কৃষিক্ষেত্রে এই চক্রান্ত আর শিল্পকারখানা বিরাষ্ট্রিয়করণের নামে বন্ধ করে দেওয়া, বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের নামে দেশের সম্পদ পাচারের রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতি, আর বিদেশী কোম্পানীর নামে মার্কিনীদের হাতে খনিজ সম্পদ তুলে দেয়া- সবই আই.এম.এফ. বিশ্বব্যংক এর তত্বাবধানে একের পর এক ঘটে যায়।
রাষ্ট্র পরিচালক সম্প্রদায় এসব গণবিরোধী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন, বুদ্ধিজীবিরা ভাগা পাচ্ছেন, দালালির কড়চা নামে ক্রোড়পত্র ছাপা হচ্ছে সংবাদপত্রে। এ সবই দেশে দেশে ঘটে চলেছে কিন্তু মার্কিনবিরোধী বিক্ষোভ বা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মতাদর্শিক আন্দোলন গড়ে উঠছে না।
আফগান যুদ্ধে প্রগতিশীলরা অনেকেই আমেরিকার পক্ষে সায় দিয়েছিলেন কারণ সেটা ছিল মোল্লাদের বিপেক্ষে যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধের বিপক্ষে কিছু বিক্ষোভ হয়েছে; মার্কিন-বৃটিশ পণ্য বর্জন করেছিল তরুন ছাত্ররা কিন্তু অচিরেই আমেরিকান পণ্য এবং কালচারে ফিরে গেছে তারা। তরুন প্রজন্ম আমেরিকান মতাদর্শের বিপেক্ষে দাঁড়াতে পারছেনা। আমেরিকান কালচার এবং ডিসকোর্স আধিপত্যকারী মতাদর্শের মতো মধ্যবিত্তের মগজে গেঁড়ে বসেছে; বৃটিশ শাসনআমলে যেমন ছিল বৃটিশদের আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির আধিপত্য। আমেরিকানদের বিপক্ষে এমনকি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষেরও ক্ষোভ আছে, ঘৃনা আছে এবং তা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার আগ্রাসন এর কারণে, মুসলিম সাম্প্রদায়ীক চেতনার কারণে। বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল লোকেরা ঠিক সেকারনেই ঠিক একইভাবে আমেরিকানদের বিরুদ্ধে যেতে পারেন না। কারণ তারা মৌলবাদী নন তারা প্রগতিশীল। মৌলবাদকে তারা উৎসাহ দিতে পারেন না আবার আমেরিকার বিপক্ষে গোঁড়া অবস্থান তাদের ফ্যাসিবাদী বা সন্ত্রাসবাদী ভুমিকা বলে প্রশ্নবিদ্ধ করা হতে পারে। তাই তারা প্লাটফরম সংকটে ভোগেন, উপযুক্ত প্লাটফরম খুঁজতে তারা শেষমেষ সিভিল সোসাইটির নামে গান্ধিবাদী অহিংস মানবতাবাদী ভুমিকায় অবতির্ন হন।
এসব ঘটনা বা পরিস্থিতি আমাদের অসহায় করে তোলে কারণ আমরা টের পাই উপরিকাঠামোর জটিলতা যা সাম্রাজ্যবাদীদেরই উদ্দেশ্য পূরণ করে, যে উপরিকাঠামো গড়ে উঠেছে ইউরোপিয় জ্ঞানশাস্ত্রের উপর। দেশে দেশে কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া সব প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবিরা ইউরোপের আলোয় আলোকিত জীবন কাটাচ্ছেন। এমনকি যারা মার্কস সাহেবকে মাঝে মধ্যে স্মরণ করেন তাদের শ্রেনী অবস্থান এবং ঐ একই সংস্কৃতির প্রভাবে নিম্নবৃত্ত মানুষদের সাথে যে দৃর্লঙ্ঘ বিচ্ছিন্নতা তৈরী হয়েছে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা ভুলে যাচ্ছেন ইউরোপিওদের কাছে তাদের পরিচয় প্রগতিশীল নয় বরং ইউরোপের অনুগত তৃতীয় বিশ্বের মুসলিম অথবা হিন্দু মধ্যবিত্ত। বর্তমানের ইঙ্গ-মার্কিন সামরিক আগ্রাসন যে-- বৃটিশদের ফেলে যাওয়া মতাদর্শিক অবশেষের উপর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত সর্বগ্রাসী আগ্রাসন তা কি তারা বোঝেন না? বিশ্বায়নের নামে, গ্যাট চুক্তির নামে, সবুজ বিপ্লবের নামে, বিরাষ্ট্রিয়করনের নামে, বিদেশী বিনিয়োগের নামে নিজেদের দেশের সর্বস্তরের মানুষের অন্তিমজ্জার উপর সাম্রাজ্যবাদীদের উদোম নৃত্য কি তারা দেখছেন না?
আসল কথা হল মার্কিনীদের নব্য সামরিক আগ্রাসনের ইস্যুতে মার্কিনীদের অর্থনৈতিক আগ্রাসনের বিপক্ষে প্রগতিশীল দেশহিতৈষী বুদ্ধিজীবিরা আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যার্থ হয়েছেন। সাধারণ মানুষেরা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমদের উপর অত্যাচার-জুলুমের কারণে তাদের প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে মার্কিন বিরোধী মনোভাব পোষন করছেন। একথা বলার অপক্ষা রাখে না যে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রকাঠামোর সাথে সম্পৃক্ত সকল গনতান্ত্রিক, অ-গণতান্ত্রিক বা সামরিক শাসকেরা মার্কিনের বিপক্ষে কোন আন্দোলন সমর্থন করতে পারেন না; কারন তারা মার্কিনীদের মদতপুষ্ট। আফগানিস্তান ইরাকে সামরিক আগ্রাসনের বিপক্ষে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বিক্ষোভকে মৌলবাদী আখ্যা দিচ্ছেন তারাই যারা বিশ্বাস করেন বাংলাদেশের মানুষেরা কোনভাবেই মৌলবাদী নয়।
এসব স্ববিরোধ এমন এক উপরিকাঠামোর নিশ্চিত উপস্থিতি প্রমান করে যা আত্মস্বর্বস্বতার চরম পরিনতিতে পৌছে গেছে এবং অন্তত এসব প্রগতিশীলদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত অর্থনৈতিক বুনিয়াদও (মধ্যবৃত্তি) রয়েছে। ফলে সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন চুড়ান্ত পরিস্থিতিতে ব্যক্তির তাৎক্ষনিক প্রয়েজনের কাছে হার মানতে বাধ্য হচ্ছে। উপরিকাঠামো এমন এক নৈতিকতার মুখোশে ঢাকা এবং সে নীতিবোধের এটাই বৈশিষ্ট যে তা সংকটময় পরিস্থিতিতে সমাজের প্রচলিত ভাবধারার বিপক্ষে কোন শক্ত অবস্থানে পৌছতে পারে না। ঐতিহাসিকভাবে পুঁজি সমাজের উপরিকাঠামোর ভেতর রয়েছে অসংখ বুনিয়াদী ডিসকোর্স যা স্ববিরোধ'কে চিরন্তন রুপে প্রতিষ্ঠিত করে।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই আগস্ট, ২০০৭ দুপুর ২:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


