| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই এ নিয়ে নানাজনের নানা “জ্ঞানগর্ভ” মারা পোস্ট আর নানারকম রবীন্দ্র বিদ্বেষমূলক পোস্ট প্রায়ই দেখা যায়। এটাও দেখানোর চেষ্টা করা হয় তিনি কতো মুসলমানবিরোধী ছিলেন, কাজী নজরুল ইসলামকেও নাকি তিনি বিষ খাইয়ে পাগল বানিয়ে দিয়েছিলেন। এসব নানা নোংরা অপপ্রচার কদিন পরপরই অনলাইনে দেখা যায়। কিন্তু কথা হচ্ছে এগুলোর ভিত্তি আসলে কোথায়?
আজ ঢাকায় এক নারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে চুনকালি মাখতে গিয়ে। এই যে ঘৃণা, এই যে হিংসা-বিদ্বেষ রবীন্দ্রনাথের প্রতি এগুলোর ব্যাপারে কিছু বলা দরকার।
প্রথম কথা হচ্ছে “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” এসব কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবে কোথায় কোন লেখায় বলেছিলেন এসব প্রশ্নের কোনও যথার্থ উত্তর, সুনিশ্চিত প্রমাণ, দালিলিক প্রমাণ বা ঐতিহাসিক রেফারেন্স কোনটাই কিন্তু কেউ দিতে পারেন না। ইদানিং আবার শুরু হয়েছে কোনও অখ্যাত লেখকের উক্তি বানিয়ে সেটাকে রেফারেন্স হিসেবে চালিয়ে এসব বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করার অপপ্রচেষ্টা। বলা বাহুল্য এসব কুরুচিপূর্ণ মিথ্যা প্রচারের ক্ষেত্রে মূল মোটিভেশন হিসেবে কাজ করছে অন্ধ ভারতবিদ্বেষ।
ইদানিং দেখা যাচ্ছে সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস নামে ভারতীয় এক লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে রবীন্দ্রনাথের এসব কথা আবারো প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা। কথা হচ্ছে এই সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস যে আসলেই এই কথা বলেছিলেন সেটারই বা কোন নিশ্চয়তা আছে? আর যদি সত্যিই বলে থাকেন তাহলেই কি এটা সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়? সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস কোনও বিখ্যাত লেখক নন, কোনও প্রখ্যাত গবেষক নন, কোনও ইতিহাসবিদও নন। ধরে নিলাম সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস এসব কথা বলেছেন। তা সত্বেও তিনি অমন কথা বলে দিলে সেটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য এটা প্রতিষ্ঠা পায় কি করে যেখানে তিনি কোনও প্রখ্যাত গবেষক নন বা প্রখ্যাত কোনও ইতিহাসবিদও নন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে দুই বাংলায় কম লেখালেখি হয়নি, গবেষণাও নিতান্ত কম হয়নি। রবীন্দ্রনাথ যদি এসব কথা বলে থাকতেন তাহলে তাঁর ওপর চালানো সেসব গবেষণায়ও তো এসব তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যেতো। কৈ, সেটাও তো পাওয়া যায়নি।
কথা হচ্ছে এসব কথা বানিয়ে বানিয়ে তো যে কোনও লেখকই এ ধরণের দাবী করতে পারেন যে রবীন্দ্রনাথ এসব বলেছেন। আমাদের দেশে আব্দুল মান্নান নামে এক অখ্যাত লেখকও তার নিজের লেখা এক বইতে এই দাবী করেছিলেন। তবে তিনিও খুব স্বাভাবিকভাবে তার বক্তব্যের সপক্ষে কোনও ঐতিহাসিক/দালিলিক প্রমাণ বা রেফারেন্স দেখাতে পারেন নি। জাস্ট বলেই খালাস যে রবীন্দ্রনাথ অমুক কথা তমুক জায়গায় বলেছেন। এসব কথা যে কোনও লেখক বা গবেষক তো বানিয়ে বানিয়ে দাবী করতেই পারেন। কিন্তু কথা হচ্ছে কোনও ঐতিহাসিক বা দালিলিক প্রমাণ যদি নাই থাকে তাহলে এসব কথা (তা যতো গায়ের জোরেই হোক বা চাপাবাজির জোরেই হোক) তা কী করে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়?
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এই বিশ্ববিদ্যালয়তেই এনে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিলো। তা সে যুগে তিনি যদি অমন কথা বলেই থাকতেন তাহলে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এনে কি সংবর্ধনা দিতো সে যুগের সচেতন ছাত্রসমাজ?
এবার আসুন একটু দেখে নিই মুসলমানদের সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আসলেই কতোখানি বিদ্বেষী ছিলেন --
…… ১৯০০ সালেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ব্যাধি ও প্রতিকার' প্রবন্ধে লিখলেন, আজ আমরা সকলেই এই কথা বলিয়া আক্ষেপ করিতেছি যে, ইংরেজ মুসলমানদিগকে গোপনে হিন্দু বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিয়া দিতেছে। কথাটা যদি সত্যই হয় তবে ইংরেজের বিরুদ্ধে রাগ করিব কেন। দেশের মধ্যে যতগুলি সুযোগ আছে ইংরেজ তাহা নিজের দিকে টানিয়ে না, ইংরেজকে আমরা এতবড় নির্বোধ বলিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিব এমন কী কারণ ঘটিয়াছে। মুসলমানকে যে হিন্দুর বিরুদ্ধে লাগানো যাইতে পারে এই তথ্যটাই ভাবিয়া দেখিবার বিষয়, কে লাগাইল সেটা তত গুরুতর বিষয় নয়। শনি তো ছিদ্র না পাইলে প্রবেশ করিতে পারেনা; অতএব শনির চেয়ে ছিদ্র সম্বন্ধেই সাবধান হইতে হইবে। আমাদের মধ্যে যেখানে পাপ আছে শত্রু সেখানে জোর করিবেই— আজ যদি না করে তো কাল করিবে, এক শত্রু যদি না করে তো অন্য শত্রু করিবে- অতএব শত্রুকে দোষ না দিয়া পাপকেই ধিক্কার দিতে হইবে। হিন্দু মুসলমানের সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশে একটা পাপ আছে; এ পাপ অনেক দিন হইতে চালিয়া আসিতেছে। ইহার যা ফল তাহা না ভোগ করিয়া আমাদের কোন মতেই নিষ্ক্রিতি নাই...”।
রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন ভদ্রলোকদের সঙ্গে চাষাদের ব্যবধান দুস্তর। এই ব্যবধান যে অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি করেছিল তা শুধু মিষ্টভাষণে অপসারিত হতে পারে না। গ্রামের এই চাষারা অধিকাংশই ছিল মুসলমান প্রজা। তিনি তাঁর ‘ব্যাধি ও প্রতিকার' প্রবন্ধে আরে লিখেছেন, “আজ আমাদের ইংরেজি পড়া শহরের লোক যখন নিরক্ষর গ্রামের লোকে। কাছে গিয়ে বলে 'আমরা উভয়েই ভাই'- তখন এই ভাই কথাটির মানে সে বেচার কিছুই বুঝিতে পারেনা। যাহাদিগকে আমরা 'চাষা বেটা' বলিয়া জানি, যাহাদের দুঃখের মূল্য আমাদের কাছে অতি সামান্য, যাহাদের অবস্থা জানিতে হইলে আমাদিগকে গভর্নমেন্টের প্রকাশিত তথ্য তালিকা পড়িতে হয়, সুদিনে দুর্দিনে আমর যাহাদের ছায়া মাড়াইনা, আজ হঠাৎ ইংরেজের প্রতি স্পর্ধা প্রকাশ করিবার বেলায় তাহাদের নিকট ভাই সম্পর্কের পরিচয় দিয়া তাহাদিগকে চড়া দামে জিনিস কিনিতে গুর্খার গুঁতা খাইতে আহবান করিলে আমাদের উদ্দেশ্যের প্রতি সন্দেহ জন্যিবার কথা সন্দেহ জন্মিয়াও ছিল। কোনো বিখ্যাত 'স্বদেশী' প্রচারকের নিকট শুনিয়াছি যে পূর্ববঙ্গে মুসলমান শ্রোতারা তাঁহাদের বক্তৃতা শুনিয়া পরস্পর বলাবলি করিয়াছে যে, বাবুরা বোধ করি বিপদে ঠেকিয়াছে। ইহাতে তাহারা বিরক্ত হইয়াছিলেন, কিন্তু চাষা ঠিক বুঝিয়াছিল। বাবুদের স্নেহভাষণের মধ্যে ঠিক সুরটা যে লাগে না তাহা তাহাদের বুঝিতে বিলম্ব হয় নাই । উদ্দেশ্য সাধনের উপলক্ষে প্রেমের সম্বন্ধ পাতাইতে গেলে ক্ষুদ্র ব্যক্তির কাছেও তাহা বিস্বাদ বোধ হয়— সে উদ্দেশ্য খুব বড় হইতে পারে, হউক তাহার নাম বয়কট' বা স্বরাজ' দেশের উন্নতি বা আর কিছু। ( সূত্র -বঙ্গভঙ্গ : তৎপরবর্তী সমাজ ও রাজনীতি)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন – “আমাদের দেশে যখন স্বদেশী আন্দোলন উপস্থিত হয়েছিল তখন আমি তার মধ্যে ছিলেম। মুসলমানরা তখন তাতে যোগ দেয়নি, বিরুদ্ধ ছিল। জননায়কেরা কেউ কেউ তখন ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ওদের একেবারে অস্বীকার করা যাক। জানি, ওরা যোগ দেয়নি। কিন্তু কেন দেয়নি? তখন বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে এত প্রবল যোগ হয়েছিল সে আশ্চর্য। কিন্তু, এত বড় আবেগ শুধু হিন্দু সমাজের মধ্যেই আবদ্ধ রইল, মুসলমান সমাজকে স্পর্শ করল না। সেদিনও আমাদের শিক্ষা হয়নি... আমি যখন আমার জমিদারি সেরেস্তায় প্রথম প্রবেশ করলেম তখন একদিন দেখি, আমার নায়েব তাঁর বৈঠকখানায় এক জায়গায় জাজিম খানিকটা তুলে রেখে দিয়েছেন। যখন জিজ্ঞেস করলেম এ কেন তখন জবাব পেলেম, যে সব সম্মানী মুসলমান প্রজা বৈঠকখানায় প্রবেশের অধিকার পায় তাদের জন্য ঐ ব্যবস্থা। এক তক্তপোশে বসাতেও হবে, অথচ বুঝিয়ে দিতে হবে আমরা পৃথক। এ প্রথা তো অনেকদিন ধরেই চলে এসেছে; অনেকদিন মুসলমান এ মেনে এসেছে, হিন্দুও মেনে এসেছে। জাজিম-তোলা আসনে মুসলমান বসেছে, জাজিম পাতা আসনে অন্যে বসেছে। তারপর ওদের ডেকে একদিন বলেছি, ‘আমরা ভাই, তোমাকেও আমার সঙ্গে ক্ষতি স্বীকার করতে হবে, কারাবাস ও মৃত্যুর পথে চলতে হবে'। তখন হঠাৎ দেখি অপর পক্ষ লাল টকটকে নতুন ফেজ মাথায় দিয়ে বলে, 'আমরা পৃথক'। আমরা বিস্মিত হয়ে বলি, রাষ্ট্র ব্যাপারে পরস্পর পাশে এসে দাঁড়াবার বাধাটা কোথায়? বাধা ঐ জাজিম তোলা আসনে। বহু দিনের মস্ত ফাঁকটার মধ্যে। ওটা ছোট নয়। ওখানে অকূল অতল কালাপানি। বক্তৃতা মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ডাক দিলেই পার হওয়া যায় না।“ ( সূত্র -বঙ্গভঙ্গ : তৎপরবর্তী সমাজ ও রাজনীতি)
রবীন্দ্রনাথ “লোকহিত” প্রবন্ধে (সবুজপত্র, ভাদ্র, ১৩২১ [১৯১৪]) লিখেছেন -- "হিন্দু মুসলমানের পার্থক্যটাকে আমাদের সমাজে আমরা এতই কুশ্রীভাবে বেআব্রু করিয়া রাখিয়াছি যে, কিছুকাল পূর্বে স্বদেশী অভিযানের দিনে একজন হিন্দু স্বদেশী-প্রচারক এক গ্লাস জল খাইবেন বলিয়া তাহার মুসলমান সহযোগীকে দাওয়া হইতে নামিয়া যাইতে বলিতে কিছুমাত্র সংকোচ নাই। কাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বশে মানুষ মানুষকে ঠেলিয়া রাখে, অপমানও করে তাহাতে বিশেষ ক্ষতি হয়না। কুস্তির সময়ে কুস্তিগীরদের গায়ে পরস্পরের পা ঠেকে, তাহার হিসাব কেহ জমাইয়া রাখে না; কিন্তু সামাজিকতার স্থলে কথায় কথায় কাহারও গায়ে পা ঠেকাইতে থাকিলে তাহা ভোলা শক্ত হয়। আমরা বিদ্যালয়ে ও আপিসে প্রতিযোগিতার ভীড়ে মুসলমানকে জোরের সঙ্গে ঠেলা দিয়াছি, সেটা সম্পূর্ণ প্রীতিকর নহে, তাহা মানি তবু সেখানকার ঠেলাঠেলিটা গায়ে লাগিতে পারে, হৃদয়ে লাগেনা। কিন্তু সমাজের অপমানটা গায়ে লাগে না হৃদয়ে লাগে। কারণ সমাজের উদ্দেশ্যই এই যে, পরস্পরের পার্থক্যের উপর সুশোভন সামঞ্জস্যের আস্তরণ বিছাইয়া দেওয়া। বঙ্গবিচ্ছেদ ব্যাপারটা আমাদের অন্ন বস্ত্রে হাত দেয়নি, আমাদের হৃদয়ে আঘাত করেছিল। সেই হৃদয়টা যতদূর পর্যন্ত অখণ্ড, ততদূর পর্যন্ত তাহার বেদনা অপরিমেয় ছিল। বাংলার মুসলমান যে এই বেদনায় আমাদের সঙ্গে এক হয় নাই তাহার কারণ, তাহাদের সঙ্গে আমরা কোনোদিন হৃদয়কে এক হইতে দিই নাই।“( সূত্র -বঙ্গভঙ্গ : তৎপরবর্তী সমাজ ও রাজনীতি)
তাহলে দেখতেই পাচ্ছেন যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে সত্যিকার অর্থে মুসলমানদের প্রতি কোনও বিরূপ মনোভাব বা মুসলমানবিরোধী কোনও মনোভাব ছিল না, বরং হিন্দু মুসলমানের ভেদাভেদ নিয়ে সমাজে যা চলছিলো সেটার ব্যাপারে তার মনে প্রবল দুঃখবোধ ছিল, বেদনা ছিল। এটা উনার সাহিত্য ভালো করে পড়লেই দেখতে পাবেন।
সমস্যা হচ্ছে আমাদের মনোভাবটা হয়েছে সেই “কান নিয়েছে চিলে” এর মতো। কেউ একজন বলে বসলো রবীন্দ্রনাথ এসব কথা বলেছেন আর ব্যস, তারপর সবাই “কান নিয়েছে চিলে” এর মতো কোনও কিছু অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই সেসব বিশ্বাস করতে শুরু করে দিল আর কি!! রবীন্দ্রনাথবিরোধী এসব মানসিকতার মূলে রসদ যুগিয়েছে মূলত পাকিপ্রেমীরা আর জামায়াতি ঘরানার বিভিন্ন মিডিয়ার প্রচারণা (মূলত সাম্প্রদায়িকতার খাতিরে) যারা চিরকালই এসব মিথ্যাচার করে এসেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে এদের প্রভাব আগের যে কোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আর তার সাথে এদেশের মানুষের মধ্যে যে রুচির দৈন্যতা এবং বিচার-বিবেচনাবোধের অভাবের যে মহা উল্লম্ফন ঘটেছে সেসব মিলেমিশে একাকার হয়ে তৈরি হয়েছে এক চরম হতশ্রী অবস্থার। যার কারণে কোনও কিছু বাছ-বিচার না করে, কোনও কিছু স্টাডি না করে এসব মিথ্যাচারই বরং মানুষ আগ্রহের সাথে গ্রহণ করছে।
একটা ব্যাপার ভুলে গেলে চলবে না। সেটা হল দেশের ভাগাভাগি হয়, সাহিত্য বা সংস্কৃতির ভাগাভাগি হয় না। এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে ভারতের হাতে থাকা একটা অংশ কিন্তু আমাদের বাংলারই আরেকটি ভাগ। বাংলার ভাগ হয়েছে কিন্তু সংস্কৃতির ভাগ তো আর হয়নি। তারাও ভাত খায় আমরাও ভাত খাই। দেশ ভাগ হয়েছে কিন্তু এই যে সংস্কৃতি এর তো কোনও পরিবর্তন হয়নি, ভাগ হয়নি। বাংলা সাহিত্য বলতে দুই বাংলার মিলিত বাংলা সাহিত্যকেই বোঝায়। এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় বলা দরকার। যেমন ইংরেজি সাহিত্য বলতে কিন্তু ব্রিটিশ, মার্কিনী বা আইরিশ সাহিত্য এভাবে ভাগাভাগি হয় না। সব ইংরেজিভাষী লেখকদের লেখাজোকাই ইংরেজি সাহিত্যের অংশ। এখানে জাতীয়তা দিয়ে ভাগাভাগি অসম্ভব। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সত্যি। সংস্কৃতি এমন একটা ব্যাপার যে এখানে ভাগাভাগি করা একটা অসম্ভব এবং অবাস্তব একটা ব্যাপার। বাংলার সাহিত্য, বাংলার সংস্কৃতির সাথে রবীন্দ্রনাথ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। সেই শেকড় এতোটাই গভীর যে তাকে আপনি চাইলেও বিচ্ছিন্ন করতে পারবেন না।
রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন বাঙালীর আত্মার আত্মীয়। আত্মার আত্মীয়কে কীভাবে ভুলে যাওয়া যায়? কীভাবে অস্বীকার করা যায়? রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় না বাংলাদেশী এ প্রশ্ন নিতান্তই অবান্তর এবং বাতুলতা। কিছু কিছু ব্যক্তি কোনও কোনও ক্ষেত্রে নিজেদের প্রখর উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের মহিমায় এমন এক সুমহান মর্যাদার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হন যেখানে তাঁর জাতীয়তা বা তাঁর নাগরিকত্ব শুধু তুচ্ছই হয়ে যায় না, সেটা দেশ-কাল-পাত্র ছাপিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিক তেমনি একজন ব্যক্তি। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন বাঙালী। আপনি যেমন একজন বাঙালী তিনিও তেমন একজন বাঙালী । আর তিনি এমন একজন বাঙালী যাকে সারা বিশ্ব অত্যন্ত মর্যাদার সাথে দেখে, অত্যন্ত সম্মানের সাথেই দেখে। বিশ্বের নানা দেশে নানা শহরে তাঁর ভাস্কর্য আছে। এই ভাস্কর্য তাঁকে পূজা করার জন্য নয়, তাঁকে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় যে এসব ক্ষেত্রে দেশ-কাল-পাত্র-জাতীয়তা এসব ব্যাপার কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। এসব আমলে না নিয়ে তিনি “ভারতীয়” না “বাংলাদেশী” এসব বিতর্ক ( এগুলো আসলে বিতর্ক নয়, কুতর্ক ) তারাই করে বা করতে পারে যাদের মানসিকতা খুবই নিম্নশ্রেণীর, খুবই নিচুমনা এবং দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। অথচ তিনি মুসলমানদের প্রতি ছিলেন সহমর্মী।
মানেটা দাঁড়াচ্ছে এরকম যে তাঁর যোগ্যতা তাঁর মহিমার গুণে তিনি সারা বিশ্বে সমাদৃত এবং সম্মানিত আর এরা তাঁর স্বজাতির লোক হয়ে (অর্থাৎ বাঙালী হয়েও) সম্পূর্ণ বাজে কারণে তাঁকে ঘৃণা করতে উঠেপড়ে লেগেছে!!
পাকিস্তানী আমলে পাকিস্তানীরাও রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এ জাতীয় নানা বিষেদ্গার করে রবীন্দ্রনাথকে আমাদের থেকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল, মুছে দিতে চেয়েছিল। পাকিদের সে প্রচেষ্টা যে মোটেই সফল হয়নি তা বলাই বাহুল্য।
এখনো রবীন্দ্র বিদ্বেষের মাধ্যমে তাঁকে ভুলিয়ে দেয়ার একটা অপচেষ্টা রয়ে গেছে এদেশে। এটা মূলত তাদের মধ্যেই বেশী যারা চিন্তাধারার দিক দিয়ে মূলত পাকিমনা বা পাকিস্তানী মাইন্ডেড। তারা ছাড়াও যারা চিন্তাধারার দিক দিয়ে মৌলবাদী বা ধর্মান্ধ তাদের মধ্যেও এসব আছে। তাঁকে বাংলা সাহিত্য থেকে, এদেশের সাহিত্যমনা সংস্কৃতিমনা মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি যে একটা সুউচ্চ শ্রদ্ধার আসন আছে সেটা অস্বীকার করতে না পেরে ব্যর্থ হয়ে তারা এখন কৌশল বদলেছে। সেই কৌশল হচ্ছে তাঁর চরিত্রহনন করা, তাঁর চরিত্রকে কালিমালিপ্ত করা।
এগুলোর মধ্যে খুব কমন একটা বিষয় হচ্ছে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী, মুসলমান বিদ্বেষী, অত্যাচারী জমিদার, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী এমনকি পতিতাবৃত্তির সাথে জড়িত এ জাতীয় অসংখ্য আজেবাজে জঘন্য তকমা দিয়ে, নানা মিথ্যে অপবাদ আর নানা বানোয়াট কাহিনী রটিয়ে, কুৎসা রটিয়ে তাঁর চরিত্রকে কালিমালিপ্ত করা। তার ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান সমাজের নানামুখী সাংস্কৃতিক দৈন্যতা, রুচির ব্যাপক দারিদ্র্য, চরম অনৈতিকতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং সুকঠিন ধর্মীয় মৌলবাদের উল্লম্ফন। যার কারণে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এসব ভয়াবহ মিথ্যাচার খুব ভালোভাবেই হালে পানি পেয়ে যাচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বাঙালীদের একজন। তাঁকে যতোই কুৎসা রটিয়ে, হিংসা-বিদ্বেষের ঘূর্ণিস্রোতে ভেসে দূরে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টাই হোক না কেন, তিনি তাঁর স্বমহিমায় উজ্জ্বল থাকবেন চিরকাল। আপনি সবকিছু ইগনোর আপনার নিচু মানসিকতার বাহার দেখিয়ে তাঁকে সম্পূর্ণ বাজে কারণে ঘৃণায় দূরে ঠেলে দিতেই পারেন, কিন্তু বাকি বিশ্বের কাছে তিনি তাঁর নিজের যোগ্যতায় স্মরণীয় বরণীয় হয়েই থেকে যাবেন। তাঁকে অসম্মান করলেন তো আপনি সারা বিশ্বের কাছে নিজেকেই ছোট করলেন, ছোটলোকি করলেন। তাঁর মতো ব্যক্তিকে অসম্মান করে আপনি সারা বিশ্বের মানুষের কাছ থেকে কোনও সম্মান পাবেন না, বরং অসম্মানই পাবেন।
১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৩৫
অন্তর্জাল পরিব্রাজক বলেছেন: ভালো লাগলো আপনার দীর্ঘ মূল্যবান বক্তব্যটি পড়ে। আসলেই আমাদের অনেক বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে এসব ব্যাপারে। যদিও রবীন্দ্রনাথকে আমি সমালোচনার বাইরে রাখা উচিৎ বলে মনে করিনা। তাঁরও সমালোচনা হওয়ার দরকার আছে। কিন্তু অনেকদিন ধরেই লক্ষ্য করছি তাঁর ব্যাপারে যে একটা অন্ধের মতো বিরোধিতা (একে বিরোধিতা না বলে কুৎসার অসুস্থ প্রতিযোগিতা বলাটাই ভালো) তাতে আর চুপ করে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য একটা প্রমাণনির্ভর, একটু বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করার চেষ্টা করেছি মাত্র। আপনার বক্তব্যকে স্বাগত জানাই।
২|
১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:৩৫
মেঠোপথ২৩ বলেছেন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আসলেই কোন কমেন্ট করেছিলেন কিনা জানিনা। তার কবিতা, উপন্যাস , গানের ভক্ত সকল সাহিত্যনুরাগী। কিন্তু তাকে যখন রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, বিপত্তিটা তখনই বাধে। এ দেশের দেয়ালে তার গ্রাফিতি আকাটা যেমন রাজনীতি, মুছে ফেলাটাও রাজনীতি। রবীন্দ্রনাথকে রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা না হলে, তার পক্ষে বিপক্ষে এত লেখালেখি হত না।
১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৩৯
অন্তর্জাল পরিব্রাজক বলেছেন: রবীন্দ্রনাথের সামাজিক অবস্থান, তাঁর কিছু বক্তব্য এবং তাঁর অনেক লেখাই রাজনীতির খোরাক যোগানোর জন্য যথেষ্ট। বলা চলে এগুলোর মধ্যেও এক প্রকার রাজনৈতিক উপাদান আছে। সুতরাং রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে রাজনীতি থাকবেই। কিন্তু তাই বলে মিথ্যা, অপপ্রচার আর কুৎসাকে মেনে নেয়া যায় না।
৩|
১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৯
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: রবি ঠাকুর কে এরা মনে করে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন । তাই মনে হয় এমন করছে ।
১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৪১
অন্তর্জাল পরিব্রাজক বলেছেন: কারণ এরা সেরকমই মাথামোটা প্রজাতির। নেহায়েত কম তো দেখা হল না এদেশের মানুষদের!!
৪|
১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৪২
মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেছেন:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফ্যাসিস্টের দোসর ছিলেন।
তাই তাকে মুছে ফেলতে হবে।
সবাই রাজুতে আয়!
©somewhere in net ltd.
১|
১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:১৫
মহাজাগতিক চিন্তা বলেছেন:
অন্তর্জাল পরিব্রাজক, আপনার এই দীর্ঘ আলোচনাটি পড়ে মনে হলো, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ককে তথ্য-প্রমাণের আলোকে বিচার করার চেষ্টা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন কি না, তিনি মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন কি না এবং তাঁকে বাঙালি সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার চেষ্টা কতটা যুক্তিসংগত—এসব প্রশ্ন আবেগ দিয়ে নয়, ইতিহাস, প্রামাণ্য দলিল ও যুক্তির ভিত্তিতে আলোচনা করা প্রয়োজন। আপনার লেখার এই মূল আহ্বানের সঙ্গে আমি একমত।
প্রথমেই বলি, কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নামে একটি বক্তব্য প্রচলিত থাকলেই সেটিকে তাঁর প্রকৃত বক্তব্য বলে গ্রহণ করা যায় না। তিনি ঠিক কী বলেছিলেন, কখন বলেছিলেন, কোথায় বলেছিলেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে বলেছিলেন, তা যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন’ কিংবা ‘মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়’—এ ধরনের বহুল প্রচারিত উক্তির ক্ষেত্রে মূল উৎস, নির্ভরযোগ্য উদ্ধৃতি এবং সমসাময়িক দলিল হাজির করা প্রয়োজন। আপনার লেখায় এই প্রমাণের প্রশ্নটিই যথার্থ গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য মনে রাখা দরকার। কোনো বক্তব্যের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি বলেই সেটিকে চূড়ান্তভাবে মিথ্যা ঘোষণা করা এবং প্রমাণের অভাবে সেটিকে অপ্রমাণিত বলা এক বিষয় নয়। ইতিহাসচর্চায় সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য অবস্থান হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক উৎস পাওয়া যাচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত দাবিটিকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে প্রচার না করা। একই সঙ্গে নতুন দলিল সামনে এলে তা যাচাই করার মানসিকতাও রাখতে হবে। এতে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করা হয়।
রবীন্দ্রনাথের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফর ও সংবর্ধনার প্রসঙ্গটিও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কাউকে সংবর্ধনা দিয়েছে বলেই তাঁর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে অতীতে কোনো মতপার্থক্য ছিল না—এ সিদ্ধান্ত একা সেই তথ্য থেকে টানা যায় না। একইভাবে, তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না থাকলে শুধু জনশ্রুতির ভিত্তিতে তাঁকে অভিযুক্ত করাও অনুচিত। অর্থাৎ, উভয় ক্ষেত্রেই প্রমাণের মানদণ্ড একই হওয়া উচিত। রবীন্দ্রনাথের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে—কোনো দিকেই আমাদের যুক্তির মানদণ্ড বদলে ফেলা উচিত নয়।
আপনার লেখার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মুসলমানদের সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি। আপনি তাঁর ‘ব্যাধি ও প্রতিকার’, ‘লোকহিত’ এবং অন্যান্য লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন যে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক, সামাজিক বৈষম্য, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং স্বদেশী আন্দোলনে মুসলমানদের অংশগ্রহণের প্রশ্ন নিয়ে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন। বিশেষ করে সমাজের এক অংশ অন্য অংশকে অবহেলা করবে, অথচ রাজনৈতিক প্রয়োজনের সময় ভ্রাতৃত্বের আহ্বান জানাবে—এই দ্বিচারিতার সমালোচনা তাঁর লেখায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।
এই বক্তব্যগুলো থেকে অন্তত এতটুকু বোঝা যায় যে, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ছিল বাস্তব সামাজিক অভিজ্ঞতা ও আত্মসমালোচনার সঙ্গে যুক্ত। তিনি শুধু দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্যের কথা বলেননি; ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে যে বৈষম্য, অপমান ও অবিশ্বাস বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেগুলোর দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রকৃত সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল মুখে ভ্রাতৃত্বের কথা বললেই চলে না; সামাজিক আচরণেও সমতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হয়। আপনার উদ্ধৃতিগুলোর এই তাৎপর্য বিশেষভাবে আলোচনাযোগ্য।
তবে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাকে যথার্থভাবে বুঝতে হলে তাঁর বিভিন্ন সময়ের রচনা, বক্তব্য এবং জমিদারি পরিচালনার মতো বাস্তব ভূমিকারও সমালোচনামূলক পাঠ প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির কয়েকটি উদার বক্তব্য উদ্ধৃত করে তাঁর সব চিন্তাকে নির্ভুল প্রমাণ করা যায় না; আবার তাঁর কোনো একটি বক্তব্য বা ভূমিকার সমালোচনা করেও তাঁর সমগ্র সাহিত্য ও চিন্তাকে বাতিল করা যায় না। রবীন্দ্রনাথও তাঁর সময়ের মানুষ ছিলেন। তাঁর চিন্তার শক্তি, সীমাবদ্ধতা, পরিবর্তন এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই তাঁকে মূল্যায়ন করা উচিত। আমার মতে, এই ভারসাম্যপূর্ণ পাঠই তাঁকে নিয়ে বিতর্ককে আরও অর্থবহ করতে পারে।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক অবদানকে স্বীকার করা এবং তাঁর প্রতিটি রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে একমত হওয়া এক বিষয় নয়। একজন পাঠক তাঁর কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধের অসাধারণ সাহিত্যিক মূল্য স্বীকার করেও তাঁর কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্যের সমালোচনা করতে পারেন। তাতে রবীন্দ্রনাথকে অসম্মান করা হয় না; বরং তাঁকে একজন বাস্তব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিচার করা হয়। কোনো লেখককে প্রশ্নাতীত করে তোলা যেমন যুক্তিবাদী চর্চার পরিপন্থী, তেমনি বিদ্বেষের কারণে তাঁর অবদান অস্বীকার করাও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার পরিচয় নয়।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রশ্নে আপনার বক্তব্যের সঙ্গে আমি অনেকাংশে একমত। ১৯৪৭ সালে রাজনৈতিকভাবে বাংলা বিভক্ত হয়েছিল, কিন্তু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বিভক্ত হয়ে যায়নি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন, জীবনানন্দসহ অসংখ্য সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের অবদানকে কেবল বর্তমান রাষ্ট্রসীমার ভিত্তিতে ভাগ করে দেখলে বাংলা সংস্কৃতির প্রকৃত ইতিহাস বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় নাগরিক ছিলেন—এটি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা; তিনি বাঙালি সংস্কৃতিরও অন্যতম প্রধান নির্মাতা—এটিও সত্য। এ দুটি পরিচয়ের মধ্যে কোনো অপরিহার্য বিরোধ নেই।
বাংলাদেশের মানুষ রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করবেন কি না, তা নিয়ে পরিচয়ভিত্তিক চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন নেই। বরং তাঁর সাহিত্য পাঠ করা, তাঁর চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং যুক্তির ভিত্তিতে তাঁর মূল্যায়ন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ তাঁর কোনো রচনার সমালোচনা করলে সেই সমালোচনার উত্তর তথ্য ও যুক্তি দিয়ে দেওয়া উচিত। আবার কেউ তাঁর নামে মিথ্যা উক্তি প্রচার করলে তার প্রতিবাদও প্রামাণ্য তথ্য দিয়ে করা প্রয়োজন। মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু মতভেদ যেন অপপ্রচার, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ কিংবা সাম্প্রদায়িক উসকানিতে পরিণত না হয়।
আপনার লেখার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বৃহত্তর প্রশ্নও রয়েছে। ইতিহাসের কোনো ব্যক্তিত্বকে আক্রমণ বা মহিমান্বিত করার পেছনে অনেক সময় বর্তমানের রাজনৈতিক ও পরিচয়গত স্বার্থ কাজ করে। তখন মানুষ মূল দলিল পড়ার পরিবর্তে নিজের পূর্বধারণার সঙ্গে মেলে এমন বক্তব্য গ্রহণ করে। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও এমন প্রবণতা দেখা যেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর সমালোচকদের সবাইকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে ধরে নেওয়াও যথাযথ হবে না। কারও বক্তব্য ভুল হলে সেই বক্তব্যের ভুলটি দেখানোই সবচেয়ে কার্যকর; বক্তার পরিচয় দিয়ে তাঁর যুক্তি বাতিল করা নয়।
আমি মনে করি, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের আলোচনার তিনটি ভিত্তি থাকা দরকার। প্রথমত, তাঁর নামে প্রচলিত বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁর সাহিত্য ও চিন্তাকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হবে। তৃতীয়ত, তাঁর সমালোচনা কিংবা প্রশংসা—উভয় ক্ষেত্রেই একই যুক্তিনিষ্ঠ মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। এই তিনটি শর্ত মানা গেলে ব্যক্তিপূজা ও ব্যক্তিবিদ্বেষ—দুই ধরনের প্রবণতা থেকেই আমরা মুক্ত থাকতে পারব।
সবশেষে বলব, রবীন্দ্রনাথকে সম্মান করার সবচেয়ে ভালো উপায় কেবল তাঁর প্রশংসা করা নয়; তাঁর রচনা মনোযোগ দিয়ে পড়া, তাঁর চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং প্রয়োজন হলে যুক্তিসংগত সমালোচনা করাও। একইভাবে, তাঁকে প্রত্যাখ্যান করার আগে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা জরুরি। ইতিহাসের বিচার আবেগের আদালতে নয়, প্রমাণ ও যুক্তির আলোতেই হওয়া উচিত।
আপনার পোস্টটি এই প্রয়োজনীয় আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। আশা করি, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্কে আমরা ব্যক্তিগত বিদ্বেষের পরিবর্তে প্রামাণ্য দলিল, ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এবং সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে প্রাধান্য দেব। কারণ, একজন কবিকে ঘিরে আমাদের অবস্থান যা-ই হোক না কেন, সত্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে আমাদের সততা যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়।