somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

আরিফ রুবেল
জীবন বৈচিত্রময়। জীবনের বিচিত্র সব গল্প বলতে পারাটা একটা গুন আর সবার সেই গুনটা থাকে না। গল্প বলার অদ্ভুত গুনটা অর্জনের জন্য সাধনার দরকার। যদিও সবার জীবন সাধনার অনুমতি দেয় না, তবুও সুযোগ পেলেই কেউ কেউ সাধনায় বসে যায়। আমিও সেই সব সাধকদের একজন হতে চাই।

গল্পঃ শূন্যতার পুনশ্চ

১৫ ই নভেম্বর, ২০১১ ভোর ৫:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শূন্য এবং শূন্যতা

দুই


ইমতিয়াজ প্রায়ই চিন্তা করে সে আত্মহত্যা করবে। প্রায়ই সে ঘরের সিলিং এর দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে প্রচন্ড বেগে ঘুরতে থাকা টঙ্গী ন্যাশনাল ফ্যানটারর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয় ফ্যানটা তো যেকোন সময় খুলে পড়তে পারে। যদিও ম্যাকানিক এনেই লাগানো হয়েছিল ফ্যানটা, তারপরও তার বিশ্বাস হয় না, ফ্যানটাকে কিংবা ম্যাকানিককে। যদি ঝুলতে গিয়ে ফ্যান ছিঁড়ে হাত-পা ভাঙে, তখন আবার আরেক কেলেংকারী হবে।


এই ফ্যানটার একটা ইতিহাস আছে। এটা ইমতিয়াজকে তানিয়া কিনে দিয়েছিল। তখন সে মিরপুরে একটা মেসে থাকত। তানিয়াদের বাসা ছিল মোহম্মদপুরে। যেহেতু ক্যাম্পাসেই ওদের পরিচয়,প্রেম তাই স্বাভাবিকভাবেই ওদের দেখা ক্যম্পাসেই হত বেশি। ইমতিয়াজ থাকত মেসে। মেসের অবস্থা যেমন হওয়ার কথা সেরকমই ছিল। তার উপর ইমতিয়াজের রুমমেটগুলো বিশেষ একটা সুবিধার ছিল না। এরমধ্যে একবার এক রুমমেট ওদের রুমের ফ্যান নিয়ে পালিয়ে গেল। এরপরে একদিন তানিয়া মেসে এসে দেখে ফ্যান ছাড়া ঘুমিয়ে আছে জ্বরাক্রান্ত ইমতিয়াজ । তখন কিছু না বললেও পরদিন আবার এসে হাজির হয় মেসে। এসেই বলল রেডি হতে। তারপর নিয়ে যায় সোজা ফ্যানের দোকানে। সেখান থেকে একটা ফ্যান কিনে দিয়ে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,

“চল এখন আমরা ঢাকা শহর ঘুরবো”

ইমতিয়াজ অবাক হয়ে বলেছিলো “এটা হাতে নিয়েই !”

-হুম

-কষ্ট হবে না ?

-তোমার কষ্ট পাওয়াই উচিত। তোমার ফ্যান নেই, এই গরম, লোড-শেডিং এ তুমি কষ্ট পাচ্ছো অথচ আমাকে কিছুই বলনি। তোমার তো এইটুকু শাস্তি পাওয়াই উচিত।


কিছু না বলে তানিয়ার কথা মেনে নিয়েছিল একবাক্যে। সেদিন সমস্তটা পথ, এমনকি ভালোবাসার চরম মুহুর্তগুলোতেও এই ফ্যানখানা তাদের সাথে ছিল এবং সেদিন থেকেই এই ফ্যানটা ইমতিয়াজের সাথী। তাদের অনেক সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, খুনসুটির সাথে সাক্ষী হিসেবে রয়ে গেছে এই ফ্যানটা। মেস ছাড়ার পর যখন ওরা আনুষ্ঠানিকভাবে একসাথে থাকতে শুরু করল বিয়ের পর তখন তানিয়া চেয়েছিল এই ফ্যানটাকে অন্য কোনো রুমে দিতে, তবে ইমতিয়াজের আপত্তিতে ফ্যানটার জায়গা হয় তাদের বেডরুমে। তাদের একান্ত ব্যক্তিগত রুমে। ডিভোর্সের পরে তানিয়া তার সব জিনিসপত্র নিয়ে গেলেও এই জিনিসটা নেয়নি। বলতে গেলে এই একটা জিনিসই ইমতিয়াজের কাছে আছে তানিয়ার স্মৃতি হিসেবে।


তিন


-স্লামালিকুম ইমতিয়াজ ভাই, কেমন আছেন ?

-ভালো আছি, তুমি কেমন আছো ?

-ভালো, ইমতিয়াজ ভাই আপনি আজকে অফিস করলেন না যে, অসুস্থ ?

-না একটু ব্রেক নিলাম, নাথিং সিরিয়াস।

-ও আমি তো ভেবেছিলাম আপনি আবার অসুস্থ-টসুস্থ কি না ! কালকে অফিস করবেন ?

-ইচ্ছা আছে।

-ওকে ইমতিয়াজ ভাই, দেখা হবে কাল।


শায়লা, ইমতিয়াজের কলিগ। সুন্দরী এবং তরুনী। এই মেয়েটার ব্যাপারে বলা যায় অফিসের সবাই, বিবাহিত-অবিবাহিত একটু-আধটু দুর্বল। মেয়েটা এতটাই সুন্দরী যে অফিসের প্রায় সকল পুরুষই এর সান্নিধ্য পাবার আশায় বসে থাকে। এমনিতে সুন্দরী হলেও শায়লার মাঝে এ নিয়ে আলাদা কোন অহংকার কখনোই দেখেনি ইমতিয়াজ। বরং তার প্রায়ই মনে হয় মেয়েটা নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে তেমন একটা সচেতন না। তেমন আহামরি পোষাক বা রংচঙে মেক-আপ নিতে কখনোই দেখেনি সে মেয়েটাকে। সাধারন সালোয়ার কামিজ এবং তার থেকেও সাধারণ সাঁজে মেয়েটা অফিসে আসে প্রতিদিন।


মেয়েটার ইমতিয়াজের প্রতি একটা দূ্র্বলতা আছে। বেশ সোজা-সাপ্টাভাবেই সে কথাটা জানিয়েছিল ইমতিয়াজকে, এবং অনেকটাই আকস্মিক ছিল সেটা। মেয়েটার কথা শুনে বেশ কিছুক্ষন থম মেরেছিল সে। তারপরে বোঝানোর চেষ্টা করল কেন তাদের এ ধরণের রিলেশনে জড়ানো ঠিক হবে না, বয়সের তফাত, ইমতিয়াজের অতীত, নতুন করে কাউকে ভালোবাসতে না পারার কথা, সব। পুরোটা সময় শায়লা মাথা নিচু করে শুনেছে। ইমতিয়াজের কথা শেষ হলে মাথা তুলে বলেছিল,

“আমি সব জেনেই আপনাকে ভালোবেসেছি, অনেক চেষ্টা করেছি ভালো না বাসতে। কিন্তু কি করব বলুন কিছু বিষয় থাকে যার উপর কারো হাত থাকে না, হয়ে যায়। আমার ক্ষেত্রেও এমনই হয়েছে। আপনি আমার থেকে অনেক বেশি জানেন, বোঝেন। এটা তো বোঝেন যে জোর করে যেমন ভালোবাসা হয় না, তেমনি জোর করে ভালোবাসা নিঃশেষও হয়ে যায় না। আমার সমস্যাটা হল আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। এজন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত”


কথাগুলো বলেই মেয়েটা উঠে চলে যায়। ইমতিয়াজ অবশ্য তার চোখের জল দেখতে পায়নি। তবে কিছুটা অবাক হয়েছিল তার থেকে প্রায় দশ-বারো বছরের ছোট মেয়েটার কথা শুনে।


চার


তানিয়া আর ইমতিয়াজের কোন বাচ্চা ছিল না। সমস্যাটা ইমতিয়াজেরই ছিল। ডাক্তার বলেছিল কোন সম্ভাবনা নেই। তানিয়া মেনে নিয়েছিল ব্যাপারটা। ইমতিয়াজ মেনে নিতে পারেনি। সব সময় একটা অপরাধবোধ কাজ করত। তাই তানিয়াকে বিভিন্নভাবে খুশী করতে তাঁর চেষ্টার কমতি ছিল না। যদিও তানিয়া কখনোই কিছু চায়নি তার কাছে।


তানিয়ার মন ভালো করতে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেত ওরা। এরকমই একটা ট্যুরে গিয়ে ওদের সাথে পরিচয় হয় জিসানের। জিসান মধ্যবয়স্ক উঠতি ব্যবসায়ী, সুদর্শন, বন্ধুভাবাপন্ন। সবার ভালো লাগার মত একটা মানুষ। ইমতিয়াজ আর তানিয়ারও ভালো লেগে যায় মানুষটাকে। তাই ট্যুর থেকে ফিরেও ওদের মাঝে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা থেকে যায়।


চাকরী ছেড়ে ব্যবসা করতে শুরু করেছিল জিসান। প্রাথমিক ক্ষতির ধাক্কা কাটিয়ে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছিল। জীবনের কষ্টের সময়গুলোর গল্প করতো ওদের সাথে। কিছুদিনের মধ্যে খুব ভালো বন্ধু হয়ে যায় সে। প্রায়ই ওদের বাসায় আসত । যখন ইমতিয়াজ বাসায় থাকত না, তখনও। আস্তে আস্তে তানিয়ার সাথে বন্ধুত্বটা যেন একটু বেশিই গাড়ো হয়ে ওঠে। প্রথম প্রথম ইমতিয়াজ কিছু মনে করত না। ভাবত একা একা বাসায় থেকে বোর ফিল করার চাইতে কারো সান্নিধ্য পেলে খারাপ কি। তাছারা চাকুরীর কাজে ব্যস্ততাও বাড়তে থাকে তার নিজের।


প্রথম সন্দেহটা হয় যখন ইমতিয়াজ একদিন বাসায় এসে তানিয়াকে পায় না বাসায়। বাসায় আসতেই জিজ্ঞেস করেছিল কোথায় ছিল সে ? জবাবে তানিয়া বলে বন্ধুর বাসায়। বন্ধুর নাম জিজ্ঞেস করলে তানিয়া তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু শান্তার নাম বলে। ইমতিয়াজ তখন কিছু না বললেও পরদিন শান্তার কাছে ফোন করে জানতে পারে ওর বাসায় যায়নি তানিয়া। সেই থেকেই সন্দেহের শুরু। তারপর আস্তে আস্তে সেটা আরো গাড়ো হয়। এতদিনের সুন্দর সম্পর্কটা আস্তে আস্তে ধ্বংসের দিকেই এগুতে থাকে। এক পর্যায়ে সেটা আর টিকিয়ে রাখার মত অবস্থায় থাকে না।


পাঁচ


তানিয়ার সাথে ডিভোর্সের কিছুদিন পর থেকেই ইমতিয়াজ লেখালেখির দিকে ঝুকে পড়ে। ছোটবেলায় স্কুল ম্যাগাজিনে লেখার সুবাদে তার নিজের প্রতি একটা আত্মবিশ্বাস ছিল সে লিখতে পারে। সেই ধারণাটা আরো গাড়ো হয় যখন তার কয়েকটি লেখা ব্লগে প্রকাশ করার পর প্রশংসা পেতে থাকে। মানুষের প্রশংসা আর লেখালেখির প্রতি ভালো লাগা থেকে সে লিখতে থাকে একের পর এক গল্প। তার একটা গল্পের বইও প্রকাশ পায় বইমেলায়। কিছু ভক্তও তৈরি হয় ব্লগ এবং পরিচিত মহলের বাইরে।


সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু গড়বড় লেগে যায় যখন তানিয়া তাকে আবার ফোন করে। তার খোঁজ খবর জানতে চায়। বলে সে দুঃখিত, ক্ষমা চায় তার কৃতকর্মের জন্য। ইমতিয়াজের শান্ত সহজ সরল জীবনটা আবার কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। পুরোনো সব স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে চোখের সামনে। একবার মনে হয় ঠিকই তো আছে। তানিয়া যা করেছে নিজের ভালোর জন্যেই করেছে। আবার মনে হয় তানিয়া তাকে এভাবে না ঠকালেও পারতো। সে তো তানিয়াকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে কার্পণ্য করেনি একটুও। তাকে তো কম কষ্ট করতে হয়নি, কম বঞ্চনা সহ্য করতে হয়নি। বেকার একটা ছেলে, শুধুমাত্র ভালোবাসার কথা ভেবে ক্যারিয়ার, পরিবার, বন্ধু সবাইকে ভুলে সে তানিয়াকে বিয়ে করেছিল। সে তো পারত ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে পরিবারের মত নিয়ে বিয়ে করে একটা মেয়েকে ঘরে আনতে। সে তো এসব কিছুই ভাবেনি। সে শুধু ভেবেছে তানিয়ার কথা। যখন সে শুনেছে তানিয়ার অমতে তার পরিবার বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে সোজা তানিয়ার বাসায় গিয়েছে, সবার সামনে তানিয়ার হাত ধরে বেরিয়ে এসেছে। তানিয়াও তো তার সাথে চলে এসেছিল শুধুমাত্র ভালোবাসার জোরেই, তাহলে ?


কিছুই মেলাতে পারে না। জীবনের হিসেব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। কিছুই ভালো লাগে না। জীবনের সবচেয়ে দামী সময়টা এক জায়গায় বিনিয়োগ করে বিনিময়ে শুধু প্রবঞ্চনা তাকে শুধুই হতাশ করে। নিজেকে প্রতারিত মনে হয়। হাজার চেষ্টাতেও গল্প লেখা হয়ে ওঠে না তার। পিসির সামনে বসে অযথাই কিবোর্ডে খট খট আওয়াজ তোলে। লেখা হয় না কিছুই। গল্পের প্লটগুলো নিয়ে বসে থাকে শূন্য দৃষ্টিতে। বিষন্নতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয় সে। অনুভব করে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের অতল গহ্বরে।


ছয়


ইমতিয়াজ আজ অফিসে এসেছে। প্রায় সাতদিনের টানা ছুটি শেষে যখন অফিসে ঢোকে তখন সবাই কেমন যেন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। সাতদিন ঘর থেকেও তেমন একটা বের না হওয়ায় হয়তো গায়ের রঙ কিছুটা ফ্যাকাশে হয়েছে। কিন্তু তাতে এতটা অবাক হওয়ার কি আছে বুঝতে পারে না সে। কেমন একটা অস্বস্তি হতে থাকে।


শায়লাও কেমন যেন অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। দেখেও না দেখার ভান। ফাইল দিতে এসে খুব একটা কথা বলা বা হাসিমুখে কুশল জিজ্ঞেস করার চিরাচরিত বিষয়গুলোর অভাব লক্ষ্য করে ইমতিয়াজের ক্মন খারাপ হয়। তবে সে এটার একটা যুক্তি দাঁড় করায় নিজে থেকে।মেয়েটা তার বাসায় আসতে চেয়েছিল দেখা করতে, সে নিষেধ করেছে এই কারণে হয়তো খানিকটা কষ্ট পেয়ে থাকতে পারে। কিংবা এমনিতেই মেয়েটার মন হয়তো খারাপ আজকে, অন্য কোন কারণে যার সাথে হয়তো তার নিজের কোন সম্পর্কই নেই।


কিছুক্ষন অফিস করেই সে বেড়িয়ে পড়ে হয়তো অফিসের অস্বস্তিকর ভাবটা কাটাতেই কিংবা হয়তো কোন কারণ ছাড়াই। কিংবা শায়লায় তাকে দেখেও না দেখাটা হয়তো তার সহ্য হয়নি। যে মেয়ে তাকে এত কেয়ার করে, যার অতিরিক্ত কেয়ার করায় সে নিয়মিতভাবে বিরক্ত হত, সে মেয়েটা এভাবে তাকে অবজ্ঞা করবে এটা হয়তো সে সহ্য করতে পারছে না।


অফিস থেকে বেড়িয়েই বুঝে উঠতে পারে না কোনদিকে যাবে। অফিসের গাড়িটা ছেড়ে দিয়েছে। টাইয়ের নট ঢিল করে ফুটপাথ ধরে হাঁটা শুরু করে। কোন একটা জায়গায় গিয়ে বসতে ইচ্ছে করে খুব। হাঁটতে হাঁটতেই সে নিজেকে নিজেকে আবিস্কার করে শুক্রাবাদ। ধানমন্ডি বত্রিশ, এখানে একটা বার আছে মনে পড়ে তার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্ধুদের সাথে একবার এসেছিল। যদিও সে গলা ভেজানোর কাজটা নিজের মত করে বাসায় সারতে পছন্দ করে তবুও কেন যেন আজকে এই জায়গায় ঢুকতে খুব ইচ্ছে করল। আবার কি ভেবে ঢুকলো না, অভ্যাসটা ভাংতে ইচ্ছে হল না। সবকিছুরই নিজস্ব বলে একটা ব্যপার থাকে। যেমন তার কষ্টগুলো একান্তই তার, খুব কম মানুষই এগুলোর ব্যাপারে জানে, আবার পান করার ব্যাপারটা তার একান্তই নিজস্ব, খুব কম মানুষের সাথে বসে সে পান করেছে এখন পর্যন্ত।


কি করবে যখন ভেবে পাচ্ছিল না ঠিক তখন একটা পরিচিত কন্ঠ শুনে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে জাবীর। জাবীর ওর আর তানিয়ার ক্লাসমেট। ওদের প্রেম থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত সব সময় সব সমস্যার একমাত্র সমাধানদাতা ছিল এই জাবীর। এমনকি তানিয়ার বাসায় ও গিয়েছিল জাবীরের বাইক ধার নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে অনেক আগেই পাড়ি দিয়েছিলে বিদেশে। সেই থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ও যে দেশে ফিরেছে সেটা জানা ছিল না ইমতিয়াজের। পুরোনো বন্ধুকে এমনভাবে কাছে পেয়ে হঠাৎ করেই কিছুটা হকচকিয়ে যায় সে, বিস্ময়ের ঘোরটা কাঁটতেই জড়িয়ে ধরে একে অপরকে। প্রাথমিক ভাব বিনিময়ের পর দু’জনে গিয়ে বসে লেকের ধারে একটা বেঞ্চিতে। জাবীরের দিকে সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিলে যখন সে হাত নেড়ে ফিরিয়ে দেয় কিছুটা অবাক হয় ইমতিয়াজ। একসময়কার চেইন স্মোকার জাবীর রায়হান কিনা সিগারেটের প্যাকেট ফিরিয়ে দিচ্ছে অথচ এই জাবীর রায়হানই এক সময় বন্ধুদের প্যাকেট থেকে চুরি করে সিগারেট খাওয়ায় ওস্তাদ ছিল। আসলেই মানুষ সময়ের সাথে সাথে বদলে যায়।

কিছুক্ষন নীরব থাকার পর জাবীর জিজ্ঞেস করে, “তানিয়া কেমন আছে রে ?”

মাথা নিচু করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইমতিয়াজ। কিছুক্ষন চুপ থেকে সব ঘটনা খুলে বলে। সব মানে সব। ওদের বাচ্চা না হওয়া, ট্যুরে যাওয়া, জিসানের সাথে পরিচয়, ওদের ডিভোর্স, আবার ফিরে ফিরে তানিয়ার ফোন দেয়া, ওর মানসিক সংকট সব উগরে দেয় অনেকদিন পর সবচেয়ে কাছের বন্ধুটাকে পেয়ে। নিজেকে অনেক হালকা লাগে ইমতিয়াজের। মাথা নিচু করে একে একে সব ঘটনা শোনে জাবীর। ইমতিয়াজের কথা শেষ হলে মাথা তুলে বলে,


“এতক্ষন তো তুই বললি, এবার আমি বলি শোন। তোর কথা শুনে মনে হল তুই তোর পুরো ব্যাপারটা নিয়ে খুব বেশি আপসেট। তুই আমাকে বল তানিয়া কি সুখে নেই ? সে তো বেশ সুখেই আছে স্বামী-সংসার নিয়ে। হ্যা তোরা একে অপরকে খুব ভালোবাসতি এবং তার সবচেয়ে বড় সাক্ষী আমি। কিন্তু অতীত তো অতীত। তুই হাজার চেষ্টা করলেও পুরোনো বিষয়টাকে সমাধান করতে পারবি না। মানুষ সবকিছু পারে কিন্তু তার অতীতকে বদলাতে পারে না। মানুষের সেই ক্ষমতা নেই অন্তত এখন পর্যন্ত এবং তুই যতদিন বেঁচে থাকবি ততদিনেও এমন কোন প্রযুক্তি আসার সম্ভাবনা নেই যা দিয়ে তুই সবকিছু ঠিক করে ফেলবি। সবকিছু আগের মত করে ফেলবি। কোন কিছুই আগের মত হয় না। তাহলে কেন এই পুরোনো কাসন্দি ঘাটা ? তুই আমার খোঁজ না রাখলেও আমি তোর খোঁজ রেখেছি। তানিয়ার ব্যাপারটা আমি একটু আধটু জেনেছি লোকমুখে শুনে, তারপরও তোর মুখ থেকে শোনার ইচ্ছা ছিল। শুনে যা মনে হল, তুই শুধু শুধুই নিজেকে ধ্বংস করছিস। তুই ভালো গল্প লিখিস,এখন তা বন্ধ করে দিয়েছিস যার কোন মানে হয় না, এবং এর অধিকার …..”


“কোন মানে হয় না !!! একটা মেয়ে যার জন্য আমার জীবনটা পুরো বদলে গেল, যার জন্য এত কষ্ট করলাম সে আমাকে এভাবে রেখে চলে গেল এখন সেটা নিয়ে আমি ভাবতেও পারব না !!! তুই দিবি আমার জীবনের এতগুলো বছর ? পারবি ফিরিয়ে দিতে সেই দিনগুলো ? পারবি না। এবং তুই বুঝবিও না কি কষ্ট আমার ভেতর। কতটা অসহায় লাগে মাঝে মাঝে।”

দুজনেই চুপ হয়ে যায়। তারপর একটা সময় জাবীর দাঁড়ায় বলে,

“আসলেই আমি এসব ব্যপার বুঝব না। অনেক আগে থেকেই আমি প্রেম ভালোবাসা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি। আর এখন প্রেম ভালোবাসা আবেগ ইত্যাদি বোঝার সময় আমার নেই। তোকে দেবার মত সময়ও আমার হাতে অল্প। সারাক্ষন কানের কাছে একটা ঘড়ি টিক টিক করে। তুই তোর অতীতের বছরগুলো নিয়ে সারাক্ষন ভাবিস আর আমি আমার হাতে থাকা কয়েকটা মাস বা সপ্তাহ নিয়ে প্রতিনিয়ত হিসেব কসি। দোস্ত সত্যি বলছি ক্যান্সার ধরা পড়ার পর ডাক্তার যখন বলল আমার হাতে খুব বেশি সময় নেই। আমিও তোর মত অতীত নিয়ে ভেবে বেশ কয়েকটা দিন নষ্ট করে ফেলেছিলাম। কিন্তু সময় নিয়ে বিলাসিতা তোদের সাজে আমার মত সীমিত সময় নিয়ে যারা পৃথিবীর বুকে বেঁচে আছে তাদের সাজে না। তাই অতীত নিয়ে ভাবা বন্ধ করে আমি সীমিত সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করার চেষ্টা করছি। আমি বেঁচে থাকাটাকে উপভোগ করছি। সত্যি কথা বলতে কি ক্যান্সার হওয়ায় এখন আর আমি অতটা কষ্ট পাই না। বরং আমি নিজেকে সৌভাগ্যমানদের একজন মনে করি যারা মৃত্যুর আগে বেঁচে থাকার মূল্যটা বুঝতে পারছে। সেই তুলনায় তোর হাতে অফুরন্ত সময়। তুই চালিয়ে যা”

কথাগুলো শুনে বজ্রাহতের মত বসে থাকে ইমতিয়াজ। এরকম কিছু শুনবে ভাবতেও পারেনি। শুধু কিছুক্ষন ফ্যাল ফ্যাল করে জাবীরের দিকে তাকিয়েই থাকল। দুনিয়াতে এত মানুষ থাকতে জাবীরই কেন? ইমতিয়াজের চোখে জল আসলেও জাবীরের চোখে ছিল হাসি। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল ইমতিয়াজের শূন্যতার এবার অবসান ঘটবে।


সাত

এর মাস কয়েক পরে জাবীর মারা যায়। কেমো দিতে দিতে এক সময়ে তার মাথার সব চুল পরে গেলে মুখে হাসির কোন কমতি ছিল না কখনোই। ইমতিয়াজ এই পুরোটা সময়ই জাবীরের সাথে থাকার চেষ্টা করেছে। জাবীরের চিকিৎসার কাজে সবসময় সাথে থেকেছে। এমনকি জাবীরের মৃত্যুর পর তার যে ইচ্ছাগুলো ছিল সেগুলোও যাতে ঠিকঠাকমত পালন হয় সেদিকে খেয়াল রেখেছে।

আর হ্যা ইমতিয়াজ শায়লাকে বিয়ে করেছে। আবার গল্প লিখতে শুরু করেছে। তার দু’টো বই বের হবার কথা সামনের বইমেলায়।


-----------------------------------------------------------------------------------



গল্পটা লিখে ফেলে রেখেছিলাম অনেকদিন। এটা নিয়ে আগানোর কথা চিন্তাতেও ছিল না। তবে খুব প্রিয় একজন ব্লগার শয়তান গল্পটা শেষ করতে তাগিদ দেন। শেষ করা একটা গল্প কিভাবে শেষ করব মাথায় খেলে না। তারপরও একভাবে চেষ্টা করেছি শেষ করতে। যে গল্পটা লিখেছিলাম মাত্র আধা ঘন্টায় তার ২য় পর্ব লিখতে সময় লাগল আধা মাস !!! তারপরও লিখতে পেরেছি এইজন্য আমি কৃ্তজ্ঞ ব্লগার শয়তানের কাছে যিনি তাগিদ না দিলে হয়তো গল্পটা যে রকমটা সেরকমই পড়ে থাকত।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ১২:৫৩
১৭টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×