| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কীট পতঙ্গের সংসার
রচনাঃ খন্দকার সাইফুর রহমান আরিফ
চরিত্র সমূহঃ
১। গগন জেলে (ঠাকুর দাদা)
২। সুপ্তি (গগণের বড় নাতনী)
৩। রমা (গগণের ছোট নাতনী)
৪। সাবু মাঝি (গগণের ভাতিজা)
৫। ছায়ামাসি (আনন্দের মা)
৬। আনন্দ (ছায়ামাসির একমাত্র ছেলে)
৭। বেনু মাতুব্বর (এলাকার মোড়ল)
৯। সোনা মাঝি (গগণের বড় ছেলে)
১০। মনু মাঝি (গগণের ছোট ছেলে)
১১। মিজান (মুদি দোকানদার)
১২। সিরাজ (চায়ের দোকানদার)
১৩। সেন্টু (বেনু মাতুব্বরের ছেলে)
১৪। মিনা (সেন্টুর মা)
১৫। রমিজ (বেনুর চামচা)
১৬। বকুল (সাবুমাঝির স্ত্রী)
১৭। এলাকার লোকজন ১৫/১৬ জন
১৮। ৫ জন মাতাল
১
অনাবশ্যক সংকীর্ণতা, জড়াজড়ি করে বসবাস, ঘরগুলি সব পরিপাটি কিন্তু চারপাশটা নোংরা, কাঁদা আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই কথা মনে করিয়ে দেয়, “স্থানের অভাব এ জগতে নাই, তবু মাথা গোঁজার ঠাঁই ওদের ঐটুকুই।” পদ্মার ভাঙ্গনে পড়া মানুষের জীবন-যাপন যেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জেলে পাড়াকেও হার মানিয়েছে। গগন জেলে সবচেয়ে প্রবীণ এদের মধ্যে। অনেক কাল আর ইতিহাসের সাক্ষী সে। এখন দুই ছেলে এক মেয়ে নাতিপুতি সবাইকে নিয়ে এখানেই তার বসবাস। এমনি আরো আছে ছায়া মাসি, রমা, রঙ্গনা, সাবু মাঝি, সুপ্তি, আনন্দ, সোনা, মনু ও বেনু মাতুব্বর। এখানে সব ধর্ম-বর্ণ মিলেমিশে একাকার। বেঁচে থাকাটাই আজ প্রধান। অভাবের তাড়নায় এখানে কোন কাজে কোন পাপ নাই, ঝগড়ায় কোন দোষ নাই, সবাই যেন সব জানে আর সব বুঝে তারপরও অনাবশ্যক বিবাদ লেগেই আছে একের সাথে আপরের। আর কোন পার্বণ এলেই সবাই যেন সব বিবাদ ভুলে যায়, মিলে যায় এক সুতায়।
গগন মাঝি জানতে চায়, হ্যারে সুপ্তি কোথায় যাস?
সুপ্তি চিৎকার করে বলে, জানো না কোথায় যাই?
না, কইয়্যা যা মাগি
তোমাগো এতোগুলান পেটের জন্য ধান্দায় যাই
কেন তোর বাপ চাচা থাকতে তোর এতো কিসের দায়?
হ্যারা তো ভাদাইম্যা, কোন কালে দায়িত্ব নিছে?
তোর যাওন লাগবো না ঘরে থাক
নিজেরে বিলায়ে দিয়ে তোমাগো বাঁচায়া রাখছি, আর আমারে প্রশ্ন করো, বাঁধা দাও?
শোন তোর ঐ পাপের পয়সায় খাইয়্যা আমরা বাঁচতে চাই না।
তাই নাকি?
হ
আচ্ছা দেখুমনি, ঐ বুইড়ারে আজ কেউ খাওন দিবি না, দেখি কোন পুণ্যবান মাতারি হেরে খাওন দেয়?
তারপর পান চিবাইতে চিবাইতে সুপ্তি চলে যায় তার আখড়ায়।
হিন্দি আর বাংলা গানের সাথে কোমর দুলিয়ে নাচে আর মদ ঢেলে দেয় সবার গেলাসে এ যেন খোলা আকাশের নিচে বিশাল এক বার। সব মাতাল হয়ে ঘুমে ঢলে পড়লে সুপ্তির ডিউটি শেষ। সে ধীর পায়ে বাড়ির পথে রওনা দেয়।
আনন্দ আজও ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে ছিলো। সে সুপ্তির পিছু নেয়।
কিরে খানকি মাগীর পুত, তুই আইজও আমার পিছু নিছিস।
গালি দেস ক্যান?
আবার কথা কস? ঐ তরে না কইছি খামাখা আমার পিছে ঘুরঘুর করবি না।
ক্যান আমারে তোর ভাল লাগে না?
আমাগো মতন মাইয়াগো ঘর সংসারের কথা ভাবতে নাই।
কি কস এগুলান?
বিয়া করনের কথা ভাবাটা আমাগো পাপ, জানস না, ঐ তুই জানস না? আনন্দের কলার ধরে ঝাকুনি দেয় সুপ্তি।
তুই খালি একবার রাজি হ, দেখ আমি বেবাক ঠিক কইড়া ফ্যালামু।
ধুরু গোলামের ব্যাটা গোলাম, ঐ তুই কি চাস আমার দেহখান তো, চল আজই তোর খায়েশ মিটাই দেই বলেই সুপ্তি একটানে তার শাড়ি খুলে ফেলে।
আনন্দ আস্তে আস্তে ওর শাড়ি ঠিক করে দেয় আর বলে এতোদিনে তুই আমারে এই চিনলি, সুপ্তি?
ঐ তুই জানস না আমি বেশ্যা, আমারে যে ডাকে তার লগেই আমি শুইয়্যা পড়ি, তারপরও তোর ঘেন্যা হয় না আমার উপর, ভালোবাসা দেখাস? তুই জানস না আমার উপর আরো পাঁচ ছয়টা পেট নির্ভর করে। আমি ইচ্ছা করলেই বিয়া করতে পারি না। আর তোর ঘরের লোক আমারে মাইন্যা নিব? তুই কিরে দুনিয়ায় এতো মাইয়্যা থাকতে তুই আমার প্রেমে মরতি আইলি কেন? সুপ্তি কান্দে আর কথা গুলি বলে।
অতোসব জানি না, তুই আমারে বিয়া করলে আমি সব দায়িত্ব নিবো। তরে আমি আর এইসব কিছুই করতে দিমু না দেখিস-
হ সব জানি এখন ধান্দায় আসোস। সাধ মিটে গেলে এমন মিঠা মিঠা কথা আর বাইর হইবো না। তখন কবি আলো মাগি শইর্যা শো, গরম লাগে। তোর গায়ে অন্য ব্যাডাগো গন্ধ ক্যারে, কোন ভাতারের কাছে গেছিলি?
নারে সুপ্তি আমি তরে সত্যিই ভালোবাসি, তোর দেহের জন্য না আমি তোর মন পাইবার চাই। আর আমিতো জানি তুই খারাপ মেয়ে না। সংসারের চাপে পইর্যা তুই নানান ধান্দার কাজ করিস কিন্তু কোন দিন পাপ কাজ করিস না, আমি সব সময় তোর উপর নজর রাখিরে মাইয়্যা, আমারে ফাঁকি দেওয়ন ওতো সহজ না।
হ, হইছে বীর পুরুষ পালোয়ান একটা, এখন বাড়ি গিয়ে ঘুমা। সক্কালে উইঠ্যাই তো আবার কামে যাওন লাগবো।
সুপ্তি হ্যাডে গেছিলাম তোর লাইগ্যা একটা মালা আর কয়ড্যা চুরি আনছি, নে-
ওই তরে কইছি না খামাখা টাকা নষ্ট কইর্যা এইসব আনবি না। এইসব তো আমি ঐ সব হারামজাদাগো কাছ থ্যাইক্যা আদায় করি তুই আবার-
আমার কি ইচ্ছা করে না তরে কিছু দিতে?
হ হইছে, এখন যা, বাড়ি যা-
আচ্ছা যাইতাছি, ওমন করস ক্যান?-
ঘরে ফিরার সাথে সাথে গগন মাঝির খ্যাকানী, ঐ যে মাগি আইছে, নাগররা রাখলো না বুঝি আর?
ঐ বুড়া এতো কথা কও কেন? আমি না গেলে সবাই না খাইয়্যা কবে মইর্যা ভুত হয়ে যাইতা, আমি সাধ কইর্যা ওই সব হারামজাদাগো কাম করি?-
তুই অন্য কাম করতে পারোস না দিদি ভাই?-
নারে বুইড়্যা অন্য কম কেউ দেয় না তো, ওরা খারাপ হইলেও ভন্ড না, আর ভদ্র বেশী ব্যাটাগো কাছে গেলে ওরা ভালোমানুষী ভাব দেখাইয়্যা সব শেষ কইর্যা দিবোরে বুইড়্যা। রাতে খাইছো কিছু?-
বুড়া মাথা ঝাকে, না-
ক্যান, খাও নাই ক্যান, ঘেন্নায়?-
নারে শরীরডা ভালো না, কিছু খাইতেও মন চায় না।
হ আবার ব্যারাম বাঁধানোর মতলব, শোন এবার কিন্তু আমি কোন ওষুধ তষুধ কিনে দিতে পারুম না, বহো খাওন আনতাছি দুইজন একলগে খাই।
সুপ্তি ভাতের থালাডা আইন্যা নিজ হাতে গগন মাঝিকে খাওয়াইয়্যা দেয়
আজ লালশাকটা ভারি মজা নাগতাছেরে সুপ্তি, দে দে একটু বেশী করে খাওয়ায়্যা দে
হ তুমারে কইছে ক্ষুদা লাগলে সবই ভালো লাগেরে বুইড়্যা
ঐ তোর মুখে খালি বিশ ঝরে ক্যা কতো?
জন্মের সময় তোমরা মনে হয় মুখে মধু দেও নাই তাই।
তরে কইছে, তুই বেশী জানস, তরে মুখে মধু আমি দিছি, তোর মাতো জন্ম দিয়েই খালাস, কথাটা বলেই চোখ মুছে গগন মাঝি।
পুলার বউডারে খুব ভালো বাসতা তাই না?
হরে ওতো আমার বউ আছিলো না, ও ছিলো আমার মাইয়্যা। কি শাসন করতো আমারে, কেমন মায়ায় সংসারডারে বাইনধ্যা রাখছিলো। ওউ গেলো আমার সব ভাইস্যা গেলো রে সুপ্তি। ঐ সর্বনাশা পদ্মা.....
সাবু মাঝির চিৎকারে সুপ্তি দৌড়ে গেল, দেখলো সাবু তার বউয়ের চুলের মুঠি ধরে হির হির করে টেনে ঘরের বাইরে নিয়ে আইতেছে।
ও জ্যাডা করো কি, করো কি, জেডিমারে মারতাছো কেন?
আরে মাগি আইজ ত্যাজ দেহাইয়্যা ভাত রান্ধে নাই, ক আমি অহন না খাইয়্যা ঘুমাবো?
বকুল তখন কান্না জড়িত গলায় বলে, ঘরে চাল নাই এক মুডও সেই হুস নাই আখরায় গিয়ে মদ গিলে আইছে, অহন ভাত চায়, ভাত কি আমি বানামু, আমারে খালি খালি মারতাছেরে সুপ্তি।
ও জ্যাডা চাল আনো নাই কেন, জেডি ভাত রানবো কি দিয়া?
ছোট বোনটাকে বলে সুপ্তি, রমা আমাগো পাতিলে যা ভাত আছে তাই জ্যাডারে দিয়া যা তো
রমা এক দৌড়ে ঘর থেকে ভাত ডাল আর লালশাক নিয়ে আসে এবং সুপ্তির হাতে দেয়
সুপ্তি সেই ভাতের থালা সাবুর হাতে দিয়ে বলে জ্যাডা এইটুক খাইয়ে শুয়ে পড়
বকুলের দিকে তাকিয়ে সুপ্তি বলে কি জেডি তুমি রাইতে কিছু খাইছো?
মাথা নেড়ে না জানায় বকুল?
আসো আমাগো ঘরে আসো, দেহি কিছু আছেনি। সুপ্তি, রমা আর বকুল একসাথে ঘরে ঢুকেতে যায়।
ঠিক তখনই চিৎকার করে সাবু বলে, হ ওরে তোগো সাথেই রাখ, আমার ঘরে আর যায়গা নাই মাগির।
সুপ্তি তখন রেগে গিয়ে বলে ক্যান, এতো বড় বড় কথা কও যে, চাইল কিনো না কেন, রাতে মদ গিলার পয়সা হয়, চাইল কিননের পয়সা হয় না, খালি মাইয়্যা মানুষের দোষ, কতো কাল আর জেডির সাথে জানোয়ারের মতন ব্যবহার করবা? আমি হইলে লাথি মাইর্যা তোমার এই সংসার ছাইর্যা কবে চইল্যা যাইতাম। জেডি বইল্যা তোমার অত্যাচার সহ্য কইর্যা পইর্যা আছে।
হ তোর এখন পাখা গজাইছে, মহল্লার ছোকড়াগো মাথা চিবাইয়্যা খাইতেছোস, তোর কি, তোর জেডিরে ছাড় কইলাম।
যদি না ছাড়ি কি করবা, তুমি দেহি একলা একলাই ভাতগুলি গিলল্যা, কই জিগাইলানাতো জেডি খাইছে কি-না, কতো আর হে না খাইয়্যা থাকবো? অহন বুঝবা না, আমার মায়ের নাহাল মরুক আগে তহন বুঝবা কিন্তু কিছুই করনের থাকবো না তহন।
এসময় বাড়ি ফিরে সোনামাঝি, কিরে কি হইছে এতো সোড়গোল কেন? এইড্যা কি নটীবাড়ি নি?
বাবা এতোক্ষনে তোমার আসনের সময় হইলো বলে বাবাকে ধরে সুপ্তি আস্তে আস্তে ঘরে নিয়ে যায় এবং বিছানায় শুইয়ে দেয়।
গগন মাঝি বলে সুপ্তি তোর বাবারে খাওয়ন দে
সুপ্তি বলে সে অহন খাওযনের অবস্থায় নাই, খিদা লাগলে উঠ্যা খাবোনে, খাওয়ন ঢাকা দেওয়া আছে।
চলবেঃ-
©somewhere in net ltd.