নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

নতুন নকিব

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রন-ক্লান্ত। আমি সেই দিন হব শান্ত।

নতুন নকিব › বিস্তারিত পোস্টঃ

রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না; কবীরা গুনাহ, জাহান্নাম ও আল্লাহর অসীম ক্ষমা: কুরআন ও হাদীসের আলোকে একটি বিশ্লেষন

০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৪৭

রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না; কবীরা গুনাহ, জাহান্নাম ও আল্লাহর অসীম ক্ষমা: কুরআন ও হাদীসের আলোকে একটি বিশ্লেষন

ছবি গুগল থেকে গৃহিত।

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

◆ ভূমিকা: এক ভীত ও কম্পিত হৃদয়ের প্রশ্ন

কল্পনা করুন, গভীর রাত। চারদিক নিস্তব্ধ। একজন মানুষ জায়নামাযের পাশে বসে আছে। অতীতের কোনো এক ভুল, কোনো এক পদস্খলন আজ তার বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে বসেছে। ঈমান আছে, আল্লাহকে সে ভালোবাসে, তবু মনে পড়ে যায় বহুদিন আগে শোনা একটি কথা: যে ব্যক্তি কবীরা গুনাহ করে সে নাকি চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। তার চোখ ভিজে ওঠে। সে নিজেকে প্রশ্ন করে, তবে কি আমার জন্য আর কোনো আশা নেই?

এই লেখা সেই ভীত হৃদয়ের জন্য। শুধু তার একার জন্য নয়, প্রতিটি মুমিনের জন্য, যে আল্লাহকে ভয় করে আবার তাঁর রহমতের আশাও করে। কারণ কথাটি সঠিক নয়। এটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা নয়, বরং খারেজী ও মুতাযিলা নামের বিচ্যুত দলের মত। কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে আমরা দেখব, আল্লাহর রহমত কত বিশাল এবং তাওহীদের উপর মৃত্যুবরণকারী মুমিনের জন্য ক্ষমার দরজা কত প্রশস্ত। একই সঙ্গে দেখব, কবীরা গুনাহ কত ভয়াবহ, যাতে ক্ষমার আশা আমাদের গাফিল না করে দেয়।

◆ আশা ও ভয়ের মাঝখানের পথ

মুমিনের জীবন দুটি ডানায় ভর করে ওড়া পাখির মতো। একটি ডানা ভয়, অন্যটি আশা। একটি ভেঙে গেলে পাখি আর আকাশে থাকতে পারে না। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের এই দুই ডানার কথাই একই নিঃশ্বাসে শুনিয়েছেন:

আশা ও ভয়ের একই ঘোষণা

نَبِّئْ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ وَأَنَّ عَذَابِي هُوَ الْعَذَابُ الْأَلِيمُ

অনুবাদ: আমার বান্দাদের জানিয়ে দিন, আমি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর আমার শাস্তিই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। -সূরা আল-হিজর ১৫:৪৯-৫০

লক্ষ করুন, আল্লাহ আগে নিজের ক্ষমা ও দয়ার কথা বলেছেন, তারপর শাস্তির কথা। রহমতের এই অগ্রগামিতা আমাদের শেখায়, বান্দার দিকে আল্লাহর প্রথম দৃষ্টি দয়ার। তাই কবীরা গুনাহের প্রশ্নে আমরা যেমন নিরাশ হব না, তেমনি নির্ভয়ও হব না।

◆ রহমতের সেই একশ ভাগ

আল্লাহর দয়া কতটা বিশাল, তা মানুষের ভাষায় পরিমাপ করা যায় না। তবু রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের একটি ছবি এঁকে দিয়েছেন। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

একশ রহমতের হাদীস

إِنَّ لِلَّهِ مِائَةَ رَحْمَةٍ، أَنْزَلَ مِنْهَا رَحْمَةً وَاحِدَةً بَيْنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ وَالْبَهَائِمِ وَالْهَوَامِّ، فَبِهَا يَتَعَاطَفُونَ، وَبِهَا يَتَرَاحَمُونَ، وَبِهَا تَعْطِفُ الْوَحْشُ عَلَى وَلَدِهَا، وَأَخَّرَ اللَّهُ تِسْعًا وَتِسْعِينَ رَحْمَةً يَرْحَمُ بِهَا عِبَادَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

অনুবাদ: আল্লাহর একশটি রহমত আছে। তার একটি মাত্র তিনি জিন, মানুষ, চতুষ্পদ জন্তু ও কীটপতঙ্গের মাঝে নাযিল করেছেন। এর কারণেই তারা একে অপরের প্রতি স্নেহ করে, দয়া করে, এমনকি বন্যপ্রাণীও নিজের সন্তানের প্রতি মমতা দেখায়। আর নিরানব্বইটি রহমত আল্লাহ রেখে দিয়েছেন কিয়ামতের দিন তাঁর বান্দাদের প্রতি দয়া করার জন্য। -সহীহ মুসলিম ২৭৫২; সহীহ বুখারী ৬০০০ | মান: সহীহ

একবার ভাবুন। মায়ের বুকে সন্তানের জন্য যে অতল মমতা, পিতার চোখে যে নীরব উদ্বেগ, প্রিয়জনের বিচ্ছেদে যে কান্না, সবই সেই একশ ভাগের মাত্র এক ভাগ। বাকি নিরানব্বই ভাগ আল্লাহ জমা রেখেছেন সেই দিনের জন্য, যেদিন একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি দয়ার দরকার হবে।

একবার কিছু যুদ্ধবন্দীকে রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে আনা হলো। সেদিনের দৃশ্যটি উমর ইবনুল খাত্তাব রা. আমাদের জন্য ধরে রেখেছেন:

মায়ের চেয়েও দয়ালু আল্লাহ

قَدِمَ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم سَبْيٌ، فَإِذَا امْرَأَةٌ مِنَ السَّبْيِ قَدْ تَحْلُبُ ثَدْيَهَا تَسْقِي، إِذَا وَجَدَتْ صَبِيًّا فِي السَّبْيِ أَخَذَتْهُ فَأَلْصَقَتْهُ بِبَطْنِهَا وَأَرْضَعَتْهُ، فَقَالَ لَنَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: أَتَرَوْنَ هَذِهِ طَارِحَةً وَلَدَهَا فِي النَّارِ؟ قُلْنَا: لَا، وَهِيَ تَقْدِرُ عَلَى أَنْ لَا تَطْرَحَهُ. فَقَالَ: لَلَّهُ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ هَذِهِ بِوَلَدِهَا

অনুবাদ: নবী সা.-এর কাছে কিছু যুদ্ধবন্দী আনা হলো। বন্দীদের মধ্যে এক নারীর স্তন থেকে দুধ ঝরছিল, সে (হারানো সন্তানকে খুঁজে) ছুটছিল। বন্দীদের মধ্যে কোনো শিশুকে পেলেই সে তাকে তুলে নিয়ে পেটের সাথে জড়িয়ে ধরে দুধ পান করাচ্ছিল। তখন নবী সা. আমাদের বললেন, তোমরা কি মনে করো এই নারী তার সন্তানকে আগুনে ছুঁড়ে ফেলতে পারে? আমরা বললাম, না, আর সে তো না ফেলার ক্ষমতা রাখে। তিনি বললেন, এই নারী তার সন্তানের প্রতি যতটা দয়ালু, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি তার চেয়েও অধিক দয়ালু। বর্ণনাকারী: উমর ইবনুল খাত্তাব রা. -সহীহ বুখারী ৫৯৯৯; সহীহ মুসলিম ২৭৫৪ | মান: সহীহ

যে প্রভু বান্দার প্রতি মায়ের চেয়েও দয়ালু, তিনি কি তাঁর একত্বে বিশ্বাসী একজন দুর্বল বান্দাকে একটি পদস্খলনের কারণে অনন্তকালের জন্য আগুনে ফেলে রাখবেন? কখনোই নয়। এ ধারণা আল্লাহর রহমতের শানের সাথে মানানসই নয়।

◆ শিরকের নিচে যা কিছু, সবই তাঁর ইচ্ছার অধীন

কুরআনুল কারীম গুনাহের জগতে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে। একদিকে শিরক, অন্যদিকে শিরকের চেয়ে নিচের সব গুনাহ:

ক্ষমার সীমারেখা

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَىٰ إِثْمًا عَظِيمًا

অনুবাদ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার গুনাহ ক্ষমা করেন না। এর চেয়ে নিচের যেকোনো গুনাহ তিনি যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রচনা করে। -সূরা আন-নিসা ৪:৪৮ (অনুরূপ ৪:১১৬)

এই আয়াতটি আমাদের প্রশ্নের মূল উত্তর। যদি কবীরা গুনাহকারী মুমিনও কাফিরের মতো চিরস্থায়ী জাহান্নামী হতো, তাহলে শিরক ও অন্যান্য গুনাহের মধ্যে এই পার্থক্য করার কোনো অর্থ থাকত না। আল্লাহ বলেছেন, শিরক ছাড়া বাকি সব তাঁর ইচ্ছার অধীন। তিনি চাইলে ক্ষমা করবেন, চাইলে গুনাহ অনুযায়ী শাস্তি দেবেন। আর চিরস্থায়ী জাহান্নামের ঘোষণা এসেছে মুশরিকদের জন্য। সূরা মায়েদার ৭২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা জাহান্নাম।

আল্লাহ আরও জানিয়েছেন, বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে ছোট গুনাহগুলো তিনি নিজেই মুছে দেন:

কবীরা থেকে বাঁচলে সগীরা মাফ

إِن تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُّدْخَلًا كَرِيمًا

অনুবাদ: তোমাদের যা নিষেধ করা হয়েছে, তার মধ্যে কবীরা গুনাহগুলো থেকে বিরত থাকলে আমি তোমাদের ছোট গুনাহ মাফ করে দেব এবং তোমাদের সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব। -সূরা আন-নিসা ৪:৩১

◆ কবীরা গুনাহকে হালকা ভাবার সুযোগ নেই

এতক্ষণ আমরা রহমতের কথা বলেছি। কিন্তু এখানেই থেমে গেলে আমরা অর্ধেক সত্য বলব। কবীরা গুনাহ অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসূলুল্লাহ সা. উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন:

ধ্বংসাত্মক সাতটি গুনাহ

اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ؟ قَالَ: الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ

অনুবাদ: তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, সেগুলো কী? তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শরীক করা, জাদু করা, আল্লাহ যে প্রাণ হরণ নিষিদ্ধ করেছেন তা অন্যায়ভাবে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ খাওয়া, যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানো এবং সতী-সাধ্বী, সরলমনা ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া। বর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা রা. -সহীহ বুখারী ২৭৬৬; সহীহ মুসলিম ৮৯ | মান: সহীহ

কুরআনে ইচ্ছাকৃতভাবে মুমিনকে হত্যার শাস্তি বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেন:

ইচ্ছাকৃত হত্যার ভয়াবহতা

وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا

অনুবাদ: যে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে দীর্ঘকাল থাকবে। আল্লাহ তার উপর ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে লানত করবেন এবং তার জন্য ভয়াবহ শাস্তি প্রস্তুত রাখবেন। -সূরা আন-নিসা ৪:৯৩

যারা কবীরা গুনাহকারীকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী বলেন, তারা এই আয়াতকেই বড় দলিল হিসেবে পেশ করেন। কিন্তু আহলুস সুন্নাহর আলেমগণ কুরআন ও সহীহ হাদীসের সব দলিল একত্র করে এর ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথমত, আরবি “খুলুদ” শব্দটি দীর্ঘ অবস্থান অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যা সবসময় অনন্তকাল বোঝায় না। দ্বিতীয়ত, কেউ মুমিনের রক্তকে হালাল মনে করে হত্যা করলে সে ঈমানের গণ্ডি থেকেই বেরিয়ে যায়, তাই তার জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নাম প্রযোজ্য। তৃতীয়ত, আয়াতটি অপরাধের প্রাপ্য শাস্তি জানিয়ে দিয়েছে, কিন্তু এর পাশাপাশি ৪:৪৮ আয়াত ও সহীহ হাদীসসমূহ বলছে, তাওহীদের উপর মৃত্যুবরণকারীকে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন অথবা শাস্তির পর মুক্তি দিতে পারেন।

এখানে একটি কথা মনে রাখা জরুরি। এই সুসংবাদ কাউকে গুনাহে সাহস জোগানোর জন্য নয়। রহমতের ঘোষণা এসেছে সেই বান্দার সান্ত্বনার জন্য, যে অনুতপ্ত, যে কাঁদছে, যে ফিরে আসতে চায়।

◆ জাহান্নামের অন্ধকার থেকে ফিরে আসার দৃশ্য

এবার সহীহ হাদীসের সেই হৃদয়স্পর্শী বর্ণনার দিকে তাকাই, যেখানে রাসূলুল্লাহ সা. কিয়ামতের দিনের একটি দৃশ্য আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। আবু সাঈদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন:

জীবন-নদে অবগাহন

يَدْخُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ، وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ، ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ، فَيُخْرَجُونَ مِنْهَا قَدِ امْتَحَشُوا وَعَادُوا حُمَمًا، فَيُلْقَوْنَ فِي نَهَرِ الْحَيَاةِ، فَيَنْبُتُونَ كَمَا تَنْبُتُ الْحِبَّةُ فِي حَمِيلِ السَّيْلِ، أَلَمْ تَرَ أَنَّهَا تَخْرُجُ صَفْرَاءَ مُلْتَوِيَةً

অনুবাদ: জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করলে আল্লাহ বলবেন, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাকে বের করো। তখন তাদের এমন অবস্থায় বের করা হবে যে তারা পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। তাদের জীবন-নদে নামানো হবে। ফলে তারা সতেজ হয়ে উঠবে, যেমন প্লাবনের স্রোতে বয়ে আসা পলিমাটিতে বীজ অঙ্কুরিত হয়। তোমরা কি দেখোনি, তা হলুদ বর্ণের ও বাঁকানো অবস্থায় বের হয়? বর্ণনাকারী: আবু সাঈদ খুদরী রা. -সহীহ বুখারী ২২, ৬৫৬০; সহীহ মুসলিম ১৮৪ | মান: সহীহ, মুত্তাফাক আলাইহি

এই বর্ণনা পড়তে গিয়ে বুকের ভেতর কেমন যেন করে ওঠে। পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া দেহ, যাদের ঈমান ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, আল্লাহর নির্দেশে তাদের তুলে আনা হচ্ছে। যে নদীতে তাদের নামানো হচ্ছে, তার নাম “জীবন”। সেখানে ডুব দিতেই মৃতপ্রায় দেহ নতুন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে, যেমন বন্যার পর পলিমাটিতে সবুজ অঙ্কুর মাথা তোলে। এ কেবল শাস্তির গল্প নয়, এ এক নতুন জীবনের সুসংবাদ।
আনাস রা. বর্ণিত হাদীসে সেই ঈমানের ওজন আরও সূক্ষ্মভাবে বলা হয়েছে, যা আল্লাহর কাছে কখনো মূল্যহীন হয় না:

যব, গম ও অণু পরিমাণ কল্যাণ

يَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَكَانَ فِي قَلْبِهِ وَزْنُ شَعِيرَةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَكَانَ فِي قَلْبِهِ وَزْنُ بُرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَكَانَ فِي قَلْبِهِ وَزْنُ ذَرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ

অনুবাদ: জাহান্নাম থেকে বের হবে সেই ব্যক্তি, যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে এবং যার অন্তরে যব পরিমাণ কল্যাণ ছিল। বের হবে সেই ব্যক্তি, যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে এবং যার অন্তরে গম পরিমাণ কল্যাণ ছিল। আর বের হবে সেই ব্যক্তি, যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে এবং যার অন্তরে অণু পরিমাণ কল্যাণ ছিল। বর্ণনাকারী: আনাস রা. -সহীহ বুখারী ৪৪; সহীহ মুসলিম ১৯৩ | মান: সহীহ

এই হাদীসগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, জাহান্নামে প্রবেশ করেও যার অন্তরে ঈমানের সামান্যতম অংশ রয়ে গেছে, সে সেখানে চিরকাল থাকবে না। ঈমান হলো সেই বীজ, যা আগুনেও নষ্ট হয় না। আল্লাহর রহমতের ছোঁয়ায় সেই বীজ আবার সবুজ হয়ে ওঠে।
এই উম্মতের জন্য রাসূলুল্লাহ সা.-এর শাফায়াতের ঘোষণাও আমাদের হৃদয়ে ভরসা জাগায়:

কবীরা গুনাহকারীদের জন্য শাফায়াত

شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي

অনুবাদ: আমার শাফায়াত আমার উম্মতের কবীরা গুনাহকারীদের জন্য। -আবু দাউদ ৪৭৩৯; তিরমিযী ২৪৩৫; ইবনে মাজাহ ৪৩১০ | মান: সহীহ (আলবানী)

ভাবুন, যিনি সারা জীবন উম্মতের চিন্তায় রাত জেগে কেঁদেছেন, তিনি কিয়ামতের কঠিন দিনেও উম্মতের গুনাহগারদের ভুলে যাবেন না। এই সৌভাগ্য শুধু তাওহীদের উপর মৃত্যুবরণকারীদের জন্য।

◆ যিনা ও চুরির পরও জান্নাতের সুসংবাদ

আবু যর গিফারী রা. বিস্ময়ে বারবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, আর নবী সা. প্রতিবারই একই সুসংবাদ দিয়েছিলেন। বুখারীর বর্ণনায় পুরো ঘটনাটি এসেছে এভাবে:

আবু যর রা.-এর প্রশ্ন ও নবীজির উত্তর

أَتَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَعَلَيْهِ ثَوْبٌ أَبْيَضُ وَهُوَ نَائِمٌ، ثُمَّ أَتَيْتُهُ وَقَدِ اسْتَيْقَظَ، فَقَالَ: مَا مِنْ عَبْدٍ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ثُمَّ مَاتَ عَلَى ذَلِكَ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ. قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ. قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ. قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ، عَلَى رَغْمِ أَنْفِ أَبِي ذَرٍّ

অনুবাদ: আমি নবী সা.-এর কাছে এলাম। তাঁর গায়ে ছিল সাদা কাপড়, তিনি তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। পরে আবার এলাম, তিনি জেগে উঠেছেন। তিনি বললেন, যে বান্দা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলে এবং এর উপর মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, সে যদি যিনা করে এবং চুরি করে, তবুও? তিনি বললেন, যিনা করলেও এবং চুরি করলেও। আমি আবার বললাম, যিনা করলেও এবং চুরি করলেও? তিনি বললেন, যিনা করলেও এবং চুরি করলেও। আমি তৃতীয়বার বললাম, যিনা করলেও এবং চুরি করলেও? তিনি বললেন, যিনা করলেও এবং চুরি করলেও, আবু যরের নাক ধুলোয় মলিন হলেও। -সহীহ বুখারী ৫৮২৭; সহীহ মুসলিম ৯৪ | মান: সহীহ

আলেমগণ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে এসব গুনাহের কোনো শাস্তি নেই। বরং এর অর্থ হলো, তাওহীদের উপর মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি পরিণামে জান্নাতেই যাবে, হয় আল্লাহর ক্ষমায় সরাসরি, নয়তো গুনাহ অনুযায়ী শাস্তি ভোগের পর। শেষ ঠিকানা জাহান্নাম নয়।

আকাবার রাতে যাঁরা রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে বাইয়াত করেছিলেন, উবাদা ইবনুস সামিত রা. ছিলেন তাঁদের একজন। সেই বাইয়াতের কথা ও তার পরের সুসংবাদ তিনি এভাবে বর্ণনা করেন:

গুনাহ আল্লাহর ইচ্ছাধীন

بَايِعُونِي عَلَى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا، وَلَا تَسْرِقُوا، وَلَا تَزْنُوا، وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ، وَلَا تَأْتُوا بِبُهْتَانٍ تَفْتَرُونَهُ بَيْنَ أَيْدِيكُمْ وَأَرْجُلِكُمْ، وَلَا تَعْصُوا فِي مَعْرُوفٍ، فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ فِي الدُّنْيَا فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا ثُمَّ سَتَرَهُ اللَّهُ فَهُوَ إِلَى اللَّهِ، إِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ وَإِنْ شَاءَ عَاقَبَهُ

অনুবাদ: তোমরা আমার হাতে এই মর্মে বাইয়াত করো যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যিনা করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না, নিজেদের হাত-পায়ের সামনে কোনো মিথ্যা অপবাদ রচনা করবে না এবং ন্যায়সংগত কাজে অবাধ্য হবে না। তোমাদের যে এই অঙ্গীকার পূর্ণ করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে। আর যে এসবের কোনোটিতে লিপ্ত হয়ে দুনিয়াতে শাস্তি পাবে, তা তার জন্য কাফফারা। আর যে এসবের কোনোটিতে লিপ্ত হলো, তারপর আল্লাহ তা গোপন রাখলেন, তার বিষয় আল্লাহর হাতে। তিনি চাইলে ক্ষমা করবেন, চাইলে শাস্তি দেবেন। বর্ণনাকারী: উবাদা ইবনুস সামিত রা. -সহীহ বুখারী ১৮; সহীহ মুসলিম ১৭০৯ | মান: সহীহ

◆ আহলুস সুন্নাহর আকীদা ও বিভ্রান্ত মত

সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং পরবর্তী যুগের আহলুস সুন্নাহর আলেমগণ এই বিষয়ে একমত। ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী রহ. উম্মতের এই আকীদাকে সংক্ষেপে এভাবে লিখেছেন:

وَأَهْلُ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم فِي النَّارِ لَا يَخْلُدُونَ، إِذَا مَاتُوا وَهُمْ مُوَحِّدُونَ، وَإِنْ لَمْ يَكُونُوا تَائِبِينَ، بَعْدَ أَنْ لَقُوا اللَّهَ عَارِفِينَ مُؤْمِنِينَ، وَهُمْ فِي مَشِيئَتِهِ وَحُكْمِهِ، إِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُمْ وَعَفَا عَنْهُمْ بِفَضْلِهِ، كَمَا ذَكَرَ عَزَّ وَجَلَّ فِي كِتَابِهِ: وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ، وَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُمْ فِي النَّارِ بِعَدْلِهِ، ثُمَّ يُخْرِجُهُمْ مِنْهَا بِرَحْمَتِهِ وَشَفَاعَةِ الشَّافِعِينَ مِنْ أَهْلِ طَاعَتِهِ، ثُمَّ يَبْعَثُهُمْ إِلَى جَنَّتِهِ

অর্থাৎ মুহাম্মাদ সা.-এর উম্মতের কবীরা গুনাহকারীরা তাওহীদের উপর মারা গেলে জাহান্নামে প্রবেশ করলেও চিরস্থায়ী হবে না, এমনকি তারা তাওবা না করে থাকলেও, যদি আল্লাহকে চিনে ও ঈমান নিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে। তারা আল্লাহর ইচ্ছা ও ফয়সালার অধীন। তিনি চাইলে নিজ অনুগ্রহে তাদের ক্ষমা করবেন, যেমন তিনি কিতাবে বলেছেন, “এর চেয়ে নিচের গুনাহ তিনি যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করেন”। আর চাইলে নিজ ন্যায়বিচারে তাদের জাহান্নামে শাস্তি দেবেন, তারপর নিজ রহমতে এবং তাঁর অনুগত শাফায়াতকারীদের সুপারিশে তাদের সেখান থেকে বের করবেন, অতঃপর তাদের জান্নাতে পাঠাবেন। -আল-আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ

এর বিপরীতে যারা বলে কবীরা গুনাহকারী চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, তারা প্রাচীন খারেজী ও মুতাযিলা সম্প্রদায়ের পথে হাঁটছে। খারেজীরা কবীরা গুনাহকারীকে কাফির বলত এবং তাদের রক্ত হালাল মনে করত। মুতাযিলারা তাকে ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি এক অবস্থানে রাখত, কিন্তু পরকালে তার জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নাম সাব্যস্ত করত। কুরআন ও সুন্নাহর অসংখ্য দলিল এই উভয় মতের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেয়। এ কারণেই উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম একে ভ্রান্ত মত বলে সাব্যস্ত করেছেন।

◆ তাওবার দরজা এখনো খোলা

এতক্ষণ আমরা পরকালের বিচারের কথা বললাম। কিন্তু একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হলো, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা। আল্লাহ তাআলা এমন বান্দাদের ডেকে বলছেন, যারা নিজেদের উপর সীমালঙ্ঘন করেছে:

নিরাশ হয়ো না

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

অনুবাদ: বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের উপর সীমালঙ্ঘন করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩

লক্ষ করুন, আল্লাহ এখানে “হে আমার বান্দারা” বলে ডেকেছেন। গুনাহগার হয়ে যাওয়ার পরও তিনি তাদের নিজের বান্দা বলে সম্বোধন করছেন। এই ডাকের মধ্যে যে আদর, যে টান, তা কোনো গুনাহগারের হৃদয়কে না ছুঁয়ে পারে না। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, যারা অনেক হত্যা ও ব্যভিচার করেছিল, তারা এসে নবী সা.-কে বলল, আপনি যা বলেন তা তো উত্তম, কিন্তু আমাদের কি কোনো কাফফারা আছে? তখন সূরা ফুরকানের আয়াত নাযিল হয়, যা এই পথের ঠিকানা বলে দেয় (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, সূরা ফুরকান; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান)।

গুনাহ নেকীতে বদলে যায়

وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ يَلْقَ أَثَامًا يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا

অনুবাদ: আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহকে ডাকে না, আল্লাহ যে প্রাণ হরণ নিষিদ্ধ করেছেন তা ন্যায়সংগত কারণ ছাড়া হত্যা করে না এবং যিনা করে না। যে এসব করবে সে শাস্তির সম্মুখীন হবে। কিয়ামতের দিন তার শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সে লাঞ্ছিত অবস্থায় সেখানে স্থায়ী হবে। তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৮-৭০

লক্ষ করুন, এই আয়াতে শিরক, হত্যা ও যিনা একসাথে বলা হয়েছে, আর তার ঠিক পরেই তাওবার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যে ঘোর অপরাধী, তার জন্যও আল্লাহর ডাক ফুরিয়ে যায়নি।

একটু থামুন। আল্লাহ শুধু গুনাহ মাফ করেই ক্ষান্ত নন, তিনি তাওবাকারীর গুনাহের জায়গায় নেকী লিখে দেন। যে কাগজে একদিন কালো দাগ ছিল, সেখানে আজ সোনালি অক্ষরে নেকী লেখা হচ্ছে। এর চেয়ে বড় দয়ার কথা আর কী হতে পারে?

আল্লাহ তাঁর খাঁটি বান্দাদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে, যারা ভুল করার পর ফিরে আসে:

ভুলের পর ফিরে আসা বান্দা

وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَىٰ مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ أُولَٰئِكَ جَزَاؤُهُم مَّغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ

অনুবাদ: তারা এমন যে, কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা নিজেদের উপর জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা চায়। আল্লাহ ছাড়া আর কে গুনাহ ক্ষমা করতে পারে? আর তারা জেনেশুনে নিজেদের কৃতকর্মে অটল থাকে না। তাদের প্রতিদান তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং জান্নাত, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আমলকারীদের প্রতিদান কতই না উত্তম! -সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৫-১৩৬

রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের শুনিয়েছেন এমন এক ব্যক্তির কাহিনী, যার হাত একশ মানুষের রক্তে রাঙানো, তবু যার ভেতরের অনুতাপ মরে যায়নি। পুরো ঘটনাটি এই:

একশ হত্যাকারীর তাওবা

كَانَ فِيمَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ رَجُلٌ قَتَلَ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ نَفْسًا، فَسَأَلَ عَنْ أَعْلَمِ أَهْلِ الْأَرْضِ، فَدُلَّ عَلَى رَاهِبٍ، فَأَتَاهُ فَقَالَ: إِنَّهُ قَتَلَ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ نَفْسًا فَهَلْ لَهُ مِنْ تَوْبَةٍ؟ فَقَالَ: لَا. فَقَتَلَهُ فَكَمَّلَ بِهِ مِائَةً. ثُمَّ سَأَلَ عَنْ أَعْلَمِ أَهْلِ الْأَرْضِ، فَدُلَّ عَلَى رَجُلٍ عَالِمٍ، فَقَالَ: إِنَّهُ قَتَلَ مِائَةَ نَفْسٍ فَهَلْ لَهُ مِنْ تَوْبَةٍ؟ فَقَالَ: نَعَمْ، وَمَنْ يَحُولُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ التَّوْبَةِ؟ انْطَلِقْ إِلَى أَرْضِ كَذَا وَكَذَا، فَإِنَّ بِهَا أُنَاسًا يَعْبُدُونَ اللَّهَ فَاعْبُدِ اللَّهَ مَعَهُمْ، وَلَا تَرْجِعْ إِلَى أَرْضِكَ فَإِنَّهَا أَرْضُ سَوْءٍ. فَانْطَلَقَ حَتَّى إِذَا نَصَفَ الطَّرِيقَ أَتَاهُ الْمَوْتُ، فَاخْتَصَمَتْ فِيهِ مَلَائِكَةُ الرَّحْمَةِ وَمَلَائِكَةُ الْعَذَابِ، فَقَالَتْ مَلَائِكَةُ الرَّحْمَةِ: جَاءَ تَائِبًا مُقْبِلًا بِقَلْبِهِ إِلَى اللَّهِ. وَقَالَتْ مَلَائِكَةُ الْعَذَابِ: إِنَّهُ لَمْ يَعْمَلْ خَيْرًا قَطُّ. فَأَتَاهُمْ مَلَكٌ فِي صُورَةِ آدَمِيٍّ فَجَعَلُوهُ بَيْنَهُمْ، فَقَالَ: قِيسُوا مَا بَيْنَ الْأَرْضَيْنِ فَإِلَى أَيَّتِهِمَا كَانَ أَدْنَى فَهُوَ لَهُ. فَقَاسُوهُ فَوَجَدُوهُ أَدْنَى إِلَى الْأَرْضِ الَّتِي أَرَادَ، فَقَبَضَتْهُ مَلَائِكَةُ الرَّحْمَةِ

অনুবাদ: তোমাদের পূর্বের যুগে এক লোক ছিল, যে নিরানব্বইটি প্রাণ হত্যা করেছিল। সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেমের খোঁজ করল। তাকে এক আবেদের কাছে পাঠানো হলো। সে তাকে বলল, আমি নিরানব্বইটি প্রাণ হত্যা করেছি, আমার কি তাওবা আছে? আবেদ বলল, না। তখন সে তাকে হত্যা করে একশ পূর্ণ করল। তারপর আবার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেমের খোঁজ করল। তাকে একজন আলেমের কাছে পাঠানো হলো। সে বলল, আমি একশ প্রাণ হত্যা করেছি, আমার কি তাওবা আছে? আলেম বললেন, হ্যাঁ, তার ও তাওবার মাঝে কে বাধা হতে পারে? তুমি অমুক অমুক জনপদে যাও। সেখানে কিছু মানুষ আল্লাহর ইবাদত করে, তুমিও তাদের সাথে ইবাদত করো। আর নিজের এলাকায় ফিরে যেয়ো না, কারণ তা মন্দ জায়গা। লোকটি রওনা হলো। অর্ধেক পথ যেতেই তার মৃত্যু এসে গেল। তখন রহমতের ফেরেশতা ও আযাবের ফেরেশতা তাকে নিয়ে বিতর্ক করল। রহমতের ফেরেশতারা বলল, সে তাওবা করে অন্তর নিয়ে আল্লাহর দিকে এগিয়ে এসেছে। আযাবের ফেরেশতারা বলল, সে কখনো কোনো ভালো কাজ করেনি। তখন মানুষের আকৃতিতে একজন ফেরেশতা এলেন এবং তাঁকে তাদের মধ্যে বিচারক মানা হলো। তিনি বললেন, দুই জনপদের দূরত্ব মেপে দেখো, সে যেটির কাছে, সে তারই। তারা মেপে দেখল, সে যেখানে যেতে চেয়েছিল সেই জনপদের কাছেই। তখন রহমতের ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে গেলেন। বর্ণনাকারী: আবু সাঈদ খুদরী রা. -সহীহ মুসলিম ২৭৬৬; সহীহ বুখারী ৩৪৭০ (অনুরূপ) | মান: সহীহ

একশ মানুষের রক্তে হাত রাঙানো এক ব্যক্তি, তবু তাওবার পথে হাঁটা শুরু করতেই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেন। এখান থেকে আমরা শিখি, গুনাহ যত বড়ই হোক, আল্লাহর ক্ষমার তুলনায় তা সামান্য। শুধু ফিরে আসার সদিচ্ছা থাকতে হবে।

আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার তাওবার জন্য কতটা অপেক্ষা করেন, তা রাসূলুল্লাহ সা. এভাবে বলেছেন:

আল্লাহ হাত প্রসারিত করে রাখেন

إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ، وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ، حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا

অনুবাদ: আল্লাহ তাআলা রাতে নিজের হাত প্রসারিত করেন, যাতে দিনের অপরাধী তাওবা করে। আর দিনে নিজের হাত প্রসারিত করেন, যাতে রাতের অপরাধী তাওবা করে। এ ধারা চলতে থাকবে সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া পর্যন্ত। বর্ণনাকারী: আবু মূসা আশআরী রা. -সহীহ মুসলিম ২৭৫৯ | মান: সহীহ

সবশেষে সেই হাদীসে কুদসী, যা পড়ে কোনো গুনাহগার আর নিরাশ থাকতে পারে না। আনাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন:

পৃথিবীভরা গুনাহের বিনিময়ে পৃথিবীভরা ক্ষমা

قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: يَا ابْنَ آدَمَ، إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ مِنْكَ وَلَا أُبَالِي. يَا ابْنَ آدَمَ، لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ وَلَا أُبَالِي. يَا ابْنَ آدَمَ، إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكُ بِي شَيْئًا لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةً

অনুবাদ: আল্লাহ তাআলা বলেন, হে আদমসন্তান, তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে আশা রাখবে, তোমার যা কিছুই ঘটে থাকুক, আমি তোমাকে ক্ষমা করব, আর আমি পরোয়া করি না। হে আদমসন্তান, তোমার গুনাহ যদি আকাশের মেঘমালা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করব, আর আমি পরোয়া করি না। হে আদমসন্তান, তুমি যদি পৃথিবীভরা গুনাহ নিয়েও আমার সামনে আস, তবে শর্ত হলো আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না, আমি তোমার কাছে আসব সেই পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে। বর্ণনাকারী: আনাস রা. -জামে তিরমিযী ৩৫৪০ | মান: হাসান

পৃথিবীভরা গুনাহের বিপরীতে পৃথিবীভরা ক্ষমা। শর্ত শুধু একটি: আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করা। এই একটি শর্তই প্রমাণ করে, তাওহীদই মুক্তির ভিত্তি।

◆ গুনাহের বোঝা নিয়ে আল্লাহর দিকে ফেরা

রহমতের এই সুসংবাদ শুনে কেউ যেন গুনাহকে হালকা না ভাবে। প্রকৃত মুমিনের অবস্থা কেমন হয়, তা বর্ণনা করেছেন সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.:

পাহাড়ের নিচে বসা মানুষের ভয়

إِنَّ الْمُؤْمِنَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَأَنَّهُ قَاعِدٌ تَحْتَ جَبَلٍ يَخَافُ أَنْ يَقَعَ عَلَيْهِ، وَإِنَّ الْفَاجِرَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَذُبَابٍ مَرَّ عَلَى أَنْفِهِ فَقَالَ بِهِ هَكَذَا

অনুবাদ: মুমিন তার গুনাহকে এমনভাবে দেখে, যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং ভয় পাচ্ছে পাহাড়টি তার উপর ভেঙে পড়বে। আর পাপাচারী তার গুনাহকে দেখে একটি মাছির মতো, যা তার নাকের উপর দিয়ে উড়ে গেল, সে হাত দিয়ে এভাবে তাড়িয়ে দিল। -সহীহ বুখারী ৬৩০৮ (ইবনে মাসউদ রা.-এর বাণী) | মান: সহীহ

এই ভয়ই মুমিনকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং ভুল হয়ে গেলে আল্লাহর দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যায়। আলেমগণ তাওবা কবুলের শর্ত হিসেবে বলেছেন, প্রথমে গুনাহ ছেড়ে দিতে হবে, কৃতকর্মের জন্য অন্তরে অনুতপ্ত হতে হবে এবং ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। গুনাহটি কোনো মানুষের হকের সাথে জড়িত হলে তার হক ফিরিয়ে দিতে হবে বা ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে (ইমাম নববী, রিয়াযুস সালিহীন, তাওবা অধ্যায়)।

সতর্কবার্তা

ক্ষমার আশা নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করে যাওয়া আল্লাহর পাকড়াও থেকে নির্ভয় হওয়ার শামিল। কবীরা গুনাহের জন্য জাহান্নামের শাস্তি সত্য। জাহান্নামের এক মুহূর্তের আযাবও সহ্য করার নয়। আল্লাহ ক্ষমা করবেন কি না, সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। তাই মুমিনের কাজ হলো ভয় ও আশার মাঝখানে থেকে দ্রুত তাওবা করা এবং নেক আমলে নিজেকে ব্যস্ত রাখা।

◆ যাঁরা এই মত প্রচার করেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে দরদভরা কিছু কথা

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, যাঁরা কবীরা গুনাহকারীকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী বলে প্রচার করেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে এই কথাগুলো লিখছি কোনো তর্কের জন্য নয়, ভালোবাসা ও শুভকামনা থেকে। আমরা ধরে নিই, আপনাদের নিয়ত ভালো। আপনারা গুনাহের ভয়াবহতা মানুষকে জানাতে চান, মানুষ যেন আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসে, এই আকুলতা থেকেই আপনাদের কথা বলা। এই দরদ ও আল্লাহভীতি অবশ্যই মূল্যবান। আমরা সবাই গুনাহগার, আমাদের কেউই নিজেকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করতে পারি না। তাই আসুন, দুজন ভাই পাশাপাশি বসে যেভাবে আলাপ করে, সেভাবে কয়েকটি বিষয় ভেবে দেখি।

এক. ভয়ের সাথে আশা না থাকলে মানুষ ভেঙে পড়ে

গুনাহের ভয় দেখানো দীনের অংশ। কিন্তু ভয়ের সাথে আশা না থাকলে তা মানুষকে সংশোধন করে না, ভেঙে দেয়। যে বান্দাকে বলা হয়, তোমার তাওবাতেও লাভ নেই, তুমি চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, সে ভাবে, তাহলে আর চেষ্টা করে কী হবে? এভাবে আমাদের অজান্তেই আমরা একজন দুর্বল মুমিনকে গুনাহের আরও গভীরে ঠেলে দিই। অথচ আল্লাহ নবী ইয়াকুব আ.-এর মুখে আমাদের শিখিয়েছেন:

নিরাশা কাফিরদের স্বভাব

يَا بَنِيَّ اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِن يُوسُفَ وَأَخِيهِ وَلَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ

অনুবাদ: হে আমার পুত্ররা, তোমরা যাও, ইউসুফ ও তার ভাইয়ের খোঁজ নাও এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। কাফির সম্প্রদায় ছাড়া কেউ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। -সূরা ইউসুফ ১২:৮৭

দুই. দলিলগুলো একসাথে পড়লে সুন্দর সামঞ্জস্য ফুটে ওঠে

আপনারা যেসব আয়াতকে দলিল হিসেবে পেশ করেন, যেমন সূরা নিসার ৯৩ নম্বর আয়াত, সেগুলোর মর্যাদা আমরা অস্বীকার করি না। প্রশ্ন শুধু বোঝার পদ্ধতির। কুরআনের এক অংশ অন্য অংশের ব্যাখ্যা করে, আর সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যা দেয়। একদিকে আছে “খালিদীনা ফীহা”-র আয়াত, অন্যদিকে আছে সূরা নিসার ৪৮ নম্বর আয়াত এবং সেই সহীহ হাদীসসমূহ, যেখানে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানওয়ালাকেও জাহান্নাম থেকে বের করে আনার কথা আছে। এই দুই শ্রেণির দলিল একসাথে রাখলে সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী আলেমগণের বোঝা পথেই সামঞ্জস্য হয়, যা আমরা আগে আলোচনা করেছি। এক শ্রেণির দলিল নিয়ে অন্য শ্রেণিকে বাদ দিলে কুরআন-সুন্নাহর সুসমন্বিত রূপ হারিয়ে যায়।

আমরা বিনীতভাবে অনুরোধ করব, ইমাম তাহাবীর আকীদা, ইমাম নববীর সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যা এবং ইবনে কাসীরের তাফসীরে এই আয়াত ও হাদীসগুলোর আলোচনা একবার মনোযোগ দিয়ে পড়ে দেখুন। আর নির্ভরযোগ্য আলেমদের সাথে খোলা মনে বসুন। সত্যের সামনে মাথা নত করার মধ্যেই আলেমের প্রকৃত সৌন্দর্য।

তিন. তাকফীরের ভয়াবহ পরিণতি

এই মতের সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি হলো, কবীরা গুনাহকারীকে ঈমানহীন বা কাফির বলার দিকে এগিয়ে যাওয়া। রাসূলুল্লাহ সা. এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন:

ভাইকে কাফির বলার পরিণতি

أَيُّمَا رَجُلٍ قَالَ لِأَخِيهِ: يَا كَافِرُ، فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا، إِنْ كَانَ كَمَا قَالَ وَإِلَّا رَجَعَتْ عَلَيْهِ

অনুবাদ: কোনো ব্যক্তি যদি তার ভাইকে বলে, হে কাফির, তবে তাদের দুজনের একজনের উপর তা বর্তায়। সে যদি তা-ই হয় যা সে বলেছে (তাহলে ঠিক), অন্যথায় কথাটি বক্তার দিকেই ফিরে আসে। বর্ণনাকারী: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. -সহীহ বুখারী ৬১০৪; সহীহ মুসলিম ৬০ | মান: সহীহ

তাই যে ধারণা মানুষকে মুসলিম ভাইয়ের ঈমান নিয়ে সন্দেহের দিকে নিয়ে যায়, তা থেকে অত্যন্ত সতর্ক থাকা দরকার।

চার. নববী দাওয়াতের কোমলতা

রাসূলুল্লাহ সা. গুনাহগারদের সাথে কেমন আচরণ করেছেন, একটু ভাবুন। এক সাহাবী বারবার মদ পান করে ধরা পড়তেন এবং শাস্তি পেতেন। একদিন এক লোক তাকে লানত করল। তখন নবী সা. যা বললেন:

গুনাহগার সাহাবীর প্রতি নবীজির আচরণ

أَنَّ رَجُلًا كَانَ يُدْعَى عَبْدَ اللَّهِ، وَكَانَ يُلَقَّبُ حِمَارًا، وَكَانَ يُضْحِكُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، وَكَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم قَدْ جَلَدَهُ فِي الشَّرَابِ، فَأُتِيَ بِهِ يَوْمًا فَأَمَرَ بِهِ فَجُلِدَ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ: اللَّهُمَّ الْعَنْهُ، مَا أَكْثَرَ مَا يُؤْتَى بِهِ. فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: لَا تَلْعَنُوهُ، فَوَاللَّهِ مَا عَلِمْتُ إِنَّهُ يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ

অনুবাদ: আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি, যাকে “হিমার” উপাধি দেওয়া হতো, সে রাসূলুল্লাহ সা.-কে হাসাত। নবী সা. মদ পানের অপরাধে তাকে বেত্রাঘাত করেছিলেন। একদিন তাকে আবার আনা হলো এবং নির্দেশ দেওয়া হলো, ফলে তাকে বেত্রাঘাত করা হলো। উপস্থিত লোকদের একজন বলল, হে আল্লাহ, তার উপর লানত করুন, তাকে কতবার আনা হচ্ছে! তখন নবী সা. বললেন, তাকে লানত করো না। আল্লাহর কসম, আমি তো জানি সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। বর্ণনাকারী: উমর ইবনুল খাত্তাব রা. -সহীহ বুখারী ৬৭৮০ | মান: সহীহ

বারবার কবীরা গুনাহে ধরা পড়া মানুষটি সম্পর্কেও নবীজির ঘোষণা ছিল ভালোবাসার। তিনি তাকে ঈমানের বৃত্ত থেকে বের করে দেননি, বরং তার অন্তরে আল্লাহ ও রাসূলের ভালোবাসার সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই কোমলতাই আল্লাহ আমাদের দাওয়াতের পদ্ধতি হিসেবে শিখিয়েছেন:

হিকমত ও উত্তম উপদেশের পথ

ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ

অনুবাদ: আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন উত্তম পদ্ধতিতে। নিশ্চয়ই আপনার রবই ভালো জানেন কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, আর তিনিই ভালো জানেন কারা হেদায়াতপ্রাপ্ত। -সূরা আন-নাহল ১৬:১২৫

সহজ করো, সুসংবাদ দাও

يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا

অনুবাদ: তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, মানুষকে বিতাড়িত করো না। বর্ণনাকারী: আনাস রা. -সহীহ বুখারী ৬৯; সহীহ মুসলিম ১৭৩৪ | মান: সহীহ

শেষ আবেদন

আমরা আপনাদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখি না। আমরা চাই, আপনাদের সেই আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি সঠিক জ্ঞানের আলোয় আরও সুন্দর ফল দিক। আপনাদের বক্তব্যে গুনাহের ভয়াবহতা থাকুক, আর সেই সাথে থাকুক রহমতের সুসংবাদ ও তাওবার আহ্বান। তাহলে যে ভাঙা মানুষটি আজ আপনাদের কথা শুনছে, সে নিরাশ হয়ে ফিরে যাবে না, বরং অশ্রুভেজা চোখে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসবে। আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, সঠিক পথ বুঝে চলার তাওফীক দিন এবং আমাদের সবাইকে সিরাতে মুস্তাকীমের উপর অটল রাখুন। আমীন।

◆ উপসংহার: ফিরে আসার ডাক

কবীরা গুনাহকারী মুমিন চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, এ কথা সঠিক নয়। তাওহীদের উপর মৃত্যুবরণকারী মুমিনের পরিণাম জান্নাত। আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করবেন, চাইলে গুনাহ অনুযায়ী শাস্তি দিয়ে পরে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন। চিরস্থায়ী জাহান্নাম কেবল কাফির ও মুশরিকদের জন্য।

তাই যে ভাই বা বোন আজ অতীতের কোনো ভুলে ভেঙে পড়েছেন, তাকে বলি, নিরাশ হবেন না। শয়তান চায় আপনি ভাবুন, আপনার জন্য আর কোনো দরজা খোলা নেই। অথচ আপনার প্রভুর দরজা এখনো খোলা। তিনি রাতে হাত বাড়িয়ে আপনার অপেক্ষায় আছেন। উঠুন, অযু করুন, দুই রাকআত নামায পড়ুন এবং সেই প্রথম মানুষ আদম আ.-এর ভাষায় আল্লাহকে ডাকুন:

আদম আ.-এর দুআ

قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

অনুবাদ: তাঁরা দুজন (আদম ও হাওয়া আ.) বললেন, হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের উপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব। -সূরা আল-আরাফ ৭:২৩


আর ক্ষমার সবচেয়ে সুন্দর আবেদনটি রাসূলুল্লাহ সা. আম্মাজান আয়েশা রা.-কে শিখিয়েছিলেন, যা ছোট্ট অথচ বিশাল:
ক্ষমার সবচেয়ে সুন্দর দুআ

قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَرَأَيْتَ إِنْ عَلِمْتُ أَيُّ لَيْلَةٍ لَيْلَةُ الْقَدْرِ مَا أَقُولُ فِيهَا؟ قَالَ: قُولِي: اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

অনুবাদ: আয়েশা রা. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি যদি জানতে পারি কোন রাতটি লাইলাতুল কদর, তাহলে সেই রাতে কী বলব? তিনি বললেন, তুমি বলো: হে আল্লাহ, আপনি অতি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। -জামে তিরমিযী ৩৫১৩; সুনানে ইবনে মাজাহ ৩৮৫০ | মান: সহীহ


আল্লাহ আমাদের সবাইকে গুনাহ থেকে বাঁচার তাওফীক দিন, ভুল হয়ে গেলে খাঁটি তাওবার সাথে তাঁর দিকে ফিরে আসার সৌভাগ্য দিন এবং তাওহীদ ও ঈমানের উপর মৃত্যু দান করুন। আমীন।

◆ সূত্রসমূহ

১. আল-কুরআনুল কারীম: সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৫-১৩৬; সূরা নিসা ৪:৩১, ৪:৪৮, ৪:৯৩, ৪:১১৬; সূরা মায়েদা ৫:৭২; সূরা আরাফ ৭:২৩; সূরা ইউসুফ ১২:৮৭; সূরা হিজর ১৫:৪৯-৫০; সূরা নাহল ১৬:১২৫; সূরা ফুরকান ২৫:৬৮-৭০; সূরা যুমার ৩৯:৫৩
২. সহীহ বুখারী: হাদীস ১৮, ২২, ৪৪, ৬৯, ২৭৬৬, ৩৪৭০, ৫৮২৭, ৫৯৯৯, ৬০০০, ৬১০৪, ৬৩০৮, ৬৫৬০, ৬৭৮০; কিতাবুত তাফসীর (সূরা ফুরকান)
৩. সহীহ মুসলিম: হাদীস ৬০, ৮৯, ৯৪, ১৮৪, ১৯৩, ১৭০৯, ২৭৫২, ২৭৫৪, ২৭৫৯, ২৭৬৬, ১৭৩৪; কিতাবুল ঈমান
৪. সুনানে আবু দাউদ: হাদীস ৪৭৩৯
৫. জামে তিরমিযী: হাদীস ২৪৩৫, ৩৫১৩, ৩৫৪০
৬. সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস ৩৮৫০, ৪৩১০
৭. আল-আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ, ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী রহ.
৮. রিয়াযুস সালিহীন, ইমাম নববী রহ.: তাওবা অধ্যায়
৯. তাফসীরে ইবনে কাসীর: সূরা নিসা ৪:৪৮, ৪:৯৩; সূরা ফুরকান ২৫:৭০; সূরা যুমার ৩৯:৫৩

মন্তব্য ১২ টি রেটিং +৬/-০

মন্তব্য (১২) মন্তব্য লিখুন

১| ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫৮

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: আল্লাহ আমাদের সবাইকে নেক আমল করার তৌফিক দিন। আপনি আল্লাহর বাণী প্রচার করে দ্বীনের খেদমত করছেন দেখে ভালো লাগলো। আপনার সুস্থতা কামনা করছি ।

০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৫১

নতুন নকিব বলেছেন:



জাযাকাল্লাহু খাইরান, প্রিয় ভাই। আপনার আন্তরিক দোয়া ও ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ নিয়তে দ্বীনের খেদমত করার, নিজের জীবনে আল্লাহর বাণী বাস্তবায়ন করার এবং ইখলাসের সঙ্গে নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

২| ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:০৪

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



আপনার মুল্যবান লেখাটি পাঠে আস্যস্থ হলাম জেনে রহমতের দুয়ার এখনো খোলা। ।লেখাটি প্রিয়তে গেল।
তবু পুরা লেখাটি পাঠে এক অনুতপ্ত বান্দার আর্তি ও আল্লাহর অসীম ক্ষমার প্রত্যাশায় লিখলাম কবিতা একটা।

নিশীথ রাতের নীরব প্রহর, আঁধার ঘেরা ঘর
জায়নামাযে বসে কাঁদে এক পাপী বান্দার অন্তর
অতীত দিনের ভুলগুলো সব চোখের সামনে ভাসে
বুকের ভেতর ব্যথার পাহাড়, অশ্রু ঝরে আসে।

হে আমার রব! কত যে পাপ করেছি অবহেলে
কতবার যে ফিরেছি আমি শয়তানেরই ছলে
জানি আমি অপরাধী, জানি আমি গুনাহগার
তবুও তোমার রহমতেরই ভিক্ষুক বারবার।

হে আল্লাহ, তুমি ক্ষমাশীল, তুমি দয়ার সাগর
তোমার রহমত ছায়া দেয় এই পাপীর অন্তর
যতই হোক গুনাহের বোঝা, যতই আঁধার রাত
তোমার দয়ার দুয়ার খোলা ফিরতে দাও মোনাজাত।

একশ ভাগের এক ভাগ দয়া ছড়িয়ে দিলে ধরায়
মায়ের বুকে সন্তানেরা ঘেরা তোমার সেই দয়ায়
নিরানব্বই ভাগ রহমত রেখেছ তুমি সঞ্চয়ে
কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে বান্দার মুক্তির আশায়।

কবীরা গুনাহ আগুনসম, জ্বালায় ঈমানের প্রাণ
সুদ, যিনা আর অন্যায় হত্যা করে জীবন খানখান
ইয়াতীমের হক গ্রাস করা, মিথ্যা অপবাদ
এসব থেকে বাঁচতে হবে এটাই দ্বীনের আহ্বান।

ভয়ের মাঝে আশা রাখি, আশার মাঝে ভয়
মুমিনের এই পথ চলাতেই রবের সন্তুষ্টি হয়
গুনাহ করে বলব না আর, ক্ষমা তো হবেই শেষে
বরং পাপের ভয়েই কাঁদব তোমার আরশের দেশে।

শিরক থেকে বাঁচিয়ে রেখো, তাওহীদ দিও প্রাণে
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ থাকুক আমার হৃদয়খানে
সরিষা দানার মতো ঈমান যদি থাকে অন্তরে,
তোমার দয়ার আশায় থাকি আখিরাতের প্রান্তরে।

হে আল্লাহ, আমার গুনাহ আকাশ ছুঁয়ে যায়
তবু তোমার ক্ষমার আশা হৃদয়েতে রয়
তুমি যদি ক্ষমা না করো, কোথায় যাব আমি?
তুমি ছাড়া নেই তো আমার দয়াময় কোনো স্বামী।

দিনের পাপে রাতের বুকে তাওবার ডাক আসে
রাতের পাপে দিনের আলো ক্ষমার আশা ভাসে
যতদিন না পশ্চিম আকাশে সূর্য উদয় হয়
তাওবার দুয়ার খোলা থাকে এটাই বড় আশ্রয়।

হে প্রিয় রাসুল কিয়ামতের সেই কঠিন ময়দানে
আপনার শাফায়াত চাই যে আমরা গুনাহগার প্রাণে
আপনার উম্মত হয়ে যেন হারিয়ে না যাই পথে
আল্লাহর রহমত চাই আমরা আপনার সাথে।

শেষ নিশ্বাসে ঈমান রেখো, রেখো তাওহীদ বুকে
কবর যেন আলোকিত হয় তোমার রহমতের সুখে
জান্নাতের সেই শীতল ছায়ায় দিও ঠাঁই আমায়
নদীর ধারে শান্তির জীবন দিও তোমার দয়ায়।

আমাদের ক্ষমা করো রব, আমাদের তাওবা কবুল করো
অন্তর থেকে অহংকার ও পাপের কালিমা দূর করো
তাওহীদের উপর জীবন দিও, তাওহীদের উপর মরণ
জান্নাতুল ফিরদাউসে হোক আমাদের শেষ আশ্রয় ও মিলন।

আমিন, ইয়া রাব্বুল আলামিন।

শুভেচ্ছা রইল

০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৫২

নতুন নকিব বলেছেন:



প্রিয় ডঃ এম এ আলী ভাই, আপনার সুন্দর অনুভূতিপূর্ণ কবিতার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। একজন অনুতপ্ত বান্দার হৃদয়ের আকুতি ও আল্লাহর অসীম রহমতের প্রতি প্রত্যাশা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

নিশ্চয়ই, মানুষের গুনাহ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও ব্যাপক। তবে ক্ষমার প্রত্যাশার পাশাপাশি আন্তরিক তাওবা, গুনাহ পরিহার এবং নেক আমলের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখতে হবে।

আল্লাহ তাআ'লা আমাদের সবাইকে তাঁর রহমত ও মাগফিরাত লাভের তাওফিক দিন এবং ঈমানের সঙ্গে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।

৩| ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৪৯

সুলাইমান হোসেন বলেছেন: গুনাহের পাহাড়ের নিচে চাঁপা পড়ে আছে।এখান থেকে কি উদ্ধার হতে পারবো।আমার অন্তরের অবস্তা হলো রহমতের আশা কমে যাচ্ছে আযাবের ভয় বেড়ে যাচ্ছে।অথচ গুনাহের মধ্যে ডুবে আছি।অনেকবার তওবা করছে,কিন্তু যথাসময়ে তওবা ভেঙে যায়।দুই তিন মিনিটের ধৈর্যের অভাবে এত বড় তওবাও ভেঙে যাচ্ছে।
একজন বান্দা।সে নামাজের পরে গভীর মনোযোগের সাথে হুজুরে ক্বলবের সাথে অন্তরে শুধু আল্লাহকে রেখে অন্য সবকিছু ভুলে যেয়ে গুনাহ মুক্তির প্রার্থনা জানাচ্ছে।তবুও প্রবৃত্তির নিকট বারবার ধরাশায়ী হচ্ছে।

এখানে আমরা কি বলব,১।তার দোয়া কবুল হচ্ছেনা?

২।নাকি আল্লাহ এমনটা চাচ্ছেন?

দুইটাই তো অসম্ভব।১ নাম্বারটা অবশ্য সম্ভব হতে পারে।যদি দোয়াকারী ব্যাক্তি হারামখোর বেনামাজি হয়,তাহলেতো তার দোয়া কবুল হবেনা।কিন্তু আমি জানি সে হারামখোর বেনামাজি নয়?গোপন বিষয় আল্লাহই ভালো জানেন।

২।তাহলে কি আল্লাহ তায়ালাই চাচ্ছেন।বান্দা গোনাহ করতে থাকুক এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকুক,।
আমার মতে এটাও অসম্ভব।

আরেকটি সম্ভাবনা,আল্লাহ হয়ত এমন বান্দার কার্যকলাপে অসন্তুুষ্ট।যেকারনে তাকে তার নফসের উপর ছেড়ে দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হলো,এই ব্যাক্তির বাঁচার উপায় কি,যে গুনাহ থেকে মুক্ত পবিত্র হতে চাচ্ছে কিন্তু পারছেনা?

১।সে কি নিজের উপর রাগ করে মহা সাধনায় আত্মনিয়োগ করবে?
২।নাকি রাগ করে দোয়া করা ছেড়ে দিবে,ইবাদত বন্দেগী ছেড়ে দিবে? দুটি প্রশ্ন

০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৭

নতুন নকিব বলেছেন:



সুলাইমান হোসেন ভাই, প্রথমেই বলব, আপনি যত বড় গুনাহগারই হোন না কেন, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কোনো অধিকার আপনার নেই। কারণ, আল্লাহ তাআলার অমোঘ ঘোষনায় তিনি বলেন:

لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا

অর্থ: তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। —সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩।

আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর সংক্ষেপে দিচ্ছি।

১. বারবার তওবা ভেঙে গেলে কি আগের দোয়া কবুল হয়নি?

মোটেও তা নয়। দোয়া কবুল হওয়া আর কোনো বিশেষ গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া এক বিষয় নয়। আল্লাহ কখন, কীভাবে বান্দার দোয়ার প্রতিদান দেবেন, তা তিনিই ভালো জানেন।

২. আল্লাহ কি চান বান্দা গুনাহ করতে থাকুক আর ক্ষমা চাইতে থাকুক?

না। আল্লাহ গুনাহ পছন্দ করেন না। তবে তিনি বান্দার তওবা ও প্রত্যাবর্তন পছন্দ করেন। সহিহ মুসলিমের ২৭৪৭ নম্বর হাদিসে আল্লাহর কাছে বান্দার তওবার আনন্দের কথা বর্ণিত হয়েছে।

৩. আল্লাহ কি অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে নফসের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন?

এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো সুযোগ নেই। কারও বারবার পাপে পতিত হওয়া মানেই আল্লাহ তাকে পরিত্যাগ করেছেন, এমন নয়। বরং তার উচিত আরও বেশি করে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া।

৪. এখন তার করণীয় কী?

- গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে তওবা করতে হবে।
- যে পরিবেশ, সঙ্গ, অভ্যাস বা উপকরণ তাকে গুনাহের দিকে নিয়ে যায়, সেগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে।
- গুনাহের প্রবণতা তৈরি হওয়ার আগেই নিজেকে সামলানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
- নফসের বিরুদ্ধে ধৈর্যসহকারে সাধনা চালিয়ে যেতে হবে।
- প্রতিবার পতিত হলেও আবার উঠে দাঁড়াতে হবে।

৫. রাগ করে কি দোয়া ও ইবাদত ছেড়ে দেবে?

কখনোই নয়। এটি হবে শয়তানের কাছে আত্মসমর্পণ। গুনাহের কারণে নামাজ, দোয়া ও ইবাদত ছেড়ে দেওয়া সমস্যার সমাধান নয়; বরং পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করবে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ»

অর্থ: আদম সন্তানের প্রত্যেকেই পাপী, আর পাপীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো যারা বেশি বেশি তওবা করে। —সুনান তিরমিজি, হাদিস ২৪৯৯।

সবশেষে একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, শয়তান প্রথমে মানুষকে গুনাহে লিপ্ত করে, অতঃপর সেই গুনাহের কারণে তাকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করতে চায়। শয়তানের দ্বিতীয় কৌশলের কাছে কখনো পরাজিত হওয়া যাবে না।

আজ তওবা করে কাল আবার ভুল হয়ে গেলে, কাল আবার তওবা করুন। তবে তওবাকে কখনো গুনাহ করার অনুমতিপত্র বানানো যাবে না। প্রতিবার তওবার সময় গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার প্রকৃত সংকল্প থাকতে হবে।

আপনি গুনাহের কারণে আল্লাহর নিকট থেকে পালিয়ে যাবেন না; বরং গুনাহ নিয়েই আল্লাহর দরজায় ফিরে আসবেন। কারণ গুনাহ থেকে মুক্তির আশ্রয় আল্লাহর দরজার বাইরে কোথাও নেই। শেষ আশ্রয়স্থল তিনিই। তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন। তিনি ছাড়া আসলে আর কেউ নেই, কিছু নেই। আল্লাহ আপনাকে এবং আমাদেরকে পবিত্র জীবন ও নফসের বিরুদ্ধে বিজয় দান করুন। আমিন।

৪| ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:১৩

সুলাইমান হোসেন বলেছেন: @ব্লগার সত্যপথিক শাইয়্যান ভাইয়ের একটি বিখ্যাত আইডিয়া রয়েছে,"গুনাহ করার থেকে ঘুমিয়ে থাকা অনেক ভালো।", আইডিয়াটা কি সঠকি নাকি ভুল।কারন আমি অধিকাংশ সময়েই ঘুমিয়ে কাটাই।এবং নিজেকে আহলে কাহফের যুবকদের বুঝ দেই।তারা তো তিন শত নয় বছর ঘুমিয়ে ছিলো।অথচ তারা ইমানদার ছিলো।তাদের কি নেক আমলের প্রতি কোনো লোভ ছিলোনা।নাকি তাদের ঘুমের মধ্যেও নেকি হইতেছিলো।আমাদের ঘুমের মধ্যেও কি তাদের মতো মর্যাদা বাড়তে থাকবে, নাকি ঘুমের সময়টা বেহুদাই গেলো।

আমার মতে,যদি আমরা ইমানদার হই,তাহলে আমাদের ঘুমের মধ্যেও নেকি হতে থাকবে,রুহানী মর্যাদা বাড়তে থাকবে,যেমন আহলে কাহফের ক্ষেত্রে ঘটেছিলো আপনার মত জানতে চাচ্ছি।

এই প্রশ্নটা এজন্য মনে এলো,আমার ডিউটি টাইমের ফাঁকে প্রচুর বিরতি বা অবসর সময় থাকে,এজন্য আমি অধিকাংশ সময়েই ঘুমিয়ে কাটাই।এজন্য প্রশ্নটা করলাম,প্রশ্নটা বিরক্তিকর হলে দুঃখিত।

০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৩৭

নতুন নকিব বলেছেন:



সুলাইমান হোসেন ভাই, আশা করছি আপনি কুশলে আছেন। এখানে আপনার প্রশ্ন আসলে একটি নয়। একাধিক। আর আপনার প্রশ্নগুলো মোটেও বিরক্তিকর নয়; বরং এটি ঈমান, আমল, সময়ের মূল্য এবং ইসলামের দৃষ্টিতে ঘুমের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার প্রকাশ। তবে আপনার বক্তব্যের মধ্যে একটি বিষয়ে সংশোধন প্রয়োজন। সেটি হলো, ঈমানদার হলেই ঘুমের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেকি বৃদ্ধি পেতে থাকবে কিংবা রুহানি মর্যাদা বাড়তে থাকবে, ইসলামে এমন কোনো সাধারণ নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়নি।

আহলে কাহফ বা আসহাবে কাহফের ঘটনা অবশ্যই আমাদের জন্য ঈমানের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। কিন্তু তাঁদের বিশেষ অবস্থাকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ঘুমের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক হবে না। চলুন, একে একে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেখে নিতে চেষ্টা করি-

১. গুনাহ করার চেয়ে ঘুমিয়ে থাকা কি উত্তম?

কথাটি একটি নির্দিষ্ট অর্থে সঠিক, কিন্তু সার্বিকভাবে সঠিক নয়। কোনো ব্যক্তি যদি এমন পরিস্থিতিতে থাকে, যেখানে জেগে থাকলে সে গুনাহে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করে, তাহলে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য ঘুমিয়ে থাকা অবশ্যই ভালো হতে পারে। কারণ গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাও ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু একজন মুমিনের জীবনের উদ্দেশ্য শুধু গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নেক আমল করা, মানুষের উপকার করা এবং নিজের দায়িত্ব পালন করাও তার কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ»

অর্থ: দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হলো সুস্থতা ও অবসর। —সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪১২।

লক্ষ করুন, এখানে অবসর সময়কে একটি মূল্যবান নিয়ামত বলা হয়েছে। এই সময়কে যথাযথ কাজে লাগানো উচিত। সুতরাং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য ঘুমানো ভালো হতে পারে, কিন্তু নেক আমলের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অভ্যাসগতভাবে সময় নষ্ট করা কোনো আদর্শ মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়।

২. আহলে কাহফ কি ইবাদত না করে ঘুমিয়ে ছিলেন?

আল্লাহ তাআলা সূরা আল-কাহফে তাঁদের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন:

«فَضَرَبْنَا عَلَىٰٓ ءَاذَانِهِمْ فِى ٱلْكَهْفِ سِنِينَ عَدَدًا»

অর্থ: অতঃপর আমরা গুহায় তাঁদের বহু বছর ঘুমন্ত অবস্থায় রাখলাম। —সূরা আল-কাহফ, ১৮:১১।

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন:

«وَلَبِثُوا فِى كَهْفِهِمْ ثَلَاثَ مِا۟ئَةٍ سِنِينَ وَٱزْدَادُوا تِسْعًا»

অর্থ: তারা তাদের গুহায় তিনশ বছর অবস্থান করেছিল এবং আরও নয় বছর বেশি। —সূরা আল-কাহফ, ১৮:২৫।

এখানে একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। আহলে কাহফ সাধারণ কোনো ঘুমের মধ্যে ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন আল্লাহর বিশেষ কুদরতের অধীনে। তাঁদের ঘুম ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নিদর্শন এবং ঈমান রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। তাঁদের মর্যাদা ঘুমানোর কারণে সৃষ্টি হয়নি; বরং তাঁদের ঈমান, তাওহিদ, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং ঈমান রক্ষার জন্য ত্যাগের কারণেই তাঁরা মর্যাদাবান হয়েছেন। আল্লাহ তাঁদের সম্পর্কে বলেন:

«إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ ءَامَنُوا۟ بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَٰهُمْ هُدًى»

অর্থ: নিশ্চয়ই তারা ছিল কয়েকজন যুবক, যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের হিদায়াত বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম। —সূরা আল-কাহফ, ১৮:১৩।

খেয়াল করুন, আল্লাহ তাঁদের ঈমান ও হিদায়াতের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের ঘুমকে নেক আমলের সাধারণ কোনো পদ্ধতি হিসেবে উপস্থাপন করেননি।

৩. ঘুমের মধ্যেও কি নেকি অর্জিত হতে পারে?

হ্যাঁ, ঘুমের মধ্যেও একজন মুমিন সওয়াবের অধিকারী হতে পারেন। তবে বিষয়টি বুঝতে হবে। ইসলামে নিয়তের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ»

অর্থ: নিশ্চয়ই সকল কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। —সহিহ বুখারি, হাদিস ১।

ধরুন, একজন মানুষ সারাদিন আল্লাহর ইবাদত, জীবিকার দায়িত্ব পালন এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। রাতে তিনি এই নিয়তে ঘুমালেন যে, শরীরকে বিশ্রাম দিয়ে আবার ফজরের নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয় করবেন। তাঁর এই ঘুমও নেক নিয়তের কারণে সওয়াবের কারণ হতে পারে, ইনশাআল্লাহ। কিন্তু এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখতে হবে:

- ঘুমের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিটি মুহূর্তে নেকি লেখা হচ্ছে, এমন কথা বলার সুযোগ নেই।
- আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিশ্রাম নেওয়া সওয়াবের কারণ হতে পারে।
- ঘুমের কারণে যদি ফরজ ইবাদত ছুটে যায় কিংবা মানুষের হক নষ্ট হয়, তাহলে সেই ঘুম প্রশংসনীয় নয়।

অর্থাৎ, ঘুম নিজে ইবাদত নয়; বরং সঠিক নিয়ত ও উদ্দেশ্যের কারণে ঘুমও সওয়াবের মাধ্যম হতে পারে।

৪. অধিক ইবাদতের জন্য শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া কি জরুরি?

অবশ্যই। ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজনকে অস্বীকার করে না। একটি সুন্দর ঘটনা রয়েছে।

হজরত সালমান ফারসি (রা.) একবার হজরত আবু দারদা (রা.)-কে বলেছিলেন:

«إِنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، فَأَعْطِ كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ»

অর্থ: তোমার ওপর তোমার রবের অধিকার রয়েছে, তোমার নিজেরও অধিকার রয়েছে এবং তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। অতএব প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার প্রদান করো।

রাসুলুল্লাহ ﷺ এই কথাকে সমর্থন করে বলেন, সালমান সত্য বলেছেন। —সহিহ বুখারি, হাদিস ১৯৬৮।

এখান থেকে বোঝা যায়, ইসলাম আমাদের সারাক্ষণ ইবাদত করতে কিংবা সারাক্ষণ জেগে থাকতে বলেনি। বরং ইবাদত, বিশ্রাম, পরিবার, জীবিকা এবং মানুষের অধিকার সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে শিখিয়েছে।

৫. আপনার ডিউটির অবসর সময় কীভাবে কাজে লাগানো উচিত?

আপনি বলেছেন, ডিউটির ফাঁকে প্রচুর অবসর সময় পান এবং অধিকাংশ সময় ঘুমিয়ে কাটান। এখানে আমার পরামর্শ হলো, আপনার কর্মস্থলের দায়িত্ব ও প্রতিষ্ঠানের নিয়মের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল থাকবেন। যদি নির্ধারিত বিরতির সময় হয়, তাহলে বিশ্রাম নিতে পারেন। কিন্তু দায়িত্ব পালনের সময় কাজের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত ঘুমিয়ে কাটানো উচিত নয়। অবসর সময়কে কয়েকটি কাজে ভাগ করে নিতে পারেন:

১. প্রতিদিন কিছু সময় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ অধ্যয়নে ব্যয় করুন।

2. নিয়মিত দরুদ শরিফ, ইস্তিগফার ও অন্যান্য মাসনুন জিকির করুন।

3. ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অধ্যয়ন করুন।

4. নিজের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নতুন কিছু শিখুন।

5. সম্ভব হলে মানুষের উপকারে আসে এমন কোনো কাজ করুন।

6. শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম ও ঘুম গ্রহণ করুন।

মনে রাখবেন, আপনার অবসর সময়টুকু হয়তো আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি।

৬. তাহলে আহলে কাহফের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কোথায়?

আহলে কাহফের যুবকেরা ঈমান রক্ষার জন্য নিজেদের পরিবার, সমাজ ও স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁদের সামনে ছিল ঈমান হারানোর ভয়াবহ পরিস্থিতি। আল্লাহ তাঁদের বিশেষভাবে রক্ষা করেছেন। তাঁদের ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়, দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে ঈমানের মূল্য বেশি। কিন্তু তাঁদের মতো ঘুমিয়ে থাকলেই তাঁদের মতো মর্যাদা অর্জিত হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং আমাদের জন্য তাঁদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ঈমানের ওপর অবিচল থাকা, আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ স্বীকার করা।

শেষ কথা

সুলাইমান হোসেন ভাই, আপনার চিন্তার মধ্যে একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। আপনি গুনাহ থেকে বাঁচতে চান এবং ঈমানদার হিসেবে আল্লাহর কাছে মর্যাদা অর্জন করতে চান। এটি প্রশংসনীয়। তবে একটি কথা মনে রাখবেন, গুনাহ না করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নেক আমল করার সুযোগ পেয়েও তা থেকে বিরত থাকা একজন মুমিনের জন্য বড় বঞ্চনা। আমাদের জীবন শুধু গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য।

আপনি যখন কর্মস্থলে অবসর সময় পান, তখন সেই সময়টুকু আল্লাহর স্মরণ, জ্ঞান অর্জন, কুরআন অধ্যয়ন কিংবা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে পারেন। এতে আপনার দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের উপকার হবে।

আসহাবে কাহফের যুবকেরা তিনশ নয় বছর ঘুমিয়ে থেকেও আল্লাহর বিশেষ রহমত ও মর্যাদা লাভ করেছিলেন। কিন্তু আমাদের জন্য সেই মর্যাদা অর্জনের পথ হলো তাঁদের মতো ঈমান, তাওহিদ, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং আনুগত্যের জীবন গড়ে তোলা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করার, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার এবং নেক আমলের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

মৃত্যু পর্যন্ত স্মরণে রাখার মত একটি বিশেষ কথা হচ্ছে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগানোই উদ্দেশ্য নয়; বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উপযোগী করে তোলাই একজন মুমিনের প্রকৃত সার্থকতা।

৫| ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৫৭

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: এই নারী তার সন্তানের প্রতি যতটা দয়ালু,
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি তার চেয়েও অধিক দয়ালু।

................................................................................
এখানে প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে, গাঁজায় এত শিশু ও নারী ( ৭৫ হাজার)
মারা গিয়েছে, সেখানে কেন আল্লাহ তালার দয়ার ,ক্ষমার
আলামত আসছেনা ???

০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯

নতুন নকিব বলেছেন:



স্বপ্নের শঙ্খচিল, প্রশ্নের জন্য মোবারকবাদ। আল্লাহর দয়া ও রহমতের অর্থ এই নয় যে, পৃথিবীতে কোনো বিপর্যয়, মৃত্যু কিংবা অন্যায় ঘটবে না।

ইসলামের দৃষ্টিতে দুনিয়া পরীক্ষার স্থান, চূড়ান্ত প্রতিদান বা বিচারস্থল নয়। গাজার নিরপরাধ শিশু ও নারীদের মৃত্যু আমাদের হৃদয়কে ব্যথিত করে। কিন্তু তাদের ওপর সংঘটিত জুলুম আল্লাহর রহমতের অনুপস্থিতির প্রমাণ নয়; বরং এটি মানুষের নিষ্ঠুরতা ও জালিমদের অপরাধের প্রমাণ।

মনে রাখতে হবে, আল্লাহর রহমত শুধু দুনিয়াবি বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মৃত্যুর পরের জীবন, আখিরাতের প্রতিদান এবং চূড়ান্ত ন্যায়বিচারও তাঁর রহমতের অংশ।

আল্লাহ বলেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৪০)

সুতরাং প্রশ্ন শুধু এটা হওয়া উচিত নয় যে, আল্লাহ কেন তাদের রক্ষা করলেন না; বরং এই প্রশ্নটিই এখানে আরও বেশি গুরুত্ববহ এবং প্রাসঙ্গিক যে, মানুষ কেন এত নিষ্ঠুর হলো এবং আমরা নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতে কী করছি? কতটুকু করতে পারছি? কিংবা, আদৌ পারছি কি না।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নির্যাতিতদের পাশে থাকার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

৬| ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৪

মোস্তফা সোহেল বলেছেন: অনেক ভাল একটি লেখা লিখেছেন।
আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
আল্লাহ যেন আমাদের সকল রকমের গোনাহ থেকে দূরে থাকার তৌফিক দান করেন।আমিন।

৭| ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯

দেশ প্রেমিক বাঙালী বলেছেন: এসব ধর্মীয় কথা লিখলে ফেসবুক ইউটিউব বিজ্ঞানীরা রাগ করে। ব্লগে জ্ঞান বিতরণ করে ধর্মের বিপক্ষে।





ধনবাদ ভালো থাকুন নিরন্তর।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.