নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাহিত্য, সংস্কৃতি, কবিতা এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে গঠনমুলক লেখা লেখি ও মুক্ত আলোচনা

ডঃ এম এ আলী

সাধারণ পাঠক ও লেখক

ডঃ এম এ আলী › বিস্তারিত পোস্টঃ

বঙ্গ ও বেঙ্গলীর শিকড় কী মুছে গেছে? নাকি পুণ্ড্রনগর সভ্যতার মত হারিয়ে গেছে ??

০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৯:০৮


বঙ্গ ও বেঙ্গলীর শিকড় কী মুছে গেছে নাকি পুণ্ড্রনগর সভ্যতার মত হারিয়ে গেছে ?? সামু ব্লগের এই ক্রান্তিকালে বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনা/পর্যালোচনা করে কিছু সময় কাঠানো যাক ।

আলোচনার শুরুতেই পুণ্ড্র নগর ( পুণ্ড্রবর্ধন) কী ছিল তা সংক্ষেপে একটু পর্যালোচনা করে নেয়া যাক।
পুণ্ড্রবর্ধন ছিল প্রাচীন উত্তরবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ, যেখানে অনার্য পুণ্ড্র জাতি বসবাস করত। এর ভৌগোলিক সীমানা ছিল দক্ষিণে পদ্মা , পশ্চিমে গঙ্গা এবং পূর্বে করতোয়া বা যমুনা নদী; বর্তমান রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা ও দিনাজপুর অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। গুপ্ত সম্রাট বুধগুপ্তের (আনুমানিক ৪৭৬–৪৯৪ খ্রি.) দামোদরপুর তাম্রশাসন অনুযায়ী এর উত্তর সীমা হিমালয় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
ছবি-১(ক) : আনুমানিক ১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ–আনু. ৩৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পুন্ড্র ও অন্যান্য রাজ্যগুলির মানচিত্র

ছবি-১(খ) : পরবর্তীতে বেঙ্গল ১৮৮০ সময়কালের একটি মানচিত্র


বৈদিক সাহিত্যে (খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ১০০০–৯০০) পুণ্ড্রদের একটি অনার্য জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ তাদের দস্যু জাতি বলা হয়েছে এবং অন্ধ্র, শবর, পুলিন্দদের সমগোত্রীয় বলা হয়। ধারণা করা হয়, পুণ্ড্র জনপদের উত্থান কমপক্ষে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের কাছাকাছি।

পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, মহাভারতের আদিপর্বে ঋষি দীর্ঘতমা ও অসুররাজ বলির বংশ থেকে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুফ্ম এই পাঁচটি জনপদের সৃষ্টি হয়।

ছবি -২ : অঙ্গ (ষোলটি মহাজনপদ, অঙ্গ তাদের মধ্যে সবচেয়ে পূর্বে অবস্থিত এবং এর অবস্থান বৃজির দক্ষিণে এবং মগধের পূর্বে)


ছবি - ৩ : বঙ্গ ( পূর্ব দক্ষিণ এশিয়ায় বঙ্গদেশ)

সুহ্ম ( মানচিত্র পাওয়া যায়নি তবে বিবরণ পাওয়া গেছে )
সুহ্ম ছিল বাংলা অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রাচীন ভারতীয় রাজ্য। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বৃহত্তর মেদিনীপুর, হাওড়া এবং হুগলি জেলার অংশবিশেষ নিয়ে সুহ্ম রাজ্য গঠিত ছিল। এই রাজ্যের রাজধানী ছিল তাম্রলিপ্ত, যা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত।

কলিঙ্গ
কলিঙ্গ ছিলো ভারতীয় উপমহাদেশের একটি প্রাচীন রাজ্য যা ভারতের মধ্য-পূর্বাঞ্চলের ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাঁকুড়া , পুরুলিয়া , মেদিনীপুর জেলার, অন্ধ্রপ্রদেশের উত্তরাংশ এবং মধ্য প্রদেশের কিয়দাংশ নিয়ে গঠিত ছিলো ।

ছবি -৪: ২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মানচিত্রে কলিঙ্গ

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দে আর্যদের পূর্বাভিযানের সময় মহারাজ বিদেঘ মাথব (শতপথ ব্রাহ্মণ, ৪/১/১৪–১৭) কোশী নদী অতিক্রম করে করতোয়া পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং পুণ্ড্র অঞ্চলে আর্য প্রভাব বিস্তার ঘটে। পরে এই অঞ্চল “পুণ্ড্রবর্ধন” নামে পরিচিত হয়।
মৌর্য যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক) পুণ্ড্রবর্ধন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এর প্রমাণ মহাস্থান ব্রাহ্মী শিলালিপি। ১৯৩১ সালে এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে ব্রাহ্মী লিপির সন্ধান মেলে, যাতে সম্রাট অশোক কর্তৃক দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে সাহায্য করার তথ্য পাওয়া যায়।

ছবি - ৫ : মহাস্থানগড়ের শিলালিপি - বাংলার প্রাচীনতম রাজকীয় নির্দেশ

প্রায় ২৩০০ বছর আগে, সম্রাট অশোক পুণ্ড্রনগর (বর্তমান মহাস্থানগড়, বগুড়া)-এ গোবদম নামক এক কর্মকর্তা বা রাজার প্রতি এই আদেশ জারি করেছিলেন। এতে সম্বঙ্গীয় সম্প্রদায়ের রাজা গোবদমের অনুকূলে একটি নির্দেশনার কথা উল্লেখ রয়েছে, যেখানে ধান সরবরাহ, দুর্যোগকালে ত্রাণ প্রদান এবং শস্যভাণ্ডার পুনরায় পূর্ণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এটি বাংলার প্রাচীনতম লিখিত ইতিহাসের অন্যতম নিদর্শন, যা পাথরে খোদাই করে সংরক্ষিত হয়েছে।গোবদম (Gobadam) একজন কর্মকর্তা বা রাজার ব্যক্তিগত নাম।সম্বঙ্গীয় (Samvamgiyas) যে গোষ্ঠী, কুল বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।

এরপর গুপ্ত যুগে (৪র্থ–৬ষ্ঠ শতক) এটি পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তি নামে প্রশাসনিক বিভাগে পরিণত হয়। গুপ্ত পতনের পর (আনু. ৫৬৭–৫৭৯ খ্রি.) এটি রাজা সঙ্গতসেন-এর অধীনে আসে এবং পরবর্তীতে গৌড় ও সমতট অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। ৭ম শতকে এটি রাজা শশাঙ্কের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে ৭ম–৮ম শতকের মধ্যে পুণ্ড্রবর্ধনের গুরুত্ব হ্রাস পেতে শুরু করে। পাল যুগে (৮ম–১২শ শতক) মহাস্থানগড় ব্যবহৃত হলেও এটি আর প্রধান শক্তিকেন্দ্র ছিল না। পরবর্তীতে চন্দ্র ও সেন শাসনামলেও এর গুরুত্ব কমে যায়। ১৩শ শতকে মুসলিম শাসনের শুরুতে এটি সম্পূর্ণভাবে প্রান্তিক অঞ্চলে পরিণত হয় এবং “পুণ্ড্রবর্ধন” নামটি বিলুপ্ত হয়ে “মহাস্থান” নামে পরিচিতি পায়।

মহাস্থানগড় তথা “পুণ্ড্রবর্ধন” তথা পুণ্ড্র নগর

আজকের এই মহাস্থানগড়ই হলো প্রাচীন পুণ্ড্র নগর বা পুণ্ড্রবর্ধনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ।
মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, যা ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামে পরিচিত ছিল। এটি একসময় প্রাচীন বাংলার একটি প্রধান রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৭০০ অব্দে এখানে একটি সুসংগঠিত নগর সভ্যতা গড়ে ওঠে, যা প্রায় আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। এই ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে মহাস্থানগড়কে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী ঘোষণা করা হয়।

ভৌগোলিকভাবে মহাস্থানগড় বর্তমান বাংলাদেশের বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায়, বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে এবং করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। প্রাচীনকালে করতোয়া নদী ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, যা বাণিজ্য ও যোগাযোগে বিশেষ ভূমিকা রাখত। এ অঞ্চলটি বরেন্দ্রভূমির উঁচু লাল মাটির উপর অবস্থিত হওয়ায় বন্যামুক্ত ও বসতির জন্য উপযোগী ছিল।

মহাস্থানগড়ের নামকরণ সম্পর্কে স্কন্দপুরাণে একটি কিংবদন্তি পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয় যে বিষ্ণুর অবতার পরশুরাম এখানে তপস্যা করে স্থানটির নাম দেন মহাস্থান। পরবর্তীতে এটি পুণ্ড্র রাজ্যের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে পুণ্ড্রনগর, পুণ্ড্রবর্ধন বা পৌণ্ড্রবর্ধন নামে পরিচিত হয়। ৭ম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ (৬৩৯–৬৪৫ খ্রি.) এই নগর পরিদর্শন করেন এবং তাঁর বিবরণে করতোয়া নদীর বিস্তৃতি ও নগরের সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন।

প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে মহাস্থানগড়ের গুরুত্ব প্রথম চিহ্নিত করেন ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটন (১৮০৮ খ্রি.) এবং পরে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম (১৮৭৯ খ্রি.) এটিকে প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী হিসেবে সনাক্ত করেন। ১৯৩১ সালে এখানে আবিষ্কৃত ব্রাহ্মী লিপিযুক্ত শিলালিপিতে মৌর্য সম্রাট অশোকের (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক) শাসনামলের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে দুর্ভিক্ষকালে প্রজাদের খাদ্য সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ লিপিবদ্ধ ছিল। এটি প্রমাণ করে যে মহাস্থানগড় মৌর্য যুগেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল।

এই নগরটি দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। মৌর্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক), গুপ্ত (৪র্থ–৬ষ্ঠ শতক), পাল (৮ম–১২শ শতক) এবং সেন (১১শ–১২শ শতক) শাসনামলে এটি প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত শাসকরাও এখানে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। ৭ম শতকে এটি রাজা শশাঙ্কের অধীনে ছিল। পাল যুগে মহাস্থানগড় বিশেষভাবে সমৃদ্ধ হয় এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপনার বিকাশ ঘটে।

মহাস্থানের চারদিক বেষ্টন করে রেখেছে প্রাচীর। প্রাচীর বেষ্টিত এ নগরীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন আমলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত দুর্গটি উপর থেকে দেখতে আয়তাকার। এটি উত্তর-দক্ষিণে ১.৫২৩ কিলোমিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১.৩৭১ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। আশেপাশের এলাকা থেকে দুর্গ প্রাচীরটি প্রায় ১১ থেকে ১৩ মিটার উঁচু। এবং এতে একাধিক প্রবেশদ্বার ছিল যেমন কাঁটা দুয়ার, দোরাব শাহ তোরণ, বুড়ির ফটক ও তাম্র দরজা।

ছবি - ৬ : একটি প্রবেশদ্বার সহ পুণ্ড্র নগর এর দুর্গ


দুর্গের ভেতরে জিয়ৎ কুণ্ড, মানকালীর ধাপ, পরশুরামের প্রাসাদ, বৈরাগীর ভিটা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল অবস্থিত যার কিছু ছবি ও বিবরণ লেখাটির নীচে দিকে তুলে ধরা হয়েছে ।

দুর্গের বাইরে প্রায় ৯ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে আছে শতাধিক প্রত্নঢিবি, যেমন গোবিন্দ ভিটা, গোকুল মেধ, ভাসু বিহার, মঙ্গলকোট, স্কন্ধের ধাপ ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে কিছু মন্দির, কিছু বৌদ্ধ বিহার এবং কিছু আবাসিক বা ধর্মীয় স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ।

ছবি - ৬ : গোকুল মেধ ( এখানে বেহুলা লখিন্দরের বাসরঘর ছিল বলে লোকমুখে শোনা যায়।)

ঐতিহাসিকদের মতে, মূলত এটি একটি বৌদ্ধ মঠ। সম্রাট অশোক এটি নির্মাণ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে লোককাহিনী অনুযায়ী, এটি বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর নামে পরিচিত। চাঁদ সওদাগর তার ছেলে লখিন্দরকে দেবী মনসার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এখানকার একটি গোপন কুঠুরিতে বন্ধ করে রাখেন। বিয়ের রাতে বেহুলা এবং লখিন্দর গোপন কুঠুরিতে অবস্থান করা সত্ত্বেও সেখানে দেবী মনসার প্রেরিত সাপ প্রবেশ করে এবং লখিন্দরকে দংশন করে।

উল্লেখ্য ১৮০৮ সালে সর্বপ্রথম ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিল্টন এই ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিত করেন। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার কানিংহাম এই ধ্বংসাবশেষকে প্রাচীন পুণ্ড্রনগর বলে নিশ্চিত করেন।
১৯২৮-২৯ খ্রিস্টাব্দে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অভ ইন্ডিয়ার তৎকালীন মহাপরিচালক কাশীনাথ নারায়ণ দীক্ষিতের তত্ত্বাবধানে মহাস্থানগড়ের প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ আরম্ভ হয়।

ছবি-৮ : মহাস্থানগড়ের প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজের আরম্ভ

মহাস্থানগড়ের প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ আরম্ভ হয়। মহাস্থানগড় খনন করে যেসব মূল্যবান জিনিসপত্র পাওয়া গেছে, তা সেখানকার যাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। সংরক্ষিত বিষয়গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন দেব-দেবতার মূর্তি, বিভিন্ন যুগের মুদ্রা, স্মারকলিপি, মাটির তৈজসপত্র, পোড়ামাটির ফলক, সিলমোহর, শিলালিপি, আত্মরক্ষার অস্ত্র, মূল্যবান অলঙ্কার সামগ্রী, সোনা, রূপা, লোহা, কাঁসা, তামাসহ বিভিন্ন মূল্যবান ধাতব সামগ্রী।

পুর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রত্নতাত্বিক খনন কার্য প্রথম শুরু হয় ১৯২৮–২৯ সালে কে. এন. দীক্ষিতের তত্ত্বাবধানে। পরবর্তীতে ১৯৩১, ১৯৬০, ১৯৮৮–৯১ এবং ১৯৯৩ সালের পর বাংলাদেশ-ফ্রান্স যৌথ উদ্যোগে পুরা এলাকা জুরেই খননকার্য পরিচালিত হয়।

ছবি - ৯ : প্রত্নতাত্বিক খনন এলাকার বিস্তৃতি

এসব খননে মহাস্থানগড়ের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা উদ্ঘাটিত হয়, যা সাতটি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত:
প্রথম পর্যায় (প্রাক-মৌর্য যুগ): খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকের পূর্বে বসতি, মৃৎপাত্র ও প্রাথমিক গৃহনির্মাণের নিদর্শন।
দ্বিতীয় পর্যায় (মৌর্য যুগ, খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক): ব্রাহ্মী লিপি, মুদ্রা, টালি, পাত্র ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিকাশ।
তৃতীয় পর্যায় (শূঙ্গ-কুষাণ যুগ): উন্নত স্থাপত্য, মুদ্রা, অলংকার ও ধর্মীয় নিদর্শন।
চতুর্থ পর্যায় (কুষাণ-গুপ্ত যুগ): পোড়ামাটির ফলক, কাঁচের অলংকার ও সীমিত স্থাপত্য।
পঞ্চম পর্যায় (গুপ্ত যুগ, ৪র্থ–৬ষ্ঠ শতক): ইটনির্মিত মন্দির, রাস্তা ও নগর কাঠামো।
ষষ্ঠ পর্যায় (পাল যুগ, ৮ম–১২শ শতক): বৌদ্ধ বিহার ও ধর্মীয় স্থাপনার বিস্তার,এটি ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধ সময়।
সপ্তম পর্যায় (মুসলিম যুগ): মসজিদ, মাজার ও নতুন স্থাপত্যের উদ্ভব।

১৩শ শতকের পর মুসলিম শাসনের সূচনায় মহাস্থানগড়ের রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যায় এবং ধীরে ধীরে এটি একটি প্রান্তিক অঞ্চলে পরিণত হয়।

১৯৮০ সনে প্রথম বারের মত আমি একবার মহাস্থানগড় পরিদর্শনের জন্য যাই । সে সময় এলঅকার লোকজনের সাথে আলাপচারিতায় বেশ কিছু প্রচলিত লোক কাহিনি শুনতে পাই । জানা যায় সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষ্মণ সেন গৌড়ের রাজা থাকার সময়ে এই গড় অরক্ষিত ছিল। সেসময় মহাস্থানগড়ের রাজা ছিলেন নল। কিন্তু ভাই নীলের সাথে তার বিরোধ লেগেই থাকত। সেসময় এক অভিশপ্ত ব্রাহ্মণ এ এলাকায় আসেন। তিনি তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে ভারতের দাক্ষিণাত্যের শ্রীক্ষেত্র থেকে এখানে আসেন। তিনি পরশু বা কুঠার দিয়ে নিজের মাকে হত্যার দায়ে অভিশপ্ত ছিলেন। তিনি এই দুই ভাইয়ের বিরোধ মেটানোর নাম করে কৌশলে নিজেই রাজা হয়ে যান। ইতিহাসে তিনি পরশুরাম হিসেবে পরিচিত হলেও তার আসল নাম ছিল রাম।

ছবি - ১০ : পরশু রামের প্রাসাদের নিদর্শন/ধংসাবশেষের স্মৃতি চিহ্ন

কিন্তু রাজা হওয়ার পর তিনি অত্যাচারী শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার অত্যাচারে যখন এলাকার জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে, তখন এখানে একজন আধ্যাত্মিক শক্তিধারী দরবেশের আগমন ঘটে। তার নাম ছিল হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (র.)।
কিংবদন্তি অনুযায়ী, তিনি মাছ আকৃতির নৌকা করে (কিছু মানুষের কথা অনুযায়ী, মাছের পিঠে করে) সেসময়ের বিশাল করতোয়া নদী পার হয়ে মহাস্থানগরে আসেন। এজন্য তাঁর আরেক নাম মাহিসাওয়ার, যার অর্থ ‘মাছের পিঠে আরোহণকারী’। তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায় তিনি বর্তমান আফগানিস্তানের বলখী নগর থেকে এসেছিলেন। তিনি সাথে করে অনেক অনুসারীও নিয়ে আসেন এ অঞ্চলে।

ছবি - ১১ : শাহ সুলতান বলখী(র,) মাহিসাওয়ারের মাজার শরীফ(এই মাজার শরীফ অবকাঠামোটি অনেক পরে নির্মিত )

মহাস্থানগরে এসে তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করলে স্থানীয় রাজা পরশুরামের সাথে তার বিরোধ হয়। একসময় (আনুমানিক ১২০৫-১২২০ খ্রিস্টাব্দ) তাদের মাঝে যুদ্ধ হয় এবং যুদ্ধে পরশুরাম পরাজিত ও নিহত হন।

কথিত আছে, জিয়ত কুণ্ড নামে একটি কূপের পানি পান করে পরশুরামের আহত সৈন্যরা সুস্থ হয়ে যেত। তাই হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (র.) একটি ঈগলের মাধ্যমে এই কূপে একটি মাংসের টুকরো ফেলেন। আর তাতেই কূপের পানি তার আশ্চর্য গুণ হারিয়ে ফেলে। এর ফলেই পরশুরাম যুদ্ধে পরাজিত হন।

ছবি -১২ : কিংবদন্তির জিয়ৎ কুণ্ড বা অমর কূপ

মহাস্থানগড়ের আশেপাশে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল রয়েছে, যেমন খোদার পাথর ভিটা, মানকালির ডিবি।

ছবি-১৩ : খোদার পাথর ভিটা


ছবি - ১৪: মানকালীর ঢিবি (যেখানে মন্দির ও মসজিদের স্তর পাওয়া গেছে)

বৈরাগীর ভিটা, স্কন্ধের ধাপ, মঙ্গলকোট, ভাসু বিহার প্রভৃতি। এসব স্থানে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্তরের নিদর্শন পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে যে মহাস্থানগড় ছিল বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

ছবি -১৫ : ভাসু বিহার ( স্থানীয়ভাবে নরপতির ধাপ নামে পরিচিত)

স্থানীয়ভাবে এটি নরপতির ধাপ নামে পরিচিত। এখানে বৌদ্ধ সংঘারামের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছে। ধারণা করা হয়, এটি একটি বৌদ্ধ ধর্মপীঠ ছিল।‘মহাস্থান’ মানে পবিত্র স্থান, এবং ‘গড়’ মানে দুর্গ। উল্লেখ্য আজ থেকে প্রায় ২,৫০০ বছর আগে গড়ে ওঠা এই স্থানটি বৌদ্ধ শিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। চীন ও তিব্বত থেকে অনেক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এখানে লেখাপড়ার জন্য আসতেন। এরপর তারা দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তেন এ শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে। স্থানটি সম্পর্কে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ তার ভ্রমণকাহিনীতে লিখে গেছেন।হিউয়েন সাঙের বিবরণ অনুযায়ী, তখন এখানে প্রায় ২০টি বৌদ্ধ বিহার, ৩০০০ ভিক্ষু এবং ১০০টিরও বেশি মন্দির ছিল।

ছবি- ১৬ : ১৯৬৭ সালে মহাস্থানগরে প্রতিষ্ঠিত প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর

যাদুঘরে সংরক্ষিত মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন যুগের অসংখ্য নিদর্শন হিসাবে সংরক্ষিত বিভিন্ন আ্‌ইটেম যথা মুদ্রা, মূর্তি, অলংকার, অস্ত্র, শিলালিপি ও পোড়ামাটির শিল্পকর্মের মধ্য টেরামাটির কতক চিত্র নীচে দেখানো হল ।

ছবি-১৭ : পোরামাটির শিল্পকর্ম ( সম্ভবত এগুলি অনেক পরের সংগ্রহ যা যাদুগরে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত হচ্ছে)

সার্বিকভাবে, মহাস্থানগড় কেবল একটি প্রত্নস্থল নয় এটি প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি একটি ধারাবাহিক সভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে টিকে ছিল। যদিও সময়ের পরিবর্তনে এর গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে, তবুও এর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আজও বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রমাণ বহন করে। এটি কেবল একটি ধ্বংসাবশেষ নয় বরং বাংলার প্রাচীন পরিচয়ের এক দৃঢ় ভিত্তি।

যাহোক মহাস্থানগরের ইতিহাস বলে পরবর্তী সময়ে পুণ্ড্রবর্ধনের বিস্তৃতি আরও বাড়ে ;পাল, চন্দ্র ও সেন যুগে এটি বিক্রমপুর ও সুন্দরবন পর্যন্ত প্রসারিত হয়। প্রাচীন সাহিত্য (যেমন কথাসরিতসাগর) ও ভ্রমণবৃত্তান্তে পাটলিপুত্র, মিথিলা, কামরূপ প্রভৃতি অঞ্চলের সঙ্গে এর বাণিজ্য ও যোগাযোগ পথের উল্লেখ পাওয়া যায়।


এখন প্রশ্ন করাই যায় বঙ্গ ও “বাঙালির শিকড় খুঁজতে গিয়ে পুন্ড্রনগরকে কী হারিয়ে গেছে বলে মনে হয়?
বিষয়টিকে বহুমাত্রিক দিক হতে পর্যালোচনা পুর্বক একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় ।

ক) নদীর গতিপথ পরিবর্তন
বাংলার ইতিহাসে নদীই প্রধান নিয়ামক।করতোয়া নদী, যা একসময় পুণ্ড্র নগরের প্রাণ ছিল, ধীরে ধীরে পথ পরিবর্তন করে । নদী শুকিয়ে গেলে বা সরে গেলে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায় , জনবসতি কমে যায় , ফলে নগরটি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায়।
প্রাচীন থেকে আধুনিক বাংলার ভৌগোলিক পরিবর্তন বুঝতে হলে নদী ও রাজধানীর গতিবিধি দেখতে হবে। প্রাচীন পুণ্ড্র নগর কেন্দ্র প্রতি প্রবাহমান নদীর গতিপথ একটু দেখা যাক

(খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক)

হিমালয় হতে
↓↓↓↓
করতোয়া নদী
↓↓↓↓
[পুণ্ড্র নগর]
↓↓↓↓
গঙ্গা নদী
করতোয়া নদী ছিল প্রধান জীবনরেখা, পুণ্ড্র নগর ছিল উত্তর বাংলার কেন্দ্র।

মধ্যযুগ (গৌড় ও নদীয়ার উত্থান)
উত্তর বাংলা
↓↓↓↓
(পুণ্ড্র পতন)
↓↓↓↓
[গৌড়]
↓↓↓↓
ভাগীরথী
↓↓↓↓
নদীয়া
নদীর প্রবাহ দক্ষিণে সরে যায়, গৌড় হয়ে ওঠে রাজনৈতিক কেন্দ্র।

মুসলিম শাসনকাল (ঢাকার উত্থান)
গৌড় (পতন)
↓↓↓↓
ঢাকা
(বুড়িগঙ্গা নদী)
↓↓↓↓
পূর্ব বাংলা
নদী ও বাণিজ্য পূর্বদিকে সরে যায়, ঢাকা হয়ে ওঠে রাজধানী

ব্রিটিশ যুগ (কলকাতা কেন্দ্রিকতা)
মুর্শিদাবাদ
↓↓↓↓
কলকাতা
(হুগলি নদীর তীর)
সমুদ্রবাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কলকাতা আধুনিক প্রশাসনিক কেন্দ্র

আধুনিক বিভাজন (১৯৪৭ পরবর্তী)
[ভারত] [বাংলাদেশ]
পশ্চিমবঙ্গ পূর্ববঙ্গ
কলকাতা ঢাকা
ভৌগোলিক নয়, রাজনৈতিক বিভাজন, একই সংস্কৃতি দুই রাষ্ট্রে বিভক্ত

(খ) রাজনৈতিক কেন্দ্রের স্থানান্তর

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ও ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে
পুণ্ড্র নগর →⟩ গৌড় →⟩ লক্ষণাবতী →⟩ ঢাকা →⟩ মুর্শিদাবাদ →⟩ কলকাতা
নতুন কেন্দ্র গড়ে উঠলে পুরনো শহর গুরুত্ব হারায়।

(গ) ঐতিহাসিক সময় প্রবাহে রাজনৈতিক প্রভাব

প্রাচীন যুগ: খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ – খ্রিস্টীয় ৩০০ : পুণ্ড্রবর্ধন জনপদ , মৌর্য ও গুপ্ত শাসন , বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির বিকাশ ।
গুপ্ত-পরবর্তী ও পাল যুগ: ৩০০ – ১২০০ খ্রিস্টাব্দ : পাল সাম্রাজ্য বৌদ্ধ ধর্মের স্বর্ণযুগ , মহাস্থানগড়, সোমপুর মহাবিহার , আন্তর্জাতিক সংযোগ (চীন, তিব্বত) ।
সেন যুগ ও পতন:১১০০ - ১২০৪ : হিন্দু পুনর্জাগরণ , রাজনৈতিক দুর্বলতা , ১২০৪ সালে বখতিয়ার খলজির আগমন →⟩বড় পরিবর্তন।
মুসলিম শাসন: ১২০৪ -১৭৫৭ : গৌড়, পরে ঢাকা কেন্দ্র , ফার্সি-ইসলামিক সংস্কৃতির প্রভাব ,বাংলা ভাষার বিকাশ (মধ্যযুগীয় সাহিত্য)।
ব্রিটিশ যুগ: ১৭৫৭ - ১৯৪৭ : পলাশীর যুদ্ধ , কলকাতা কেন্দ্রিক শাসন , আধুনিক শিক্ষা, জাতীয়তাবাদ
আধুনিক যুগ: ১৯৪৭ - বর্তমান :দেশভাগ ; বাংলাদেশ (১৯৭১) , সাংস্কৃতিক দ্বৈততা কিন্তু অভিন্ন শিকড় ।

(ঘ) আক্রমণ ও ধ্বংস

বিভিন্ন সময়ে আক্রমণ হয়েছে; গুপ্ত পরবর্তী অস্থিরতা ,সেন যুগের পতন, তুর্কি-আফগান আগমন (১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজির অভিযান) এসবের ফলে পুরনো নগর কাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত বা পরিত্যক্ত হয়

(ঙ) ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর

প্রাচীন পুণ্ড্র নগরে ছিল বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব , পরে হিন্দু ধর্ম , মুসলিম শাসন আসার পর নতুন সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি হয় ফলে পুরনো পরিচয় মুছে গিয়ে নতুন পরিচয় তৈরি হয়।

(চ) বহিরাগত শাসন ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

আর্য, মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, তুর্কি, মোগল, ব্রিটিশ প্রত্যেকেই বাংলায় প্রভাব ফেলেছে । ভাষা, ধর্ম, প্রশাসন সবকিছু বদলেছে
ধাপে ধাপে । ফলে একক শুদ্ধ শিকড় খুঁজে পাওয়া কঠিন।

(ছ) ভাষার বিবর্তন

প্রাচীন ভাষা: প্রাকৃত, পালি, সংস্কৃত , মধ্যযুগে: অপভ্রংশ → বাংলা । আজকের বাংলা ভাষা বহু শতাব্দীর পরিবর্তনের ফল।

(জ) উপনিবেশবাদ (ব্রিটিশ শাসন)

ব্রিটিশরা প্রশাসনিক কাঠামো বদলে দেয় , ইংরেজি শিক্ষা চালু করে ,ইতিহাসকে নতুনভাবে লিখে
অনেক স্থানীয় ইতিহাস ও পরিচয় চাপা পড়ে যায়।

(ঝ) দেশভাগ (১৯৪৭)

বাংলা ভাগ হয়ে যায়: পশ্চিমবঙ্গ (ভারত) , পূর্ববঙ্গ → বাংলাদেশ । সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিভাজন ঘটে।

আসলে পুন্ড্র কি হারিয়ে গেছে? না, পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, বরং স্তরে স্তরে লুকিয়ে আছে।

পুণ্ড্র নগর আজও আছে মহাস্থানগড়ে , বাংলার লোকসংস্কৃতি, ভাষা, খাদ্যসবই সেই প্রাচীন শিকড়ের ধারাবাহিকতা ।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমাদের সেই অতীতের সঙ্গে যুক্ত করে ।

মূল উপলব্ধি হল ইতিহাসে কোনো সভ্যতা হঠাৎ মুছে যায় না বরং তা পরিবর্তিত হয় , অন্য সভ্যতার সঙ্গে মিশে যায় , নতুন রূপে বেঁচে থাকে ।পুণ্ড্র নগর →⟩ গৌড় →⟩ ঢাকা →⟩ আধুনিক বাংলা
এই ধারাই বাঙালির প্রকৃত ইতিহাস।

এখন ভু-পাকৃতিক, রাজনৈতিক, সাহিত্যিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণে দেখা যাক পুন্ড্র সত্যিই হারিয়ে গেছে কীনা ?

(ক) প্রকৃতির কথা বললে প্রথমেই আসে নদীর কথা আর নদী হল বাংলার আত্মার রূপক। বাংলার ইতিহাস মানেই নদীর ইতিহাস।নদী যেমন পথ বদলায় , তেমনি সভ্যতাও রূপ বদলায় । পুণ্ড্র নগর হারায়নি,নদীর মতোই তার অস্তিত্ব সরে গেছে অন্য জায়গায়।

(খ) অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা দার্শনিকভাবে বলতে গেলে দেখা যায় তিনটি স্তর আছে যথা :-

১)রূপ →⟩ নগর, স্থাপত্য, ২)চেতনা →⟩ ভাষা, সংস্কৃতি আর ৩) স্মৃতি →⟩ ইতিহাস ।
পুণ্ড্র নগরের রূপ নষ্ট হয়েছে কিন্তু তার চেতনা ও স্মৃতি আজও বেঁচে আছে।

(গ) বাঙালির পরিচয় একটি মিশ্র সত্তা
বাঙালি কোনো একক জাতিগত পরিচয় নয় : দ্রাবিড় + অস্ট্রিক + আর্য + তুর্কি + মোগল + ব্রিটিশ।তাই বঙ্গ ও বেঙ্গলীর শুদ্ধ শিকড় খোঁজা মানে একটি নদীকে একটি উৎসে সীমাবদ্ধ করা।

(ঘ) সাহিত্যিক প্রতিফলন

রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ,তাঁদের লেখায় এই হারানো-না-হারানোর অনুভূতি বারবার এসেছে।
জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে...এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয় - হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে
এখানে ফিরে আসা মানে হারানো শিকড়ে ফিরে যাওয়া নয় , বরং সেই শিকড়ের অন্তর্লীন অস্তিত্বকে অনুভব করা ।

চূড়ান্ত উপলব্ধি হল পুণ্ড্র নগর হারায়নি, সে বাংলার মাটির নিচে, ভাষার ভেতরে, স্মৃতির গভীরে বেঁচে আছে,
বঙ্গের শিকড় প্রোথিত মাটির বহু গভীরে ও বহু স্তরে রয়েছে ছড়িয়ে ।

বাংলা কোনো স্থির ভূখণ্ড নয় এটি একটি প্রবাহমান সময়
যেখানে পুণ্ড্র নগর আজও ঢাকা, কলকাতা,
আর গ্রামবাংলা হয়ে বেঁচে আছে।

বঙ্গভুমি নদীর মতো একে বেকে যাওয়া
তবে মাটির গভীরে প্রোথিত তার শিকর আর
ভূপৃষ্ঠে স্বমহিমায় বিরাজমান ঐতিহাসিক এক দেশ ও জাতি।

তাই কবিতার ভাষায় বলে যাই -

কেউ বলে বঙ্গের শিকড় হারিয়ে গেছে
কেউ বলে পুণ্ড্র নগর নিঃশব্দে মাটির তলায় ডুবে গেছে
কিন্তু ইতিহাস কখনো এত সরল নয়
সে কখনো মৃত্যু নয়, বরং রূপান্তরের এক দীর্ঘ নিশ্বাস।

করতোয়া নদীর তীরে একদিন ভোর হতো
কুয়াশার ভেতর থেকে জেগে উঠত পুণ্ড্র নগর
বণিকদের হাঁকডাক, মন্দিরের ঘণ্টা
বৌদ্ধ ভিক্ষুর স্তব সব মিলিয়ে এক জীবন্ত স্পন্দন।
মাটি তখন শুধু মাটি ছিল না
সে ছিল মানুষের স্বপ্ন, বাণিজ্যের পথ, বিশ্বাসের আলো।

তারপর নদী পথ বদলাল
নদী কখনো কাউকে যায় না বলে
আমি যাচ্ছি চলে।
সে নিঃশব্দে সরে যায়
পেছনে ফেলে যায় শুকনো তীর, ফাঁকা শহর
আর মানুষের স্মৃতিতে জমে থাকা এক দীর্ঘ বিষণ্নতা।

পুণ্ড্র নগর তখন ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে
না, সে একদিনে হারায়নি
সে প্রতিদিন একটু একটু করে ফিকে হয়েছে
যেমন মানুষের মুখের স্মৃতি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়।

গৌড় উঠে আসে
ঢাকা তার পর
কলকাতা আরও পরে
ইতিহাস যেন এক ভ্রমণকারী
যে কখনো এক জায়গায় থাকে না স্থির।

তবু প্রশ্ন জাগে
তাহলে কি শিকড় সত্যিই হারিয়ে যায়?
শিকড় কি শুধুই ইট পাথরের ভেতরে থাকে?
না কি মানুষের ভাষায়, গানের সুরে
ধানের গন্ধে, বৃষ্টির শব্দে?
যদি শিকড় মাটির নিচে থাকে
তবে তা কখনো মরে না
সে অদৃশ্য হয়ে থাকে
কিন্তু সময়মতো আবার নতুন অঙ্কুর হয়ে ওঠে।

বাংলা ঠিক তেমনই এক শিকড়
যাকে দেখা যায় না
কিন্তু অনুভব করা যায়
একজন কৃষকের কণ্ঠে
একটি লালনের গানে
একটি শিশুর প্রথম উচ্চারিত মা শব্দে
পুণ্ড্র নগর আবার জেগে ওঠে
অদৃশ্য অথচ অমলিন।

আমরা ভাবি আমরা বিচ্ছিন্ন
দেশভাগ আমাদের আলাদা করেছে
ইতিহাস আমাদের ভেঙে দিয়েছে।
কিন্তু নদী যেমন দুই তীরকে আলাদা করেও
একই স্রোতে বয়ে যায়
তেমনি বাংলা আজও এক
তার গভীরতম স্তরে।

পুণ্ড্র নগর কোনো ধ্বংসস্তূপ নয়
সে একটি স্মৃতি
একটি প্রবাহ
একটি নীরব উপস্থিতি।
সে আছে
মাটির নিচে
সময়রের ভাঁজে
আমাদের অচেতন সত্তার ভেতরে।

হয়তো একদিন আমরা আবার শুনতে পাব
করতোয়ার হারানো স্রোতের শব্দ
মহাস্থানগড়ের মাটির নিচ থেকে ভেসে আসা ইতিহাসের ডাক।
তখন বুঝব
কিছুই হারায় না।
সবকিছু শুধু রূপ বদলায়
নদীর মতো
মেঠো পথের বাকের মতো
সময়ের মতো
বাংলার মতো।


তথ্য ও ছবি সুত্র : গুগল অন্তরজাল সাথে উইকিপিডিয়া প্লাস নীজ চোখে পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : এই পোস্টটি গতকাল ব্লগার এইচ এন নার্গিস এর ব্লগ বাগানে থাকা একটি মুল্যবান লেখনী
‘বঙ্গ আর বেঙ্গলি ,শেকড়ের খোঁজে , কেন হারিয়ে গেল পুণ্ড্র নগরের সভ্যতা ?পোস্টটি হতে অনুপ্রানীত ।
তাঁর প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা ।

মন্তব্য ১০ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (১০) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪

রাজীব নুর বলেছেন: এক সময় মহাস্থানগড় বাংলার রাজধানী ছিল, ভাবতেই অবাক লাগে।
মহাস্থানগড়ে ''গোকুল'' নামে একটা গ্রাম আছে। সেই গ্রাম এক রহস্যময় গ্রাম।

০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৫০

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



আপনার মন্তব্যটি খুবই আকর্ষণীয় ।এখানে ইতিহাস, লোককথা ও রহস্য এই তিনটি স্তর একসাথে মিশে আছে।
একটু অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।

বাংলার প্রাচীন ইতিহাস, লোকঐতিহ্য ও কল্পনার জগৎ এই তিনের সংমিশ্রণে কিছু স্থান ও কাহিনি এমন এক বিশেষ
মাত্রা পায়, যা একদিকে বাস্তব, অন্যদিকে রহস্যময়। মহাস্থানগড়, গোকুল গ্রাম এবং বেহুলা–লখিন্দরের কাহিনি ঠিক

এমনই একটি জটিল ও আকর্ষণীয় ক্ষেত্র, যেখানে প্রত্নতত্ত্ব, ভূগোল এবং লোকবিশ্বাস একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।
প্রথমেই মহাস্থানগড়ের প্রসঙ্গে আসা যাক। এটি প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের ধ্বংসাবশেষ, যা খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে মধ্যযুগ
পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অনেকেই একে বাংলার রাজধানী বলে উল্লেখ করেন,
তবে অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে দেখা যায় এটি পুরো বাংলার নয়, বরং প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের রাজধানী ছিল। তা
সত্ত্বেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। সুপরিকল্পিত নগরব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা প্রাচীর, পানি ব্যবস্থাপনা সব
মিলিয়ে এটি একটি উন্নত সভ্যতার নিদর্শন।

এই মহাস্থানগড়ের কাছেই অবস্থিত গোকুল গ্রাম, যেখানে রয়েছে গোকুল মেধ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক
স্থাপনা। গবেষণা অনুযায়ী, এটি মূলত ৭ম থেকে ১১শ শতকের একটি বৌদ্ধ স্তূপ বা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ।
পরবর্তীকালে এখানে হিন্দু ধর্মীয় প্রভাবও দেখা যায়। অর্থাৎ, গোকুল কোনো অলৌকিক স্থান নয়, বরং
একটি বহুধর্মীয় ইতিহাস বহনকারী প্রত্নস্থল।

তবে এখানেই শুরু হয় রহস্য। স্থানীয় লোকবিশ্বাসে গোকুল মেধকে বলা হয় লখিন্দরের বাসরঘর যেখানে বেহুলার
স্বামী সাপের কামড়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এই ধারণার কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই; এটি সম্পূর্ণরূপে মঙ্গল
কাব্যের কাহিনির সঙ্গে পরবর্তীকালে যুক্ত একটি সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা। কিন্তু এই লোকবিশ্বাসই গোকুলকে একটি
রহস্যময় স্থানে পরিণত করেছে।

এখন যদি আমরা বেহুলা–লখিন্দর কাহিনিকে ভূগোলের আলোকে দেখি, তাহলে একটি চমৎকার সত্য উন্মোচিত
হয়। এই কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু হলো নদীপথ। বেহুলার যাত্রা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া নদীকে ঘিরে আবর্তিত
যেগুলো সবই বাস্তব নদী। প্রাচীন বাংলার জীবন ছিল নদীনির্ভর, এবং সেই বাস্তবতাই কাহিনির ভিত তৈরি
করেছে। চাঁদ সওদাগরের চাম্পকনগর ও সম্ভবত ভাগীরথি নদীকুলে কোনো বাস্তব বাণিজ্যকেন্দ্রের
প্রতিফলন।

তবে কাহিনির সব অংশ বাস্তব নয়। বেহুলার দেবলোকে যাত্রা, স্বামীর পুনর্জীবন এসব প্রতীকী। এগুলো মানুষের
বিশ্বাস, ভালোবাসা, ধৈর্য এবং নিয়তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের রূপক। এখানে নদীর স্রোত যেন জীবনের অনিশ্চয়তা,
আর বেহুলার নৌযাত্রা মানুষের অদম্য প্রচেষ্টার প্রতীক।

এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয়ীকরণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সাহিত্যিক কাহিনিকে বাস্তব
ভূগোলের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে শুরু করে। ফলে গোকুল মেধের মতো একটি বৌদ্ধ স্তূপ ধীরে ধীরে বাসরঘর এ
রূপান্তরিত হয়। এটি ইতিহাসের বিকৃতি নয়, বরং সংস্কৃতির একটি স্বাভাবিক রূপান্তর প্রক্রিয়া।

আসলে রহস্য শব্দটি এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ। যেখানে ইতিহাস অসম্পূর্ণ, যেখানে
ধ্বংসাবশেষ নীরব, সেখানে মানুষ নিজের কল্পনা দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করে। পুরনো ইট, ভাঙা স্থাপনা,
অজানা অতীত এসবই মানুষের মনে এক ধরনের অলৌকিক অনুভূতি সৃষ্টি করে। সেই অনুভূতিই রহস্য
নামে পরিচিত হয়।

সবশেষে বলা যায়, মহাস্থানগড় ও গোকুল আমাদের একটি গভীর সত্যের সামনে দাঁড় করায়। এখানে ইতিহাস
নিঃশব্দ, কিন্তু লোককাহিনি উচ্চকণ্ঠ। বাস্তব ভূগোলের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষের কল্পনা এক নতুন জগৎ তৈরি
করেছে যেখানে সত্য ও গল্প পাশাপাশি চলে।এই পুরো আলোচনার সারমর্ম এক বাক্যে প্রকাশ করা যায়,
যেখানে প্রমাণের সীমা শেষ হয়, সেখান থেকেই মানুষের কল্পনা ইতিহাসকে রহস্যে রূপ দেয়।

মুল্যবান মন্তব্যটির জন্য ধন্যবাদ

শুভেচ্ছা রইল

২| ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:২৮

নতুন নকিব বলেছেন:



চোখের আড়ালে থাকা আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে শ্রমসাধ্য বিশাল পোস্ট। অনেক কিছু জানার সুযোগ হলো। ধন্যবাদ আপনাকে, প্রিয় ভাই।

০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১৬

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



মুল্যবান মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ ।
আমার এই প্রয়াশটি মুলত বিস্মৃত শিকড়ের সন্ধানে বঙ্গজাতির পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে এক বুদ্ধিবৃত্তিক তথ্যভিত্তিক
যুক্তি নির্ভর আহ্বান।

ইতিহাস কখনো সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় না; সে শুধু আড়ালে সরে যায়। ধূলিধূসর স্তরের নিচে, ভাঙা ইটের স্তূপে, কিংবা
লোককথার অস্পষ্ট রেখায় সে তার অস্তিত্ব লুকিয়ে রাখে। পুন্ড্রনগর আজকের মহাস্থানগড় তেমনই এক নীরব ইতিহাস
যা আমাদের চোখের সামনেই থেকেও অদৃশ্য হয়ে আছে। অথচ এই বিস্মৃত নগরীর ভেতরেই লুকিয়ে আছে বঙ্গ ও
বাঙালি জাতির শিকড়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আমরা যখন নিজেদের পরিচয় খুঁজতে যাই, তখন প্রায়ই ইতিহাসের সাম্প্রতিক স্তরেই আটকে থাকি মধ্যযুগ,
ঔপনিবেশিক যুগ, কিংবা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে। কিন্তু এর বহু আগেই, খ্রিস্টপূর্ব শতাব্দীগুলোতে, এই ভূখণ্ডে
গড়ে উঠেছিল এক সুসংগঠিত নগরসভ্যতা পুন্ড্রনগর। এটি শুধু একটি শহর ছিল না; এটি ছিল প্রশাসন, বাণিজ্য,
সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। করতোয়ার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই নগর যেন এক প্রাচীন স্পন্দনের ধারক, যা
আজও মাটির গভীরে জীবন্ত।

দুঃখজনকভাবে, আমাদের জাতীয় চেতনায় এই পুন্ড্রনগরের স্থান ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে এসেছে। আমরা তার নাম
জানি, কিন্তু তার আত্মা অনুভব করি না। আমরা তার ধ্বংসাবশেষ দেখি, কিন্তু তার ঐতিহ্যের গভীরতা অনুধাবন
করি না। ফলে আমাদের শিকড়ের সঙ্গে একটি সূক্ষ্ম বিচ্ছেদ তৈরি হয়েছে যা হয়তো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু
গভীরভাবে বাস্তব।

এই প্রেক্ষাপটে নব উদ্যোগে আলোচনা শুধু একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক প্রয়োজন।
পুন্ড্রনগরকে নতুনভাবে দেখা মানে শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য পুনরাবিষ্কার করা নয়; বরং আমাদের নিজস্ব ইতিহাস
চেতনা পুনর্গঠন করা। এটি এমন এক প্রচেষ্টা, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কেবল একটি ভাষাভিত্তিক
জাতি নই, আমরা একটি প্রাচীন ভূগোলভিত্তিক সভ্যতার উত্তরাধিকারী।

পুন্ড্রনগরের গুরুত্ব আরও গভীরভাবে অনুধাবন করা যায় যখন আমরা দেখি, এটি ছিল বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক
বিনিময়ের কেন্দ্র। এখানে বৌদ্ধ, হিন্দু এবং পরবর্তী সময়ে মুসলিম সংস্কৃতির ছাপ পাওয়া যায়। এই ধারাবাহিকতা
প্রমাণ করে যে, বাঙালির ইতিহাস কোনো একরৈখিক প্রবাহ নয়; এটি বহুস্বরের এক সমবেত সংগীত। সেই
সংগীতের প্রাচীনতম সুরগুলোর একটি লুকিয়ে আছে পুন্ড্রনগরের স্তব্ধ ইটের মধ্যে।

কিন্তু প্রশ্ন হলোআমরা কেন এই ঐতিহ্যকে নতুন করে আলোচনায় আনব?

প্রথমত, এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তিকে দৃঢ় করে। যে জাতি তার অতীতকে জানে না, সে তার ভবিষ্যৎও
নির্মাণ করতে পারে না। পুন্ড্রনগর আমাদের শেখায়, আমরা কেবল ইতিহাসের ভোক্তা নই; আমরা ইতিহাসের
ধারক।

দ্বিতীয়ত, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনে সহায়তা করে। বহিরাগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব থেকে বেরিয়ে
এসে আমরা যখন নিজেদের ইতিহাসকে নিজেদের চোখে দেখি, তখনই প্রকৃত আত্মমর্যাদা গড়ে ওঠে।

তৃতীয়ত, এটি গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। পুন্ড্রনগর এখনো সম্পূর্ণভাবে আবিষ্কৃত হয়নি।
এর প্রতিটি স্তর, প্রতিটি নিদর্শন আমাদের সামনে নতুন প্রশ্ন তোলে, নতুন অনুসন্ধানের আহ্বান জানায়। আমাদের
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মহাস্থানগর এলাকা তথা বগুরারই এক কৃতি সন্তান । পোস্টটি যদি কোন মতে তাঁর নজরে
পরে তাহলে তার উদ্যোগে এমনো হতে পারে এর অনাবিস্কৃত বিষয়গুলি আবার নবউদ্যমে আবিস্কার হলেও
হতে পারে , আমাদের জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে পারে ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোমপুন্ড্রনগর আমাদের কল্পনাশক্তিকে জাগ্রত করে। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে
একটি বাস্তব ভূগোল ধীরে ধীরে কাহিনি, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে এক নতুন অর্থ ধারণ করে। এখানে ইতিহাস
নিঃশব্দ, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই এক গভীর আহ্বান রয়েছে নিজেকে জানার, নিজের শিকড়কে স্পর্শ করার।

আজকের দিনে, যখন বিশ্বায়নের প্রবাহে অনেক ছোট পরিচয় হারিয়ে যাচ্ছে, তখন পুন্ড্রনগরের মতো ঐতিহ্য
আমাদের একটি স্থির ভিত্তি দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের অস্তিত্বের শেকড় অনেক গভীরে
প্রোথিত, এবং সেই শেকড়কে নতুন করে আবিষ্কার করাই আমাদের দায়িত্ব।

অতএব, পুন্ড্রনগর নিয়ে নব উদ্যোগে আলোচনা কোনো অতীতচর্চার বিলাসিতা নয়; এটি একটি প্রয়োজনীয়
জাগরণ। এটি আমাদের ইতিহাসকে পুনরায় পড়ার, পুনরায় বোঝার এবং নতুন প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে
উপস্থাপন করার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

শেষে বলা যায় যে মাটি আমাদের জন্ম দিয়েছে, তার নীরব ইতিহাসের ভেতরেই আমাদের পরিচয়ের গভীরতম
সত্য লুকিয়ে আছে; আর সেই সত্যকে খুঁজে পাওয়ার পথই হলো পুন্ড্রনগরের দিকে ফিরে তাকানো।

শুভেচ্ছা রইল

৩| ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

রাজীব নুর বলেছেন: সূর্যের চেয়ে বালি গরম। অর্থ্যাত মন্তব্যের চেয়ে উত্তর বড়। বিশাল বড়। সম্ভবত আপনি চ্যাটজিপিটির সাহায্য নেন।

০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৪৮

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



গরম বালুর ওপর হাঁটলে হাত-পা যেমন পুড়ে যায় ঠিক সেই রকম অনুভূতিই কী পেয়েছেন, পেয়ে থাকলে দুঃখিত।
মন্তব্যের চেয়ে আমার উত্তর সবসময় বড়, হয়তো তাই আজও তাই হয়েছে। সুর্যের রোদ যেমন বালিকে গরম
করে তোলে, ঠিক তেমনি মন্তব্যটি আমাকে যথেষ্ট উত্তপ্ত করেছে। সত্যি বলতে, এমন বালসুলভ মন্তব্য
আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়।লেপটপের কী বোর্ডে আমার হাতের আঙ্গুল ঝর তুলে । দিনের ১৫/১৬ ঘন্টা
আমি বিবিধ ধরনের লেখালেখির মধ্যেই থাকি ।

আমি যে প্রাথমিক খসড়া তৈরি করেছিলাম, সেটা এই পোস্টের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বড়। কারণ সে লেখা
দিয়ে বই বের হবে । পোস্টের লেখালেখি আমার প্রকাশিতব্য বই এর রসদ । সেই বড় খসড়ার মধ্য থেকেই
প্রয়োজনমাফিক প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করে কিছু অংশ তুলে এখানে মন্তব্যের ঘরে সংযোজন করেছি। আমার
লেখা প্রায়শই দীর্ঘ হয়, কখনো ২-৩ পৃষ্ঠার। এটা নতুন কিছু নয়, চ্যাট জিপিটির জন্মের অনেক আগে থেকেই
আমার ব্লগে শতাধিক পোষ্টে পাঠক মন্তব্যের ঘরে বিশাল বিশাল গদ্যে পদ্যে লেখা মন্তব্য প্রতি মন্তব্য রয়েছে।
অন্যদের ব্লগেও আমার প্রায় দশ হাজারের ওপর মন্তব্য প্রতিমন্তব্য রয়েছে যার অনেকগুলিই আপনার ডইরী
লেখামুলক পোস্টের চেয়ে অনেক বড় । অনেক গুলিই গদ্যে ও পদ্যে লেখা, যা পড়লেই বোঝা যায় আমি
বিষয়ের কত গভীরে যেতে পছন্দ করি। কষ্টকর হলেও পরের ঘরে বিশাল বিশাল আকারের মন্তব্য লিখে
আসি অবলীলায় অকৃপনভাবে । প্রায় লেখাতেই লাইক দেই , অনেকের লেখা ভালবেসে প্রিয়তে নিয়ে আসি।
এই ব্লগকে , ব্লগের সকলকে ভালবাসী । তবে যারা পরের পিছনে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে টিপ্পনী কেটে বেড়ায়
তাদের নিয়ে এখন দেখছি কিছু নতুন করে ভাবনার বিষয় আছে । অবশ্য যার যার ব্যক্তি স্বাধিনতা বলে কথা।

যাহোক আপনি যদি আমার পোস্টগুলো অনুসরণ করেন, স্পষ্ট দেখতে পাবেন যে আমার জন্য চ্যাট জিপিটি
একেবারেই অপরিহার্য নয়। তবে হ্যাঁ, যখন প্রয়োজন পড়ে, আমি অন্য অনেকের মতো এই নতুন সহায়ক প্রযুক্তিটির
সাহায্য নিই বিশেষ করে লেখার মান উন্নয়ন বা এডিটের জন্য। মোবাইলে বা লেপটপে লিখলে যেমন প্রয়োজন
পরেনা কীভাবে কাকে দিয়ে লেখানো হয়েছে তেমনি প্রযুক্তি বাবহারের কথা বলাটি কী খুব বেশী প্রয়োজন।
যাহোক আশা করি আপনার কৌতুহল নিরসন হয়েছে।

শেষ কথায় বলতে চাই, কে কীভাবে লিখল সেটা বড় কোনো ব্যাপার নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো লেখা প্রাসঙ্গিক
হয়েছে কি না। প্রাসঙ্গিকতা ছাড়া দীর্ঘতা বা শব্দের খেলা কোনও মূল্য রাখে না। তাই আমি সবসময় চেষ্টা করি,
লেখার ভাব, বিষয়বস্তু এবং প্রাসঙ্গিকতা সবার আগে রাখতে। লেখাটি বড় হয়ে গেল কীনা তা আমার কাছে মুখ্য
নয় । যাদের বড় লেখার প্রতি এলার্জী সেটা তাদের বিষয় ।

এই বড় লেখাগুলি আমি শুধু পাঠকের জন্যই লিখিনা । এগুলি তুলে নিয়ে যত্ন করে রেখে দিই আরো বহুবিধ কাজে
লাগবে বলে ।

গরম বালুর মতো ঝলমল করা অনুভূতির মধ্যে এই লেখার স্বাদটা ঠিক সেই রকম যেখানে লেখা বড়, কিন্তু
প্রাসঙ্গিকতা তার প্রাণ।

এই প্রতি মন্তব্যটিও সূর্যের থেকে বালী বেশী গরম অনুভুত হবে নিশ্চয়ই । দয়া করে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা
বলুন । ব্লগ ছেলে খেলার জায়গা নয় । ব্লগ মানে বস্তুনিষ্ট লেখার জায়গা । ব্লগ কতৃপক্ষ ণেখার জন্য কোন শব্দ বা
আকার লিমিটেশন যুক্ত করে দেয়নি । হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র ব্লগার এখন ব্লগে নিয়মিত বিচরণ করছি ।
তাই ব্লগারদের মাঝে মিথক্রিয়া শুভন হলে ব্লগের এই ক্রান্তিকালে খুবই ভাল।

যাহোক লেখায় পাঠক সকল সময়ই সন্মানীত ও মুল্যবান । যা মনে চায় বলতে পারেন ।

শুভ কামনা রইল

৪| ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩

রানার ব্লগ বলেছেন: বর্তমান জেনজি নামক প্রজন্ম এর কোন কিছুই বিশ্বাস করে না । তারা আসমান থেকে পরেই খাটি ঈমান্দার হয়ে বসে আছে ।

০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:০৮

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



অবস্থা দৃষ্টে দেখা যাচ্ছে জেনজি বিবর্তনের উল্টাপথে হাঁটাছে।কিছু ক্ষেত্রে এমন দেখা যায়, বিশেষ করে
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব , অ্যালগরিদম-চালিত কনটেন্ট (যা উত্তেজনাপূর্ণ/চরমপন্থী জিনিস বেশি দেখায়) ,
কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব (রাজনীতি, বাণিজ্য, আইডিওলজি) এতে কিছু তরুণ জেন জী দ্রুত প্রভাবিত
হয় , গভীর যাচাই ছাড়া মত গ্রহণ করে , চরম বা reactionary অবস্থান নেয় ।

তবে এটাকে পুরো জেন জি এর বৈশিষ্ট্য বলা যাবে? না, কারণ একই সাথে উল্টো ছবিটাও আছে । জেনজি ই
আবার fact-checking culture বাড়াচ্ছে , সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে ।নতুন চিন্তা, নতুন সমাধান
আনছে অর্থাৎ একই প্রজন্মের মধ্যে দুই বিপরীত ধারা একসাথে চলছে। ইতিহাসে সব সময়ই তরুণ প্রজন্ম নিয়ে
এমন উদ্বেগ ছিল। নতুন চিন্তা এলে পুরনোরা সেটাকে ভুল মনে করে কিন্তু সেই নতুন চিন্তার মধ্যেই ভবিষ্যতের
বীজ থাকে তাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল guidance (সঠিক দিকনির্দেশনা) সাথে critical thinking
তথা বিচারশক্তি। আমি আশাবাদী জেন জী রা নীজেদেরকে সঠিকভাবেই চালিত করতে পারবে যদি তাদেরকে
কে কীভাবে ব্যবহার করতে চায় কী উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ব্যবহার করতে চাচ্ছে সে বিষয়টা যদি সঠিক সময়ে
সঠিকভাবে উপলব্দি করতে পারে ।

শুভেচ্ছা রইল

৫| ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:১৭

আজাদী হাসান রাজু বলেছেন: আমাদের জেলা +++++

৬| ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৫১

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: নতুন অনেক কিছু জানলাম ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.