
আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলে মনে হয় ভারতের ভাগ্য নির্ধারণের গুরুদায়িত্ব বুঝি এদেশের মানুষের ওপর এসে পড়েছে। ভারতে কোথাও একটু আন্দোলন বা উত্তাপ ছড়ালেই এপারে যেন উৎসবের ধুম পড়ে যায়। বিশেষ করে জুলাই পক্ষ আর তরুণ প্রজন্মের তরুণদের মাতামাতি দেখলে মনে হয় কাল সকালেই বুঝি দিল্লি বদলে যাচ্ছে।
ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষাপট বেশ বিচিত্র। সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতি বেকারদের তেলাপোকা বলেছেন। এতে ক্ষেপে গিয়ে ভারতের বেকার তরুণরা কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ না করে একদম অভিনব এক বুদ্ধি বের করল। তারা তৈরি করে ফেলল ককরোচ জনতা পার্টি । তাদের দাবি খুব পরিষ্কার, জালিয়াতি বন্ধ করতে হবে, প্রশ্ন ফাঁস থামানো চাই, বেকারদের চাকরি দিতে হবে আর উন্নত জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে হবে। আন্দোলনের চাপে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানও পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। ওদিকে মানবাধিকার কর্মী সোনম ওয়াংচুক অনশনে বসেছেন, কৃষকেরা ফসলের ন্যায্য মূল্যের জন্য আন্দোলন করছে এবং বিদেশী কৃষি পণ্য যাতে দেশের বাজার দখল করতে না পারে সেজন্য আইনের দাবি জানাচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদিকে কখনো হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় না । যেখানে ভারতের এক শতাংশ লাভ আছে সেখানেও তিনি ছুটে গেছেন। আরব আমিরাত ওপেক থেকে বেরিয়ে নিজেদের মতো উৎপাদন শুরু করতেই মোদি সেখানে গিয়ে কম দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আর তেলের চুক্তি করে এসেছেন। ইউরোপ ২০২৭ সাল থেকে রাশিয়ার গ্যাস কেনা বন্ধ করবে শুনে আগেই কম দামে সেই গ্যাস পাওয়ার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কম দামে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কিনে এনেছেন, এমনকি বাংলাদেশে ডিজেল রপ্তানি করছেন। বাংলাদেশ সরকার আবার ভাবছে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কিনে ভারতের শোধনাগারে শোধন করে এপারে আনা যায় কিনা।
এত কিছুর পরও কেন ভারতীয় জনগণ সন্তুষ্ট নয়? কারণ সেখানকার মানুষ জীবনমান উন্নত করতে চায়। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম, চাকরির সংকট আর প্রশ্ন ফাঁসের কারণে সেই জীবনমান ভালো করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এটা পুরোপুরি ভারতের সরকার এবং তাদের জনগণের বিষয়। ভারত একটা গণতান্ত্রিক দেশ, সেখানে মোদিকে সরাতে হলে ভোটে হারিয়ে সরাতে হবে। নির্বাচন ছাড়া ভারতে সরকার পতন হওয়ার ইতিহাস নেই। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগেই প্রমাণিত হয় সেখানে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, তাই মোদির কিছু হলেও নির্বাচন ছাড়া বিজেপি ক্ষমতা ছাড়বে না। বিরোধী দল কংগ্রেসের অবস্থাও খুব একটা মজবুত নয়।
কিন্তু আমাদের এপার বাংলায় শুরু হয়ে গেছে চরম হাস্যকর কাণ্ড। জুলাই পক্ষ আর তরুণ প্রজন্ম যেন মোদির পতন দেখার জন্য ছটফট করছে। প্রতি মিনিটে মিনিটে স্ট্যাটাস ঝুলছে যে মোদির দিন শেষ, সরকার দমনপীড়ন চালিয়েও সামলাতে পারছে না। ওদিকে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ আবার আন্তর্জাতিক চক্রান্ত খুঁজে পেয়ে বলছে সব নাকি মার্কিন ডলারের খেলা, শেখ হাসিনাকে যেভাবে সরানো হয়েছে মোদিকেও নাকি সেভাবে সরানোর পাঁয়তারা চলছে। তাদের এখন অঢেল সময়, তাই তারা বসে বসে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বানাচ্ছে।
যে দেশের মানুষ নিজের ঘরের অনিয়ম নিয়ে টু শব্দ করতে পারে না, তারা অন্য দেশের পতন নিয়ে দিনে তিনবেলা গোলটেবিল বৈঠক করছে। আমাদের দেশে কি প্রশ্ন ফাঁস হয় না? চব্বিশের জুলাইয়ের পর এ দেশে কি পরিমাণ বেকারত্ব বেড়েছে সে খবর কেউ রাখে? সরকারের অদ্ভুত সব সিদ্ধান্তের কারণে যে অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হচ্ছে তা নিয়ে কোনো আন্দোলন নেই। তরুণদের কাউকে দেখলাম না তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে লেখালেখি করতে। ব্যাংকের নীতি সুদহার দশ শতাংশে ঠেকানো হয়েছে, ব্যবসার বারোটা বাজছে, প্রবৃদ্ধি কমছে, সে নিয়ে কোনো শিক্ষিত মানুষের মাথাব্যথা নেই। বিদেশে আমাদের পাসপোর্ট আর ভিসার মান তলানিতে ঠেকছে, বাজেটে প্রবাসী এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কেন কম, তা নিয়ে কারো আলাপ নেই।
সবার এখন একটাই চিন্তা, মোদি যেহেতু ভারতে মুসলিমদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে তাই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পতন হতেই হবে। ভারতের জনগণের জীবনমান নিয়ে তারা কেউ ভাবছে না । এদিকে নিজের ঘরের ছাদে আগুন জ্বলছে, সেটা বোঝার সক্ষমতাও নেই । ভারতের মানুষ তাদের নিজেদের অধিকার আদায়ের হিসাব মেলাচ্ছে, আর এপারে মানুষ হিসাব করছে সাম্প্রদায়িক মোদির পতন কবে হবে । বিজেপিকে নিয়ে ট্রল করে নিজের দেশের অর্থনৈতিক ধস কিংবা চাকরি সংকট মিটবে না। ওই সময়টা নিজ দেশের অনিয়ম আর বেকারত্ব নিয়ে কথা বললে হয়তো সত্যিই দেশের কিছুটা লাভ হতো।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


