আগেরগুলো পড়তে চাইলে-ডুমেলা বতসোয়ানা-১৯
বতসোয়ানার রাজনীতি এবং বাংলাদেশের রাজনীতি প্রত্যক্ষ করে আমার চোখে একটি পার্থক্যই বড় করে দেখা দিল। আমাদের দেশে আসলে রাজনীতির সিস্টেমেই সবচেয়ে বড় ত্রুটি। রাজনীতিবিদ হওয়ার কথা সমাজের শিক্ষিত, সচেতন, দেশপ্রেমিক ব্যক্তির। আর আমাদের দেশে রাজনীতিবিদ হয় অশিক্ষিত, মাস্তান, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী টাইপের গডফাদাররা। কিন্তু প্রকৃত সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা যদি এরকম দেশ পরিচালনায় অংশ নিতেন তাহলে কি আমাদের দেশের রাজনীতিটা আরও পরিশুদ্ধ হতো না? প্রকৃত সিভিল সোসাইটি বলতে এখানে সমাজের সর্বস্তর থেকে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত সিভিল সোসাইটি বুঝাচ্ছি। প্রতিটি শিক্ষিত, সচেতন, দেশ প্রেমিক পেশাজীবীকে এই সিভিল সোসাইটির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সরকারের নীতি সম্পর্কিত বিষয়ে তাদেরকে সবসময় অবহিত রাখতে হবে। শিক্ষক, সাংবাদিক, ডাক্তার, আইনজীবী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী প্রতিটি স্তর থেকে সিভিল সোসাইটির প্রতিভূ হিসেবে নেতৃত্ব উঠে আসতে হবে। শিক্ষকরা তাদের ন্যয্য দাবী দাওয়া আদায়ের নিমিত্তে বড় দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করে, ডাক্তাররা তাদের দাবী আদায়ের জন্য রাজনীতির খাতায় নাম লেখায়। সাংবাদিকরা, আইনজীবীরা, বিচারজীবীরা, সরকারি চাকুরিজীবীরা দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে একটি রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় বসানো নিয়ে কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে। নিজ নিজ পেশা গোষ্ঠীর উন্নয়নের কথা বলে নেতৃত্ব হাতে নিয়ে পেশাজীবী সংগঠনগুলো হয়ে যায় রাজনৈতিক সরকারের আজ্ঞাবহ। কিন্তু প্রতিটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার জন্য যদি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে একটি করে গবেষণা কেন্দ্র থাকতো তাহলে কতোই না ভালো হতো। শিক্ষা ক্ষেত্রে জবাবদিহীতা আনয়নের লক্ষ্যে স্থায়ী ন্যাশনাল এডুকেশন কমিশন গঠন করেও এরকম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট উইং এর মাধ্যমে পেশাজীবীদের সমস্যাগুলো সমাধানের নিরন্তর প্রচেষ্টা হাতে নেওয়া যায়।
যাক ফিরে যাচ্ছি আবার সেই রাজনীতির কথায়ই। নব্বুই এর দশকে আমাদের দেশটি স্বৈরাচার মুক্ত হয়ে যখন গণতন্ত্রের পথে পা বাড়াল তারপর থেকে আমাদের দেশে নীরবে একটি সুশীল সমাজের নেতৃত্ব শুরু হয়েছে বলা যায়। আরও স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, ছিয়ানব্বুই সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ধারণার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের নেতৃত্বে সুশীল সমাজের উত্থান। ক্ষমতার প্রতি নির্লোভ কিন্তু দেশের প্রতি কমিটেড এই নেতৃত্ব মাত্র তিনমাস দেশ শাসন কার্য কি নিষ্ঠার সাথেই না পরিচালনা করেছেন। এক এক টার্মে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে রাজনৈতিক দলগুলো দেশের যে বিশৃঙ্খল অবস্থা করে রাখে সে অবস্থা থেকে মাত্র তিনমাসে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করে দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় নির্বাচন পরিচালনা করে যে দক্ষতার ছাপ রেখে যান এই তিনমাসে, তাদেরকে যদি তিনবছর সময় দেওয়া যেতো! তাদেরকে যদি পাঁচ বছর সময় দেওয়া হতো! কী হতো তাহলে? দেশের চেহারাটাই কি আমূল পাল্টে যেতো না? আমার সাথে অনেকেই দ্বিমত হবেন। কিন্তু আমার কতিপয় যুক্তি আছে এ ব্যাপারে। যুক্তিগুলো এই-
এ পর্যন্ত তিনটি নির্বাচনকে সামনে রেখে তিন টার্মে প্রধান উপদেষ্টা সহ সর্বমোট তেত্রিশ জন উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছে যারা সবাই সমাজে নিরপেক্ষ এবং সুশীল সমাজের নেতা হিসেবে বিবেচিত। ওনারা তিন মাসের জন্য ক্ষমতায় বসে দেশের নীতি নির্ধারণী অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দেশ পরিচালনার নিত্যদিনের কর্মকান্ড পরিচালনা করেছেন, আর্থিক ক্ষমতাবলে কোটি কোটি টাকার ব্যয়ের সাথে জড়িত থেকেছেন। তিনমাস শেষে যখন একজন নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে ওনারা স্ব-স্ব জায়গায় ফিরে যান কই কেউতো কখনো বলেননি যে ‘ওমুক উপদেষ্টা ওমুক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ঘুষ খেয়েছেন’ কিংবা ‘ওমুক উপদেষ্টা ক্ষমতা বহির্ভূতভাবে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন’। সুতরাং আমরা ধরে নিতে পারি মাত্র এই তিনমাসের জন্য আমরা আমাদের রাজনীতিবিদদের সুপারভাইজার হিসেবে যাদেরকে বসাই তাঁরা মোটামুটি সবাই নির্লোভ, নির্মোহ এবং দেশপ্রেমিক। তিনমাসে এই এক একজন উপদেষ্টা দুর্গাদেবীর ন্যয় দশ হাতে দশদিক সামলানোর মত করে যে দেশ পরিচালনার মত কঠিন একটি কাজ করেন তাতে তাঁদের কর্মদক্ষতা নিয়েও সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। (এতে করে প্রমাণিত হয় দক্ষ লোক অল্প হলেও চলে। এত বড় বড় মাথাভারী মন্ত্রিসভা দিয়ে দেশ চালানোর দরকার হয় না।) এখন প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোকে যদি শুধু তিন মাসের জন্য ক্ষমতা প্রদান করা হয় যে, তারা আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশ থেকে বেছে বেছে সুশীল সমাজের সমন্বয়ে একটি ‘উপদেষ্টা সরকার’ গঠন করবে, তাহলে বিষয়টি কি দাঁড়াবে ? অথবা প্রচলিত রাজনীতিবিদদের বলছি, আপনারাই পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকুন কিন্তু আপনারা আমাদের তত্ত্বাবধায়ক উপদেষ্টাদের মত নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী হোন, তাদের মত নির্লোভ, নির্মোহ হোন। দেশের মানুষকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেওয়ার জন্য দেশপ্রেমিক হোন। নতুবা আমরা একদিন সেই উপদেষ্টা নেতৃত্বকেই আমাদের দেশের মূল নেতৃত্ব হিসেবে মেনে নেওয়ার আন্দোলনে নেমে যাব। আমাদের দেশের মঙ্গলের জন্য একদিন না একদিন আমাদেরকে তা করতেই হবে। জনগণ খুব দ্রুতই আপনাদের ক্ষমতা লড়াইয়ের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করবে।
বিষণ্নতা একটি রোগ। এ রোগটি মানুষের মন থেকে সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ কারও মানসিক অবস্থা খারাপ থাকলে তার মনের মধ্যে বিষণ্নতা রোগটি ধীরে ধীরে বাসা বেঁধে নেয়। আস্তে আস্তে এটি একসময় মানসিক শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়। ‘আমি ভাল নেই’ এই কথাটিই আসলে বিষণ্নতাযুক্ত মনের লক্ষণ। বিষণ্নতা নিয়ে ক’দিন ধরে আমার মাথায় চিন্তা ঢুকেছে। আমি কি বিষণ্নতায় ভুগছি ? আসলেই এখানে কিছু ভালো লাগছে না। বতসোয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই হোস্টেল রূমে আমি একাকী বিষণ্নতার এই দিনগুলো কাটাচ্ছি। আমার এই বিষণ্নতার প্রকৃত কারণ কি ? আমি বিষণ্নতার কারণ খোঁজার চেষ্টা করি। নিজের দেশ ছেড়ে, পরিবার পরিজন ছেড়ে বিদেশ-বিভূঁইয়ে পড়ে থাকার জন্য মন খারাপ থেকে বিষণ্নতা ? নাকি পাওয়া না পাওয়ার সুক্ষ হিসাব মেলানোর অতৃপ্তিতে সৃষ্ট বিষণ্নতা ?- আমার সমস্ত চিত্তে উদয় হয়, কোন বিষণ্নতায় ভুগছি আমি ? বিদেশ বিভূঁইযে পড়ে থেকে হোম সিকনেসে তো ভুগছিই সে সাথে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি আমার মনকে আরও বিষণ্ন করে তুলছে।
আমি কোন রাজনীতিবিদ নই। আমি বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক। রাজনীতিবিদরা দেশ নিয়ে ভাবেন না। তারা নিজেদের নীতি নিয়ে ভাবেন। ব্যক্তি নীতি, দলীয় নীতি নিয়ে ভাবেন। দেশের নীতি নিয়ে ভাবার তাদের সময় কই ? ক্ষমতায় না থাকলে অংক কষতে থাকেন যে কিভাবে কষে ল্যাং মেরে ক্ষমতাধারীকে নামিয়ে দেওয়া যায়। আর ক্ষমতায় থাকলে ভাবেন যে, আগামী আরেকটা টার্ম কিভাবে ক্ষমতা নিয়ে টিকে থাকা যায়। এই ল্যাং মারা আর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতার কারণে এমন হয়েছে যে, পলিটিশিয়ানদের মধ্যে পরষ্পরের প্রতি আর কোন আস্থা অবশিষ্ট নেই। তাইতো পাঁচ বছর পর পর কারা ক্ষমতায় গিয়ে দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হবেন তার জন্য রেফারীর প্রয়োজন হয়। দেশকে লুটেপুটে খাবার ক্ষমতায় যাওয়ার দৌড়ে রেফারী হিসেবে তত্বাবধায়ক সরকারকে মাঠে তিনমাসের জন্য থাকার প্রয়োজন হয়। ২০০৬ সালের অক্টোবরের এই শেষ সময়ে বাংলাদেশে ৩ মাসের জন্য রেফারীর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। প্রধান রেফারী কে হবেন তাই নিয়ে শুরু হয়েছে পলিটিক্যাল দলগুলোর মধ্যে বিরোধ। বিরোধ থেকে বিশৃঙ্খলা এবং অবশেষে দেশ প্রায় অচল। বিদেশ বসে দেশের এই করুণ অবস্থা দেখা খুবই কষ্টের। আমি খুবই কষ্ট পেতে থাকি। বিদেশে বসে আমার মন আরও বিষণ্ন হয়ে যায়।
আমি বতসোয়ানার যা কিছুই দেখি আমার দেশের সাথে তুলনা করি। তুলনা করে দেখি এদেশের সাথে আমার দেশের পার্থক্য কতটুকু। আফ্রিকা মহাদেশ সম্পর্কে ছোটবেলায় পড়েছি এটি একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ। সেই ধারণা আজও মাথা থেকে যায়নি। কিন্তু এখানে এসে ভুল ভাঙলো। বতসোয়ানা দেশটি সে অর্থে আমাদের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে আছে। এদেশটিতে নেই রাজনৈতিক হিংসা-হানাহানি, নেই শ্রমিক ধর্মঘট, নেই হরতাল-জ্বালাও-পোড়াও। পলিটিকাল দলগুলোর মধ্যে নেই ক্ষমতার কাড়াকাড়ি। পাঁচ বছর পর পর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন হয়। নির্বাচিত সরকার দেশ শাসন করে। এনিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। সুশৃঙ্খল একটি জাতি এরা। কিউ ধরে প্রয়োজনীয় কাজ সারে নিরবে নিশ্চুপে। আমি এ পর্যন্ত কারও মধ্যে কোন ঝগড়া-ঝাটি, হাতাহাতি, মারামারি দেখিনি। এদের যদি গায়ের রং কালো না হতো তাহলে এরা আরও আত্মবিশ্বাসী থাকত।
বতসোয়ানার একটি ছেলের সাথে আমার পরিচয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রী পর্যায়ের ছাত্র। আমার সাথে পরিচয়ের পর থেকে ওকে দিয়ে বেশ কিছু কাজ করিয়ে নিয়েছি। তাই ওর সাথেই আমার বেশি ঘনিষ্ঠতা। ছেলেটির নাম ভিক্টর। বতসোয়ানার নানান বিষয় নিয়ে আমি ওর সাথে আলোচনা করি। ভিক্টরের মুখ থেকে আমি বতসোয়ানাকে চিনতে চেষ্টা করি। কালো বলে ওরা নিজেরা হীনম্মন্যতায় ভোগে। একদিন আমি ভিক্টরকে বললাম আমার সাথে আমার বাংলাদেশে চলো। ভিক্টরের জিজ্ঞাসা, বাংলাদেশে গেলে আমরা তাকে মারবো কিনা ? আমি বললাম কেন মারবো তোমাকে ? ভিক্টরের উত্তর “আমরা যে ব্ল্যাক ম্যান।” এরা খুবই সরল জাতি। জটিলতা তেমন একটা নেই এদের মনে। তাই সবদিক মিলিয়ে আমার বাংলাদেশের চেয়ে বতসোয়ানাকে এগিয়ে রাখতে চাই আমি। আমি এখানে বসে বসে আমার বাংলাদেশের জন্য প্রার্থনা করি যেন বাংলাদেশ বতসোয়ানা হয়ে যায়। আমার দেশে রাজনৈতিক কোন জটিলতা যেন না থাকে।
চলবে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

