
শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল পর্যায়ে বই পড়া প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হয়েছিলো। সে সময়ে বেশ কয়েকটি বই পড়ে পরীক্ষা দিতে হতো। সেখান থেকে বাছাই করে শিক্ষার্থীদের মাঝে ভালো ফলাফলকারীদের পুরস্কার দেয়া হতো। মূল বিষয় ছিলো, শিক্ষার্থীদের মাঝে বই পড়ার অভ্যেস গড়ে তোলার চেষ্টা করা। আমার ধারনা আমার ক্ষেত্রে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এদিক দিয়ে অনেকটাই সফল।
আমার স্কুলে যখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এই প্রোগ্রামটি এলো, আমি খুব দ্রুত নাম লিখিয়ে বেশ কিছু বই নিয়েছিলাম অল্প কয়েকদিনের জন্য। পড়া শেষে বইগুলো ফেরত দিয়ে পরীক্ষাও দিয়েছিলাম। অবশেষে ভালো ফলাফলের জন্য স্যারের হাত থেকে পেলাম সার্টিফিকেট ও কয়েকটি বই। সে সময়ে এই বিষয়টি আমার মনে গভীর দাগ কেটে ছিলো। আমার বাবা-মা দু'জনেই বেশ খুশি হয়েছিলেন, উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। খুব সম্ভবত সেখান থেকেই মূলত সাহিত্যের প্রতি আমার কম-বেশী ভালোলাগা তৈরী হয়েছিলো। মনের এক কোনে সেই ভালোলাগাটা আজও আছে।
এখন জীবন অনেক বেশী ব্যস্ত, খুব বেশী অবসর মেলে না। আর তথ্য এখন এতটাই হাতের নাগালে যে, বই পড়ার জন্য কোথাও গিয়ে বই কেনার প্রয়োজন পড়ে না। অনলাইনে বিভিন্ন সোর্স থেকে বই ডাউনলোড করে পড়া যায়। চাইলে, ঘরে বসে পছন্দের বই-ও অর্ডার করা যায়। যদিও ফিজিক্যাল বই সংগ্রহের একটা ইচ্ছে আমার আছে তবে সেটা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারনে।
২০১০ সালে এ্যাপল কোম্পানী যখন প্রথম আইপ্যাড বাজারে নিয়ে আসে তখন থেকেই আমার কাছে সবসময় আইপ্যাড ছিলো। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মডেলের আইপ্যাড ব্যবহার করেছি। প্রথম দিককার আইপ্যাড খানিকটা বড় ছিলো, পরে অবশ্য এ্যাপল কোম্পানী যখন আইপ্যাড মিনি বাজারে রিলিজ করে। তখন আমি সুইচ করে আইপ্যাড মিনিতে চলে আসি। এক হাতে ধরে নিয়ে বই পড়ার জন্য আপাতত এর চেয়ে কোন ভালো ডিভাইস আমার চোখে পড়ে নি। বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে আমার স্কুল পড়ুয়া ছেলেকেও আইপ্যাড মিনি দিয়েছি যাতে সে আমারটা ব্যবহার না করে। সে তার আইপ্যাড ব্যবহার করে কার্টুন দেখার জন্য, ফেইসটাইমে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে কথা বলার জন্য ও স্কুলের বইগুলোর ডিজিটাল ভার্সন পড়ার জন্য।
আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমেরিকায় বই কিনে পড়ার তেমন সুযোগ ছিলো না। যেটা করতাম সেটা হলো লাইব্রেরীতে গিয়ে পাঠ্য বই কয়েক ঘন্টা পড়ার জন্য নিয়ে নিতাম। লাইব্রেরীতে নিজের ডেস্কে বসে আইপ্যাডের ক্যামেরা ব্যবহার করে প্রত্যেকটা পাতার ছবি তুলে নিয়ে আসতাম। বাসায় এসে সেগুলোকে একত্র করে পি.ডি.এফ. -এ কনভার্ট করে বই আকারে বানিয়ে নিয়ে সেটা দেখেই মূলত পড়াশোনা করতে হতো। সেই থেকেই মূলত বই পড়ার জন্য আইপ্যাডের উপর এক ধরনের নির্ভরতা চলে আসে।
আমার আইপ্যাডে পাঠ্য বই বইয়ের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যেরও কিছু বই সব-সময়ই থাকতো, এখনও আছে। হুমায়ুন আহমেদ এর কিছু বই আজও পড়া হয়নি, ধীরে ধীরে সেগুলোই পড়ার চেষ্টা করছি। ইচ্ছে হলেই মাঝে মাঝে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে আইপ্যাড থেকে আগে নিয়ম করে পড়া হতো। বাংলাদেশে এসেও সে অভ্যেসটার তেমন কোন পরিবর্তন হয় নি, এখনোও তেমনটাই হচ্ছে তবে আগের তুলনায় অনেক কম। ইদানীং অবশ্য অধ্যাপক মাইকেল শয়্যারের "ইম্পেরিয়াল হিউবরিস" বইটি পড়ার চেষ্টা করছি, শেষ করতে পারছি না। লং-ফ্লাইটে বই পড়াটা আমার পুরোনো অভ্যেস, তবে এই বইটা খানিকটা পড়েই কিছুটা হাপিয়ে উঠি, বার বার চেষ্টা করেও এক নাগাড়ের পড়ে বইটা এখনো শেষ করতে পারিনি। একই লেখকের অন্য আরেকটি বই "থ্রু আওয়ার এনিমি'স আইজ" আমার হাতে এসেছে বেশ অনেকদিন, সেটা শুরুও করতে পারিনি এখনও।
আজ বিকেলে যখন ছেলেকে স্কুলের বাস থেকে রিসিভ করার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি, তখন রাস্তার ঠিক উল্টো দিকেই দেখলাম ভ্রাম্যমান ঐ লাইব্রেরী-টি দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করেই অনেক পুরোনো দিনের বেশ কিছু স্মৃতি ভেসে আসলো মনে। কিছুক্ষণ ভেবে-চিন্তে রাস্তার ওপারে গিয়ে লাইব্রেরী-টির কয়েকটা ছবি তুলে ফেললাম। ড্রাইভারের সিটের পাশের সিটে বসে এক ভদ্রমহিলা কি যেন লিখালিখি করছিলেন, ঠিক বোঝা গেল না। লাইব্রেরীটির আশে-পাশেও আর কাউকে দেখা গেল না।
বাংলাদেশের কিছু মানুষ আছেন, যাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার তেমনি একজন, আলোকিত মানুষ। স্যার, আপনি যেখানেই থাকুন অনেক অনেক সুস্থ আর ভালো থাকুন।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


