somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিক্ষাভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বা ইবিপিএম

২২ শে জুলাই, ২০১০ সকাল ১১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

EBPM = C2 + E2M
বিশ্বের ৫০টি সর্বনিম্ন উন্নয়নশীল দেশের একটি হিসেবে বাংলাদেশকে অনেকগুলো সমস্যার মোকাবেলা করতে হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, খরা ইত্যাদির পাশাপাশি দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, কর্মসংস্থানের অভাব ইত্যাদিকে সুনির্দিষ্টভাবে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। হালে যোগ হয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সমস্যাগুলোর সবকটিই একটি অপরটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং সবকটিই অধিক মনোযোগের দাবি রাখে। তবে সরকারি নীতি অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে দারিদ্র্যকেই এক নাম্বার সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তা থেকে বের হয়ে আসার জন্য নানান কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে।

সরকার পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায় ২০০৫ সালে ১৫ কোটি জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে ৯ কোটি ৩৮ লক্ষ লোক দরিদ্র। ২০০০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯ কোটি ১০ লক্ষ। ৫ বৎসরে দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে ২৮ লক্ষ। বৃদ্ধির হার সমান থাকলে চলতি বৎসরে মোট দরিদ্রের সংখ্যা ৯ কোটি ৬৬ লক্ষ বলে অনুমান করা যায়। বিদ্যমান দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির কোন পরিবর্তন না আনা হলে কিংবা নতুন কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হলে ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ১০ কোটিতে এবং ২০৩৪ সনে মোট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৩ কোটি হবে বলে অনুমান করা যায়। ২০৩৪ সনের মধ্যে দেশকে দারিদ্র্য মুক্ত করতে চাইলে প্রতি বৎসর কমপক্ষে ৫২ লক্ষ লোককে দারিদ্র্য মুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা কত এ নিয়ে স্পষ্ট কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন জরিপ, দায়িত্ববান ব্যক্তিদের উদ্বৃতি, এনজিওর বক্তব্য মিলিয়ে সাদামাটা দৃষ্টিতে বলা যায় শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মিলিয়ে কাজ করতে সক্ষম, এমন বেকার লোকের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। এরা কাজ করতে সক্ষম, কিন্তু কাজ নেই। তাদের অনেকেই মানবেতর জীবন-যাপন করছে। কেউবা বাবা-মা, কেউবা অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে আছে। প্রতিবছর প্রায় ২৫ লক্ষ লোক শ্রম/চাকুরির বাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ((International Labor Organization)) পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী বেকার সংখ্যা বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ- বিশ্বের এমন ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২ তম। ২০০৪-২০০৫ অর্থ বৎসরে বাংলাদেশের জিডিপিতে শিল্পের অবদান ছিল ১৩.৯ ভাগ এবং শিল্পে মোট শ্রম শক্তির ১০ ভাগ নিয়োজিত ছিল। এতে করে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য বিমোচনে আমাদের দেশে শিল্প সেক্টরের হতাশাজনক অবদানের চিত্রই ফুটে ওঠে।

সম্প্রতি পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায় ১০০ জনের মধ্যে ৯৭ জনই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে বাংলাদেশের সমস্যা বলে মনে করেন এবং এদের মধ্যে শতকরা ৭৭ জনই একে এক নাম্বার সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সমাজের একজন অতি দরিদ্র ব্যক্তি থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত ক্ষেত্র বিশেষে উচ্চবিত্ত শ্রেণীসহ সবার কাছে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিই এক নাম্বার সমস্যা বলে বিবেচিত হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে বর্ধিত অর্থের জোগান দিতে গিয়ে অসততার সূত্রপাত এবং সৃষ্টি হচ্ছে দুর্নীতির। দুর্নীতি ডেকে আনছে সন্ত্রাস ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা। দেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠী যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নয়, সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নয়, তারা দিন দিন দরিদ্র হচ্ছে। দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষালাভ করতে পারছে না এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থানও করতে পারছে না।

দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারও বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপশি রয়েছে এনজিও এবং উন্নয়ন সহযোগীরা। তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজারজাত ব্যবস্থার উন্নয়ন। এতে করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ফলশ্রুতিতে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে। উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজারজাত ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য Education Based Production and Marketing বা শিক্ষাভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ধারণাটি (ইবিপিএম) অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
গ্রামে উৎপাদিত একটি পণ্য কিছু অসাধু ফড়িয়া, আড়তদার, মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে পড়ে দাম বৃদ্ধি পেতে পেতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের বাইরে চলে যায়। এ অসাধু ফড়িয়া, আড়তদার ও মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানোর কার্যকর পন্থা হচ্ছে দেশব্যাপী শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সংগঠিত জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের একটি আধুনিক ও সহজ বন্টন চ্যানেল গড়ে তোলা। এই চ্যানেলটি ই হতে পারে ইবিপিএম। ইবিপিএম এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, লোকাল কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে সহজেই তা করা সম্ভব। ইবিপিএম ব্যবস্থায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য কিংবা সেবা সামগ্রী নিয়ে বৃহৎ বৃহৎ শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।

একটি দেশ শিল্পে সমৃদ্ধ হলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায় অনায়াসে। শিল্প সমৃদ্ধ দেশটির বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে লক্ষ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি সম্ভব। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, লোকাল কমিউনিটি কর্তৃক উৎপাদিত স্থানীয় একটি পণ্যই হতে পারে এরূপ শিল্পের কাঁচামাল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক এরূপ বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় সামান্য একটু সংস্কার কাজে হাত দিতে হবে। এ সংস্কার কাজের কার্যকর হাতিয়ার হবে One School Many Product (OSMP), One Product All Village (OPAV), One Product for All People (OPAP) ইত্যাদি। স্কুলভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে বিদ্যমান সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় Local Curriculum (LC) এবং অনানুষ্ঠানিক বা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায় Life Long Education (LLE) অন্তর্ভুক্ত করে স্থানীয় পণ্য ও সেবা তথা শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করা যায়। এ শিক্ষা ব্যবস্থার আওতায় শিক্ষার্থীরা স্থানীয় পণ্যটি সম্পর্কে জানবে, শিখবে। উদ্যোক্তা হয়ে তারা মাইক্রো বিজনেস গঠন করবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ এরূপ ব্যবসায়ের পৃষ্ঠপোষক হবে। স্থানীয় কমিউনিটি ও এই প্রক্রিয়াটির সাথে যুক্ত থাকবে। এভাবে গ্রামের একেকটি পণ্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে শিল্প গড়ে ওঠবে এবং এই শিল্পের পৃষ্ঠপোষকও হবে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবক-কমিউনিটি।

EBPM ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য থাকবে কর্মমুখী নয়, কর্মসংস্থানমূলক শিক্ষা প্রদান। লোকাল কারিকুলামের আওতায় প্রচলিত ধারার শিক্ষার্থীরা কর্মসংস্থানমূলক শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং লাইফ লং এডুকেশনের আওতায় শিক্ষাবঞ্চিতরা শিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানমূলক শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হবে। সম্প্রতি জাপানের One Village One Product (OVOP বা এক গ্রাম এক পণ্য আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশে এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো বা ইপিবি এক জেলা এক পণ্য নামে একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। এই কর্মসূচিটির কি অবস্থা তার ফলোআপ রিপোর্ট জানা নেই। তবে আমাদের বাংলাদেশে এখন প্রয়োজন শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত করে এই কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা।

এই কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে ন্যাশনাল এডুকেশন ফান্ড বা জাতীয় শিক্ষা তহবিল কর্তৃপক্ষ গঠন পূর্বক সোশ্যাল স্টক এক্সচেঞ্জের আওতায় বাজারে শিক্ষা বন্ড ছেড়ে তহবিলের অর্থ সংস্থান করা যেতে পারে। EBPM কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থার আওতায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে একত্রে শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের আওতায় এনে জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব।


আগামী সংখ্যায়- ইবিপিএম ধারণা বাস্তবায়ন কৌশল।
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×