সীমন্তিনী (পর্ব ১)
১.
সময়ের সাথে সাথে মা-এর নিষেধের পাল্লাটা যেন দিন দিন ভারী হচ্ছে। মাঝে মাঝে রাগ লাগে সেতু'র। এটা করোনা, ওটা করোনা...বারান্দায় এতোক্ষণ দাঁড়িওনা; আরো কত্ত কি!
আরেব্বাবা! এতই যখন নিষেধ, তখন বাড়ির নাম 'খেচর' পালটে 'পাঁজর' রাখলেই পারে! ঠোঁট ফুলিয়ে ভেংচি কাটে সেতু।
সারাদিনে ওর আনন্দের সময় হচ্ছে স্কুলের সময়টা। একটা ব্যাপার ওর খুব মজা লাগে। মেয়েগুলো যখন স্কুলের গেট দিয়ে ঢোকে, তখন তাদের চোখে মুখে কেন জানি একটা আতঙ্ক আতঙ্ক ভাব থাকে। কিছুটা নিষ্প্রাণও। কিন্তু স্কুলের আঙ্গিনায় পা রাখা মাত্রই ভোজবাজির মতো দূর হয়ে যায় ওদের মুখের মলিনতা। মায়েরা-বাবারা-কিংবা ভাইয়েদের হাত ছাড়িয়ে স্কুলের চারদেয়ালের ভেতর যেন ওরা আকাশ খুঁজে পায়। সেতু তখন ওদের দেখতে দেখতে কামরাঙ্গা গাছে উঠতে ব্যস্ত। কিছু মেয়ে অবাক হয়ে দেখে! ওদের চোখে রাজ্যের বিষ্ময়! মেয়ে হয়ে গাছে উঠতে পারে! কিছু অতি উৎসাহী মেয়ে ফিস ফিস শুরু করে দেয়। সেতুর দলও নেহাৎ কম ভারী নয়। ওরা সেতুকে আড়াল করে রাখে পি.টি ম্যাডাম (ওরা বলে পিটুনি ম্যাডাম) এর চোখ থেকে।
সেতু এখনো ছোট্ট মেয়েটি। তার শিশুসুলভ আচরণও তাই মন্দ মানুষের কাছে সাহসের মনে হয়। সেদিন স্কুলে ফেরার পথে একটা অপরিচিত ছেলে টান দিয়ে খুলে নিলো ওর চুলের ক্লিপ। আর যায় কোথা! ঘুরেই জাপটে ধরলো ছেলেটিকে। না, চিৎকার করে লোক ডাকেনি সে। বরং ছেলেটিকে মাটিতে ফেলে দিয়ে সমানে কিল ঘুষি মারতে শুরু করলো। প্রথমত; ছেলেটি ওর চেয়ে খুব বেশি বড় নয়; দ্বিতীয়ত, একটা মেয়ের কাছে এরকম আচরণ আশা করেনি সে। তাই ছেলেটা থতমত খেয়ে গেছে। মার খাচ্ছে সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই। সেতু অভ্যস্ত হাতে মারছে তাকে। ছেলেটারও হয়তো দু-এক ঘা দেবার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু কিছুটা সামলে ওঠার পর রাস্তার কিছু লোককে এগিয়ে আসতে দেখে সে আর আগে বাড়েনি। প্রথম সুযোগেই দে চম্পট!
এই ঘটনা স্কুলে প্রচার হয়ে গেলো। মেয়েগুলো আবারও ফিস ফিস করতে লাগলো। কি ডানপিটে মেয়ে! সেতু সেদিনই প্রথম শুনলো, অন্য মেয়েরাও নাকি এমন সমস্যায় পড়েছে অনেক বার।
নিষ্পাপ প্রশ্ন তার, 'তোরা কিছু বলিসনি?'
'ওরাতো বখাটে! কি বলবো ওদের?'
কি বলবি মানে? বলবি আমরাও বখাটে! ওরা তোর ক্লিপ খুলে নিলে তুই ওদের বেল্ট খুলে নিবি!'
মেয়েগুলো অবাক হয়ে শোনে ওর কথা। সেতুটা কি পাগল রে বাবা!
সেতু শিস বাজাতে বাজাতে একটা আম সই করে ঢিল ছোঁড়ে।
কেনি জানি ঢিলটা আমের গা ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়; লাগেনা।
সে ততক্ষণে উধাও।
আজ কোন কিছুতেই যেন তার মন বসছেনা। মনে পড়ছে, শান্তা কেঁদে কেঁদে বলছিলো কিভাবে একটা ছেলে ওর গায়ে অশ্লীল ভাবে হাত দিয়েছিলো ভীড়ের মধ্যে।
সেতু ভাবছিলো, কিভাবে গায়ে হাত দিলে সেটা অশ্লীল হয়!
কথাটা শান্তাকে জিগ্যেস করবে ভেবেছিলো, পাছে ওরা ওকে বোকা ভাবে; তাই জিগ্যেস করেনি।
অবশ্য এই ঘটনাটা ওর বেশিক্ষণ আর মনে রইলোনা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার আগেই বেমালুম ভুলে গেলো সারাদিনের কথাগুলো।
২.
মায়ের আচরণ ইদানিং খুব অদ্ভুত হয়ে গেছে। এইতো সেদিন ওর প্রিয় সাদা ড্রেসটাতে মা একটা বিচিত্র কাপড় লাগিয়ে এনেছে। কাঁধের উপর থেকে আধখানা চাঁদের মত করে গলার নিচে দিয়ে অন্য পাশের কাঁধ পর্যন্ত।
সেতু চিৎকার করে উঠলো, আমার এতো সুন্দর জামাটাকে নষ্ট করে ফেললে মা?
-বড় হচ্ছিস, এখন এরকম ড্রেসই পড়তে হবেরে মেয়ে!
-নিকুচি করি তোমার বড় হওয়ার! এমন ড্রেস আমার লাগবেনা।
মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে সে। বড্ড অভিমানী মেয়ে! বড় হওয়াটা যেন দিন দিন ওর পায়ে শেকলের মত জড়িয়ে যাচ্ছে। ও ভেবে পায়না বড় হলে এত্তো কিছু নিষেধ কেন? মাও তো বড়, কই, সেতো এমন অদ্ভুত ড্রেস পড়েনা!
এতোদিনে ওর গণ্ডিটা পাড়ার শেষের মাঠ থেকে গলির মাথা পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। স্কুল থেকে ফেরার পথে হন্যে হয়ে ও খোঁজে বন্ধুদের। সবাই যেন ভোজবাজির মত উধাও। সেদিন লুকিয়ে মাঠের দিকে চলে গিয়েছিলো সেতু; গিয়ে দেখে অপরিচিত কিছু ছেলে ওখানে খেলছে। ওরও খুব ইচ্ছে করছিলো, কিন্তু কি একটা সংকোচে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে চলে এসেছে। খুব কান্না পাচ্ছিলো তার। ফেরার পথে কিছু পথশিশুকে পেয়ে ওদের সাথে লুকোচুরি খেলে কান্নাটা কোনরকমে সামাল দিয়েছে সে। পারমিতা দের বাড়ি গিয়েছিলো একদিন। সেতু খেয়াল করলো, পারমিতা তাকে যখন বিদায় জানাতে এগিয়ে এসেছিলো, ওর সাথে ওর মাও এসেছিলো গলির মাথা পর্যন্ত। মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা অস্বস্তি তার ভেতরে জানান দিচ্ছে-কিছু ঠিক নেই! কিচ্ছু ঠিক নেই। এ যেন জীবনের এক বেপরোয়া ছন্দপতন!
সেদিন বাথরুমে হঠাৎ সেতুর আর্ত চিৎকার! কেবল মা-ছিলেন বাসায়, তিনি ছুটে এলেন।
কোনরকমে দরজা খুলেই সেতু মায়ের কোলে ঝাপিয়ে পড়লো। থরথর করে কাঁপছে।
মা, আমি বোধ হয় মরে যাচ্ছি মা! পেটে প্রচণ্ড ব্যাথা! এত্তো এত্তো রক্ত! কোটি কোটি রক্ত!
সেতু মায়ের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছে। ব্যাথায় নীল হয়ে গেছে মুখটা। সেতু যদি তখন ওর মায়ের মুখের দিকে তাকাতো, নিশ্চিত ভাবে তাঁকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর মা বলে ঘোষণা করতো।
কারণ, মা তখন মিটি মিটি হাসছিলেন। উনার অভিজ্ঞ মন যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। সেতুকে একটা টুলের উপর বসিয়ে মা ভেতরের ঘর থেকে একটা অদ্ভুত জিনিস নিয়ে এলেন। তারপর সেতুর কানে কানে কিছু একটা বললেন।
সেতু অবাক হলো যদিও, কিন্তু মায়ের কথা শুনলো।
এক্ষেত্রে আমার নিজের একটা বক্তব্য আছে। সবাই বলে মেয়েদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় প্রখর; কিন্তু আমি এটা বিশ্বাস করিনা। মেয়েদের ইন্দ্রিয় যে ছয়টা-এটাই আমি বিশ্বাস করিনা। তাদের ইন্দ্রিয় অসংখ্য। এবং এই অসংখ্য ইন্দ্রিয়ই তাদের প্রাকৃতিক ও সামাজিক অনেক বৈরীতা থেকে বাঁচায়। যেকোন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শেখায়। যাই হোক সে অন্য কথা, আমরা আবার গল্পে ফিরে যাচ্ছি।
সেদিন রাতে মা সেতুকে ডাকলেন।
-আয় মা, তোর চুল বেঁধে দেই। এমন হতচ্ছাড়া করে রাখিস কেন চুল গুলোকে! একটু যত্ন নিতে পারিস না?
-আমি চুল বাঁধলে তোমার হাতের এই আদরটা তো মিস করবো মা!
মা অবাক! তিনি একটা মুখ ঝামটা আশা করছিলেন সেতুর কাছ থেকে। তা না করে সেতু এত্তো গুছিয়ে উত্তর দিলো!
-কিরে! তুই এমন ঢং এর কথা শিখলি কোত্থেকে?
বোঝা গেলো, খুব খুশি হয়েছেন তিনি।
একটা আনন্দ মিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মা। মেয়েটা বড় হয়ে যাচ্ছে।
চুল বেঁধে দেবার ঘটনাটার শৈল্পিক দিক ছাড়াও আরেকটা জরুরী দিক আছে; যা কমবেশি সব মায়েদেরই প্রিয়। তা হচ্ছে আড়াল। প্রয়োজনীয় এবং কঠিন কথাগুলো এসময় খুব সহজ ভাবে বলা যায়-যা মুখোমুখি বলতে গেলে অনেক কথাই মুখে আটকে যাবে। ব্যস্ততা আর যত্নের আড়াল মানুষের সামনে একটা স্বস্তির জায়গা করে দেয়।
এই দিনটির কথা সেতুর সারাজীবন মনে থাকবে। মা একঘেয়ে স্বরে কথা বলে যাচ্ছেন। আর সেতুর মুখটা লজ্জায় রক্তিম হয়ে যাচ্ছে।
সেদিন দুইমেরুর বয়সী দুজন মানুষের মধ্যেকার বয়সের নদীর তফাৎটাতে যেন একটা অদৃশ্য সেতু তৈরী হয়ে গেলো।
সেতু সেদিন ছুটে চলে গিয়েছিলো মা'এর চোখের সামনে থেকে। সঙ্কোচে।
সেদিন তার কিছুটা ভয় ভয় করছিলো।
টেবিলে রাখা মিষ্টি চেহারার সুকান্তের ছবিটাও ওর কাছে খুব ভয়ঙ্কর লাগছিলো। ছবিটা উলটে রেখেছিলো সে। রাশেদ ভাইয়ের কথা মনে হতে ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিলো সেতু। তার শারিরীক পরিবর্তনের রহস্যটা এখন তার কাছে আর রহস্য নয়। শান্তার গায়ে অশ্লীল ভাবে স্পর্শ করেছিলো যে ছেলেটা, সেই স্পর্শের মানেও তার অজানা নয় এখন।
একদিনেই সেই ছোট্ট মেয়ে সেতু বালিকা থেকে হয়ে উঠেছে একজন লাজুক কিশোরী; যার কাছে পৃথিবীটা নতুন করে তার মোড়ক উন্মোচন করছে।
সেদিন থেকে তার গণ্ডি চলে এলো বাড়ির ভেতরের এই ছোট্ট বারান্দাতে।
পতনোন্মুখ ছন্দের এ যেন আরেক ধাপ অবনমন।
৩.
আট বছর পরের একদিন...
রাশেদ ভাই, এই রাশেদ ভাই। ডিপার্টমেন্টের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে পড়িমরি করে ডাকলো সেতু।
-আরে! সেতু না? কত্ত বড় হয়ে গেছিস!
-তুমিও তো ব্যাটা হয়ে গেছ। কত্তদিন পরে দেখা! তা কোথায় ছিলে এতোদিন?
-সে অনেক লম্বা গল্পরে, আরেকদিন বলবো। আজকে শুধু এটুকু বলি, পালিয়েছিলাম।
-কোথায়?
-কোলকাতায়।
-অ, তা আমাকে না বলে পালালে কেন শুনি?
তোকে বলতে গেলে তো আমার পালানো কঠিন হয়ে যেতোরে! মনে মনে বললো রাশেদ।
মুখে কিছু না বলে একটু হাসলো।
সেতু মিটিমিটি হাসছে। ওর চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক। হঠাৎ বলে উঠলো,
"দেয়ালে দেয়ালে মনের খেয়ালে লিখি কথা,
আমি যে বেকার পেয়েছি লিখার স্বাধীনতা।"
হো হো করে হেসে উঠলো দুজনে।
পরের দৃশ্য-
সেতু গাট্টা খেয়ে রাশেদের শান্তিনিকেতনী ব্যাগ খামচে ধরে আছে।
আর রাশেদ অসহায়ের মত হন্যে হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে-কোথায় চুইংগাম পাওয়া যায়!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

