উন্নয়নের এই যুগে মানব সম্পদ উন্নয়নের কথা প্রায়ই শোনা যায়। রাষ্ট্রিয় ব্যবস্থাপনায় মানবজাতীকে বোঝা না বানিয়ে কিভাবে সম্পদে রূপান্তারিত করা যায়, তা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের, সমাজের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক কলামিষ্টদের ভাবনার শেষ নেই। রাষ্ট্রের বিকাশ আর উন্নয়নের প্রশ্নে এটা একটা মহা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারই বটে। পশু সম্পদ উন্নয়নের মতো মানব সম্পদ উন্নয়ন একটা প্রকল্প। প্রকল্পের নামকরণ দেখেই বোঝা যায় জনগন সর্ম্পকে শাসক সম্প্রদায়ের মতামত এবং যথার্থতা। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক যেহেতু অসাধারণ কিছু মানুষ, রাষ্ট্রের সকল বিষয় সম্পর্কে যাবতীয় সিদ্ধান্ত তারাই নিয়ে থাকেন যদিও তারা এই মানবসম্পদ উন্নয়নের রাষ্ট্রিয় ব্যাবস্থাপনায় বর্তমান ভুমিকায় এসেছেন। কিন্তু তারা এখন দক্ষ জনশক্তি, সাধারণ নয়, অসাধারণ মানুষ। রাষ্ট্রের মানুষগুলো তাদের সম্পদ হওয়াই স্বাভাবিক। সম্পদের তো একটা সংজ্ঞা আছে, সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী অনুৎপাদনশীল কোন বস্তু সম্পদ হতে পারে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অর্থাৎ একটা নিদৃষ্ট ভৌগলিক সীমারেখার ভেতর বসবাসকারী জনগন ঐ এলাকার সব সম্পদের মালিক; আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সংজ্ঞা অনুযায়ী সে সম্পদের সুষ্ঠ ব্যাবস্থাপনা রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকারের দায়ীত্ব। আর সবার উপরে রয়েছেন রাষ্ট্রের নিয়মিত বেতনভুক্ত বিশাল কর্মীবাহিনী। পুঁজিবাদী গনতন্ত্রে শাসক শ্রেনী ভোটের মাধ্যমে লিগালাইজ করে যে জনগন তাদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার দিয়েছে তাই সকল সম্পদ বন্টন এর সিদ্ধান্ত তারা অর্জন করেছেন। তেল-গ্যাস-কয়লা এসব খনিজ সম্পদের মালিক রাষ্ট্র অর্থাৎ ক্ষমতাকাঠামোর পরিচালনাকারী সম্প্রদায় তেমনি মানব সম্পদের মালিকও তারাই। তারাই পরকিল্পনা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কিভাবে মানুষগুলোকে দেশের তথা শাসকদের বোঝা না বানিয়ে সম্পদ বানানো যায়; যে সম্পদের মাধ্যমে রাজস্ব আসতে পারে, এটা হচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রতি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা আরো হতাশাজনক, ইদানিংকার বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের কাজর্কমে মনে হচ্ছে জনগন নিয়ে এদের কোন মাথাব্যাথাই নেই। বরং বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ তেল-গ্যাস-কয়লা-বন্দর বহুজাতিক কোম্পানীকে ইজারা দিয়ে দুপাইস কামানোই তাদের উদ্দেশ্য। মিল-কারখানা বন্ধ করে, কৃষিখাতে দেশীয় প্রজাতী এবং পরবিশে ধ্বংস করে বহুজাতিক কোম্পানীকে সুবিধা দিয়ে বাংলাদশের সাধারণ মানুষকে এই অসাধারণ লোকগুলো চরম অনশ্চিয়তার দিকে ঠেলে দিয়ে নিশ্চিন্তে নিজেদের সাময়ীক লাভালাভ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। এভাবেই তারা নিজেরা ক্রমে ক্রমে এদেশকে তাদের নিজেদের(এলিটদের) বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছেন। তারা এখন ডলার পাউন্ড জমাচ্ছেন বাকি জীবন নিশ্চয়ই তাদের ইউরোপে আমেরিকায় কাটাতে হবে। বাংলাদেশের দরিদ্র জনগনের জন্য তারা ক্ষুধা এবং র্কমহীন ভবষ্যিত ছাড়া আর কিছুই রেখে যেতে পারবেন এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এবং সে ইচ্ছাও হয়তো তাদের নেই।
সাধারণ জনগন সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে কখনো দু'বেলা পেট ভরে খায় অথবা অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটায়। সমাজের নিম্নবৃত্তের মানুষদের দুঃসহ জীবন-যাপন সত্বেও রাষ্ট্রের কোন সুযোগ সুবিধাই তাদরে কাছে পৌছয় না। যদিও বা পৌছায়, রাষ্ট্রিয় সুযোগ-সুবিধার কোন ক্ষুদ্র অংশও তাদের কায়ীক পরিশ্রম ব্যতিরেকে পৌছয় না। রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস যে জনগন, সেই জনগনের মধ্যে বৃহত্তম অংশ প্রায় ৮০% সমাজের নিম্নবৃত্ত মানুষ। তাদের শিক্ষা চিকিৎসা এবং অন্যান্য তথাকথিত প্রগতিশীল সামাজিক উপকরনের (মধ্যবৃত্তিয় ভাষায় যাকে বলা হয় কালচারড্ হয়ে ওঠা) তুলনায় অন্ন সংস্থান করা জরুরী। তারপরও নিদৃষ্ট সময় পর-পর তার পছন্দের বা অপছন্দের অপরচিত কোন ভোট প্রার্থিকে ভোট দিতে বাধ্য হন নেতাদের সাথে সামাজিক সম্পর্কের চাপে এবং ভয়-ভীতির কারণে। ভোট ই একমাত্র-- শাসকরা যা প্রচার করে এক মহান 'নাগরকি অধিকার' বলে এবং বিপুল বাজেটে তার আয়োজন করে। ভোট হল সেই ফরমালিটিস যার মাধ্যমে শোষকদের ক্ষমতায় থাকাকে লিগালাইজ করা হয়। নিম্নবৃত্তের মানুষদের রুজি রেজগারের সময় নষ্ঠ করে যদি ১০ মাইল দুরে গিয়ে ভোট দিতে হয় তাহলে ভোট প্রার্থির নির্বাচনী খরচ বেড়ে যায়। তাই যে গ্রামে মানুষের জন্য খাবার পানির ব্যবস্থা নেই সে গ্রামেও ভোটকন্দ্রে খোলা হয়। রাষ্ট্রের কাছে মানুষের খাদ্য চিকিৎসার নিশ্চয়তা দাবী করাটা অন্যায়! এসব রাষ্ট্রের দায়ীত্ব নয়; কিন্তু ভোট দেয়া নাকি এইসব মানুষের মৌলিক অধিকার (হাস্যকর)। এ হচ্ছে গনতন্ত্র। যে তন্ত্রে জনগনই সকল ক্ষমতার উৎস।
৫ বছর পর পর ভোট দেয়ার নাম র্স্ববস্ব ফরমালিটিস শেষে জাল ভোট, সন্ত্রাস, অবৈধ টাকা, সরকারী(আমলাদের) ও বিদেশী চক্রান্তের পরও যদি দেশী বিদেশী পর্যবেক্ষকগণ "ভোট নিরপক্ষ হয়েছে" বলেন তাহলে সেই ভোটের মাধ্যমেই নাকি জনগন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের গনতান্ত্রিক সরকারকে সকল ক্ষমতা অর্পন করে। এর মাধ্যমে নাকি একথাই প্রমান হয় যে 'জনগনই সকল ক্ষমতার উৎস'! কোন ভৌগলিক সীমারখোর ভিতর বসবাসকারী মানুষ ঐ এলাকার সমস্ত সম্পদের মালিক্। স্বাভাবকিভাবেই সকল ক্ষমতা জনগনের হাতে থাকার কথা, কিন্তু বুর্জোয়া গনতন্ত্রে তো নয়ই বরং বলা যায় সম্পদের উপর ব্যাক্তিমালিকানা ও রাষ্ট্র চিন্তার উদ্ভব থেকে আজ র্পযন্ত সমাজ বিকাশের কোন স্তরেই জনগনের হাতে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছিল না, রাস্ট্র বা ক্ষমতা কাঠামোর নিয়ন্ত্রক হিসেবে যারা রাস্ট্র বা সমাজ পরিচালনা করে তারাই সকল সম্পদ নিয়ন্ত্রন ও বন্টনের ক্ষমতার অধিকারী। তারাই সমাজরে সুবিধাভোগী সম্প্রদায়। তাদের স্বার্থে তাদের সুবিধামত সেই সম্পদের বন্টন তারা করেন, সাধারণ মানুষের কথা তারা চিন্তাও করেন না। পৃথিবীর ইতিহাসের কোন পর্বে বা কালে রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের বন্ধু ছিল না।
বাংলাদেশের সংবিধানে জনগনের মৌলিক চাহিদাকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। অর্থাৎ গরিব জনগন না খেয়ে উদোম অবস্থায় চিকিৎসার অভাবে রাস্তায় মরে গেলেও সংবিধান অনুযায়ী এজন্য রাষ্ট্রের কোন দায় থাকবে না। রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র পরিচালনাকারী রাজনৈতিক দল কে কোনরকম দায়ী করা যাবে না কারণ, সংবিধান অনুযায়ী তারা জনগনের মৌলিক চাহিদা পুরণে বাধ্য নয়। বাংলাদেশে ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে নিজস্ব সংবিধান প্রনয়ন করে। 'মুক্তিযুদ্ধ' শব্দবন্ধের ভেতরই পাওয়া যায় এই যুদ্ধের চেতনা, যা ছিলো মানুষের মুক্তির জন্য যুদ্ধ। আমরা যুদ্ধ দেখিনি। আমরা প্রশ্ন করতে পারি, কোন মুক্তির জন্য ৭ কোটি মানুষ যুদ্ধ করেছিল এবং ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল? পাকিস্তানীদের হাত থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতার মুক্তি নাকি রাষ্ট্রিয় দুঃশাসন মুক্তি? তথাকথিত জাতীয়তাবাদের বায়বীয় বোধে সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করেছিল নাকি পাকিস্তানিদের সাম্রাজ্যবাদী দুঃশাসনের পরিবর্তে (পাকিস্তানীদের নিয়ন্ত্রিত শত্রু রাষ্ট্রের পরিবর্তে) একটা বন্ধুরাস্ট্র তারা আশা করেছিল যেখানে যখন তখন পুলিস আর্মির গুলি চলবে না; যেখানে রাস্ট্র জনগনের শত্রু না হয়ে বন্ধু হবে। সাধারণ মানুষের জীবন-যাপনে রাষ্ট্রের সহযোগিতা থাকবে। পাকিস্তানী রাষ্ট্র ছিল নিপিড়নকারী, জনগন ভেবেছিল স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবে শোষনহীন বন্ধুভাবাপন্ন। সাধারন নিম্নবিত্ত মানুষ সহজ সরল সৎ এবং র্কমঠ; তারা কখনো চায়নি রাস্ট্র তাদের মুখে ভাত তুলে দেবে, কিন্তু রাষ্ট্র মানুষের জীবিকার উপায় কেড়ে নেবে একথা নিশ্চয়ই ভাবেনি ৮০ ভাগ দরিদ্র জনগোষ্ঠি। কিন্তু তাই হয়েছে। একের পর এক দাতাদের পরার্মশে কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। উন্নয়নের নামে শ্রমিকদের র্কমসংস্থান কেড়ে নেয়া হয়েছে। সংবিধানে মৌলিক চাহিদাগুলোকে অধিকারের নামমাত্র স্বীকৃতি ও পর্যন্ত দেয়নি ৭১ পরর্বতি সরকার।
তাহলে এই যে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ, যে দেশের সংবিধানে জনগনের মৌলিক চাহিদেকে অধিকারের স্বীকৃতি দিল না, একের পর এক খেটে খাওয়া মানুষের উপর আর্মি পুলিশের বি ডি আরের গুলি চলছেই, তাহলে এই যুদ্ধ কিসের জন্য হয়েছিল? তাহলে কি এই যুদ্ধ দেশী ক্ষমতাপিপাসু সমপ্রদায়ের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের লড়াই-ই ছিল? অর্থাৎ পাকিস্তানী শাসকদের হাত থেকে পূর্ব-পাকিস্তানে গড়ে ওঠা নব্য শাসকদের ক্ষমতা দখলের লড়াই? আর বাঙালী জাতিয়তাবাদের প্রবক্তা মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবিরাই সাধারণ গরিব মানুষদের ধোঁকা দিয়েছিল? ঠেলে দিয়েছিল যুদ্ধের ভেতর? এই প্রশ্ন করার নৈতিক অধিকার আমাদের রয়েছে। আমরা ৩০ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ জানতে চাই।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পরও রাষ্ট্রের ৮০% নিম্নবৃত্তের সাধারণ মানুষের জন্য রাষ্ট্রের কোন দায় দায়ীত্ব দুরের কথা ন্যায্য দাবী জানালেও বার বার বুলেট দিয়েই জবাব দিয়েছে সরকার। সামরিক শাসক এবং গনতান্ত্রিক শাসক উভয়ই একই ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে সেই পাকিস্তানী শাসকদের মতো, বৃটিশ নীলকরদের মতো। গ্রামাঞ্চলে মানুষেরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে নীলকরদের সাথে তুলনা করে; সেই নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে কানসাটে শান্তিপুর্ণ বিক্ষেভে পুলিশ বিডিআরের গুলি আর এমপি বাহিনীর হামলায় নিহত হয়েছে ২০ জন, নেপালে সাম্প্রতিক রাজতন্ত্র উচ্ছেদ আন্দোলনে ও এত মানুষকে প্রাণ দিতে হয়নি। কানসাটে পুলিশের লুটপাট ৭১ ছাড়িয়ে গেছে বলে মন্তব্য করছে এলাকাবাসী। এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে কৃষক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষের বিভিন্ন দাবী আদায়ের আন্দোলনের বিপক্ষে রক্তাক্ত বুলটে উপহার দিয়েছে প্রায় সব সামরিক এবং গনতান্ত্রিক সরকার।
'৭১ এ পাকিস্তানী আর্মির গনহত্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এ দেশের সাত কোটি মানুষ, যাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল তারা নিরাপদে পালিয়েছিল, শরনার্থী হয়েছিল ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে অথবা বিভিন্ন এলাকায়। আর নিম্নবৃত্তের মানুষ যাদের খাদ্যের বাসস্থানের নিশ্চয়তা ছিলনা তারা বাঁচার জন্য যুদ্ধ করেছিল, খাদ্যের জন্য, নিরাপত্তার জন্য তাদের অস্ত্র হাতে নিতে হয়েছিল। ক্ষুধার্ত মানুষের কোন জাতিয়তা নেই, সব যুগে সব রাষ্ট্রে ক্ষুধার্তরা পরিত্যক্ত; না খেয়ে মরলে দেখার কেউ নেই; না রাষ্ট্র না ধর্ম। সকল গণসংগ্রামে তারাই অপ্রতিদ্বন্দী লড়াকু, কারণ রাষ্ট্রের সকল সিদ্ধান্ত খেটে খাওয়া মানুষের ঐতিহাসিক ক্ষুধাকে আরো বেশী দীর্ঘায়িত করে।
আশেক ইব্রাহীম
১১/০৬/০৫
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুন, ২০১১ রাত ১:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



