| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সত্যপথিক শাইয়্যান
আমি একজন চিন্তুক, সমাজ নিয়ে চিন্তা করি! সমাজের ভালোর জন্যে গান-গল্প-ছড়া লিখি ও আইডিয়া শেয়ার করি। আপনি?
জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক পুনরুত্থান এবং দেশ থেকে দারিদ্র্য পুরোপুরি নির্মূল করার পেছনে এই মাস্টারপ্ল্যানটিই ছিল সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
এই পরিকল্পনাটি ১০ বছরের মধ্যে জাপানের অর্থনীতিকে দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিয়ে ৭.২% বার্ষিক প্রবৃদ্ধির টার্গেট নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে, জাপানিদের কঠোর পরিশ্রম এবং ইকেদার চমৎকার নীতির ফলে মাত্র ৭ বছরেরও কম সময়ে জাপানের অর্থনীতি দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১০% ছাড়িয়ে যায়।
হায়াতো ইকেদার এই পরিকল্পনা যেভাবে জাপান থেকে দারিদ্র্য দূর করে একটি সমতাভিত্তিক মধ্যবিত্ত সমাজ তৈরি করেছিল, তার মূল কৌশলগুলো বাংলাদেশে প্রয়োগ করা যায় কি না তা ভেবে দেখতে হবে।
ভারী ও রাসায়নিক শিল্পায়ন
ইকেদা বুঝতে পেরেছিলেন যে, সস্তা শ্রম ও টেক্সটাইল শিল্পের মতো হালকা খাতের ওপর ভর করে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। তিনি সরকারি বিনিয়োগের দিক পরিবর্তন করে অটোমোবাইল, জাহাজ নির্মাণ, স্টিল এবং রাসায়নিক শিল্পের মতো ভারী ও মূলধন-নিবিড় খাতে ব্যাপক জোর দেন। এর ফলে লাখ লাখ গ্রামীণ অনুন্নত মানুষ শহরের আধুনিক শিল্পকারখানায় উচ্চ বেতনের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, যা তাদের দারিদ্র্যের বৃত্ত থেকে বের করে আনে।
ট্যাক্স হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ ভোগ বৃদ্ধি
দারিদ্র্য দূর করতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি ছিল। ইকেদা সরকার ট্যাক্স বা করের হার ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেন। কর কমানোর ফলে সাধারণ মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ জমা হতে থাকে। এই অর্থ দিয়ে জাপানিরা রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন এবং রঙিন টেলিভিশনের (যা জাপানে "থ্রি ডিভাইন ট্রেজার্স" বা 'তিনটি ঐশ্বরিক রত্ন' নামে পরিচিত ছিল) মতো কনজিউমার পণ্য কিনতে শুরু করে। অভ্যন্তরীণ বাজারের এই বিপুল চাহিদাই জাপানি কোম্পানিগুলোকে আরও বড় হতে সাহায্য করে।
সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী
ইকেদার পরিকল্পনার একটি বড় চালিকাশক্তি ছিল সামাজিক কল্যাণ। ১৯৬১ সালে এই প্ল্যানের অংশ হিসেবে জাপানজুড়ে "সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা" এবং "সর্বজনীন জাতীয় পেনশন ব্যবস্থা" চালু করা হয়। এর ফলে কোনো নাগরিক অসুস্থ হলে বা বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছালে আকস্মিক চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ার ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত হয়ে যান।
শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং পূর্ণ কর্মসংস্থান
মাস্টারপ্ল্যানটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল "পূর্ণ কর্মসংস্থান" নিশ্চিত করা, অর্থাৎ কাজের যোগ্য প্রতিটা নাগরিকেরই চাকরি থাকবে। সরকার সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে ব্যাপক অর্থায়ন শুরু করে। ফলে, গ্রাম থেকে আসা অদক্ষ যুবকরাও দ্রুত প্রশিক্ষণ নিয়ে উচ্চ বেতনের দক্ষ কারখানাকর্মীতে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ পান।
আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ ও গ্রামীণ উন্নয়ন
দারিদ্র্য যেন কেবল গ্রামেই আটকে না থাকে, সেজন্য ইকেদা "আঞ্চলিক আয় বৈষম্য নির্মূল" করার উদ্যোগ নেন। তিনি গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলগুলোর সাথে শহরের সংযোগ বাড়াতে মহাসড়ক, বুলেট ট্রেন (শিনকানসেন) এবং আধুনিক বন্দর নির্মাণের মতো বিশাল পাবলিক ওয়ার্কস প্রজেক্টে রাষ্ট্রীয় তহবিল ঢেলে দেন। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি শহরের বাজারে ভালো দামে বিক্রির সুযোগ পান।
ফলাফল ও মূল মূল্যায়ন
হায়াতো ইকেদার এই "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" জাপানকে একটি চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের দেশ থেকে এমন একটি রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করে যেখানে ৯০% নাগরিক নিজেদের "মধ্যবিত্ত" (Middle Class) বলে মনে করতে শুরু করেন। এটি সমাজের নিচের স্তরের মানুষের আয় এতোটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, মাত্র এক দশকের মধ্যে জাপান থেকে "চরম দারিদ্র্য" শব্দটাই কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়।
জাপানের এই "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই কিন্তু পরবর্তীতে মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ তাঁর বিখ্যাত "লুক ইস্ট পলিসি" তৈরি করেছিলেন।
০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৪
সত্যপথিক শাইয়্যান বলেছেন:
ধন্যবাদ।
অর্থনীতির একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে এমন বিষয় আমাকে অনেক আগে থেকেই টানে।
আমাদের দেশের মানুষগুলো কেমন যেন!!! নেতাদের কথা মানতে চায় না।
নেতারাও তাই সাধারণ মানুষদের মতো হয়ে গিয়েছেন।
ভালো থাকুন নিরন্তর।
২|
০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪
আলামিন১০৪ বলেছেন: শুধু টার্গেট নিলেই কাজ হয় না, দরকার কঠিন পরিশ্রম, সংকল্প আর সততা- জাপানীজদের এগুলো সবই আছে।
ইলেকট্রনিক্স আর ভারী শিল্পে অগ্রগতির পিছনে এদের চমকপ্রদ ইতিহাস আছে। ২য় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর এরা আমেরিকার টেকনলজি চুরি করে এনে তাদের চেয়েও এগিযে যায় বিশেষত-শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রোবোটিক আর্ম, ইলেকট্রনিক্স এ জাপানের তুলনা শুধু জাপান।
https://www.youtube.com/watch?v=ihkRwArnc1k
আপনি অর্থনীতি ছাত্র ছিলেন এককালে, জেনে ভালো লাগল। আপনার মতে ফিয়াট মূদ্রার সাথে সম্পর্কিত মূদ্রাস্ফীতির সমান সুদ আর ইসলামে বণিত রিবা কি এক?
ফিয়াট মূদ্রার কি কোন অন্তনির্হিত মূল্য আছে? ইহা কি একটি চুক্তিপত্র নয়? (চাহিবামাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক ইহার বাহককে ....টাকা দিতে বাধ্য থকিবে)। চুক্তিপত্রে বর্ণিত টাকা তো কোন মুল্যবান ধাতু দিয়ে বিনিময় করবে না। ফিয়াট মূদ্রা ছাপিয়ে সরকার হিডেন ট্যাক্স এর নামে পকেট কেটে সেভিংস বন্ডের মাধ্যমে ইন্টারেস্ট দিলে তা রিবা কিভাবে?
০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ১:১২
সত্যপথিক শাইয়্যান বলেছেন:
আপনি হয়তো জানেন না যে, আরব দেশে আমাদের প্রবাসীরা কি রকম হাড় ভাঙ্গা কাজ করেন। তাঁদের মতো বাংলাদেশীদের একটু পথের দিশা দেখাতে পারলেই আমাদের দেশেই অনেক কিছু সম্ভব।
আর, জাপানীরা চোর নয়।
০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ১:১৩
সত্যপথিক শাইয়্যান বলেছেন:
আপনি কি মূল্যবান ধাতু পকেটে নিয়ে দোকান থেকে আনাজপাতি কেনায় আগ্রহী?
৩|
০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৪৮
রাসেল বলেছেন: জাপান কর্তৃক অনেক উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু দুর্নীতি লাঘবে ভূমিকার কথা কথা তুলে ধরা হয়নি, যা বাংলাদেশে উৎসাহ দেয়া হয় ।
০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ১:১৮
সত্যপথিক শাইয়্যান বলেছেন:
দূর্নীতি প্রায় সব দেশেই রয়েছে।
জাপানেও দূর্নীতি আছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দূর্নিতির ধারনার সূচকে জাপানের অবস্থান ১৮।
অর্থাৎ, ঐ দেশেও দূর্নিতি আছে।
ভালো থাকুন।
৪|
০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৪৬
জ্যাক স্মিথ বলেছেন: সভ্যতা বিবর্তিত হয় আর তাই একদিন আমরাও জাপনাকে ছাড়িয়ে যাবো।
০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ১:১৯
সত্যপথিক শাইয়্যান বলেছেন:
জাপানের ইনকাম ডাবলিং পরিকল্পনা আমাদের দেশেও প্রয়োগ করা যেতে পারতো।
ভালো থাকুন নিরন্তর।
©somewhere in net ltd.
১|
০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৯
সাড়ে চুয়াত্তর বলেছেন: আপনার এই ধরণের লেখা ভালো লাগছে। এই লেখায় উল্লেখিত কৌশল আমাদেরও অনুসরণ করা উচিত (যতটা আমাদের জন্য প্রযোজ্য বা সম্ভব)। কিন্তু আমাদের দেশে সেই রকম কোন নেতা কখনও আসেনি।