ছোটবেলায় একটা কথা প্রায়ই শুনতাম: যাঁরা আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা, তাঁদেরকে নাকি আল্লাহ্ আগেভাগেই তাঁর কাছে নিয়ে যান। তবে পরবর্তীতে কেমন যেন খটকা লাগলো। ওপরে যিনি আছেন, তিনি বেছে বেছে আমাদের প্রিয় মানুষগুলোকেই কেন সবার আগে তুলে নিয়ে যান? কাউকে কাউকে কোনো সন্ত্রাসী বা দেশোদ্রোহী ষড়যন্ত্র করে হত্যা করে, আর কারো দেহে বাসা বাঁধে ক্যান্সার, টিউমার বা আরো কত কী! মোটকথা হলো, ভালো লোকের দুনিয়াতে বেশী দিন থাকতে নেই।
প্রসঙ্গ হুমায়ুন আহমেদ। তাঁকে শ্রদ্ধা এবং সমীহমিশ্রিত হিংসা করি আমি। শুধুমাত্র কলমের খোঁচায় কারো বুকের মাঝখানে নিজের জায়গা বানিয়ে নেয়া কোনো ছেলেখেলা নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। বলেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন না- একদিন বাংলার বুকে একজন হুমায়ুনের জন্ম হবে। সহজ লেখা লেখার চেষ্টা কখনও কেউ করেনি- এমনটা তো নয়। কারো মুখের অপরিশীলিত ভাষাকে বিন্দুমাত্র ঘষামাজা না করে বইয়ের পাতায় তুলে দেয়ার পথিকৃত নন তিনি; এর আগেও এ কাজ অনেকেই করেছে। তারপরেও সবার লেখাই ঘুরেফিরে ‘সাহিত্য’ হয়ে যায়; অলংকারের ভারে, জৌলুসের নীচে চাপা পড়ে লেখা হারিয়ে ফেলে তার প্রাণ। আর ওই লোকটার হাতে কালো অক্ষরগুলো প্রাণ পায়। দুই অক্ষরের ‘হিমু’ শব্দটা নিজেই যেন বইয়ের পাতার ওপর হেলে দুলে চলতে থাকে পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে।
ছোটবেলায় মনে আছে- ‘বোতল ভুত’ বইটা উল্টেপাল্টে পড়েছি কতবার- কোনো ইয়ত্তা নেই। তখন খুব ঠান্ডা লাগতো, বুকে কফ বসে যেতো। ওষুধ খেতে হতো প্রতিদিন। সব হোমিওপ্যাথির শিশির ভেতরই ভুত দেখা শুরু করলাম। কোথাও কেউ নেই-এর শেষ পর্ব প্রচারের ১০ বছর পরও আসাদুজ্জামান নূর তাঁর ‘বাকের ভাই’ ইমেজ থেকে বেরোতে পারেন নি। চাবির রিং ছাড়া তাঁকে অসম্পূর্ণ লাগে আজও। এই দুনিয়াতে কয়জন লেখকের কাল্পনিক সৃষ্টির ফাঁসি রুখতে মানুষ রাস্তায় নেমেছিলো? হুমায়ুন আহমেদ সাহিত্যিক নন। সাহিত্যিক তাঁরা- যারা বাস্তব ঘটনা আর কল্পনার একটা ‘পার্ফেক্ট’ মিকচার তৈরি করে ভাষার প্যাকেটে মুড়ে বাজারজাত করেন। যে লোকটা নিজের হৃদয় উজাড় করে দেন লেখার খাতায়, আর সেই হৃদয়ের টুকরো টুকরো আহরণ করে প্রত্যেকটা পাঠক হয়ে যায় হিমু, মিসির আলি আর শুভ্র, সাহিত্যের ভন্ডামী যিনি করেন না, তাঁকে সাহিত্যিক বললে সেটা তাঁর অপমান।
ছোটবেলায় বিটিভির যেকোন নাটকের শুরুতে সব নাম-পরিচয় দেখানোর পর শূন্য পর্দায় ভেসে উঠতো একটা লেখা: ‘রচনা ও পরিচালনা: হুমায়ুন আহমেদ’। লেখাটা এতটাই পরিচিত হয়ে গিয়েছিলো, যে একদিন কোনো নাটক দেখতে বসে ‘হুমায়ুন আহমেদ’-এর জায়গায় অন্য একটা নাম লেখা দেখে আব্বুকে বলেছিলাম- ‘দেখো, দেখো- ভুল লিখেছে!’ প্রথমবারের মত যখন লোকটার চেহারা দেখি একদিন একটা ম্যাগাজিনে- ছোটখাটো একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। ততদিনে বুঝতে শিখেছি। হুমায়ুন আহমেদ যে একটা লোকের নাম, তিনিও যে রক্ত-মাংসের মানুষ- সেটা বোঝার বয়স হয়েছে ততদিনে। তারপরও, যখন দেখলাম- লোকটা সত্যি সত্যি দেখতে আমার আশেপাশের আর দশটা লোকের মত- ব্যাপারটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগছিলো!
কি লিখবো তাঁর সম্পর্কে? যখন ছোটবেলায় ‘আজ রবিবার’ দেখতাম, কেউ যদি আমাকে বলতো- ‘জানিস, এই হুমায়ুন আহমেদ লোকটা না, একদিন ক্যান্সার হয়ে মরে যাবে!’ আমি বিশ্বাস করতাম না। আজও করিনা। বাংলাদেশের পুরো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়া মহা পরাক্রমশালী হুমায়ুন আহমেদ তুচ্ছ ক্যান্সারের কাছে পরাজিত হতে পারেন না। উপরে খোদা আছেন, বিশ্বাস করি। তিনি স্বার্থপরের মত ভালো লোকগুলোকেই বেছে বেছে তুলে নেন আগেভাগে- সেটাও জানি। তবে আমাদের ভালোবাসার শক্তিও ফেলনা নয়। এদেশের লক্ষ লক্ষ পাঠকের বুক উজাড় করা নিঃসার্থ ভালোবাসা তাঁকে এই দুনিয়ার বুকেই গেঁথে রাখবে আরো অনেক অনেক দিন। তিনি ফিরে আসবেন, আবারো লিখবেন। সৃষ্টি করবেন আরো কয়েকজন বাকের ভাই। এত লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসার বাঁধন ছিঁড়তে খোদ খোদারও বেগ পেতে হবে। আমাদের ভালোবাসার টানেই তাঁকে ফিরিয়ে আনবো দেশের মাটিতে- সুস্থ, সবল, সদা-হাস্যোজ্জ্বল আমাদের অতি পরিচিত পুরনো হুমায়ুন আহমেদ হিসেবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই নভেম্বর, ২০১১ সকাল ৯:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




