ইরাবতি
আমার ইরাবতি, কতদিন তোমাকে দেখিনা। কত দিন, আহা কতদিন আমি উপোসি তোমার পথ চেয়ে। তোমার ঘরের দরোজা তোমাকে দেখে, পাড়ার মোড়ের পান সিগারেট বিক্রেতা, রাস্তার রিকসাওয়ালা সবাই তোমাকে দেখে। কেবল আমি দেখিনা। আমাকে তুমি খুব ভালো করে জানো বলেই আমাকে এড়িয়ে যাবার সকল কৌশলও তোমার নখদর্পনে। দেখিনা, আহা কতদিন দেখিনা!!
সেই কবে তোমার প্রত্যাখ্যানের না ধ্বণি শুনে নিজেকে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে আমি ফিরে এসেছি। তার পর থেকে আর এক মুহূর্ত্বের জন্যও পারিনি সুস্থির হতে। স্বস্থির নিঃশ্বাস নেয়া ভুলে গেছি আমি। শুধু অনবরত ভুল করে চলেছি। আমার খাবার প্লেট থেকে শুরু করে ঘুমানোর বালিশ, গোসলের সাবান , বারান্দার গ্রীল সব কিছু এখন উদাসি ভুলের দখলে। নির্ভুল ভুলগুলো যখন মাঝে মাঝে সচেতন হয়ে উঠে তখন তাদের মত নির্মম আর কিছু হতে পারে না। অহঃর্নিশ রক্তাক্ত করে আমার অস্তিত্বের ভূ-ভাগ। আহা, কতদিন, কতদিন তোমাকে দেখিনা ইরাবতি !!
তুমি হয়তো জানোনা, আজকাল বড্ড প্রকৌশলী হয়ে উঠছি। নিজেকে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে ভা্ঙ্গনের সকল কলাকৌশল আজ আমি রপ্ত করেছি। এই পৃথিবীতে আমার মত বড় কারিগর তুমি এখন আর খুজে পাবেনা। নিজেকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে বর্ণহীন করে ফেলছি।
ইরাবতি, আমার ইরাবতি, আমি বড্ড হিংশুটে ছিলাম। তোমার সাথে কেউ কথা বলুক, মিশুক এটা আমি মনে মনে কখনো চাইতাম না। তুমি যখন হেসে অন্য কারো সাথে কথা বলতে, বিশ্বাস করো, তখন আমার ভূ-ভাগে নিদারুন খরা জাগতো। আমি জলের আশায় খররৌদ্রের চাতকের মত হাসফাসঁ করতাম। তুমি যখন আমার দিকে কাজলচোখে বড় বড় করে তাকাতে, তখন আমার নিজেকে ভিখিরী মনে হতো, সারাদিন ঘুরে যার সঞ্ছয় এক-আধটা আধুলির বেশী নয়। আহা, ওই দুটি চোখঁ যদি আমি কিনে রাখতে পারতাম!!
কিছুই কি ফিরে আসেনা ইরাবতি? ফিরতে চাইলে সকলি ফিরে আসে। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ যত দুরেই যাক, আবার কূলে ফিরে আসে। দিন শেষে সকল পাখী ফিরে, পশ্চিমে ডুবে পরদিন সকালেই আবার সূর্য ফিরে আসে। এমনকি রাস্তার বেশ্যারাও এক সময় ঘরে ফিরে আসে রমণী হয়ে। শুধু তুমি ফিরে আসোনা ইরাবতি!! আহা কতদিন দেখিনি তোমায়!!
চলে গেছ, যাবে যদি একবারেই যাও না কেন??? কেন আমার স্বপ্নের ভিতর দুঃস্বপ্ন হয়ে হানা দেয়ার দুঃসাহস দেখাও? কেন এই ঝড়ো বাতাসে তোমার শরীলী মাদকতা আমাকে উন্মাতাল করে? তোমার নিঃশ্বাসের শব্দ কেন আজো আমার বুক পকেটে এসে লুকোচুরি খেলে? কেন রক্তচক্ষু মেলে প্রতিদিন আমার দিকে চেয়ে থাকো? কেন আততায়ী হয়ে আমার সুখনিদ্রা খুন করতে আসো? একবারেই চলে যাওনা কেন? আমি দেখতে চাই কতটুকু যেতে পারো? মৃত্যুর চেয়ে বড়ো কোন সীমানা তোমার জানা আছে কি না?
আমাদের কোন দিন ঘর বাধার স্বপ্ন ছিল না। কিন্তু আমাদের একটা যৌথ ঘর ছিল। যেখানে মাঝে মাঝে আমরা সবুজ সবুজ স্বপ্নের আবাদ করতাম। সেই স্বপ্নে বিভোর কত রাতে আমরা প্রকৃতির সকল সীমাবদ্ধতা ভুলে গিয়েছিলাম। যখন অন্ধকারকে ছিড়ে নতুন দিনের বিদ্রোহে সূর্য তৎপর, তখনো আমাদের দুজনের হাত দুজনের হাতের মুঠোয়। কখনো ঘুমের ঘোরে কাধে মাথা রেখে পরস্পরকে বুঝার চেষ্ঠা।
কখনো ঝড়. কখনো নীরবতা। কিন্তু আমাদের হাতের মুষ্ঠি কথনো আলাদা হয়নি। মনে আছে ময়মনসিংহ গিয়েছিলাম আমি একরাতে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমি সারারাত জেগে তোমাকে জানিয়েছিলাম কতটা মিস করছিলাম তোমাকে। রাজশাহীর পদ্মার চরে ভরাপূর্নিমার রাতে আমি তোমাকে চেয়েছিলাম। আমি হাটতে হাটতে, বসতে বসতে, দৌড়াতে দৌড়াতে, শুতে শুতে, খেতে খেতে, কথা বলতে বলতে, তর্ক করতে করতে, বাচতেঁ বাচতেঁ, মরতে মরতে তোমাকে চেয়েছিলাম। উচ্ছারিত প্রতিটি শব্দের, প্রতিটি নিঃশ্বাসের তরজমায় তোমাকে চেয়েছিলাম। প্রতিটি ক্ষনে। আহা সেই তোমাকেই আমি কতদিন দেখি না !!!!!!!!
ইরাবতি, আমার ইরাবতি, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি কখন সুতো ছিড়ে গেলো, সুর ভেঙ্গে গেলো। এক পলকায় পরিচিত তুমি হয়ে গেলে অপরিচিত শহর। আমি হয়ে গেলাম অচল পয়সা। হাজার সাধাসাধি, চিৎকার আর অনুরোধের গলা চেপে ধরে তুমি নিরব হলে। আমি লোনা জলে জং ধরা লোহার মত পুরনো হয়ে গেলাম!! আমারই দোষ। আমি বড়ো বেখেয়ালী ছিলাম। কিন্তু তুমিতো জানো, তার চেয়ে বেখেয়াল ছিলাম "আমার" প্রতি আমি। "আমি" তো আমাকে ছেড়ে যায়নি এখনো। তুমি কেন গেলে? তবে কি "আমার" মত করে আমাকে এখনো ভালোবাসতে পারনি "তুমি"। তুমিতো হার মানো না, এত সহজে "আমার" কাছে এসে হার মেনে গেলে??
কেন চলে গেছ? সেই প্রশ্নটার জবাব আমি খুজেছি অনবরত। সহস্রবার নিজেকে খুটিয়ে খুটিয়ে জিঞ্জেস করেছিলাম, কেন? কেন?? কেন??? কেন???? কেন?????? আমার প্রশ্নগুলো প্রতিধ্বনি হয়ে আমাকেই ব্যঙ্গ করেছে। দাত ভেঙছিয়ে হেসেছে। কোন সদুত্তর দেয় নি। সেই প্রশ্নটার উত্তর আমি আজো পাইনি।
কে হায় হৃদয় খুড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?......... হয়তো আমি বাসি। আর তাইতো এখন আমার জলের সাথে দারুন সন্ধি। লোনা জল আর ঘন লাল জল, যত চাও দিতে পারি। কত নেবে?? আহা কতদিন তোমাকে দেখি নি!!!!
আজকাল শরীরে তেমন একটা বল পাইনা্। গোপন অসুখ বাসা বেধেছে। ডাক্তার সরাসরি আমাকে তেমন কিছু বলে না। কিন্তু আমি তার ভাবসাবে বুঝি। আমার সময় আর বেশী দিন নেই। এই পৃথিবীর আলো বাতাস যথেষ্ঠ ভোগ করেছি। এবার চলে যেতে হবে। সানাই বাজছে। দ্বিতীয় মৃত্যুর অপেক্ষায় আমি(প্রথম মরে গেছি তুমি চলে যাবার পর)। বিষাদের সুর তুলে আমার জন্য কেউ কাদবেনা। আমি বরাবরই ছিলাম নিভৃতচারী মানুষ। নিভৃতেই চলে যাবো। এখনো হাটতে পারি। কিন্তু আর কতদিন পারবো জানি না। আমার কোন আফসোস, অপূর্ণতা, অতৃপ্তি নেই, এক তুমি ছাড়া।
মাঝে মাঝেই চোখঁ বন্ধ করে ভাবি, তুমি আমার উঠোনে বসে আছ। আমি তোমার হাতের আঙ্গুল নিয়ে খেলছি। দুপুরবেলা আকাশমনি গাছের পাতার ফাকেঁ রৌদ্রছায়া যেমন খেলা করে তেমন। তোমার চুলে আমার পছন্দের বেলী ফুল। আমি জানি আমার এ স্বপ্নটা দুঃস্বপ্নেও সত্য হবে না। তারপরও ভাবি, আচ্ছা যদি সত্যি হয়! যদি তুমি সত্যি সত্যি আসো, খুব যতন করে আমার মাথায় সোহাগের হাত রেখে প্রশ্ন করো "তোমার কি হয়েছে?"। আমি তখন কি জবাব দেবো!!!!!!!!!!!!!!
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০০৯ রাত ৯:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




