প্রথম পর্ব (Click This Link)
তুমি এখন ফোনটা রেখে দাও। রুমের লাইট অফ করে সোজা ভাবে বিছানায় কিছুক্ষন শুয়ে থাকো। মন থেকে অন্য সমস্ত চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দাও, তারপর খুব গভীর ভাবে নিজের কাছে প্রশ্ন করো আমার জন্য তোমার মধ্যে মায়া জন্মেছে কি না? উত্তরটা পরের দিন আমাকে জানিয়ো।
ফোন রাখতে হবে না। তুমি একটু অপক্ষা করো। আমি এখনই ভেবে দেখছি। কথাটা বলে প্রিয়াংকা চোখ বন্ধ করে। যখন সে চোখ খোলে তখন তার ভিতর থেকে জেগে উঠে পরিপূর্ণ এক স্নেহময়ী নারী। সে নারী ধীরস্থীর, দায়িত্বশীল, আবেগ জড়ানো কণ্ঠে উচ্চারণ করে, সত্যিই তোমার জন্য আমার মধ্যে মায়া জন্মে গেছে।
এরপরও কি ভাববে তুমি স্বার্থপর?
জানি না।
আজ রাখি। আমি তোমাকে আবার পরে ফোন করবো। ভালো থেকে। শুভ রাত্রি।
তুমিও ভালো থেকো। শুভ রাত্রি।
ফোন রেখে প্রিয়াংকা ভাবতে থাকে কথাগুলো একবার, দুইবার, তিনবার-নিজের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করে। পরিবর্তনটা ঠিক কি রকম বুঝতে পারে না। কি করে জানলো এত সব কথা তাও ভেবে কোন কুল কিনারা পায় না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রিয়াংকা। সকাল থেকেই শুধু কানে বাজতে থাকে নিজেরই কণ্ঠ ‘সত্যি তোমার জন্য আমার মধ্যে মায়া জন্মে গেছে’'। সকাল থেকেই প্রিয়াংকা আগের চেয়ে অনেক বেশি উচ্ছ্বল, বেশি চঞ্চল। গুন গুন করে গান গায়। যা দেখে তাই সুন্দর লাগতে থাকে। ক্লাসের ফাকে রানুকে বলে পুরো বিষয়টা । রানু বলে, ও তোকে আগে থেকেই চেনে। না হলে এটা কখনই সম্ভব না। আচ্ছা আমার নামেতো আরো অনেক মেয়ে আছে, আমি যে ওর পরিচিত প্রিয়াংকা সেটা বুঝলো কি ভাবে? রানু বলে, এটা বুঝলি না! ও তোর ই-মেইল আইডি, ফোন নাম্বার আগে থেকেই জানে। একথাতো চিন্তা করিনি। দাড়া এরপর ফোন করলে মজা দেখাবো।
বিকেল থেকে প্রিয়াংকার মনের আনন্দ উবে গিয়ে ধীরে ধীরে বিষন্নতা আর অস্থিরতার ছায়া পড়তে শুরু করে। ফোন হাতেই থাকে, কখন বেজে উঠবে এই অপক্ষায়। কল আসে কয়েকটা, অল্প কথা বলে লাইন কেটে দেয়। সকালের উচ্ছ্বাস আর রাতের বিষন্নতা খাবার টেবিলে জয়িতার চোখ এড়ায় না। জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে তোমার?
না, কিছু না।
ভাল না লাগলে শুয়ে পড়ো। বেশি রাত জেগো না।
সত্যিই এখন আর কিছুই ভাল লাগছে না। লাইট অফ করে বিছানায় শুয়ে ফোনের অপক্ষা করে আর ভাবতে থাকে ওকে আজ কিছু কথা জিজ্ঞেস করবে। প্রশ্ন গুলো সাজাতে থাকে মনে মনে। একসময় ঘুমিয়ে পরে। জয়িতা এসে একাবার দরজায় উঁকি মারে। টের পায় না প্রিয়াংকা। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায় ফোনের মিউজিকে। ফোন রিসিভ করে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে-
হ্যালো।
ঘুমিয়ে পড়েছিলে?
হ্যাঁ।
কেমন আছ তুমি?
ভালো।
আমি কি তোমায় বিরক্ত করলাম?
না ঠিক আছে। তুমি বলো।
আচ্ছা তুমি কি আমার ফোনের অপেক্ষায় ছিলে?
হ্যাঁ।
তাহলে ঘুমিয়ে পরলে যে?
টের পাইনি। একটা সত্যি কথা বলবে?
বলো।
তুমিতো আমায় চেন এবং আমার ই-মেইল আইডি, আমার ফোন নাম্বার আগে থেকেই জানতে। তুমি আমাকে আসলে বোকা বানাতে চাইছো। আজকাল এভাবে অনেকেই মানুষকে বোকা বানায়, ঠিক কিনা বলো?
না। আমি তোমাকে চিনি না, আমি তোমাকে দেখিনি কোনদিন। কোলকাতায় আমি যাইনি কোন দিন। যা যা বলেছি সবই সত্যি, বিশ্বাস করা না করা তোমার ব্যাপার।
আচ্ছা তাহলে আজ তোমার সম্পর্কে বলো?
কি জানতে চাও?
একে একে অনেক গুলো প্রশ্ন করে প্রিয়াংকা। পল্লব ঠিকমত জবাব দেয়। প্রিয়াংকা পল্লব সম্পর্কে অনেক তথ্য পায়। পল্লব তার পূর্ব পরিচিত কেউ নয়। এরপরও সন্দেহ থেকে যায় পল্লব হয়তো তাকে জানে।
তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি? কিছু মনে করবে নাতো?
কি?
তুমি কি জান, আজ তুমি আমায় যে প্রশ্নগুলো করলে একজন পুরুষ মানুষ সম্পর্কে এক সাথে এতগুলো প্রশ্ন কখন করা হয়?
কখন?
যখন তাকে নিয়ে বিয়ের কথা ভাবা হয়। তুমি কি আমার জন্য সেরকম কোন মেয়ে দেখেছ নাকি?
প্রচন্ড ধাক্কা খেয়ে বোকা বনে যায় প্রিয়াংকা। এভাবে তো সে চিন্তা করেনি। শ্রেফ কৌতুহল বসে জিজ্ঞেস করেছে, না। ওরকম কিছু না। জানতে ইচ্ছে হলো তাই জিজ্ঞেস করলাম। এবার বলো আমার সম্পর্কে আর কি জেনেছো?
তোমাদের বাড়িটা কি ডুপ্লেক্স?
হ্যাঁ।
বাড়িতে তোমার বাবা, মা আর তোমার ছোট ভাই থাকো। তোমার দাদা বর্তমানে দূরে কোথাও আছে। তোমাদের প্রত্যেকের রুমে আলাদা টিভি এবং নিচতলায় একটি টিভি তাই না? তোমরা কি দুইভাই এক বোন?
হ্যাঁ। কিন্তু তুমি কি করে জানলে আমাদের বাড়ির ভিতরের কথা। তুমি কে ঠিক করে বলোতো।
এটা খুব সহজ, এখনই বলছি। গতকাল তোমার সাথে ফোনে কথা বলার সময় তোমার ছোট ভাইয়ের সাথে টিভি দেখা নিয়ে তোমার যে কথা গুলো হয়েছে তা থেকেই জেনেছি এগুলো। তোমার দাদার রুম যেহেতু লক করা, চাবি কোথায় তুমি জানো না? তার মানে সে এখন কলকাতার বাইরে। কোথায় থাকে সে?
ব্যাঙালোরে। কমপিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। এবার বলো বাকি কথাগুলো কিভাবে জেনেছো?
তাহলে শোন, সাইকোলজিতে ইনটুইশন বলে একটি বিষয় আছে। যে সব মানুষের ইনটুইশন ভালো থাকে, তারা যদি গভীর ভাবে কোন কিছু অনুমান করতে চেষ্টা করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা ভুল হয় না। তবে সব সময় না।
হ্যাঁ। তুমি অসাধারণ। আমি খুব লাকি যে তোমার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। প্রথম ভেবে ছিলাম তোমার সাথে দু’একদিন কথা বলবো, এখন মনে হয় তোমার সাথে আরো কিছুদিন কথা বলতে হবে।
তোমাকে নিয়ে আমার একটা ভয় ছিলো। ভয়টা এখন কেটে গেল। যাক তোমার সাথে আরো কিছুদিন কথা বলতে পারবো।
আমার যখন খুব মন খারাপ থাকে তখন শুধু তোমার কথা মনে হয়। তোমার সাথে কথা বললে মন ভালো হয়ে যায়।
আচ্ছা তাহলে আমার চাকরিটা ছেড়ে দেই?
কেন? হঠাৎ চাকরি ছাড়তে চাইছো কেন?
তোমার মন ভালো করার চাকরিটা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বেশি পছন্দের।
আমি কি তাই বলেছি? তোমার সাথে কথা বলা মুশকিল, এখন থেকে হিসেব করে কথা বলতে হবে।
আমারতো তাতে হবে না। আমার যে অনেক কথা আছে তোমার সাথে।
তাহলে বলো, আমি শুনছি।
আমার অনেক সময় লাগবে।
কদিন যাবততো কত কথা বলছি। আজও তো প্রায় দু’ঘন্টা হয়ে গেল। দু’ঘন্টা কি কম সময়? এর মধ্যে তুমি পারলে না তোমার কথা বলতে?
দু’ঘন্টা আসলেই অনেক কম সময়। এতো অল্প সময়ে আমার কথা শেষ হবে না। আমি আমার কথা শুরু করতে পারি কখন শেষ হবে আমার কোন ধারণা নেই। এমনও হতে পারে আমার কথা শেষ হবার আগে তোমার মাথার সমস্ত চুল সাদা হয়ে যেতে পারে। তুমি কি পারবে আমাকে এতখানি সময় ভিক্ষা দিতে?
প্রিয়াংকার হাসিতে কেঁপে ওঠে সারা শরীর, মনে হয় সে শূন্যে ভাসছে। এখন কি বলবে সে ভেবে পায় না। এ কথার অর্থ বোঝার মত যথেষ্ট বয়স এবং বুদ্ধি তার হয়েছে। এ পর্যন্ত বহু ছেলেই তাকে প্রোপোজ করেছে বিভিন্ন ভাবে। কিন্তু পল্লব সেতো ডাকাতি করতে এসেছে রীতিমত। যাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বা ইচ্ছা কোনটাই আর অবশিষ্ট নেই প্রিয়াংকার মনে, এত সময় আমি দিতে পারবো না? বললে এক্ষুনি বলো।
বললামতো এত অল্প সময়ে হবে না।
তোমাকে আধঘন্টা সময় দিচ্ছি এর মধ্যে বলো।
আধঘন্টায় আমার কথা শেষ হবে না।
তোমাকে নিয়ে আমার খুব সমস্যা।
ঠি-ক আছে। তা হলে রাখি, ভালো থেকো, শুভ রাত্রি। বলে ফোনের লাইন কেটে দেয় পল্লব।
চোখ বন্ধ করে প্রিয়াংকা। প্রাণের গভীরে কৃষ্ণের বাঁশী বাজে। বাঁশী শুনে রাধা ছুটে যেত বৃন্দাবন। কিন্তু এ কৃষ্ণতো পুরো দুনিয়াটাকে বৃন্দাবন বানিয়ে বাঁশী বাজায়। কোথায় খুঁজবে সে তার কলির কৃষ্ণকে। কোনো ঠিকানা বা ফোন নাম্বারটাও রাখা হয়নি। শুধু ই-মেইল আইডি দিয়ে কাউকে খুঁজে বের করা তার পক্ষে কোন দিনই সম্ভব না। যদি যে আর ফোন না করে। ম্যাসেঞ্জারে জবাব না দেয়। কি করার আছে প্রিয়াংকার?
- চলবে, পরের পর্ব ( Click This Link )
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০১০ দুপুর ১২:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


