somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সীমন্তিনী (পর্ব ১)

১৪ ই মে, ২০১১ দুপুর ২:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(উৎসর্গঃ পৃথিবীর সব মেয়ে; যাদের অনুপস্থিতিতে সমস্ত পৃথিবী বিরাণ আর কর্কশ হয়ে যেতো।)

১.
সেতু যদি একটু বড় হত, তাহলেই বুঝতে পারতো যে তার জগৎটা ছোট হয়ে যাবার পেছনে ধীরলয়ের একটা ছন্দ আছে। সে ছোট্ট মেয়ে। তেরো বছরের এই জীবনে সে কয়টা বছর স্থির হয়ে কাটিয়েছে এটা হিসেব করা খুব সহজ। তাই প্রথম প্রথম মেনে নিতে খুব কষ্ট হত তার। পাশের বাড়ির বন্ধু আমগাছটা তাকে মাথা ঝুঁকিয়ে ডাকতো; যে গাছের প্রতিটি পাতায় সেতুর হাতের স্পর্শ আছে। খুব ভালো ক্রিকেট খেলে সেতু। সে মেয়ে বলে কেউ তাকে দলে নিতে চাইতোনা। কিন্তু যেদিন ওর বন্ধুদের কয়েকজনকে দুদ্দাড় মেরে পিটে ব্যাট হাতে নিয়ে, অনুদের বাড়ির চারতলার জানালার গ্লাস ভেঙ্গেছিলো ছক্কা হাঁকিয়ে; সেদিন থেকে ওকে দলে নেবার জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। পাশের পাড়ার সাথে এপাড়ার জয়ের অনুপাতটাও সেদিন থেকে বেড়ে গিয়েছিলো। প্রথম প্রথম ও পাড়ার ছেলেরা আপত্তি করতো। ঝুঁটি বাঁকিয়ে ছুটে যেতো সেতু'ই। বলতো, আই.সি.সির এমন কোন নিয়ম আছে কিনা বল যে, দলে মেয়ে ক্রিকেটার থাকতে পারবে না! ওর এই তেড়ে ওঠা ভঙ্গি দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে যেত। সেতু ক্লাসের সেকেন্ড গার্ল। সুতরাং ক্রিকেটের কপি বুক খোঁজার চেয়ে তার কথাটাকেই মেনে নেয়াটাকে ওরা সহজ মনে করতো। আর ওদিকে সেতু নির্বিবাদে ছক্কা হাঁকাতো! আড়ালে ওর নাম হয়ে গেলো উইলো মানবী।

সেতু যদি ভালো ছাত্রী না হতো, তাহলে হয়তো ওর এই দুরন্তপণা সবার চক্ষুশূল হয়ে যেতো। সবাই বলতো ধিঙ্গি মেয়েটা কি ত্যাঁদোড় রে বাবা! মা-বাবা কিছু শেখায়নি; ইত্যাদি ইত্যাদি। যেহেতু সে ছাত্রী ভালো, সেহেতু সবার বলার ভঙ্গিটাতে একটা প্রশ্রয় আর স্নেহের সুর আছে। 'মেয়েটা চঞ্চল'-এ কথা বলেই সবাই থেমে যায়। হয়তো সেতু তখন কোন বাসার গাছ থেকে নারকেল পেড়ে তার পানি খেতে খেতে সামনে দিয়ে যাচ্ছে; তার জামা বই ভিজে যাচ্ছে সেই পানিতে-তাতে কোন বিকার নেই তার। তারা কথা থামিয়ে দিয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা শুরু করে; 'আসলে নারী স্বাধীনতার এই যুগে...'
সেতু তাতে থোড়াই কেয়ার! তখনো বালিকা সে। নারীত্ব কি তা জানতে তার বয়েই গেছে!

সেতু জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে ভাবছে। রাশেদ ভাইটা এখন আর বাসায় আসেনা। আগে যখন তখন আসতো। খুব দুষ্টামি করতো ভাইয়া। মাথায় যে গাট্টা গুলো মারতো, তা মেনে নেবার মতো মেয়ে সেতু নয়। কিন্তু বাচ্চারা কিভাবে যেন স্নেহ বোঝে; সেতুও বুঝতো রাশেদ ভাইয়ের স্নেহ। সে কেবল হিসেব রাখতো কয়টা গাট্টা খেল। কারণ, গাট্টার সংখ্যা এবং তার বাবদ প্রাপ্ত চুইংগামের সংখ্যা সমান। রাশেদ ভাই এবার এস.এস.সি দেবে। হয়তো তাই পড়ালিখায় ব্যস্ত।
রাশেদ ভাই একবার বলেছিলো, 'বুঝলিরে ব্রীজ, আমি একটা ল্যাবেন্ডিশ মার্কা ছাত্র। আমার পড়া তো সারাবছর না, মোটে পরীক্ষার আগের তিন মাস। ব্যস, তাতেই চলবে। সারা বছর পড়বি তোরা। ডাক্তার হবি, ইঞ্জিনিয়ার হবি, সমাজবিজ্ঞানী হবি।'
সেতু জিগ্যেস করেছিলো, তাহলে তুমি কি হতে চাও ভাইয়া! লাড্ডুর দোকানদার? হি হি হি।
জবাবে ইয়াব্বড় একটা গাট্টা। সেতু তেড়ে মেরে উঠতেই দেখে-চোখের সামনে ঝুলছে একটা চুইংগাম।
সে খপ করে চুইংগামটা ধরে ফেলে আড় চোখে তাকায় রাশেদ ভাইয়ের দিকে- 'যাও মাফ করে দিলাম।'
সেতু জানে রাশেদ ভাই কবি হতে চায়। কোন কবি হতে চায় তাও জানে সে। সুকান্ত। গালে হাত দিয়ে বসে থাকা মিষ্টি চেহারার একজন কবি। সেতু লুকিয়ে লুকিয়ে সুকান্তের কবিতা পড়ে। গালে হাত দেয়া কবি'টার সাথে কোথায় যেন রাশেদ ভাইয়ের মিল খুঁজে পায় সে।

২.
ক্লাস সিক্সে ওঠার পর সেতু খুব অবাক হয়ে গেল। অবাক হবারই কথা। প্রথমত; একসাথে এতো মেয়ে সে কখনো দেখেনি। দেখার কথাও নয়। সেতু যখন মাঠে ঘুড়ি ওড়াতে ব্যস্ত তখন এই মেয়েরা সবাই বাড়ির দেয়ালের ভেতর বসে রান্নাবাটি খেলেছে। তাই সেতুর জগৎ আর তাদের জগৎ আলাদা। দ্বিতীয়ত; দীপক, তুহিন, অনু, হামজা-ওর প্রাণের বন্ধুদের কাউকে এখানে সে দেখতে পাচ্ছেনা। অবশ্য ফার্স্ট গার্ল অনামিকাকে পাওয়া গেছে; তাতে কি? সেতু শুনেছে এটা গার্লস স্কুল। এখানে নাকি মেয়েরা পড়ে। ওর বন্ধুরা কোথায় পড়ছে-এটা জানার জন্য ওর খুব চিন্তা হতে লাগলো। প্রথম দিন তাই ক্লাসে মন বসাতে পারেনি সেতু।

সেদিন সন্ধ্যায় মা ওকে স্কুল ড্রেস বানিয়ে দিতে গেলো। বাহ! ভালোতো! আগে যে ড্রেস কিনতে বায়না ধরতে হতো, সেই ড্রেস মা কিনা নিজের ইচ্ছায় বানিয়ে দিচ্ছে! গার্লস স্কুল নামক প্রতিষ্ঠানটার প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার মন ভরে গেলো। যদিও পোশাকটা বেশ অদ্ভুত! কোমরের কাছে বেল্ট, কাঁধ থেকে একটা মোটা বেল্ট বুকের উপর থেকে ক্রস করে কোমরের বেল্টের সাথে লাগানো। পেছনে মাছের লেজের মত ঝুলে থাকে সেই বেল্ট। সেই ড্রেস প্রথম দিন পড়ে সেতুর হাসি আর থামতেই চায়না। মা বিরক্ত হয়ে জিগ্যেস করে, 'কিরে হাসছিস কেন'? সেতু হেসে বলে; 'মা, নিজেকে কেমন আসামী আসামী লাগছে।'
বিরক্ত হতে গিয়েও হেসে ফেললেন মা।
তার এই মেয়েটা দেখতে এতো সুন্দর হয়েছে! কি মায়া কাড়া! মেয়েকে টেনে নিজের কাছে আনলেন তিনি। মাথায় একটা ফুঁ দিয়ে নিজের দেয়া নজর কাটালেন; বিড়বিড় করে বললেন 'বালাই ষাট'।
সেতু মাকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে রইলো কিছুক্ষণ। মায়ের গন্ধটা তার খুব প্রিয়। সে মনে মনে বললো, তোমাকে অনেক ভালোবাসি মা, মুখে বলতে পারিনা।
তারপর এক ঝটকায় মুখ তুলে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, 'এহ মা! তোমার গায়ে ঘামের বোঁটকা গন্ধ। বিচ্ছিরি! যাও গোসল করে এসো'।
সেতু স্কুলে চলে গেলো।
মা, হেসে অস্ফুটে বললেন, 'পাগলী'।

৩.
সেতু তার প্রিয় ট্র্যাকসুটটা খুঁজে পাচ্ছেনা। পুরো ঘর ওলট পালট করে ফেলেছে- কিন্তু কোথাও নেই।
মা...মা...
চিৎকার করে ডাকলো।
মা হাতে জামা সেলাই করছেন। তিনি এলেন।
কিরে! চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলছিস কেন? কি হয়েছে?
'মা, আমার ট্র্যাকসুটটা খুঁজে পাচ্ছিনা। আজকে হাশেম পাড়ার সাথে আমাদের ফাইনাল। সময় নেই হাতে, একটু খুঁজে দেবে মা? লক্ষী মা!'
-'ওটা আমি একজনকে দিয়ে দিয়েছি'।
-কেন মা? সেতুর চোখ বিষ্ময়ে বিষ্ফারিত! আমার এত প্রিয় ট্র্যাকসুট! তুমি কি নিষ্ঠুর মা!
মা এর চোখ অন্যদিকে ফেরানো। তাতে চিক চিক করছে পানি। মনে মনে ভাবছে, নিষ্ঠুরতার এই তো শুরু মা!
-কি হলো মা? জবাব দাও।
মা একটু সামলে নিলেন। 'তুমি আজকে খেলতে যেতে পারবেনা। যাও হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বস'।
সেতু নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেনা! নিজের মা কেও অপরিচিত লাগছে আজকে। ধপ করে বসে পড়লো সে।
-'কিন্তু মা আমি না গেলে তো আমরা হেরে যাব। ওরা সবাই তখন আমাকে দোষ দেবে'; সেতু মরিয়া হয়ে বললো।
-যা বলেছি করো। বিরক্ত করোনা।
কঠিন গলায় কথাগুলো বলে মা চলে গেলেন।
সেতু বিছানায় বসে কাঁদতে শুরু করলো। কষ্টে তার বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে। মা আমার সাথে এমন করে কথা বললো? তার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কান্নাকাটি তার স্বভাবে নেই বলে কিছুটা বিব্রত। বুকের মধ্যে জমে থাকা অভিমানটার তীব্রতায় ওর শরীর মুহূর্মুহু কেঁপে উঠছে। এই মুহূর্তে সে পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মেয়ে।
ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো সেতু। কেন জানি রাশেদ ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে তার। ওর খেলা দেখার জন্য রাশেদ ভাই সবার আগে মাঠে এসে বসে থাকতো।
চিৎকার করে বললো সে; 'তুমি খুব খারাপ মা। সবচে খারাপ!'
মা ও ঘর থেকে শুনলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। কেবল একটি দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেলো।
সেতু কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে।
চোখের কোণে শুকিয়ে আছে জলের দাগ।
বুক ভেঙ্গে যাবার মত দৃশ্য।

সীমন্তিনী (পর্ব ২)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মার্চ, ২০১৫ রাত ২:২৭
১৫টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×