নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

স্বাধীনচেত একজন কবি ও লেখক। লিখতে এবং অন্যের লেখা পড়তে ভালোবাসি। ভীষণ ভ্রমণ পিপাসু সময় পেলেই ঘুরতে বের হই। অবসরে মুভি দেখি এবং বই পড়ি।

খন্দকার সাইফুর রহমান আরিফ

খন্দকার সাইফুর রহমান আরিফ › বিস্তারিত পোস্টঃ

ছোট গল্পঃ একটি সত্যি ঘটনা অবলম্বনেঃ করোনা কাহিনী (পাশে থাকার গল্প)।

২৫ শে অক্টোবর, ২০২২ সকাল ৮:২১

একটি সত্যি ঘটনা অবলম্বনেঃ
করোনা কাহিনী (পাশে থাকার গল্প)

রাকিব মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীর জিএম পদে চাকুরী করতো। রুমা তার স্ত্রী। তাদের দুই ছেলে মেয়ে ছেলে বড় মেয়ে ছোট দুজনেই নাম করা বেসরকারী স্কুলে পড়ে। রুমা পুরাপুরি গৃহিনী। যদিও অনেকবার চাকুরী করতে চেয়েছে বাট দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে পেরে উঠেনি। হঠাৎ করোনা পরিস্থিতিতে রাকিবের বেতন অর্ধেকে নেমে গেলো। তাও চলছিলো টেনেটুনে কোনমতো। তারপর একদিন তাদের কোম্পানী বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে গেলে, রাকিবসহ অনেকেরই মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। যদিও কোম্পানী তিন মাসের বেতন দিয়েছে অন্য চাকুরি খোঁজার জন্য ও সে সময়ে চলার জন্য। কিন্তু, তাতে কি আর জীবন চলে? একটা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেলে সেখান থেকে নেমে আসা খুবই কষ্টকর। প্রতিদিন রাকিব নতুন নতুন কোম্পানীতে সিভি পাঠায়। কেউ কেউ ডাকবে বলে কথা দেয়। শেষ পর্যন্ত জব আর তার হয় না। এদিকে করোনার কারণে প্রতিটি জিনিসের দাম বেড়ে বড়ে নাগালের বাইরে চলে গেছে আর জমানো টাকাও প্রায় শেষ। ছেলে মেয়ের স্কুলের বেতন এমন কি বুয়ার বেতনও কয়েক মাসের বাকি। লজ্জায় ঘৃনায় নিজেকে ধিক্কার দেয়া ছাড়া আর কি-বা করতে পারে সে?
জিসান চিৎকার করে কাঁদছে সে পিৎজা খাবে। ডাল ভাত সে খাবে না। রুমা কি করবে দিশেহারা। রাইসা চুপিচুপি মাকে বলে, মা আমরা কি গরিব হয়ে গেছি? এবার রুমা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। রাইসাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। তারপর আস্তে আস্তে চোখ মুছে বলে, না মা তোমার বাবার একটু সমস্যা হয়েছে। নতুন একটি চাকুরি পেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। মেয়ের পাল্টা উত্তর মা বাবার চাকুরি না হওয়া পর্যন্ত কি আমরা গরিব থাকবো তারপর বাবার চাকুরি হলে আমরা আবার বড়লোক হবো? এসব তোমাকে ভাবতে হবে না। যাও খেলো গিয়ে। আবার সে বলে মা, তাহলে ভাইয়াকে আর আমাকে পিৎজা কিনে দাও এসব আমরা খাই না। বলে অন্য রুমে চলে যায় রাইসা।
এর মধ্যে বাড়িওয়ালা এসে হাজির। ভাবি রাকিব ভাই কোথায়? চাকুরিব ইন্টারভিউ দিতে গেছে। শোনেন ভাবি এসব ইন্টারভিউ টিন্টারভিউ দিয়ে এ সময়ে জব হবে না। এখন আরো ছাঁটাই চলছে। নতুন লোক, আর ওনার মতর ওতো বেতনে লোক নেবে না। আমি বলি কি সামনের মাসে কম ভাড়ায় ছোট একটা বাসা দেখে আপনারা উঠে যান। তারপর অবস্থা ঠিক হলে আবার বড় বাসা নেবেন। আর আমার ভাড়ার কথা চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু দিনের পর দিন তো আর আমি ফ্রি রাখতে পারবো না। আপনাদের কথা যেমন আমি ভাবলাম, আমার কথাটাও তো আপনাদের ভাবা উচিৎ। রুমা আস্তে আস্তে বলে না ভাই ঠিক আছে, ও আসুক আমরা আলোচনা করে জানাবো।
রাকিবের খাওয়া শেষ হলে রুমে আস্তে আস্তে বলে শোন, বাড়িওয়ালা ভাই এসেছিলো। কি ভাড়া চাইলো? না। তবে সামনের মাসে বাসা ছেড়ে দিতে বললো। ছোট একটা কমদামি বাসা দেখে চলে যেতে বললো আর ওনার এই তিন মাসের ভাড়া দিতে হবে না। বলো কি এতো দয়া বাড়িওয়ালার? সব বাড়িওয়ালা খারাপ নাকি। ম্যাক্সিমামই কসাই, ভাড়া ছাড়া কিছুই বোঝে না। তাতো একটু হবেই কোটি কোটি টাকা খরচ করে বাড়ি বানায়। তাদের আয়ের একমাত্র উৎস এই বাড়িভাড়া। তাতো একটু এমন হবেই। হুম বড় একটা দীর্ঘশ্বাস রাকিবের।
রাকিব রুমেকে বলে একটু একটু করে তো অনেক ফার্নিচার করেছি। এতোসব নিয়ে ছোট বাসায় যাবে কেমন করে? রুমা তখন বলে হাতে তো কোন টাকা নাই, বাসা পরিবর্তন ও নতুন বাসায় এ্যাডভান্স বাবদও তো টাকা লাগবে। তাই বলি অপ্রয়োজনীয় কিছু ফার্নিচার বিক্রয় করে দাও। পরে অবস্থা বুঝে আবার কেনা যাবে। পরে বিক্রয় ডট.কমে দিয়ে একটা শোফা, একটা এ্যাকুরিয়াম, আরো ছোট খাটো অনেক ফার্নিচার বিক্রয় করে দিয়ে স্রেফ দুটো খাট, দুটো আলমারি, একটা ডাইনিং টেবিল আর জিসান রাইসার পড়ার টেবিল নিয়ে ওরা বাসা পরিবর্তন করে ছোট তিন রুমের একটা বাসা দেখে বনশ্রীতে শিফ্‌ট করে। বাকি ফার্নিচার বিক্রয়ের টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া এ্যাডভান্স এবং বাসা পরিবর্তনের খরচ করে। হাতে দুই চার হাজার টাকা আছে। কি দিয়ে কি হবে মাথায় ধরে না রুমা রাকিবের।
রুমা রাতে শুয়ে শুয়ে রাকিবকে বলে বাসায় কিছুই নাই। কাল কি খাওয়াবো ছেলে মেয়েকে? রাকিব হাওমাও করে শিশুদের মতন কাঁদতে থাকে। এ কোন পাপের শাস্তি? রুমা ওকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করে তারপর আস্তে আস্তে বলে শোন একটা কথা বলি, উত্তেজিত হবে না কিন্তু, কাল কমিশনারের বাসায় সরকারি রিলিফ দিবে করোনায় যাদের ঘরে খাবার নেই তাদের জন্য। আমি গিয়ে নিয়ে আসি? খবরদার, মরে যাবে কিন্তু এ ফকিন্নিদের সাথে লাইন ধরে ঐ চালডাল আনবে না। এবার রুমা নিজেই উত্তেজিত হয়ে যায় চিৎকার করে বলে, তাহলে কি খাবো কাল? একটু বিষ এনে দাও, ছেলে মেয়েকে খাইয়ে আমি খাই।
রাকিব বলে সোহেলের কাছে হাজার দশেক টাকা ধার চেয়েছি। কাল দেবে, দিলেই বাজার করে আনবো। সকালে সোহেলের অফিসে হাজির রাকিব। সোহেল আমতা আমতা করে করে বলে, সরি দোস্ত যে বিলটা পাওয়ার কথা ছিলো তা পাই নাই। আমার কাছে হাজার পাঁচেক টাকা আছে, আজ তোকে তিন হাজার দিতে পারি বাকি দুই হাজার দিয়ে আমি চললাম। মেজাজ গরম হলেও উপায় নাই হাত পেতে ঐ তিন হাজার টাকা নিয়েই চালডাল নুন তেল কিনে বাসায় যায় রাকিব। রাকিব খেয়াল করলো ছেলে মেয়ে দুটোও যেন সব পরিস্থিতি বুঝে গেছে কোন বায়না নাই, কান্নাকাটি নাই।
রুমা আর রাকিব চিন্তা করে এমনি করে তো ঢাকায় থাকা যাবে না। বাড়িতেই ফিরে যাবে। অন্তত বাসা ভাড়াটা তো লাগবে না। রাকিব কিছু একটা করে খাওয়ার টাকাটা জোগাড় করতে পারবে। ঘুম থেকে কলিং বেলের আওয়াজে রাকিব রুমা জেগে উঠে। দুজন দুজনের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকায়! কে হতে পারে এতো সকালে? দরজা খোলে রুমা, দরজায় অচেনা এক যুবক দাড়িয়ে আছে সাথে এক বস্তা চাল, ৫লিঃ তেল, ১০ কেজি আলু , চা, চিনি, ডাল ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসহ নগদ ১০,০০০/-টাকা দেয়। পিছে রাকিব এস হাজির। কে পাঠালো এগুলি? যুবক বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আপনাদেরকে দিতে বলেছে। চিন্তা কইরেন না আপনার যতোদিন না কিছু ব্যবস্থা হচ্ছে ততোদিন আমাকে ফোন দিয়েন প্রতিমাসে আপনাদের চলার মতন ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমরা আপনাদের মতন মধ্যবিত্তদের সাহায্য করছি। যারা এই পরিস্থিতিতে না পারছে রাস্তায় নামতে না পারছে চলতে শুধু তাদেরকেই দিচ্ছি। খুব গোপনে যেন আপনারা লজ্জায় না পরেন। এবং যারা এটা করছে তারা আপনাকে সরাসরি না দিয়ে আমার মাধ্যমে দিচ্ছে যেন আপনার ফেস লস না হয়।
রাকিব আর রুমা বাসা ভাড়া দিয়ে বাচ্চাদের জন্য একটু মাছ মাংস কিনে আনে। এর মধ্যে সোহেল এসে হাজির। ভাবি চা খাবো। রুমা চা করে আনে। সোহেল যাওয়ার সময় রাকিবের হাতে প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা তুলে দিয়ে যায়। বন্ধু তোর নাম না দিয়ে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম আমাদের বন্ধুদের মধ্যে যাদের অবস্থা ভালো তাদেরকে সাহায্য করার জন্য। সবার সম্মিলিত ভাবে আমার কাছে এই টাকাটা আসে। সেটাই তোকে দিয়ে গেলাম। এর আগে তুই তো অনেককে গোপনে সাহায্য করেছিস। এভাবে যদি আমরা আমাদের অসহায় পরিস্থিতির স্বীকার বন্ধুদের পাশে দাঁড়াই তাহলে কারোরই সমস্যা হবে না ইনশাাাল্লাহ। হয়তো আরো কিছু পাবো পেলে তোকে দিয়ে যাবো। রাকিব সেখান থেকে তিন হাজার সোহেলকে দেয়। সোহেল হেসে দিয়ে বলে লাথ্থি দিয়ে তোর পেট ফাটিয়ে দেব। তিন হাজার টাকার হিসাব করছিস। আরে তুই আমার কাছে কতো টাকা পাস তার হিসাব আছে? আমার বিপদে তো দৌড়ে তোর কাছেই যেতাম। কোন দিন খালি হাতে আমাকে ফিরিয়েছিস শয়তান, আর কোনদিনও সেই টাকা আর ফেরত নিয়েছিস? রাকিব অশ্রুসজল চোখে হেসে জড়িয়ে ধরে সোহেলকে, আর বলে বন্ধু অনেক ধন্যবাদ।
সোহেল যাওয়ার সময় বলে আরো একটা সুসংবাদ আছে। তোর কাছ থেকে একটা সিভি নিয়েছিলাম না। ওটা জামান ভাইকে দিয়েছি। এই মাসে না হোক সামনের মাসেই একটা জব তোর হয়ে যাবে। তবে বেতন খুব বেশী হবে না। মোটামুটি দেবে চলতে পারবি। তারপর আস্তে আস্তে বাড়াবে। রাকিবের কাছে সবই যেন স্বপ্নের মতন মনে হচ্ছে। ওর কাছে কেবলই মনে হচ্ছে হয়তো ওর গোপনে করা সাহায্য গুলির প্রতিদান হিসাবে ওপরওয়ালা সব রিটার্ন দিচ্ছে। সবারই মনে রাখা উচিৎঃ “তুমি যা করবে তার প্রতিদান অন্য কোন সময়ে অন্য কোন পরিস্থিতিতে অন্য কারো মাধ্যমে ঠিক ফিরে আসবে।”

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.