somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন হুমায়ুন আহমেদ

১৮ ই নভেম্বর, ২০১১ সকাল ৯:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছোটবেলায় একটা কথা প্রায়ই শুনতাম: যাঁরা আল্লাহ্‌র প্রিয় বান্দা, তাঁদেরকে নাকি আল্লাহ্‌ আগেভাগেই তাঁর কাছে নিয়ে যান। তবে পরবর্তীতে কেমন যেন খটকা লাগলো। ওপরে যিনি আছেন, তিনি বেছে বেছে আমাদের প্রিয় মানুষগুলোকেই কেন সবার আগে তুলে নিয়ে যান? কাউকে কাউকে কোনো সন্ত্রাসী বা দেশোদ্রোহী ষড়যন্ত্র করে হত্যা করে, আর কারো দেহে বাসা বাঁধে ক্যান্সার, টিউমার বা আরো কত কী! মোটকথা হলো, ভালো লোকের দুনিয়াতে বেশী দিন থাকতে নেই।

প্রসঙ্গ হুমায়ুন আহমেদ। তাঁকে শ্রদ্ধা এবং সমীহমিশ্রিত হিংসা করি আমি। শুধুমাত্র কলমের খোঁচায় কারো বুকের মাঝখানে নিজের জায়গা বানিয়ে নেয়া কোনো ছেলেখেলা নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। বলেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন না- একদিন বাংলার বুকে একজন হুমায়ুনের জন্ম হবে। সহজ লেখা লেখার চেষ্টা কখনও কেউ করেনি- এমনটা তো নয়। কারো মুখের অপরিশীলিত ভাষাকে বিন্দুমাত্র ঘষামাজা না করে বইয়ের পাতায় তুলে দেয়ার পথিকৃত নন তিনি; এর আগেও এ কাজ অনেকেই করেছে। তারপরেও সবার লেখাই ঘুরেফিরে ‘সাহিত্য’ হয়ে যায়; অলংকারের ভারে, জৌলুসের নীচে চাপা পড়ে লেখা হারিয়ে ফেলে তার প্রাণ। আর ওই লোকটার হাতে কালো অক্ষরগুলো প্রাণ পায়। দুই অক্ষরের ‘হিমু’ শব্দটা নিজেই যেন বইয়ের পাতার ওপর হেলে দুলে চলতে থাকে পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে।

ছোটবেলায় মনে আছে- ‘বোতল ভুত’ বইটা উল্টেপাল্টে পড়েছি কতবার- কোনো ইয়ত্তা নেই। তখন খুব ঠান্ডা লাগতো, বুকে কফ বসে যেতো। ওষুধ খেতে হতো প্রতিদিন। সব হোমিওপ্যাথির শিশির ভেতরই ভুত দেখা শুরু করলাম। কোথাও কেউ নেই-এর শেষ পর্ব প্রচারের ১০ বছর পরও আসাদুজ্জামান নূর তাঁর ‘বাকের ভাই’ ইমেজ থেকে বেরোতে পারেন নি। চাবির রিং ছাড়া তাঁকে অসম্পূর্ণ লাগে আজও। এই দুনিয়াতে কয়জন লেখকের কাল্পনিক সৃষ্টির ফাঁসি রুখতে মানুষ রাস্তায় নেমেছিলো? হুমায়ুন আহমেদ সাহিত্যিক নন। সাহিত্যিক তাঁরা- যারা বাস্তব ঘটনা আর কল্পনার একটা ‘পার্ফেক্ট’ মিকচার তৈরি করে ভাষার প্যাকেটে মুড়ে বাজারজাত করেন। যে লোকটা নিজের হৃদয় উজাড় করে দেন লেখার খাতায়, আর সেই হৃদয়ের টুকরো টুকরো আহরণ করে প্রত্যেকটা পাঠক হয়ে যায় হিমু, মিসির আলি আর শুভ্র, সাহিত্যের ভন্ডামী যিনি করেন না, তাঁকে সাহিত্যিক বললে সেটা তাঁর অপমান।

ছোটবেলায় বিটিভির যেকোন নাটকের শুরুতে সব নাম-পরিচয় দেখানোর পর শূন্য পর্দায় ভেসে উঠতো একটা লেখা: ‘রচনা ও পরিচালনা: হুমায়ুন আহমেদ’। লেখাটা এতটাই পরিচিত হয়ে গিয়েছিলো, যে একদিন কোনো নাটক দেখতে বসে ‘হুমায়ুন আহমেদ’-এর জায়গায় অন্য একটা নাম লেখা দেখে আব্বুকে বলেছিলাম- ‘দেখো, দেখো- ভুল লিখেছে!’ প্রথমবারের মত যখন লোকটার চেহারা দেখি একদিন একটা ম্যাগাজিনে- ছোটখাটো একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। ততদিনে বুঝতে শিখেছি। হুমায়ুন আহমেদ যে একটা লোকের নাম, তিনিও যে রক্ত-মাংসের মানুষ- সেটা বোঝার বয়স হয়েছে ততদিনে। তারপরও, যখন দেখলাম- লোকটা সত্যি সত্যি দেখতে আমার আশেপাশের আর দশটা লোকের মত- ব্যাপারটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগছিলো!

কি লিখবো তাঁর সম্পর্কে? যখন ছোটবেলায় ‘আজ রবিবার’ দেখতাম, কেউ যদি আমাকে বলতো- ‘জানিস, এই হুমায়ুন আহমেদ লোকটা না, একদিন ক্যান্সার হয়ে মরে যাবে!’ আমি বিশ্বাস করতাম না। আজও করিনা। বাংলাদেশের পুরো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়া মহা পরাক্রমশালী হুমায়ুন আহমেদ তুচ্ছ ক্যান্সারের কাছে পরাজিত হতে পারেন না। উপরে খোদা আছেন, বিশ্বাস করি। তিনি স্বার্থপরের মত ভালো লোকগুলোকেই বেছে বেছে তুলে নেন আগেভাগে- সেটাও জানি। তবে আমাদের ভালোবাসার শক্তিও ফেলনা নয়। এদেশের লক্ষ লক্ষ পাঠকের বুক উজাড় করা নিঃসার্থ ভালোবাসা তাঁকে এই দুনিয়ার বুকেই গেঁথে রাখবে আরো অনেক অনেক দিন। তিনি ফিরে আসবেন, আবারো লিখবেন। সৃষ্টি করবেন আরো কয়েকজন বাকের ভাই। এত লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসার বাঁধন ছিঁড়তে খোদ খোদারও বেগ পেতে হবে। আমাদের ভালোবাসার টানেই তাঁকে ফিরিয়ে আনবো দেশের মাটিতে- সুস্থ, সবল, সদা-হাস্যোজ্জ্বল আমাদের অতি পরিচিত পুরনো হুমায়ুন আহমেদ হিসেবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই নভেম্বর, ২০১১ সকাল ৯:২৪
৯টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×