্তু নির্বাচনে কারচুপি, জালিয়াতি, ব্যালট ডাকাতি এ পর্যায়ে হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন ১০০ ভাগ ভোটের হিসাব মেলাতে পারেনি। উপজেলা নির্বাচনে ৫০-৬০ ভাগ ভোটারও ভোট দিতে আসেননি।
কেন তারা এলেন না? কারণ তারা দেখেছেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা যাদের ভোট দিয়েছিলেন, তারা কেউ বিজয়ী হয়ে আসতে পারেননি। বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে অন্য কাউকে। নির্বাচনের অবধারিত ফলাফল আগে থেকেই আন্দাজ করে তারা সিদ্ধান্তে উপনীত হন, ভোট দিয়ে কোনো লাভ নেই। উপরন্তু প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ কর্মীরা যে হাঙ্গামা-হামলার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল তাতে ভোট তো দূরের কথা জীবনের নিরাপত্তাই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভোট কম পড়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘নির্বাচনে দেশের কিছু কিছু জায়গায়, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা, ব্যালট পেপার ছিনতাই, ভোটদানে বাধা ও অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। যে পরিমাণ ভোটারের উপস্থিতি আশা করেছিলাম তেমনটা হয়নি। আমরা ভোটারদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিলাম। তার পরও কেন ভোটাররা ভোট দিতে আসেননি তা অনুসান করা হবে। তারা কি উপজেলা নির্বাচন সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে নাকি কেউ তাদের ভোট দিতে আসতে বাধা দিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কিছু পরিবর্তন আসছে। আমরা এটাই আশা করেছিলাম। মন্ত্রী-এমপিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করবে এমনটা আশা করিনি। একটি উপজেলায় একজন মন্ত্রী ভোট কেন্দ্রে গিয়ে বসে ছিলেন। মন্ত্রীরা যাতে নির্বাচনী এলাকায় না যান, সে জন্য আমরা সরকারকে চিঠিও দিলাম। অথচ মন্ত্রী গিয়ে ভোট কেন্দ্রে বসে থেকে অসুবিধার সৃষ্টি করেছেন। আর এক উপজেলায় একজন এমপি নির্বাচন কর্মকর্তাদের মারধরও করেছেন। তারা সরকারি পদে থেকে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও প্রভাব বিস্তার করেছেন।’ নির্বাচনে কম ভোট পড়ার কথা স্বীকার করে সিইসি বলেন, ‘আগের দু’টি উপজেলা নির্বাচনেও ভোটের হার কম ছিল।’
গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে আমি আদৌ সন্তুষ্ট নই। আমাদের প্রত্যাশা ছিল আরো অনেক বেশি।’ তিনি বলেন, ‘যেসব বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া গেছে তার সবই করেছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকরা। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় করতে না পারায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অপর নির্বাচন কমিশনার মোঃ ছহুল হুসেইন সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার দারুণ এক তত্ত্ব শোনালেন। তিনি বললেন, আগের দু’টি উপজেলা নির্বাচনে যেহেতু ভোট কম পড়েছিল, তাই এবারের নির্বাচনে ভোট কম পড়াটা যৌক্তিক। তা-ই যদি হয়, তাহলে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮৭ ভাগ ভোট পড়ার যৌক্তিকতা কোথায়? ৮০টিরও বেশি আসনে ৯০-৯৫ ভাগ ভোট পড়ার যৌক্তিকতা কোথায়? আর ১০০-১০৫ শতাংশ ভোট পড়ার যৌক্তিকতা বিষয়ে না হয় প্রশ্ন না-ই তুললাম। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যখন ব্যালট পেপার রাস্তাঘাটে কুড়িয়ে পাওয়া যেতে থাকল তখনো ভোটের কারচুপি জালিয়াতি ধামাচাপা দেয়ার জন্য এবং যারা ব্যালট কুড়িয়ে পেল নির্বাচন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে মামলা দায়ের করতে শুরু করল। কমিশন যদি তখন দোষীদের ধরে শাস্তির ব্যবস্থা করত তাহলে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। নির্বাচন কমিশনের লাই পেয়ে উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা এতটা বেপরোয়া হয়ে ওঠার সাহস পেল। শুধু কর্মী-সমর্থকরা নয়, তাদের সাথে যোগ দিলো আওয়ামী সমর্থক নির্বাচনী কর্মকর্তারাও। আড়াইহাজারের মারুজাদী স্কুল কেন্দ্রে নির্বাচনী কর্মকর্তারা আওয়ামী লীগের পক্ষে ব্যালট পেপারে সিল মারছিল। বেলা দেড়টায় সেখানে সাংবাদিকরা উপস্থিত হলে ব্যালট বাক্স ও সিল মারা ব্যালট বই রেখেই সেখানকার নির্বাচনী কর্মকর্তারা সটকে পড়েন। এমনি এক ন্যক্কারজনক পরিস্থিতিতে উপজেলা নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। একেবারে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন।
এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া চিরাচরিত। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ দাবি করেছেন ৯৯ ভাগ এলাকায় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় কাজ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নির্বাচনে বিশেষ কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা আমরা পাইনি। তবে কোথাও যদি আইন ভঙ্গ হয়ে থাকে তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আওয়ামী লীগের মুখপাত্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, নির্বাচনে সঙ্ঘাত পরিহারের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তিনি উপজেলা নির্বাচনে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় তার দলের লোকদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। নির্দলীয় নির্বাচনে দলীয় হাঙ্গামার প্রশ্নই ওঠে না। সারাদেশে বড় ধরনের সহিংসতার কোনো খবর আমরা পাইনি। এই ছিল মোটামুটি উপজেলা নির্বাচনের চিত্র। সৈয়দ আশরাফ একবার বলেছেন, উন্নত বিশ্বে জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে স্থানীয় নির্বাচনেই ভোট বেশি পড়ে। আবার বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে ৩০-৩৫ শতাংশ ভোটারই ভোট দিয়ে থাকেন।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র পনেরো দিনের মাথায় আওয়ামী লীগ প্রশাসনকে দলীয়করণ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয়করণ, ছাত্রাবাসগুলো থেকে প্রতিপক্ষের ছাত্রদের বিতাড়ন প্রভৃতি যে ধারার সূচনা করেছে, তা থেকে বাদ পড়েনি উপজেলাগুলোও। ধারণা করা হয়েছিল, জাতীয় সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়নের কাজে নিয়োজিত থাকবেন। আর উপজেলা চেয়ারম্যানরা এলাকার উন্নয়ন কাজে মনোনিবেশ করবেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অধ্যাদেশ জারি করে এ ধরনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ইতোমধ্যে জানান দিয়েছেন, উপজেলার কর্মকাণ্ড তত্ত্বাবধান করবেন স্থানীয় এমপিরা। কারণ তারাও ওই এলাকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। সে ক্ষেত্রে উপজেলা পরিষদগুলোর কাজ সীমিতই থাকবে।
২২ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাচন আরো একবার প্রমাণ করল, এই নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠুভাবে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানেরই ক্ষমতা রাখে না। সে যোগ্যতাও তাদের নেই। সে সদিচ্ছারও তারা প্রমাণ দিতে পারেনি। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের, হাঙ্গামা রোধে, জালিয়াতি-কারচুপি ব েতারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। বরং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেভাবে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করেছিল, একইভাবে উপজেলা নির্বাচনেও তাদের বিজয় নিশ্চিত করেছে। এই নির্বাচন কমিশনের তবু কি গদি আঁকড়ে বসে থাকতে হবে?
লেখকঃ সাংবাদিক, চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড মিডিয়া
ই-মেইলঃ [email protected]
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


