somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দূঃসময়ের সাক্ষী : শাহীন সিদ্দিকী

১৬ ই মার্চ, ২০০৯ দুপুর ১:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দূঃসময়ের সাক্ষী
শাহীন সিদ্দিকী


ফরেন পলিসি নামে একটি আমেরিকান থিংক ট্যাংক কোনো দেশের বিদ্যমান রাজনীতি, মিলিটারী, অর্থনীতি এবং সামাজিক উপাদানসমূহের প্রধাণতঃ বারোটি সূচক নিরীক্ষা করে ব্যর্থ বা অকার্যকর রাষ্ট্র’র সার্টিফিকেট ইস্যু করে থাকে। এর মধ্যে সংবিধান অবজ্ঞা, নিরাপত্তাহীনতা, প্রতিরক্ষাহীনতা, বাজে অর্থনীতি, অসম উন্নয়নের পাশাপাশি পাবলিক সার্ভিস, হিউম্যান রাইটস্, হিউম্যান ফ্লাইট, ভূ-রাজনৈতিক চাপ এবং বহির্দেশীয় হস্তক্ষেপ অন্যতম। প্রতিটি পয়েন্টে দশের মধ্যে গড়ে সাড়ে নয় এবং সর্বমোট ১১৪.২ পয়েন্ট পেয়ে শীর্ষস্থান অধিকার করায় ব্যর্থ রাষ্ট্রর খেতাবটি সোমালিয়ার কপালে জুটেছে। সূদানের ঝুলিতে ১১৩, জিম্বাবুয়ের ১১২.৫, শাদের ১১০.৯ এবং ইরাকের ভাগে এসে পড়েছে ১১০.৬ পয়েন্ট করে।

এ ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই যে, সোমালিয়া বর্তমানে এমনই এক দেশ যেখানে কোন শান্তি নেই, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তো দূরের কথা দু’দশক ধরে কার্যকর কোন সরকারও নেই। সমস্ত জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর থাকায় দেশটির নেগেটিভ ইমেজ বিশ্বে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত লাভ করতে সহায়তা করছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কি কারণে সোমালিয়া এই পর্যায়ে এসে পৌঁছলো? কারাইবা এর জন্য দায়ী? এত্থেকে বাংলাদেশের এই মূহুর্তে কি কিছু শেখার রয়েছে? সোমালিয়ানরাও তো আমাদের মত হোমোজেনিয়াস জাতি! লোকগুলো সবাই দেখতে মোটামুটি একই রকম। একই ভাষা, বর্ণ ও শতকরা একশো ভাগ অভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে কোন্ বিরোধের ফলে বর্তমানে তাদের এই লজ্জাকর পরিণতি? আমাদের মত সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রেমিক এবং বিজয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এককালের গর্বিত দেশ সোমালিয়া কেনইবা গৃহযুদ্ধ, অরাজকতা ও লুটপাটের রাজত্বে আজ পরিনত হয়ে গেলো?

সপ্ত থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সোনালী অধ্যায় ছিল সোমালিয়ায়। নতুন নতুন অনেক শহর তৈরী ও অবিশ্বাস্য রকমের উন্নয়নের স্মৃতি পুরোনো দিনের ঢাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নবম শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউরোপের বড় বড় শহরের একই আদলে মোগাদিসু শহর। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা চলে পনেরো শতক পর্যন্ত। সুলতান আহমদ ইবনে ইবরাহীম আল গাজীর নেতৃত্বে ১৫৪৩ সালে সোমালিয়ানরা ওইনা দাগা’র যুদ্ধে ইথিওপিয়ান-পর্তুগীজ যৌথবাহিনীকে পর্যদস্তু করে ইথিওপিয়ার তিন-চতুর্থাংশ দখল করে নেয়। এরপর ফ্রেঞ্চ, ব্রিটিশ, ইতালী অনেকেই এল। সোমালিয়ান বীর প্রবাদ পুরুষ মুহম্মদ আব্দুল্লাহ হাসান হজ্জ্ব থেকে ফিরে এসে দেখেন তার দেশ ইতোমধ্যে ব্রিটিশ কলোনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এমনকি ব্রিটিশ সৈনিকেরা আব্দুল্লাহকে নিজ দেশে ঢুকতে পর্যন্ত বাধা দিয়ে বিনিময়ে অর্থ দাবী করে।অগ্নিমূর্তি ধারণ করে হাজী আব্দুল্লাহ হাসান চড় মেরে বসেন দখলকারী এক ব্রিটিশ সেনাকে। অল্প সময়ের মধ্যে অজেয় প্রতিরোধ তিনি গড়ে তোলেন। ব্রিটিশরা তাই তাঁর নাম দেন ‘ম্যাড মোল্লা’। যাহোক, লম্বা ইতিহাসের দিকে আমরা আজ যেতে চাইনা। তবে ১৯৩৬ সালের মোগাদিসু ডাউন-টাউনের ছবি দেখলে সহজেই লালবাগের কেল্লা বা সোনারগাঁর পূরান চেহারা যে কারো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করবে।

আফ্রিকার শিং বা হর্ণ অব আফ্রিকা বলা হয় সোমালিয়াকে। আরব ও লোহিত সাগরের কোল ঘেঁষে ইরিত্রিয়া, জিবুতি, ইথিওপিয়া এবং সোমালিয়া মিলে মানচিত্রে গন্ডারের শিঙ-র আকৃতি দেখায় বলেই জায়গাটির এরূপ নামকরণ। লোহিত সাগরের মুখে অবস্থান বলে সোমালিয়া মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সাথে ব্যবসা-বানিজ্যে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ভারত সাগরও তাদের সাথে এসে মিলেছে। অন্যভাবে বলা যায়, গুরুত্বপূর্ণ এই ভৌগোলিক স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানই সোমালিয়ার উপর সাম্রাজ্যবাদীদের লোলুপ দৃষ্টির মূল কারণ। বর্তমানে ঠিক বংগোপসাগর ও চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে যেমনটি চলছে। প্রায় ছয় লাখ আটত্রিশ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সোমালিয়ার আনুমানিক মোট ১৪ মিলিয়ন জনসংখ্যার অধিকাংশ মানুষই বাস করে উর্বর ভূমি বিশেষতঃ জুবা ও শেবেল নদীর উপকূলবর্তী অঞ্চলে। মাত্র পনেরো থেকে বিশ ভাগ মানুষ বাস করে শহরাঞ্চলে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় (১৯৬০) সোমালিয়া আফ্রিকার ‘গ্রামীণ গণতন্ত্র’র মডেল বলে পাশ্চাত্যে খ্যাতি লাভ করেছিল। ১৯৬৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্যে আর্মি কমান্ডার সাইদ বারী (সোমালিয়ানরা তাকে সিয়াদ বারী বলে ডাকেন) তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্দুর রশিদ আলীকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেন।তিনি সোমালিয়ান ঐতিহ্যের সাথে সংগতি রেখে গড়ে তোলেন চীনের আদলে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। নিজেকে ঘোষনা করেন জ্যালে সাইদ বা কমরেড সাইদ। রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করন করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। সোমালিয়ানদের জন্য অনেক ভাল কাজও তিনি করেছেন। নিম্ন-উচচ সব শিক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করেছিলেন। শিক্ষালয়ে প্রত্যেকের জন্য কোরআন শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছিলেন, যার কারনে এখনো সব সোমালিয়ানরাই সুন্দর করে কোরআন তেলায়াৎ করতে সক্ষম। সার্বজনীন রুপ দিতে সোমালিয়ান ভাষা রোমান হরফে লেখা চালুর ব্যবস্থা তিনিই করেছেন, যেমনটি মালয় ভাষার ক্ষেত্রে মাহাথির মোহাম্মদ করেছেন। যাহোক, একটানা ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকে লাল ঘোড়া দাবরিয়ে বেড়ান কমরেড সাইদ বারী।

সোমালিয়াকে আয়ত্বে রাখা দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল যার মূল কারন আমরা আগেই বলেছি। সাইদ বারীকে এক পর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ত্যাগ করলে ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি রাশিয়ার সাথে পূর্বের সব মৈত্রী চুক্তি ছিঁড়ে ফেলেন। বহিষ্কার করেন স্পর্শকাতর বিভাগসমূহে কর্মরত ডজন ডজন রুশ উপদেষ্টাদের। আনুগত্যের মস্তক এবার ঝুঁকে পড়ে পাশ্চাত্যের দিকে।দেশটির পতন মূলতঃ এখান থেকেই শুরু হয়। সোমালিয়ানরা বলে থাকেন, রাশিয়ার কথামত ১৯৭৭-৭৮ সালে ইথিওপিয়া আক্রমণই ছিল বারী প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ভুল, ঠিক সাদ্দাম হোসেন যেমন আমেরিকার ভন্ড প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ইরাক ধ্বংসের বীজ বুনেছিলেন কুয়েত আক্রমণ করে। ইথিওপিয়ার দখলীকৃত ঔপনিবেশিক আমলের সব সোমালিয়ান আইল্যান্ডগুলো (যেগুলোতে এখনো সোমালিয়ান ভাষীরা বাস করে) কব্জা করার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন সোমালিয়া থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। কিউবা ও রাশিয়া মিলে সাইদ বারীর অপ্রতিরোধ্য হস্ত সংকুচিত করতে বাধ্য করে। এই অঞ্চলে নৌ-স্থাপনার মোক্ষম সুযোগ ভেবে সাইদ বারীর নতুন প্রেমিক বেশে আসে আমেরিকা যুক্তরাস্ট্র।১৯৮৯ সাল পর্যন্ত এই আশীর্বাদ অব্যাহত থাকে। বিনিময়ে জোটে অর্থনীতি ও সামরিক খাতের নাম করে বছর প্রতি একশো মিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ ডিল, ঠিক যেমনটি জেনারেল পারভেজ মোশাররফ পেয়েছিলেন বুশের তথাকথিত ওয়ার অন টেরর-এর প্রেমিক সেজে।

সোমালিয়াকে ব্যর্থ রাষ্ট্র প্রস্তুত করতে একনায়ক সাইদ বারীকে আমেরিকা ও রাশিয়া ইচ্ছেমত ব্যবহার করেছে। এর বাইরে আরেকটি সত্য কথা হলো, বাংলাদেশের মত সোমালিয়ারও কপাল খারাপ। ভাল প্রতিবেশী নেই। পূর্ব থেকেই সোমালিয়াবিরোধী কর্মকান্ড ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন প্রতিবেশী দেশ ইথিওপিয়া থেকে উৎসরিত হয়ে আসছে। আর ওদিকে ইথিওপিয়াও হল পরাশক্তির আজ্ঞাবহ কলোনী।গোত্রীয় বা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব সোমালিয়াতে পূর্ব থেকেই ছিল। দূর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত স্বৈরাচারী বারী প্রশাসনের নিয়ন্ত্রনহীনতার সুযোগে সেটিও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বিদ্রোহী ব্যবসায়ী নেতা আলী মাহ্দি এবং মিলিটারী কমান্ডার ফারাহ আইদিদ মোগাদিসু সফলভাবে আক্রমণ করে। ১৯৯১ সালের ২৬শে জানুয়ারী বারীযুগের অবসান ঘটে। তারপর যা হবার তাই-ই শুরু হয়ে গেল। রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী বলে কিছু রইল না। কমান্ড, শৃংখলা একে একে খসে পড়ে সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রনহীন হয়ে পড়ল সোমালিয়া। অস্ত্র চলে গেল ট্রাইবাল লিডার, গডফাদার ও পিরাট (যারা সমুদ্রের জাহাজ পর্যন্ত ছিনতাই বা জিম্মি করে অর্থ দাবী করে)-দের হাতে। শুরু হলো অরাজকতা, ডাকাতি ও লুটপাটের রাজত্ব। দূঃসময়ের সাক্ষী সোমালিয়ানরা স্বদেশভূমি ছেড়ে ছুটে পড়লেন সারা পৃথিবীতে। একশো ভাগ শিক্ষিত চরম আতিথি পরায়ন সোমালিয়ান জাতি ও এক সময়কার ব্ল্যাক ডায়মন্ডদের নতুন উপাধি হল যাযাবর। অকার্যকর তত্ত্বের এ যেন সফল কার্যকরণ!

১৯৭৫ সালের আরেক ব্যর্থ রাষ্ট্র সিকিমের কাহিনীও মোটামুটি একই রকম। দূঃসময়ের এ যেন আরেক সাক্ষী! মাত্র ৭ হাজারের একটু বেশী বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র সিকিমকে ভারত ২২তম প্রদেশে অন্তর্ভুক্ত করার আগ পর্যন্ত ৩০০ বছর ধরে বৌদ্ধ ধর্মানুযায়ী চোগল রাজারা শাসন করতেন। মানুষগুলো সবাই দেখতে একই রকম। বেশীরভাগই নেপালী বংশোদ্ভূত এবং হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। হিমালয়ের পাদদেশে ছবির মত সাজানো একটি দেশ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন দেশটির পুরাতন নাম হিন্দু ধর্মের দেবতার নামানুসারে ছিল ইন্দ্রকিল অর্থাৎ ইন্দ্র দেবের বাগান। মানচিত্রে বুড়ো আঙুলের মত দেখতে সিকিমের চারপাশে রয়েছে পশ্চিম বঙ্গ, ভূটান, তিব্বত ও নেপাল। সারা বিশ্বের পর্যটকদের নিকট হটস্পট বলে পরিচিত ছিল সিকিম।কিন্তু ষড়যন্ত্র তাদেরকেও ছাড়েনি।

সিকিমের সর্বশেষ যুবরাজ পলডেন নমগেল ক্ষমতা গ্রহনের আগে ১৯৬০ সালে নিউইয়র্ক পরিভ্রমণ করেন। সাক্ষাৎ মেলে আমেরিকান ধনাঢ্য মেয়ে হোপ কুকের। বৌদ্ধ রীতি অনুযায়ী বিয়েও করেন তাকে। বৃদ্ধ রাজা তাশি নমগল মারা যান ১৯৬৩ সালে। এবার নতুন ও সর্বশেষ চোগল রাজা হলেন আমেরিকান মেয়ের বর পলডেন নমগল। ভারতের আশীর্বাদ নিয়ে গঠণ করেন মন্ত্রীসভা। এই অসময়ে প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোতেও রয়েছে ভারতের পরীক্ষিত-বন্ধুরা ক্ষমতায়। রাজ্য হারানো নির্মম গল্পের শেষ অধ্যায় হলো, ১৯৭৩ সালে হঠাৎ করে দেশব্যাপী শুরু হয়ে যায় অসম্ভব রকমের গোলযোগ ও অস্থিরতা। রাজা পলডেনের অক্ষমতা সম্পর্কে ভাল করেই জানা ছিল ভারতপন্থী সব বলয়ের। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তো চুক্তি অনুসারে বরাবরই ইন্ডিয়ার হাতে। নেহেরু ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের থেকে এভাবেই শিয়ালের নিকট মুরগী বর্গা দেয়ার মত স্পেশাল স্ট্যাটাসের ব্যবস্থা করে রেখে গিয়েছিলেন। ভারতীয় গণমাধ্যম ইতোমধ্যে সার্থকভাবে বিশ্বব্যাপী প্রচার করে সিকিমের বিরুদ্ধে অকার্যকর রাষ্ট্রের তত্ত্ব’। এরই ধারাবাহিকতায় সুযোগ বুঝে ১৯৭৫ সালে দেশটিকে সম্পূর্নভাবে গিলে ফেলে ভারত। সর্বশেষ চোগল রাজা পলডেন (সম্ভবতঃ এরপর থেকেই চোগলখুরী শব্দটা আমরা পেয়েছি) ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান শশুরবাড়ী নিউইয়র্কে ১৯৮০ সালে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি, আমাদের প্রিয় দেশটি সোমালিয়া বা সিকিম হওয়ার পর্যায়ে আসেনি। আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আবারো ঘুরে দাঁড়াবে, কমান্ড অব চেইন দ্রুত ফিরে আসবে, শোককে শক্তিতে পরিণত করে আবার সম্মুখপানে আমাদের সেনারা ধাবিত হবে, অন্ততঃ এ আশাটুকু করতে চাই। যত অপপ্রচারই চালানো হোক না কেন কারো সাধ্য নাই এদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্র বলে অভিহিত করা। অনেক চেষ্টা করে ভূটানকেও পারেনি। ভূটান আজ নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। নেপালে অনেকবার প্রো-ইন্ডিয়ানরা শাসন করেছে, এমনকি ভারতীয় সেনাবাহিনী পর্যন্ত সেখানে দীর্ঘদিন মোতায়েন থেকেছে। কাজ হয়নি, বরঞ্চ ভারতবিরোধী শক্তিই দিন দিন বেড়েছে সেখানে। মাওবাদীরা আজ নেপাল শাসন করছে। শ্রীলংকার অবস্থাও অনুরুপ। কোন প্রতিবেশীই ভারতের অবিশ্বাসী প্রভূত্ব চায়না। বৃহৎ রাষ্ট্র ভারত তার ভাল প্রতিবেশী হওয়ার মর্যাদা দিন দিন হারাচ্ছে। প্রত্যেকটা সংকটকালীন সময়ে ইন্ডিয়ানপ্রচার মাধ্যমের উস্কানীমূলক প্রচারণা এবং তথাকথিত রিসার্স প্রতিবেদন বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রতিফলিত না হলে জাতি তার অস্তিত্ব সংকটে কখনো পড়বেনা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, মোট চারটি উপাদান নিয়ে একটি কার্যকর রাষ্ট্রের সংজ্ঞা নিরুপিত হয়। জনগণ, সরকার, নির্দিষ্ট ভূ-খন্ড ও সার্বভৌমত্ব। শেষোক্ত দুটি উপাদানের মূল নিয়ন্ত্রণকারীদেরকে বাংলাদেশে আমরা নাম দিয়েছি বাংলাদেশ রাইফেলস্ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। যদি রাষ্ট্রের উপরোক্ত চারটি উপাদানসমূহের ভংগুরতা সম্মন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায় অর্থাৎ বিভাজিত জনগন, একদেশদর্শী কিংবা বিদেশ-প্রীতি সরকার এবং সার্বভৌমত্ব ও ভূ-খন্ডের অরক্ষতা, তখনি কথা এসে যায় ‘অকার্যকর বা ব্যর্থ রাষ্ট্র’র বুনিয়াদ। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর একটা সুশৃংখল বাহিনীকে শেষ করে ফেলার মত নির্মম ঘটনা এদেশে ঘটেনি। এরচেয়েও নির্মম সত্য কথা হলো, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী বাহিনীর উপর এমন গুরুতর হামলাও জাতিকে বিভাজনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারল না! বরঞ্চ, স্বাধীনতা-উত্তর প্রজন্ম ও বাংলাদেশের শত্রুরা এই সুযোগে ভাল করে আবারো বুঝে নিল বর্তমানের অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা রাজনীতি কোন কিছুতেই এই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেনা, এমনকি দেশের অস্তিত্বের উপর চুড়ান্ত হামলা এলেও! অধিকন্তু দিনে দিনে প্রমাণ মিলছে উর্বর মস্তিষ্ক প্রসূত নব নব উদ্ভট ও বিভক্তি উৎপাদনের বিকৃত বীজ প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে চলবে। এভাবে চলতে থাকলে আজ থেকে বিশ বছর পর ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চেহারা কেমন হবে? নাইন-ইলেভেন আমেরিকানদের অনেক কিছু শেখালেও ওয়ান-ইলেভেন মনে হয় আমাদেরকে কিছুই শেখায়নি! স্কটিশ একটি প্রবাদবাক্য হলো, জোর করে ঘোড়াকে পানির কাছে নেয়া যায়, কিন্তু তাকে পানি পান করানো যায় না। ঘুমের মানুষকে জাগানো যায়, কিন্তু যারা জেগে ঘুমায়, তাদেরকে জাগাবে কে?

লেখক :কানাডায় একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানীতে কর্মরত প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×