প্রিয়াংকা বিবিএ-র ছাত্রী। অনেক বন্ধু তার, ক্লাস করা এবং বাড়িতে পড়ার সময় বাদে বাকি সময় সে ব্যস্ত থাকে কখনো ল্যান্ডফোনে, কখনো সেলফোনে আবার কখনো ইন্টারনেটে বন্ধুদের সাথে চ্যাট করে। কখনো খাঁটি ইংরেজিতে কখনো হিন্দিতে কখনোবা খিচুরি ভাষায়। তার টিভিতে মাত্র কয়েকটি পছন্দের চ্যানেল এডযাস্ট করা। কোন বাংলা চ্যানেল নেই। গানের সিডি সব ইংরেজি আর হিন্দি। বাড়িতে শুধু ইংরেজি পত্র পত্রিকাই রাখা হয়। দিনে দু’একবার তা উল্টে পাল্টে দেখে সবাই। বাঙালি ড্রাইভার হিন্দি ভালোই জানে, ইংরেজি ডিরেকশন বুঝতে পারে।
নিজের চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত প্রচন্ড সচেতন প্রিয়াংকা। পূজার সময় বাড়ির সবার সাথে শখ করে বাঙালি পোশাক পড়ে। এছাড়া বাদ বাকি সময় সে বিভিন্ন ধরনের পোষাক পড়ে, ফ্যাশন ডিজাইনের পত্রিকা দেখে পোষাক চুজ করে। প্রিয়াংকার বন্ধুদের কেউ কেউ বিভিন্নভাবে প্রেম নিবেদন করলেও স্বয়ং বিষ্ণু দেবতাও জানেন না যে, প্রিয়াংকা কাউকে বিশেষ চোখে দেখে কি না? সে নিজেকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। প্রিয়াংকার সেলফোনে অনেক অপরিচিত ফোন আসে। ইচ্ছে হলে কথা বলে না হলে কেটে দেয়। ইনবক্সে প্রতিদিন জমা হয় অসংখ্য ই-মেইল। মাঝে মধ্যে ইচ্ছে হলে কারো সাথে চ্যাট করে বা ভিডিও কনফারেন্স করে, কখনো কেটে যায় এক ঘন্টা, দু’ঘন্টা। ম্যাসেঞ্জারে হঠাৎ একদিনএক ছেলের সাথে যোগাযোগ হয়। প্রথমেই সে জানায় তার নাম পল্লব শ্রীবাস্তব, বয়স ২৭, প্রিয়াংকা চাইলে সে চ্যাট করতে চায়।
প্রিয়াংকা প্রশ্ন করে তুমি কোথায়?
লস এ্যাঞ্জেলস, তুমি?
ক্যালকাটা।
তুমি কি বাঙালি?
হ্যাঁ, তবে বাংলা জানি না, তুমি কোন শহরে জন্মেছ?
নৈনিতাল, তুমি এখন কি পড়ছো? তোমার নাম কি?
বিবিএ, সেকেন্ড সেমিস্টার, প্রিয়াংকা, তুমি এখন কি করছ?
তোমার সাথে চ্যাট করছি? তোমার নামটা খুব সুন্দর।
তা নয়, অন্য সময় তুমি কি করো?
ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ, টয়লেট, সেভ, বাথ, ব্রেকফাস্ট, কখনো স্ট্যাডি, কখনো আকাশে উড়ে বেড়াই।
এগুলো ফান, সত্যি করে বলো তুমি পড় না চাকুরি কর?
দুটোই করি?
কতটুকু পড়েছো? এখন কি পড়ছো?
এ ফর এ্যারেপ্লেন, এ্যারেপ্লেন পর্যন্তই পড়েছি।
এটাতো পৃথিবীর সব ছেলেমেয়েরাই ছোট বেলায় পড়ে।
ওটুকুই আমার জ্ঞান।
তুমি হেয়ালী করছ?
মোটেও না।
তাহলে সত্যি কথাটা বলো।
আজ না অন্য একদিন বলবো।
আজই বল, আমার খুব রাগ হচেছ।
বলছিতো অন্যদিন বলবো, সত্যিই বলবো।
আর কোনদিন তোমার সাথে যোগাযোগ হবে না।
কেন? তুমি চাও না?
তাহলে বলো তুমি কি কর?
কথা দিচ্ছি এর পরদিন বলবো।
আমার মনে হয় তুমি খুব অল্প শিক্ষিত।
হ্যাঁ। এবার তোমার কাছে শিখবো।
আমার কাছে। আমি তোমাকে কি শেখাবো?
পরশুদিন ঠিক এই সময় অনলাইনে থেকো। তখন বলবো, তোমার সাথে আরো অনেক কথা আছে। এখন আমাকে অফিস যেতে হবে, বাই।
বাই।
কমপিউটার অফ করে শুয়ে পড়ে প্রিয়াংকা। মেজাজ খারাপ লাগে। ছেলেটা সহজ কথা এত ঘোরায় কেন? আর ওর সাথে যোগাযোগ করবে না। পরদিন আবার বসে কমপিউটার নিয়ে। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ঘোরাঘুরি করে। কারো সাথেই যোগাযোগ করে না। পরের দিন আবার বসে। এক সময়ে পেয়ে যায় পল্লবকে।
তুমি কেমন আছো?
ভালো। তুমি কেমন আছো?
আমিও ভালো। গতকাল কোথায় ছিলে?
আকাশে।
তাই বুঝি? তা এখনো কি আকাশেই আছো?
না, এখনতো তোমার সাথে।
আজ বলো তুমি কি কর?
এটা জানা কি খুব জরুরী?
অবশ্যই। আমিতো সহজেই আমার কথা বলেছি। তবে তুমি কেন সহজ নও?
আচ্ছা বলছি। তার আগে তোমার কাছে একটা জিনিস চাই।
কি চাও তুমি?
তোমার ফোন নাম্বার।
কেন?
ফোনে বলবো।
হু, তুমি খুব বেশী চালাক।
অজানা কাউকে প্রথম ফোন নাম্বার দেয় প্রিয়াংকা। লাইন কেটে যায়। একটু বাদে বেজে ওঠে ফোন। প্রিয়াংকা ফোন রিসিভ করে।
হ্যালো
তোমার কণ্ঠ খুব সুন্দর। খুব ইনোসেন্ট।
তাই! এবার বলো।
কি বলবো?
যা বলার জন্য ফোন নাম্বার নিলে।
বলছি, তার আগে তোমার সম্পর্কে কয়েকটা কথা মিলিয়ে নেই। ভুল হলে সুধরে দিও।
আমার সম্পর্কে জানলে কিভাবে?
আচ্ছা তুমি কি পাঁচ ফুট তিন? তুমি কি ৪৭ কেজি? তুমি কি দেখতে খুব সুন্দর? তুমি কি খুব অল্প দিন হলো কলকতায় এসেছ?
অবাক বিস্ময়ে অভিভুত হয় প্রিয়াংকা। কিভাবে জানলো ও এসব কথা।
কিভাবে জানলে তুমি? তুমি কি আমায় চেনো?
তোমাকে আমি চিনি না। তবে চেনার চেষ্টা করেছি। বলোতো যা বলেছি সব সত্যি কি না?
হ্যাঁ। সবই সত্যি শুধু এক কেজি কম। বল কি ভাবে জানলে? তোমার কি আধ্যাত্মিক কোন শক্তি আছে?
না, ওরকম কিছু নেই। আজ যেটুক জেনেছি তাই বললাম। তুমি আমার সাথে কথা বললে আরো কিছু বলতে পারবো।
আমি খুব অবাক হচ্ছি। আচ্ছা আরও দু’একটা বলতো।
তুমি এখন যে ড্রেসটা পড়া সেটা কি হাল্কা সবুজ?
তুমিতো আমার মাথা খারাপ করে দিবে। এ কিভাবে সম্ভব? বল এখনই বলো, না হলে আমার রাতে ঘুম হবে না। তুমি কি ভিন্ন গ্রহের কেউ?
না, আমি একজন সাধারণ মানুষ।
তাহলে তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি আমার আশপাশের কেউ। আমাকে খুব ভালো ভাবে চেনো। আমি যখন বারান্দায় ছিলাম তখন আমায় দেখেছো।
না। মিথ্যা বলছি না। আমি এখন অনেক দূরে। আমি তোমাকে দেখিনি কোন দিন। তুমি ইচ্ছে করলে আমাদের দেখা হতে পারে। যদি বিশ্বাস না করো তা হলে তোমাকে আমি প্যারিসে আমার হোটেলের ফোন নাম্বার দিচ্ছি। ফোন করে কনফরম হতে পার।
তুমি এখন প্যারিসে? পরশুইতো বললে তুমি লস এ্যাঞ্জেলসে। এরপর হয়তো বলবে টোকিও বা সিংগাপুর। আসলে তুমি একটা মিথ্যুক।
আকাশে উড়ে এসেছি। হয়তো তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু আমি পুরো মাসই পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে থাকি। এটাই আমার চাকুরি।
তুমি কি পাইলট?
না।
তবে কি এয়ার ক্রু ?
তাও না।
তবে তুমি কি?
বলেছিলাম না এ্যারোপ্লেন পর্যন্ত পড়েছি। আসলে আমি এ্যারোনটিক ইন্জিনিয়র, ডেল্টা এয়ার লাইন্স -এ চাকুরি করি।
সেদিন বলোনি কেন?
একটু মজা করলাম। এছাড়া সহজে বলে দিলে তুমি হয়তো ফোন নাম্বারটা আমায় দিতে না।
তাহলে এবার বলো আমার সম্পর্কে এতকিছু জানলে কিভাবে?
এর উত্তর পরের দিন দিব।
আমার খুব টেনশন হবে।
একটু হোক না। বলে দিলেতো সহজ হয়ে গেল। তার চেয়ে নিজেই ভেবে বের করার চেষ্টা করো। না পারলে আমিই বলে দিবো।
ঠিক আছে। তাহলে আরো কিছু বলো।
তুমি খুব ভালো, খুব ইনোসেন্ট, সহজেই ক্ষেপে যাও, সহজেই হাসো। সবাই তোমাকে খুব আদর করে। এখনো তুমি শিশুদের মত বায়না ধরো। খাবার নিয়ে এখনো মায়ের বকুনী খেতে হয়।
তাই! বাড়িতে কিন্তু সবাই আমাকে খুব স্বার্থপর বলে।
এটা মিথ্যে কথা।
তুমি কি করে জানলে এটা মিথ্যে। আমিও জানি এটাই সত্যি। সবাই জানে। সবাই বলে।
আমি বিশ্বাস করি না। ছেলেবেলায় এরকম একটু আধটু সবাই থাকতে পারে। কিন্তু বড় হবার সাথে সাথে পরিবর্তন হয়।
আমি একই রকম। সত্যিই আমি খুব স্বার্থপর।
আচ্ছা মানলাম তুমি স্বার্থপর। স্বার্থপর মানুষের মধ্যে তো দয়া মায়া খুব কম থাকে। তাই না?
হ্যাঁ।
তোমার মধ্যে যদি দয়া মায়া কম থাকতো, তাহলে আমার জন্য তোমার মধ্যে এত মায়া এলো কোথা থেকে?
তোমার জন্য আমার মধ্যে মায়া? তুমি আমার কে? আমিতো তোমাকে চিনিই না। আর কেনইবা আমি তোমায় মায়া করতে যাব।
ওভাবে কথাটা উড়িয়ে দিয়ো না। আমি যা বলি মন দিয়ে শোন।
- চলব
২য় পর্ব : Click This Link
(বিঃদ্রঃ মুল গল্পটির (শিয়ালদহ থেকে সল্টলেক) প্রেক্ষাপট কোলকাতায় বাংলা ভাষার ক্রমশ অবক্ষয়, সময়-১৯৪০ থেকে ২০০৭। সম্পূর্ণ গল্পটি হয়তো এখানে দিব না।)
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৫:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


