
চেয়ারের আত্মকথা
চেয়ারটি নাকি একদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, "মানুষ আমাকে যতটা ভালোবাসে, আমাকে বানানো কাঠটাকেও যদি ততটা ভালোবাসত, তবে পৃথিবীতে এত অহংকার জন্মাত না।"
আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "কেন?"
চেয়ারটি বলল, "আমার ওপর বসামাত্র মানুষের উচ্চতা কয়েক ইঞ্চি বাড়ে না, কিন্তু ধারণা হয় যেন কয়েক হাত বেড়ে গেছে! সে তখন মেঘের সঙ্গে কথা বলে, মাটির মানুষের কথা শুনতে পায় না।"
ক্ষমতার চেয়ারেরও বোধহয় একটা অদ্ভুত জাদু আছে। সেখানে বসলে কানের কাছে সত্যের শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসে, অথচ প্রশংসার প্রতিধ্বনি পাহাড়ি ঝরনার মতো অবিরাম শোনা যায়। আয়নাও তখন আর মুখ দেখায় না; দেখায় শুধু মর্যাদার অলংকার।
ইতিহাসের বড় মজা হলো, সে কোনো দিনই চেয়ারের প্রেমে পড়ে না। সে বরং চেয়ার ছেড়ে উঠে যাওয়া মানুষের পায়ের শব্দ শোনে। কে কী রেখে গেল—পদচিহ্ন, না ধুলোর দাগ- সেটাই তার আগ্রহ।
সম্প্রতি বঙ্গভবনের এক বাসিন্দাও সেই চিরন্তন নিয়মের বাইরে থাকতে পারলেন না। প্রাসাদের দরজাগুলো যেমন একদিন সাদর সম্ভাষণ জানায়, তেমনি আরেকদিন নীরবে বিদায়ও বলে। ইট-পাথরের প্রাসাদ কারও ব্যক্তিগত স্মৃতিসৌধ নয়; সেখানে সবাই অতিথি, শুধু থাকার মেয়াদটুকু আলাদা।
অদ্ভুত বিষয়, ক্ষমতা মানুষকে প্রায়ই বিশ্বাস করায় যে সময় তার ব্যক্তিগত সচিব। অথচ সময় কারও চাকরি করে না। সে নিজের ঘড়ি নিজেই দেখে। নির্ধারিত মুহূর্তে সে দরজায় কড়া নাড়ে, আর বলে, "মহাশয়, এবার পরবর্তী অতিথির পালা।"
ক্ষমতার করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে কেউ কেউ ভাবেন, নীরবতাই সবচেয়ে নিরাপদ ভাষা। কিন্তু ইতিহাস ভাষাতত্ত্বের ছাত্র নয়; সে নীরবতারও অনুবাদ করতে জানে। অনেক সময় উচ্চারিত বাক্যের চেয়ে অনুচ্চারিত বাক্যই তার নথিতে মোটা অক্ষরে লেখা থাকে।
মানুষের দুর্ভাগ্য, সে প্রায়ই চেয়ারকে স্থায়ী মনে করে, অথচ নিজের নামটিকেই সাময়িক করে ফেলে। সম্মান অর্জন করতে লাগে একটি জীবন; হারাতে লাগে কখনও একটি সিদ্ধান্ত, কখনও একটি নীরবতা।
শেষ পর্যন্ত চেয়ারটি আবার ফিসফিস করে বলল, "আমার জন্য এত লড়াই কোরো না। আমি তো কাল অন্য কারও নিচে চলে যাব। যদি কিছু রেখে যেতে চাও, তবে রেখে যাও এমন একটি বিবেক, যার সামনে ইতিহাসও নীরবে মাথা নোয়ায়।"
সেদিন বুঝলাম, ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ এই যে, মানুষ চেয়ার আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়; অথচ ইতিহাস সব সময় মানুষটাকেই বিচার করে, চেয়ারটিকে নয়।
.
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


