(এটা আমার ৫০ তম পোষ্ট। যারা নিজেদের অনিচ্ছায় কর্মহীন থাকতে বাধ্য হচ্ছেন( মানে বেকার),তাদেরকে উৎসর্গ করলাম)।
কুয়েট(খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে EEE পাস করার আগে কখনও ভাবিনি এরকম হবে। ভার্সিটির শেষের দিকে কেউ যদি জিজ্ঞাসা করত,পাস করার পর প্ল্যান কি, সোজা বলে দিতাম ৩ মাস খালি ঘুমাবো।
তারপরেও পাস করার ১-২ মাস আগে থেকেই দেখি অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় চাকরীর জন্য এপ্লাই করা শুরু করেছে। অনিচ্ছা স্বত্বেও কয়েকটায় করলাম। দেখতে দেখতে ফাইনাল রেজাল্ট পাবলিশের আগে কয়েকজন ভাইভাও দিয়ে দিল গোটা কয়েক। আমি ডাক পেলাম না। তবে সেটা আমলে নেয়ার মত ব্যাপার ছিলো না।
যাইহোক, রেজাল্ট দিয়ে দিল ফাইনালি।বিএসসি পাস করে ফেললাম। কয়েকজন পটাপট জবে ঢুকে গেলো। আমার টনক নড়ল, জোরেশোরে এপ্লাই করা শুরু করে দিলাম। ১-২ মাস পার হতেই একেক জন ২-৩টা জবও সুইচ করে ফেলল। অনেকে বড় বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে ঢুকে পড়ল। অথচ আমি ভাইভা দিতেও ডাক পেলাম না।
আমার এসএসসি- এইচএসসি রেজাল্ট ভালোই বলা চলে। বিএসসিরটাও মোটামোটি। শুনেছিলাম রেজাল্ট দিয়ে শুধু ডাক পাওয়া যায়, আর কোনো কাজে আসে না। অথচ আমি এদিকে ভাইভায় ডাকই পাচ্ছি না। ৫-৬ মাস যাওয়ার পর মোটামোটি মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। কোথাও ভাইভাতেও ডাক পাই না। এদিকে আমাদের ব্যাচের বেকারত্বের আকাশ থেকে নক্ষত্রগুলো প্রায় সব খসে পড়েছে। আমি আর আরো দুই-তিন জন মোটা মোটি ষ্টার বেকার। আমরা কোথাও ডাক পাই না। বিডি জবস এ কয়েকশ এপ্লাই হয়ে গেছে। সিভির হার্ডকপি বাংলার ঘরে ঘরে পৌছে দিয়েছি। তারপরেও ভাইভা দেবারও যোগ্যতা অর্জন করতে পারছি না। বড় ভাইদের সহায়তায় কতবার যে সিভির ফর্মেট চেঞ্জ করেছি তার হিসেব নেই।
এরই মাঝে আমি আর আমার বন্ধু, তখনকার ষ্টার বেকার ব্লগার আজম মিলে ঠিক করলাম, বেকারত্বের প্রতিবাদ স্বরূপ আমরা আমাদের সার্টিফিকেটের ফোটোকপি পোড়াব। ডেট টাইম ফিক্সড হলো,আমি চীটাগং যাব আমার সার্টিফিকেটের ফটোকপি নিয়ে। কর্মসূচির ৩ দিন আগে আজমের ভালো একটা জব হয়ে গেলো।
‘বড় একা আমি। নিজের ছায়ার মত, শুন্যতার মত দীর্ঘস্বাস এর মত,নিঃসঙ্গ বৃক্ষের মত, নির্জন নদীর মত -বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত, মৌন পাহাড়ের মত, আজীবন দন্ড প্রাপ্ত সাজা প্রাপ্ত আসামির মত- বড় একা আমি ...বড় একা ।।।।’
ষ্টার বেকার হিসেবে তখন আমার একমাত্র সঙ্গী লম্বা অভি। সেই হতাশাময় দিন গুলো যেন শেষ হবার নয়। এরি মাঝে আমার একটা ভাইভায় ডাক পড়ল। আমাকে ডাকল ‘সুহৃদ ইন্ড্রাস্ট্রিজ’- নামক কে বা কারা(বিডি জবস এ এপ্লাই করেছিলাম)। লম্বা অভিকেও ডাকল হুয়াই টেলিঃ তে। আমাকে ভাইভাতে কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু জানানো হলো, জব লোকেশন ঢাকার বাইরে,১২ ঘন্টা ডিউটি (ফ্যাক্টরির জব), সেলারী ৮ হাজার টাকা । সবকিছুতে রাজি হলে ৫ বছরের বন্ড দিয়ে জয়েন করতে পারি
যাইহোক, এরই মাঝে লম্বা অভির হুয়াইতে জব হয়ে গেলো। আমি পরিণত হলাম সুপারষ্টার বেকারে। ততদিনে বেকারত্বের এনিভার্সারি পালন শেষ হয়েছে। আমাদের ব্যাচে বেকার বলতে সবার চোখে আমার ছবি ভেসে ওঠে- এটা বেশ বুঝতে পারছি।
এরমাঝে একদিন সকালে এক কনসাল্ট্যান্সি ফার্ম থেকে ভাইভায় ডাকল। ঐদিনই দুপুরের পর। গেলাম। প্রায় ৪ ঘন্টা বসে থাকলাম। আমি ছাড়া কেউ ভাইভায় নেই। ভাবলাম, চাকরী বোধ হয় হয়েই যাবে। যাইহোক, ভেতরে ডাকল একপর্যায়ে। দাড়িয়ালা ৫০-৫৫ বছরের এক ব্যাক্তি। আমার সিভি দেখেই বলল- না ,না হবে না। তোমার তো কোনো এক্সপেরিয়েন্সই নেই।
আমি বুঝতে পারলাম না,তাহলে আমাকে কেন ডাকল।
আমি বললাম, এক্সপেরিয়েন্স নেই বলে কেউ যদি ভাইভাতেই না ডাকে,জবে না নেয়-তাহলে এক্সপেরিয়েন্স হবে কেমনে?
দাড়িয়ালা ব্যক্তি ক্ষেপে বলল, তুমি জানো এটা কত টাকার জব( পরে শুনেছি ২০ হাজার)? তোমরা তো এখন করবে ৫-৬ হাজার টাকার চাকরি।
জানিনা দাড়িয়ালা ব্যক্তির সাথে আমার কি শত্রুতা, সে প্রবল আক্রোশে আমাকে ঝাড়ি দিতে লাগল। আমার ভার্সিটি নিয়েও কটু কথা বলল। আমরা নাকি চোথা পড়ে পাস করি,অমুক তমুক।( আরও প্রচুর কটূক্তি করেছে যা না বলাই শ্রেয়)। চাকরির দরকার আমার,কিন্তু তাই বলে ইচ্ছামত অপমান করবে এটা কি কথা ! ইমেডিয়েটলি আমার চোখে পানি চলে আসল। গালি গালাজের মুখেই সেখান থেকে উঠে চলে গেলাম।
সেইদিন আমি এত ফ্রাস্টেটেড ছিলাম তা বলে বোঝাতে পারব না। বাসায় টানা ৩ দিন রুম থেকে বের হইনি। বসে বসে সিগারেট খেয়েছি। মনে হচ্ছিলো লাইফের কোনো ভ্যলুই নাই। তখন আমার মা আমাকে স্বান্ত্বনা দিয়ে একটা কথাই বলেছিলো, বাবা, আমার দোয়া আছে তোমার সাথে। দেখবা জীবনে তুমি অবশ্যই সফল হবা।
আম্মুর এই কথার দেড় মাসের মাঝে একটা মোবাইল অপারেটর কোম্পানীতে আল্লাহর রহমতে জব হয়ে গেল।
যারা অসহনীয় বেকার জীবন কাটাচ্ছেন,তাদের একটা কথাই বলব, চেষ্টা করুন মায়ের দোয়া নিতে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আল্লাহপাক অবশ্যই সন্তানের জন্য মায়ের দোয়া কবুল করেন।
N.B:বেকার জীবনের দুঃখের দিনে আমার পাশে থাকার জন্য যাদের ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করা যাবে না : আসিফ আর আহিত, দিতু, আজম, লম্বা অভি সহ আরও অনেককে। আল্লাহ তোমাদের উত্তম প্রতিদান দান করুন।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে অক্টোবর, ২০১১ রাত ৯:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



