somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

আরিফ রুবেল
জীবন বৈচিত্রময়। জীবনের বিচিত্র সব গল্প বলতে পারাটা একটা গুন আর সবার সেই গুনটা থাকে না। গল্প বলার অদ্ভুত গুনটা অর্জনের জন্য সাধনার দরকার। যদিও সবার জীবন সাধনার অনুমতি দেয় না, তবুও সুযোগ পেলেই কেউ কেউ সাধনায় বসে যায়। আমিও সেই সব সাধকদের একজন হতে চাই।

গল্পঃ শূন্য এবং শূন্যতা

০৬ ই আগস্ট, ২০১১ রাত ২:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাংল ইমতিয়াজ আহমেদের। আজকে অনেকদিন পর সকাল সকাল ঘুম ভাংল তার। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষন বৃষ্টি দেখল, একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেট হাতে নিয়ে আরো কিছুক্ষন বৃষ্টির অঝোর ধারার ক্রন্দন দেখল। তারপর নিজের হাতেই এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে বসল ডেস্কটপের সামনে। অনেকদিন কিছু লেখা হয় না। আসলে অনেকদিন ধরে নতুন কোনো লেখা মাথায় আসছে না তার, পুরোনো লেখাগুলোও এগুচ্ছে না।


এমন না যে সে খুব ভালো লেখে, তবে তার গল্প লিখতে খুব ভালো লাগত একসময়। ভালো লাগত চরিত্রগুলো নিয়ে খেলতে। নিজেকে কেমন যে ঈশ্বর ঈশ্বর মনে হত। মনে হওয়াটা একেবারে যে ভুল ছিল তাও না। তার চরিত্রগুলোর ভাগ্য নিয়ন্তা তো একমাত্র সে নিজেই। তার ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার কোন এখতিয়ার এদের কখনো ছিল না। আর সেদিক থেকে ভাবলে তো সে এক প্রকার ঈশ্বরই!


লেখালেখিকে কখনো সে পেশা হিসেবে নেয়নি কিংবা ভাবেওনি সেরকম করে। তার নিজের অনেক কাজ আছে। ৯টা-৫টা অফিস করে, বন্ধুদেরকে সময় দিয়ে দিন ভালোই চলছিল তার। কিভাবে কিভাবে যেন লেখালেখিটা হয়েই যেত। কিন্তু বেশ ক’দিন যাবত এই সহজ কাজটাই ঠিক হয়ে উঠছে না । এক ধরণের শূন্যতা কাজ করছে তার ভেতরে। অনেক চেষ্টা করেছে সে কারণটা খুঁজে বের করতে, পায়নি। চেষ্টা করেছে নতুন করে লিখতে, পারেনি। তবে ফিরে ফিরে যে উপলব্ধিটা তাঁর বার বার হয়েছে তা হল স্রষ্টা হওয়া যতটা সহজ সে ভেবেছিল, কাজটা অতটা সহজ না। স্রষ্টা কখনো ক্লান্ত হন কিনা সে ব্যপারে না জানলে নিজেকে তার প্রায়ই অনেক ক্লান্ত লাগে। অনেক চেষ্টা করার পরও যখন কিছুই আসে না মাথায় তখন কেমন যেন এক ধরণের হতাশা এসে ভর করতে লাগল তার নিজের উপর।


আজকে অনেকদিন পর সে বসেছে ডেস্কটপের সামনে গল্প লেখার উদ্দেশ্যে। বেশ সময় নিয়ে অসমাপ্ত গল্পগুলো পড়ল। অনেকগুলো গল্প, যেগুলোর প্লট, চরিত্র ভেবে রেখেছিল কিন্তু কেন যেন এগুতে পারেনি! সবগুলো গল্পই কেমন যেন এক একটা অবোধ্য জট। যেগুলো হাজার চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারছে না। মাঝে মাঝে মনে হয় চরিত্রগুলো তারদিকে তাকিয়ে হাসছে। মাঝে মাঝে সেই হাসি প্রচন্ড অসহ্য মনে হয় ইমতিয়াজ আহমেদের কাছে যে তখনই সে পিসি শাট ডাউন করে দেয়। কিছুক্ষন ভাবে, তারপর হয়তো আবার লিখতে বসে। কিন্তু লেখা এগোয় না। এক সময় পুরোনো হতাশা আবার এসে ভর করে। তখন হয়তো একটার পর একটা সিগারেট ধরিয়ে নিজের এই হতাশা কাটাতে চেষ্টা করে সে।



সিগারেট তার নিত্যদিনের সঙ্গী। যখন থেকে সে এই বস্তুটার প্রেমে পড়েছে তখন থেকে এখন পর্যন্ত এই বস্তুটাকে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করতে দেখেনি। শুধু একবার জন্ডিসের সময় মাস দুয়েকের বিচ্ছেদ ছাড়া কখনোই কাছছাড়া করেনি সিগারেট নামক বস্তুটাকে। কয়েক ইঞ্চি আকৃ্তির নিকোটিন নামক বিষের ধারক এই বস্তুটা তার সুখে দুঃখে একমাত্র বন্ধু হিসেবে সবসময় সঙ্গ দিয়ে গেছে তাকে। এবারেও সে এরই আশ্রয় নিল। কিন্তু উপলব্ধি করল আগের মত আর একে বন্ধু মনে হচ্ছে না। হয়তো না লিখতে পারার, মনে অব্যক্ত কথাগুলো কম্পিউটারের স্ক্রীনে ফুটিয়ে তুলতে না পারার বেদনা থেকেই সে ছুড়ে ফেলল মাত্র দু’টান দেয়া সিগারেটটা।


কোনো কিছু ভালো না লাগলেই ছুড়ে ফেলতে হবে এমন কোন কথা নেই। মানুষকে বেশিরভাগ সময়ই ভালো না লাগা অনেক কিছুর সাথে কম্প্রোমাইজ করতে হয়। মানিয়ে নেয়া বা মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা এগুলো মানুষ বড় হতে হতে শেখে, সমাজই তাকে শেখায়। তবে ইমতিয়াজ এই ব্যাপারটার সাথে ঠিক অভ্যস্ত না। বেশিরভাগ সময়ই তার এই কম্প্রোমাইজ না করার মানসিকতা তার কাছের অনেক বন্ধুকে তার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। অনেক সুযোগ সে নিজের ইচ্ছায় ছুড়ে ফেলেছে শুধু কম্প্রোমাইজ করতে পারবে না এই ভেবে। কিন্তু সিগারেটটা তার এভাবে ছুড়ে ফেলাটা ঠিক হয়নি, অন্তত আরো কয়েক টান দিয়ে ফেলে দেয়া যেত। এশট্রেতে নিভে যাওয়া দুমড়ানো সিগারেট শলাকাটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে সে।


তানিয়ার সাথে ছাড়াছাড়িটাও সেই কম্প্রোমাইজ করতে না পারা থেকেই। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ভালোবাসার সেই মানুষটির বিভিন্ন আচরণ যখন সে আর মানতে পারছিল না, তখনই কেমন যেন এলোমেলো লাগত নিজেকে। একদিন ডেকে বলল সে কথাগুলো, খুব ঠান্ডা ভাষায়। নিজের কণ্ঠস্বরে নিজেই অবাক হচ্ছিল ইমতিয়াজ। তানিয়া শুনেছিল। সব শুনে শুধু বলল “আসলে একটা মানুষকে আমরা যেমন ভাবি মানুষটা ঠিক তেমনই হবে এমন কোন কথা নেই। তুমি আমাকে যেমন ভেবেছিল বা যেমন আশা করেছিলে তেমনটা হচ্ছে না। আবার উলটো করে বললে তোমাকে আমি যেমন ভেবেছিলাম তুমি ঠিক তেমন না। আর তাছাড়া মানুষের জীবনটাও যে ঠিক যেমনভাবে সে চায় তেমনভাবেই চলবে তাও ঠিক না। তুমি যদি মনে করো আমার সাথে আর রিলেশন রাখবে না আমার কোনো সমস্যা নেই। আর তাছাড়া আমাদের কোন বাচ্চা নেই, কাজেই আমরা খুব সহজেই আলাদা হতে পারি। তুমি ডিভোর্সের কাগজ রেডি করো আমি সাইন করে দেব।”


কিছুদিনের মধ্যেই ডিভোর্স হয়ে যায় ওদের। তানিয়া একটা বিয়ে করেছে, ওদের সন্তানের প্রথম জন্মদিনে গিয়ে বাচ্চাটাকে উপহারও দিয়ে এসেছে। তানিয়া আর তার স্বামীর মুখে যে হাসি দেখেছে তাতেই সে বুঝেছে কতটা সুখে আছে ওরা। এই সুখটা কি তানিয়া পেত যদি ইমতিয়াজের সাথে সম্পর্কটা এখনো থাকত ? যে সম্পর্কে দুজনের একজনও সুখী না সে সম্পর্কে রেখে কি লাভ ? কি লাভ প্রতিনিয়ত নিজের সাথে কিংবা সেই মানুষটির সাথে কম্প্রোমাইজের নাটক করে ?


দিনকে দিন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আশেপাশের জগত তার কাছে এখন প্রায় অচেনা। সে চেনে না এই শহর কিংবা এই শহরের মানুষগুলোকে। অথচ একসময় কতটা পরিচিত ছিল এই শহর, কতটা আপন ছিল এই শহরের অচেনা মানুষগুলো। বন্ধুরা তাকে একে এক ছেড়ে গিয়েছে। কেন গিয়েছে তারাই জানে। হয়তো কম্প্রোমাইজ করতে পারেনি কিংবা ইমতিয়াজ নিজেই কম্প্রোমাইজ করেনি। বন্ধুমহলে এক সময় প্রবল জনপ্রিয় ইমতিয়াজ এখন বলতে গেলে প্রায় বন্ধুহীন। আবারও সেই হতাশা এসে ভর করে তাঁর উপর।



ইতিমধ্যে আরেকটা সিগারেট ধরিয়েছে ইমতিয়াজ। আজকের দিনটা খুব সুন্দর, চমৎকার পরিবেশ। বাইরে বৃষ্টি। গত ক’দিনের ভ্যাপশা গরমটা নেই। সিগারেটটা হাতে নিয়েই বারান্দায় গিয়ে বসল। ওর বারান্দা থেকে বাইরে রাস্তার বেশ খানিকটা দেখা যায়। অন্যান্য দিনের মত আজকে এত কোলাহল নেই। খুব কম মানুষই বাইরে বেড়িয়েছে। এমনিতেই আজকে ছুটির দিন তার উপর এই বৃষ্টি। সব মিলিয়ে ঘুমন্ত এক শহর উপভোগ করল কিছুক্ষন। ঢাকার আকাশ দেখে না সে বহুদিন, ভাবল কিছুক্ষন ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিঁজে আসে। কিন্তু পরক্ষনেই নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। কি দরকার? বৃষ্টি স্পর্শ না করেই, বৃষ্টি উপভোগ করার মধ্যবিত্ত সুলভ মানসিকতায় পেয়ে বসে তাকে। তার আর বৃষ্টিতে ভেঁজা হয় না। দেখা হয় না কাকেদের বর্ষা-বিলাশ, কিংবা শ্রমিকের কষ্ট কিংবা চায়ের দোকানে অলস বসে থাকা দোকানির হা-হুতাশ। এগুলো নিয়ে সে ভাবে না, সে শুধু ভাবে তার গল্প কেন এগোয় না !

শূন্যতার পুনশ্চ
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০১১ সকাল ৭:৪৪
২৫টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×